শুক্রবার, ২৩ জুন, ২০১৭

বিশ্ব সংগীত দিবস ~ আর্কাদি গাইদার

আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের গ্রামগুলো থেকে যখন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের জাহাজের খোলে গাদা করে নিয়ে আসা হতো, তখন তাদের মধ্যে অর্ধেকের কিছু বেশি জীবিত অবস্থায় আমেরিকা, কিউবা বা ক্যারীবিয়ান দ্বীপগুলোতে পৌছাতো। বাকিরা জাহাজের মধ্যেই মারা যেতো। তাদের মরদেহগুলো অতলান্তিক মহাসাগরের জলে ফেলে দেওয়া হতো। অতলান্তিকের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত - এই লম্বা সমুদ্রযাত্রায় নিজেদের মনোরঞ্জনের জন্যে নাবিকরা মহিলা বন্দীদের লাগাতার ধর্ষন করতো। একবার আমেরিকায় পৌছানোর পরে পরিবারগুলোকে ভেঙে ফেলা হতো। বাবা, মা, সন্তানকে বিক্রি করে দেওয়া হতো আলাদা আলাদা মালিকের কাছে ক্রীতদাস হিসেবে। শ্বেতাঙ্গরা চিরকালই বুদ্ধিমান জাতি - তারা চেষ্টা করতো যাতে একই মালিকের কাছে এক পরিবার, এক গ্রাম, বা এক উপতাজির সদস্যরা বিক্রি না হয়। নিজেদের মধ্যে চেনাপরিচিত থাকলে, সংগঠিত হয়ে বিদ্রোহ করবার সম্ভাবনা বেশি। আলাদা আলাদা উপজাতির ভাষা আলাদা, এদের সদস্যদের বেছে বেছে আলাদা রাখলে নিজেদের মধ্যে কোনরকম যোগাযোগের মাধ্যম থাকবে না। কিছু কিছু মালিকের তাতেও ভয় যেতো না, তারা তাদের অধীনে সমস্ত ক্রীতদাসদের জীব কেটে দিতো, যাতে নিজেদের মধ্যে কথা না বলতে পারে। মালিকের প্লান্টেশনে এরা খাটতো, জীবনযাপন করতো, প্রেম করতো, বিয়ে করতো, আগামী প্রজন্মের জন্ম দিতো, তারপর দেখতো মালিক তাকে বেচে দিচ্ছে, চাবুক খেতো, গুলি খেতো। এত করেও এদের ইতিহাসকে মালিকরা মুছতে পারতো না। রাতের বেলায় সবাই জড় হতো আগুনের চারপাশে, আফ্রিকায় ফেলে আসা নিজেদের গ্রাম, নিজেদের দেব দেবী, নিজেদের ফেলে আসা মাটির প্রতি উৎসর্গ করতো নিজেদের। নেচে, গেয়ে। কেউ কারুর ভাষা বোঝে না, তাই অধিকাংশ শব্দ শুধু শব্দই থাকতো, কথা না। একটা কাঠের তক্তার দুপ্রান্তে পেরেক গেঁথে একটা তার বাধা, ফাঁপা কুমড়োর খোল, মুরগী বা ছাগল বা মানুষের হাঁড়, মাটির জগ, এই ছিলো বাদ্যযন্ত্র। সাথে ছিলো উদ্দাম নৃত্য আর গোঙানো। প্রতিদিন রাতে এই ভাবে তারা আমেরিকা থেকে পালিয়ে নিজেদের দেশ আফ্রিকায় ফিরে যেতো। এই আদিম সংগীতে আস্তে আস্তে কথা বসলো, সুর বসলো। মালিকদের ভাষাকেই আপন করলো ক্রীতদাসেরা। সেই ভাষাতেই নিজেদের গান লিখলো। ক্রোধ, ক্ষোভ, হতাশা, বিচ্ছেদ পুরোটা উজার করে বন্দী করলো গানে। জন্ম নিলো 'ব্লুজ / Blues'।
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় আমেরিকাতে ক্রীতদাস প্রথার বিলুপ্তি ঘটলো। শ্বেতাঙ্গ মালিকদের নতুন অস্ত্র আবিষ্কার করতে হলো - ধর্ম। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠলো নিগ্রোদের জন্যে আলাদা চার্চ, সেখানে নিগ্রোরা শিখলো বাইবেল, যীশু, অহিংসা, আনুগত্য। এবং শিখলো গান। চার্চের হীম থেকে নিজেরা নিজেদের মতন তৈরি করে নিলো 'গোস্পেল মিউজিক'। আস্তে আস্তে নিগ্রোদের হাতে এলো ইউরোপিয়ান বাদ্যযন্ত্র। শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের মনোরঞ্জনের জন্যে বিভিন্ন জায়গায় বিনোদনকারী হিসেবে কাজ পেলো তারা। শিখলো পিয়ানো, গীটার, ড্রাম, ভায়োলিন। এবং Blues আর Gospel এর হাত ধরে Jazz আবিষ্কার হলো। যা গোটা বিংশ শতাব্দী জুড়ে পৃথিবীকে মাতিয়ে রাখলো।
এর আশেপাশের সময়কালে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে ভারত ভুখন্ড তখন ঘটনাবহুল জায়গা। ইউরোপ থেকে একে একে বিভিন্ন জাতি পাড়ি দিয়ে ঘাঁটি গাড়ছে এই দেশে। ইংরেজ, পর্তুগীজ, ফরাঁসী, ওলন্দাজ সবাই যাত্রা করছে ভারতের পূর্ব উপকূলে বাংলা নামক এক ভুখন্ডে। সেখানে একের পর এক অঞ্চল দখল করে নিজেদের পতাকা ওড়াচ্ছে, মানুষকে পরাধীন বানাচ্ছে। আর তাদের সাথে ঝাকে ঝাকে হাজির হচ্ছে আইরিশ এবং পর্তুগীজ ক্যাথোলিক পাদ্রী। তারা চার্চ তৈরি করছে গ্রামে গ্রামে। এরকমই কোন এক সন্ধিক্ষনে গ্রামের চাষীরা ভয়ে ভয়ে চার্চের বাইরে দাঁড়িয়ে শুনছে ভেতরে সন্ধ্যেপ্রার্থনার ক্যারল। তাদের গ্রাম্য লোকগীতির থেকে তা একেবারেই আলাদা। এবং শুনতে শুনতে কখন তাদের অজান্তেই তাদের লোকগীতির সাথে মিশে যাচ্ছে আইরিশদের লোকগীতি। ভারতের অন্য প্রান্তে তখন রাজস্থানের যাযাবর উপজাতি আস্তে আস্তে যাত্রা করছে মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে দিয়ে ইউরোপের দিকে। এদেরকে কেউ বলে 'রোমা', কেউ বলে 'জীপসি'। ইউরোপে তখন আমেরিকা থেকে জ্যাজ সবে এসেছে। এই জীপসিদের হাত ধরে মিলছে একইসাথে তিনটে মহাদেশের সুর। রাজস্থানী লোকগীতির গন্ধওয়ালা Gypsy Jazz পাগল করে দিচ্ছে ইউরোপকে।
মস্কোতে এক শীতের সন্ধ্যায় লেনিন আর গোর্কি আড্ডা মারছেন। রেকর্ডে চলছে বীঠোভেনের Appasionata সোনাটা। লেনিনের চোখে জল। গোর্কি কে বললেন - 'জানো, বীঠোভেন যদি বাজানো বন্ধ না করতেন, তাহলে হয়তো আমি উঠে বিপ্লবটা শুরুই করতে পারতাম না।' হিটলার ওদিকে ঘোষনা করছেন - ' যে জার্মান ওয়াগনারকে অনুধাবন করতে পারে না, সে কোনদিন ন্যাশনাল সোশ্যালিজমকে বুঝতে পারবে না।' রিচার্ড ওয়াগনার। যার ' Ride of the Valkyries' এর নামের সাথে পরিচিত না থাকলেও বহু সিনেমার আবহসংগীত হিসেবে আপনার অতি চেনা সুর।
১৮৭১ সালে গোটা ইউরোপকে কাপিয়ে দিলো প্যারিস কমিউন। মাত্র তিনমাসের জন্যে প্যারিসের শাসনক্ষমতা চলে গেলো শ্রমজীবির মানুষের হাতে। তারপর সৈন্যদের হাতে ধ্বংস হলো কমিউন সরকার। কিন্তু আগামী কয়েক শতাব্দীর জন্যে লড়াইয়ের রসদ জুগিয়ে গেলো খেটে খাওয়া মানুষের চেতনায়। প্যারিস কমিউনের পরাজয়ের পর এই লড়াকু মানুষেরা ভাবলো, পৃথিবীর সব দেশের নিজস্ব anthem রয়েছে। আর আমরা যে দেশটার কথা ভাবি, কল্পনা করি, যার জন্যে লড়ি, যেই দেশের কোন সীমানা নেই, সমস্ত জাতি, সমস্ত ভাষাভাষির খেটে খাওয়া মানুষকে নিয়ে যে দেশটা, যার অস্তিত্ব যত্ন করে রক্ষা করা রয়েছে আমাদের মগজ এবং হৃদয়ে, তার কি কোন নিজস্ব স্তবগান থাকবে না? গান লিখতে বসলেন প্যারিস কমিউনের সৈনিক Eugene Pottier. সুর দিলেন ছুতোর মিস্ত্রী Pierre De Geyter। তৈরি হলো 'The International' - আন্তর্জাতিক। অনুবাদ করা হলো পৃথিবীর সমস্ত ভাষায়। পৃথিবীর প্রতিটি কোনে আজও মানুষের লড়াইয়ের আবহসংগীত হিসেবে বেজে চলেছে - আন্তর্জাতিক!
আমেরিকায় একটি চার্চের সম্পূর্ন অচেনা গোস্পেল - যা ধর্ম নিয়ে লেখা - তা হঠাত গাওয়া হলো সাউথ ক্যারোলিনা খনিশ্রমিকদের স্ট্রাইকে। গানটার নাম 'We Shall Overcome'. আমেরিকাজুড়ে তখন একদিকে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের জোয়ার, অন্যদিকে কৃষাঙ্গদের সিভিল রাইটস মুভমেন্ট কাপিয়ে দিচ্ছে একের পর এক শহরকে। আস্তে আস্তে সবার মুখে উচ্চরিত হলো এই গানটি। একে আরও জনপ্রিয় করে তুললো পিট সীগার এবং জোন বায়েজদের মতন শিল্পীরা, প্রতিটি জনসভা, মিটিং, পিকেট লাইনে তারা গাইতে লাগলো - আমরা করবো জয়। আস্তে আস্তে পুরো পৃথিবী শিখে ফেললো এই গানটি - 'আমরা করবো জয়'।
বিশ্ব সংগীত দিবসের শুভেচ্ছা সবাইকে। ধ্রুবজ্যোতি চক্রবর্তীর গানের দুটো লাইন ধার করলাম আজকের জন্যে।
'গান হোক, আরও গান হোক,
গান হোক, সবাই সমান হোক, 
আমাদের মন্দিরে আগামী সকালের আজান হোক।'

মার্কেট ভিজিট ১৫ ~ অভিক সরকার

গেসলুম আদিত্যদা'র কাছে! কি বললেন? কোন আদিত্য? ইক্কিরে বাওয়া,  চিনলেন না? আরে আদিত্যদা, ইউপি'র সিএম,  আরে আমাদের যোগীজী! 
মানে? 
এই দ্যাখো, ঘাবড়ে গেলেন নাকি? আরে ঘাবড়াবেন না মশাই। মানে আর কিছুই না, সামান্য এয়ার্কি কচ্ছিলুম আর কি! আমি গোরখপুর গেসলুম মার্কেট ভিজিটে, তাই একটু...আরে এই দ্যাখো, তেড়েমেড়ে আসছে কেন লোকজন? আরে উনি যে খুবই ভালোমানুষ সে কি আর জানি নে? মুক্তকন্ঠে স্বীকার করি সে কথা। যেমন সাহস, তেমন তেজোময় মূর্তি, তেমনই জ্বালাময়ী ভাষণ!  আর কি প্রশস্ত ললাট, কি অম্লানকুসুম হাসি, কি চিকনিচামেলী গাল, এককথায় কি উচ্চবংশ, ক্কি উচ্চবংশ!  
দাঁড়ান, ব্যাপারটা খুলে বলি।

সদ্য যে কম্পানিটি আমার আর আমার বউ বাচ্চার ভাত কাপড়ের দায়িত্ব নিয়েছে, তারা ভালোবেসে নিভৃতে যতনে ইস্টার্ন ইণ্ডিয়ার সঙ্গে ইস্ট ইউপিও জুড়ে দিয়েছে। আমি অবশ্য মিনমিন করে বলার চেষ্টা করছিলুম, "হাম প্রচণ্ড দুবলা হ্যায় স্যার, তাকাকে দেখিয়ে, গাল দুখানা শুকাকে আমসি হো গ্যায়া হ্যায়। উসকে উপর আমার আবার প্রচণ্ড ভূতের ভয় স্যার, আর ইউপির গোভূতগুলো যে কি জঘন্য হোতা হ্যায় স্যার যে কেয়া বোলেগা, তাড়া করনে সে  দৌড়তে দৌড়তে আমার ঠ্যাং খুল যায়েগা স্যার" ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু ভবী তো আমার এইসব নানা প্রকারে কাতর আর্তনাদে ভুললেনই না। তার উপর ভাইস প্রেসিডেন্ট লোকটা মশাই দেখলুম বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি সব ভাইসে ভর্তি! খ্যা খ্যা করে হাসতে হাসতে পেটে একটা খোঁচা মেরে বললো, " ওহে কুমড়োপটাশ, সামান্য দৌড়াদৌড়ি করলে আখেরে তোমার ভালোই হবে হে। বডিখান যা বানিয়েছো বাপু, বলি একটা আয়নায় আঁটে?"

ইনসাল্টিং না? আপনারাই বলুন।

অবশ্য পরে ভেবে দেখলুম প্রস্তাব খারাপ না। ইস্ট ইউপি বলতে লাখনৌ থেকে বেনারস আর বালিয়া পজ্জন্ত আর কি! আমিও শুনেটুনে আর আপত্তি করিনি। কম্পানি বলছে লাখনৌ থেকে বেনারস, আমি শুনছি গলৌটি কাবাব থেকে রাবড়ি! বস দেখাচ্ছে বেহরৌচ থেকে সিদ্ধার্থনগর হয়ে গোরখপুর, আমি ম্যাপে পষ্ট দেখছি আঙুল সামান্য এদিকওদিক হলেই কপিলাবস্তু  থেকে লুম্বিনী হয়ে কুশীনগর ! যাদৃশী ভাবনার্যস্য ইত্যাদি প্রভৃতি!

যাক গে। আমিও ভেবেছি গরমটা একটু কমুক, বিষ্টিটিষ্টি একটু পড়ুক, হাসি হাসি মুখে একদিন না হয় এলাহাবাদ বা বেনারসে বডি ফেলবো হপ্তাখানেকের জন্যে। আহা আমার মতন প্রতিভার সঙ্গ কি এক হপ্তার কমে কেউ পেতে চায়, বলুন? একটা 'এয়ার' নিয়ে ফ্লাইট থেকে নামবো, লোকজন গাড়িফারি হাজির থাকবে, সামান্য মার্কেট ভিজিট,  তারপর চন্নামেত্তর মতন চাট্টি উপদেশ ছিটিয়ে দিয়ে হোটেলে ফিরে রাজকীয় অভ্যর্থনা, আর কি চাই? অবস্থাগতিকে  সন্ধেবেলায় মিটিং, হোটেলরুমেই অবিশ্যি.. চাইতেই কোল্ড ড্রিঙ্কস, না চাইতেই....  হেঁ হেঁ সেসব বোঝেনই তো! 
কিন্তু ও হরি, ম্যান প্রপোজেস, ভাইগ্য ডিজপোজেস বলে ঈশপ ফেবলস না রসময় গুপ্তের কাব্যসঙ্কলনে একটা কথা আছে না? হাতেনাতে ফলে গেলো মশাই!

গোরখপুরের আমাদের একটি ডিস্ট্রিবিউটর আছেন, যিনি কিঞ্চিৎ বাহুবলী বলে বাজারে দুর্নাম আছে। এসব অবিশ্যি ওদিকে জলভাত, লোকে দুচারটে খুন করাকে গৌরবজনক বলেই মনে করে। বেয়াইমশাই চারটে খুন করেছেন, আর উনি নিজে মাত্তর দুটো, এ দুর্নাম ঘোচাবার জন্যে মেয়ের বাপ মেয়ের বিয়ের আগে নিজের 'ওজন' বাড়াতে অনিচ্ছাসত্ত্বেও নেহাৎ বাধ্য হয়েই আরও দুটো খুন করেছে এসব স্বচক্ষে দেখা, স্বকর্ণে শোনা ("চারগো হাম ভি কিয়ে হ্যাঁয়, হাম কিসিসে কম হ্যায় কা রে বাবুয়া?")।   কলকাতায় যেমন মিষ্টির দোকান, ইউপি বড় বড় শহরে তেমন বন্দুকের দোকান। আর শুধু কি 'দম্বুক'? ওয়ান শটার, তামাঞ্চা, দেসি কাট্টা, রামপুরিয়া...ভ্যারাইটি আর অ্যাসর্টমেন্ট দেখলে চোখ টেরিয়ে যাবে মশাই!  আর দুচারটে নীচু জাতের দোসাদ বা চামার বা কুর্মি মারলে ওখানে ওসব তেমন দোষের বলে ধরা হয় না, "অ্যাঃ,  টিকটিকি" বলে কাটিয়ে দেয়।

তা আমাদের ডিস্ট্রিবিউটরটি বছরখানেক বেগড়বাঁই করছেন খুবই। বাহুবলী বলে কেউ বিশেষ কিছু বলতেও সাহস পায় না। আরে মশাই, যে লোকটা দশ বছর আগে গোরখপুরে দশ হাজার টাকা দিয়ে পানের দোকান খুলেছিলো, আজ সে আড়াইশো কোটি টাকার সাম্রাজ্যের মালিক, তার কুছ তো ইজ্জত করো গে কে নেহি, হাঁয়? 
তা গত মাসে বাবুর ষাট লাখ টাকা টার্গেট ছিলো। তিনি বলে পাঠালেন যে তিনি পাঁচ লাখের বেশি করবেন না, তাঁর নাকি মুড নেই! তাতে আমি সবিনয়পূর্বক ফোন তুলে বল্লুম যে যেহেতু আমার বাবা এই ব্যবসায় নেই, তাই তাঁর পক্ষে বাকি পঞ্চান্ন লাখের ভরপাই করা তো সম্ভব হবে না রে ভাই! তোর মুড নেই শুনে দুঃখ পেয়েছি খুবই। তবে কিনা  বড় মানুষের মুড, পালিয়ে আর যাবে কোথায়, কাছেপিঠেই আছে কোথাও। তাকে একটু খুঁজেপেতে এনে অর্ডারটা দিতে হচ্চে যে কত্তা!  তাতে উনি বললেন যে এভাবে কাজ করতে উনি অভ্যস্ত নন। আমি মশাই পোচ্চণ্ড বিনয়ী ম্যান, তাঁর অভ্যেসের সবিশেষ প্রশংসা করে বল্লুম তাহলে আর কি, পেয়েছি ছুটি বিদায় দেহো ভাই, ব্যবসা আমি অন্যত্র লইয়া যাই!

দুদিন পরে মহাসিন্ধুর ওপার থেকে আমারই সেলস টিমের আর্তনাদ ভেসে এলো, সে বাবু নাকি পিস্তলটিস্তল দেখিয়ে আমার ছেলেছোকরাদের সামান্য চমকেছেন। এখানে স্বীকার করতে আমি বাধ্য যে পিস্তল জিনিসটা শরীরের পক্ষে খুবই উপকারী, ওতে অজ্ঞান নাশ হয়,  শুভবুদ্ধির উদয় ঘটে, পিত্ত থেকে চিত্তবিকার অবধি ক্যুইক সেরে যায়, আর দ্রুত কর্মক্ষমতা বাড়ানোর ব্যাপারে তো লাজবাব! কিন্তু আমি মাইরি সেলসটিমগতপ্রাণাং, তন্নামশ্রবণপ্রিয়াং, মানে বাংলায় বলতে গেলে তাদের কান্নাকাটি মোটে সইতে পারিনে। ফলে দিন চারেক আগের এক দুপুরবেলা 'পূর্বাঞ্চল এক্সপ্রেস' নামের একটি অতি খাজা ট্রেনে চড়ে বসতে বাধ্য হলাম।

পুর্বাঞ্চল এক্সপ্রেস একটি অতি বেয়াক্কেলে ট্রেন মশাই, এই বারণ করে দিলুম, ঘুণাক্ষরেও চড়বেন না। একে প্যান্ট্রি নাই, তার ওপর যেমন জঘন্য সার্ভিস, তেমনই নোংরা টয়লেট!  সে যাই হোক, অশেষ নরকযন্ত্রণা ভোগ করে, গোরখপুর পৌঁছে, সেই মহামহিম বাহুবলীটির সঙ্গে মিটিং করে, তারই কথার জালে তাকে পেড়ে ফেলে, তৎক্ষণাৎ তাকে স্যাক করে, পরের দিন একখান ইনোভা গাড়িতে বেনারস পৌঁছবো বলে উঠে পড়লুম। সে বেচারা বুঝলোই না কোথা হইতে কি হইয়া গেলো, দস্যু মোহন কি করিয়া যেন তাহারই টুপি তাহাকেই পরাইয়া গেলো! 
বেনারস আমার প্রিয় শহর, এখানেই একবার নাম বিভ্রাটে আমার এক মর্মান্তিক দুঃখভোগ ঘটেছিলো ( মার্কেট ভিজিট ৩ অবলোকন করহ), তদসত্বেও আমি এ শহরের চার্ম থেকে মুক্ত হতে পারিনি। কিছু কিছু শহর গেলেই আমার বড় আপন মনে হয়, যেমন পুনে, যেমন জলপাইগুড়ি, যেমন ভাইজ্যাগ, তেমনই বেনারস। কিন্তু এবার সময় বড় কম ছিলো, ঘন্টা ছয়েকের মধ্যে মার্কেট ভিজিট ও ডিস্ট্রিবিউটার্স মিট সেরে রাতে চড়ে বসলুম কলকাতাগামী একটি ট্রেনে।

আর সেখানেই তেনাকে দেখলুম।

রাতের ট্রেন। আমি দিব্য আমার প্যাকড ডিনার এবং ব্যাগপত্তর নিয়ে আমার  লোয়ার বার্থের সিটটিতে বেশ আয়েশ করে বসেছি। খানিকক্ষণ বাদেই এক মোটাসোটা গোলগাল হাফপ্যান্ট পরিহিত, সোনালি রিমলেস চশমা পরিহিত,  ফ্রেঞ্চকাট শোভিত এক ভদ্রলোক, তাঁরই সুন্দরী সুতনুকা স্ত্রী এবং সাক্ষাৎ তেনাকে সমভিব্যাহারে এসে আমার সামনের সিটটি অধিগ্রহণ করলেন!

তেনার হাইট চার ফুটের মতন, বয়েস পাঁচ বছর, পরনে মিষ্টি একটি বেবি পিঙ্ক ফ্রক, এবং একগাদা চুল মাথায় ঝুঁটি করে বাঁধা। তিনি এসেই প্যাসেজের মধ্যে দুদিকের দুটি লোহার হ্যাণ্ডেল পাকড়ে ( যা বেয়ে লোক ওপরের বার্থে ওঠে) ঝুলতে লাগলেন। তাঁর মাতৃদেবী তাতে হাঁ হাঁ করে উঠলে তিনি সলজ্জ মুখে জবাব দিলেন "ব্যায়াম কচ্চি তো"। বলাবাহুল্য, অমন ব্যায়ামে লোকজনের চলাচলের বিলক্ষণ অসুবিধা হচ্ছিলোই, ফলত তেনার মা তাঁর কান পাকড়ে তাঁকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন, কিন্তু হা হতোস্মি! তিনি মায়ের কোল থেকে নেমে ফের সেই প্যাসেজের মুখে দাঁড়িয়ে প্যাসেজ পেরিয়ে যাতায়াতকারী সব্বার কাছে, "টিকিট,  টিকিট দিজিয়ে" বলে টিকিট দাবি করতে লাগলেন। যাত্রীরা ফিক করে হেসে তেনার গালে হাত দিয়ে একটি করে টিকেটের দাবি মিটিয়ে চলে যেতে লাগলেন। মাতৃদেবী হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, "এই শুরু হলো!"

বুঝলাম,  একটি যন্ত্র ট্রেনে উঠিয়াছেন বটেক!

তা ট্রেন চলতে তিনি খানিকক্ষণ "ও বাবা, বোর হচ্চি তো, ও মা, স্টোন পেপার সিজার খেলো না" বলে ঘ্যান ঘ্যান করে বুঝলেন যে সে লাইনে জুত হচ্ছে না।পিতৃদেব একটি ম্যাগাজিন বার করে ঘুমোতে লাগলেন, মাতৃদেবী চোখ বুঝে বোধহয় কিঞ্চিৎ জিরিয়ে নিয়ে লাগলেন, তাঁর ফুররফুৎ নাসিকাধ্বনিতে মালুম হলো তিনি এই ছুরি পাথরের জগতের মধ্যে আর নেই। তাতে কি এই ক্ষুদ্র লক্ষ্মীবাইটিকে আর থামানো যায় মশাই? তিনি খানিকক্ষণ  আমার দিকে জুলজুল করে চেয়ে রইলেন, তারপর তারপর কথা নেই বার্তা নেই রীতিমতো দাঁত বার করে ইঁ ইঁ ইঁ করে ভয় দেখাতে লাগলেন! আমিও তো "আমি কি ডরাই সখী" বলে তেড়েমেড়ে দাঁত বার করে, দুই কানের পাশে দুই হাত নিয়ে গিয়ে বিচ্ছিরি ভাবে নাড়িয়ে খুবই ভয় দেখাতে লাগলুম। তিনি আমাকে বক দেখালেন, আমি তাঁকে কাক দেখালুম। তিনি ঘোর্ৎ করলেন, আমি ঘুঁৎ করলুম। শেষে তিনি হেসে ফেলে দয়ার্দ্র কন্ঠে বললেন, "তুমি দেখছি কিচ্ছু জানো না, হিঁ.. ওই ভাবে আমার ভয় লাগে নাকি?" জিজ্ঞেস করলুম, "তা তোমার কিসে ভয় লাগে?" তিনি খানিকক্ষণ ভাবলেন, তারপর ঠোঁট বেঁকিয়ে বললেন "ভূতের সিনেমা, ইঞ্জেকশন আর পড়ার আন্টি"। 
বলা বাহুল্য, এরপর অট্টহাস্য করা ছাড়া উপায় থাকে না।

আমার মৃদুকন্ঠের মিষ্টালাপেই নাকি মুমূর্ষু রোগী রোগশয্যা থেকে উঠে বসে ট্রেকিং কিংবা তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে পড়ে, অন্তত  আমাদের ফ্যামিলিতে তো তেমনই  প্রবাদ। বাকিদের ছেড়ে দিন, স্বয়ং আমার গিন্নি তো প্রকাশ্য আদালতে দাঁড়িয়ে তামা তুলসী হাতে এই বক্তব্যে সায় দেবেন!  তা সেই অট্টহাস্যে ট্রেনটা সামান্য থরথর কেঁপে উঠে দ্বিগুণ জোরে ছুটতে লাগলো। তেনার বাবা মা দুজনেই জেগে উঠে খানিকক্ষণ থুম মেরে বসে রইলেন, তারপর সকাতরে আমার দিকে চেয়ে বললেন, "আপনার সঙ্গে খুব দুষ্টুমি করছে, না?"

যার নিজের মেয়ের বয়েস আট, সে পঞ্চমবর্ষীয়া একটি বালিকার অসীম অত্যাচারে ঠিক কতটা বিচলিত হতে পারে সে আপনারা জানেনই ! আমি সজোরে ঘাড় নেড়ে বল্লুম, "কৈ, না তো!"

কিন্তু তিনি কোথায়?

খেয়াল হলো যে এরপর তিনি নেমে পরে একবার তাঁর বর্তমান সাম্রাজ্য, মানে সমস্ত কামরাটি সরেজমিনে তদন্ত করতে বেরিয়েছেন। শুধু কি তদন্ত?  প্রত্যেককে ডেকে ডেকে "হ্যাল্লো আঙ্কেল, হোয়াটস ইওর নেম? হ্যলো আন্টি হোয়াটস ইওর নেম? হোয়ের ডু ইউ স্টে, হুইচ স্কুল ইউ রিড ইন" ইত্যাদি বলে সবাকার তত্ত্বতালাশ নিয়ে সে প্রায় সি আই ডি ডিপার্টমেন্ট খুলে ফেলেন আর কি। তার ওপর আরও অন্য এক রগড়। ঠিক আমাদের পাশে কম্পার্টমেন্টে যাচ্ছিলেন এক 'এম্লেসাহিব',  মানে জনৈক বিধায়ক মহোদয়। তা পৃথিবীর এই অংশে সমস্ত সরকারি বাবুলোগ, মানে আর্দালি ও চাপরাশি অবধি যা সমাদর পেয়ে থাকেন, তা সভ্য দুনিয়াতে বড় বড় 'অফসর'দের কপালে তা মুশকিলহি নেহি, একদম না মুমকিনভি হ্যায়।  এই অম্লসাহিবটিও তিন চারজন পুলিশ প্রহরাবেষ্টিত হয়ে, খানচারেক মোসাহেব ও চামচা সমভিব্যাহারে রাজপাট জাঁকিয়ে বসেছিলেন প্রায়। অকস্মাৎ সেই রাজ্যপাটে  ভদ্রমহোদয়ার ব্লিৎজক্রিগ! তিনি সপাট গিয়ে এম্লেসাহিবের প্রায় কোলে উঠে প্রশ্ন করলেন, " হোয়াটস ইওর নেম?" 
ভদ্রলোকের চোখ প্রায় গোলগোল হয়ে কপালে উঠে যাচ্ছিল আর কি!  ওঁরই এলাকায় ওঁকে নামধাম জিজ্ঞেস করে, হ্যার ঘাড়ে কয়ডা মাথা! কিন্তু প্রশ্নকর্ত্রীর হাইট দেখে বুঝলেন কেসটা কি! তারপর দুজনে মিলে অনেকানেক ভব্য আলোচনান্তে, দুজনেই দুজনকে মাঝেমধ্যে কল করবেন এমন প্রতিশ্রুতি আদায় করে ইনি ফের নিজের রাজপাটে ফিরে এলেন।

কিন্তু চলে এলেই তো আর হলো না মশাই। সামান্য এন্টারটেইনমেন্ট না হলে রাজারাজড়াদের মনই  বা উঠবে কি করে বলুন? এখন ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো সেই আমি। দুর্ভাগ্যক্রমে সেই সময় আমি একটি রহস্যোপন্যাসে ডুবে ছিলুম। তিনি খানিকক্ষণ আমাকে অভিনিবেশ সহকারে পর্যবেক্ষণ করে প্রশ্নবাণ ছুঁড়লেন, "তোমাকে সামার হলিডেতে খুব হোমটাস্ক দিয়েছে, তাই না?"
দ্রুত একমত হয়ে পড়ি, তদুপরি মুখখানা খুবই কাঁদোকাঁদো করে রাখতে হয়, "সে তো বটেই, একগাদা হোমটাস্ক, তার ওপরে প্রোজেক্ট ওয়ার্ক, তারও ওপরে একগাদা সামেশন আর সাবস্ট্রাকশন, আর আমাদের স্কুল টীচার কি স্ট্রিক্ট কি বলবো কি বলবো, ইয়া ম্মোটা ম্মোটা স্কেল দিয়ে...." আমার গলা থেকে হাহাকার ঝরে পড়ে, সেই আগত দুর্ভোগের চিন্তায় ব্যাকুল কান্নার শুনে পাথরও গলে যেতে বাধ্য, আর ভক্তের কান্নায় ভগবান দ্রবীভূত না হলে শাস্ত্র টাস্ত্র সব মিথ্যে , মুনি ঋষিরা সেইরকমই বলে গেছেন শুনেছি না? তেনারও চোখটা ছলছল করে এলো বোধহয়, আমার পাশে বসে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সান্ত্বনা দেন, "আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে, ম্যাথসটা না হয় আমি হেল্প করে দেবো, কেমন? আমাদের তো সামেশন শেখাচ্ছে এখন!"

এত বড় আশ্বাসের পরেও যে খুশিতে মাতোয়ারা হয়ে যে না ওঠে  স্বীকার করতেই হয় যে সে ব্যাটা এক্কেরে ঘোর পাষণ্ড বিভীষণ! ফলে বইটই বন্ধ করে হাঁটু মুড়ে সিটের ওপর গুছিয়ে বসতেই হলো, আলাপ পরিচয়টা সেরে ফেলি, এই ছিলো মতলব!
"তোমার নাম কি শুনি? 
"মৌটুসি। তোমার নাম কিইইইই?"
"উমমম আমার নাম কুমড়োপটাশ বকবকম"।
"ইশশশশ, মিথ্যেবাদী। কুমড়োপটাশ কারও নাম হয় নাকি?" 
"হয় হয় যানতি পারো না। আচ্ছা তুমি কোথায় থাকো মৌটুসি?" 
" আমি তো খিদিরপুরে থাকি। তুমি?"
দিব্য মজা লাগছিলো, বানিয়ে বানিয়ে বললাম, "আমিও খিদিরপুরে থাকি, হুমহুম, তাই তো তোমাকে চেনা চেনা লাগছে। তোমাদের বাড়িতে একটা বুদ্ধুভুতুম থাকে না?"
" ইসশশ, তুমি কি মিথ্যুক, কি মিথ্যুক গো! আমাদের ক্লাসের বিভানও এত মিথ্যে বলে না। তুমি তো হাওড়ায় থাকো"।
চমৎকৃত হই, সামনে স্বয়ং হারমাইওনি গ্র‍্যাঞ্জার সশরীরে নাকি?, "কি করে বুঝলে?"
"হি হি হি হি,  তোমাকে কেমন হাওড়া হাওড়া দেখতে!"

স্তম্ভিত হওয়ার কিছু বাকি থাকে না আর, সত্যি বলেছে বলে খুশি হবো, নাকি রেসিস্ট কমেন্ট বলে ক্ষোভে ফেটে পড়ে  ফেসবুকে স্টেটাস দেবো বুঝে উঠতে পারি না। ওদিক থেকে মহোদয়ার মাতৃদেবীর কাংস্যনিন্দিত কণ্ঠস্বর শোনা যায়, "ছি মামমাম, ওসব কি বাজে কথা? বারণ করেছি না ওরকম বলতে?" 
আমি কাষ্ঠহাসি হেসে বলি, "না না ঠিক আছে, বাচ্চা তো, হেঁ হেঁ ", এই বলে ফের  অটল ধৈর্যের সঙ্গে আলাপ জমাতে ব্রতী হই, " আচ্ছা, তোমাদের স্কুলে কী কী পড়ায়?" 
তিনি ভাবুক ও স্বপ্নালু চোখে অনেক্ষণ উর্ধ্বনেত্র হয়ে থাকেন, তারপর ক্ষীণ স্বরে শুরু করেন, " ম্যাথস, ইংলিশ, বেঙ্গলি, সায়েন্স..." এরপরে ভাণ্ডার ফুরিয়ে যায়, তিনি গভীর চিন্তার সঙ্গে কর গুনতে থাকেন। আমারও মায়া হয়, আহা, এই বয়সে আর কত কিই বা শিখবে বলুন তো? সময় তো পড়ে আছেই সামনে,অত্ত তাড়াহুড়ো কিসের অ্যাঁ?  অতএব অন্য প্রশ্নে যেতে হয়, "তোমার বেস্ট ফ্রেণ্ড কে?" 
"স্কুলে না বাড়িতে?"

তাই তো! এই বয়সে এসে যখন চারিদিকে তাকিয়ে দেখি শুধু ঈর্ষাকাতর সহকর্মী আর কাঠিচালনায় বীরোত্তমকেশরী প্রতিবেশীদের, তখন ভুলেই যাই শিশু বয়সে আমারও কিছু বন্ধু ছিলো, তাদেরও আমরা স্কুলের বন্ধু আর পাড়ার বন্ধুতে ভাগ করতাম। তখন ছোট শরীরে বড় মন ছিলো, সর্বত্র বন্ধু খুঁজে পেতাম, আর এখন?

"আচ্ছা, দুটোই বলো"
"স্কুলে প্রেরণা আর সানা। আর সোসাইটিতে সানিয়া আর ফারহা। মল্লিকা আর ঈশানীও ফ্রেন্ড বটে,  কিন্তু বেস্ট ফ্রেণ্ড না। মানে প্রেরণার মত বেস্ট ফ্রেণ্ড না। তবে আইশরইয়ার থেকে বেশি ফ্রেণ্ড। তবে ঈশানী যতটা ফ্রেণ্ড আইশরইয়া তার থেকে বেশি ফ্রেণ্ড। মল্লিকা আর সানিয়াকে তুমি সেম সেম ধরতে পারো। তবে সত্যি করে বলতে গেলে কিন্তু ফৌজিয়াও আবার গুড ফ্রেণ্ডসদের মধ্যে আছে, বুঝলে? ধরো আইশরইয়া আর মল্লিকার থেকে বেশি, কিন্তু ফারহার মতন অতটা নয়...."

ঈশ্বর পরম কারুণিক, বেশিক্ষণ এই ক্লাসিফিকেশন আর পেকিং অর্ডার শুনতে হলে মাইরি অজ্ঞান হয়ে যেতুম, জিএসটি বিলের সাবক্লজ বোঝা বরং এর থেকে ঢের সহজ। এর অর্ধেক মেহনতে শার্লক হোমসের নতুন সিরিজ বার করা যায়, হ্যারি পটার তিনবার নতুন করে লেখা যায়, গেম অফ থ্রোন্সের জি বাংলা ভার্শান বার করা যায় (টিরিয়ন ল্যানিস্টারের চরিত্রে রুদ্রনীল!)।  আমি খানিকক্ষণ শিবনেত্র হয়ে তাকিয়েছিলুম, হাফ বোতল হুইস্কি সাবড়ে তার ওপর দু'পুরিয়া গাঁজা মারলে ওর থেকে বেশি হ্যাল হওয়া সম্ভব না। পরে ধাতস্থ হতে দেখি তিনি আমার কেনা চানাচুরের প্যাকেটটি খুলে খুবই মন দিয়ে সেটি সাফ করার চেষ্টায় আছেন। সেদিকে খুবই করুণ চোখে তাকাতে ( স্প্রাইটে হাফ হাফ করে মিশিয়ে বাকার্ডি এনেছিলুম বটে। এখন বিনা চানাচুরে কি করে ... থাক এযাত্রা  বোধহয় বাড়িতে গিয়েই...),  তিনি দয়াপরবশ হয়ে বললেন, "তুমিও একটু খাবে নাকি? দেখো, খুব ঝাল কিন্তু"! এই বলে সামান্য প্রসাদ আমার হাতে দিলেন। আমিও বুভুক্ষুর মতন মায়ের প্রসাদ, যা পাওয়া যায় তাই ভালো, ভেবে গালে চালান করে দিলুম। তারপর আড়চোখে আরেকবার চাইতেই তিনি চোখ পাকিয়ে বললেন "খুব ঝাল বল্লুম যে, আবার চাইছো? তোমার মা বলেনি যে গ্রিডি হওয়া ভালো নয়? "
এরপর আরেকটু চানাচুর চায়, এমন সাহস কার? আমিই বা কোন বাহুবলী হে? হাত  চাটতে চাটতে জুলজুল করে চেয়ে রইলাম, আর তিনি প্যাকেটটা শেষ করে হু হা করতে করতে তাঁর জন্যে নির্দিষ্ট বোতল থেকে আধ বোতল জল সাবাড় করে দিলেন। আমি আর কি করি, অগত্যা হতাশ্বাস হয়ে ফের একেনবাবু খুলে বসেছি, ( আহা, সুজন দাশগুপ্ত মহাশয়ের জয় হউক),  তিনি দেখি ফের কাছে ঘেঁষে এলেন, "তোমার আরও খেতে ইচ্ছে করছিলো, তাই না?" 
ছোট্টবেলা থেকে শিখেছিলাম মিথ্যে বলা পাপ, তাই দ্রুত ঘাড় নাড়িয়ে সম্মত হলাম। 
ও ম্মা, এইটে শোনামাত্র তিনি দেখি গুটিগুটি পায়ে গিয়ে তেনার মায়ের পাশ থেকে একটা এত্তবড় হলুদ রঙের প্যাকেট বার করলেন, মুখে সলজ্জ হাসি। ওটা কি রে? ত্তাই ব্বলো, একটা আস্ত পট্যাটো চিপসের প্যাকেট! এইটে না বার করে আপনি আমারই চানাচুর আমাকেই দয়াদাক্ষিণ্য করে দিয়ে.... কি নিষ্ঠুর কি নিষ্ঠুর...

তিনি সন্তর্পণে প্যাকেটটা ছিঁড়লেন, যাতে আওয়াজ তেনার মায়ের কানে না যায়। তাঁর সেই চার্লস শোভরাজকে লজ্জা দেওয়া সূক্ষ্ম হাতের কাজ দেখে মালুম হয় যে একাজে তিনি রীতিমতো দক্ষ...শশশ্ করে অবশ্য আওয়াজও করলেন আমার মতন বুরবককে সতর্ক করার জন্যে ... তারপর ... তারপর... তারপর... ভাবতেও জিভে লাল গড়াচ্ছে.. লিখতেও এই পাতি কলমচির আঙুলগুলি শিহরিত হচ্ছে...তিনি একটি মাত্র চিপস তুলে, সেটি ভেঙে এক চতুর্থাংশ মাত্র আমার হাতে দিয়ে অত্যন্ত গম্ভীরভাবে  বললেন যে, " বেশি চিপস খেলে পেট ব্যাথা করে, তোমার মা তোমায় বলেনি?" এই বলে তিনি একমুঠো চিপস নিজের মুখের মধ্যে পুরে কড়মড় করে চিবোতে চিবোতে আমার দিকে সপ্রশ্ন চোখে চেয়ে রইলেন। আমিও সমুদ্রশোষণকারী অগস্ত্যকে চামচে করে জল খেতে দেওয়া হয়েছে এমন মুখ করে আঙুল চেটেচুটে বসে রইলুম।

বল্লাম না, মায়ের প্রসাদ, যা পাওয়া যায় তাইই ভালো!

এরপর অনেক রাত হয়েছে, এই বিধায় আমি আমার সিটে বিছানা বিছোতে লাগলুম, এরপর খেয়ে দেয়ে শোবো এই অভিপ্রায়। আমার দেখাদেখি এঁর মা'ও তাঁদের বিছানা তৈরি করতে লাগলেন। তিনিও অবশ্য সোৎসাহে তাঁর মা'কে সেই পুণ্যকর্মে সহায়তা করতে লাগলেন। মাতৃদেবী যথারীতি বিস্তর বিরক্ত হচ্ছিলেন। এখন কাজ এবং আকাজের মধ্যে এক্স্যাক্টলি কি পার্থক্য সেই নিয়ে ভিন্নরুচির্হি লোকাঃ বলে একটা ভারী দামি কথা আছে। মুশকিল হচ্ছে যে বড়রা কথাটা একদম মানতে চান না।।ফলে তেনার পিঠে উপর্যুপরি দুইবার দুম দুম করে কার্পেট বম্বিং হওয়ার পর তিনি গম্ভীর মুখে যেন ডানকার্কের সেই বন্দর থেকে, "গ্লোরিয়াস রিট্রিট" করে ফের আমার কাছে ফিরে এলেন।
তিনি গম্ভীর মুখে বসে আছেন দেখে সামান্য মায়া হলো। আরেকটু কাছে ঘেঁষে এলাম, 
" তোমরা কোথায় গেছিলে মৌটুসি"।
" এলাহাবাদ", অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত উত্তর, যা লোকে সচরাচর ক্ষিপ্ত হলেই দেয়।
"ইয়ে, ঘুরতে?" প্রশ্নটা করা সঙ্গত হলো কি না বুঝলাম না।
"আঙ্কলের বিয়ে"। নাহ, বুঝলাম, ন্যায়শাস্ত্রে যে বলে পর্বতো বহ্নিমান ধূমাৎ, এই সেই ধূম! অবশ্য পিঠে দুম করে পড়লে... 
"হুমম। তা মৌটুসি, তুমি ঘুরতে যেতে ভালোবাসো?
"হুঁ"। 
"বাহ বাহ। তা এবার সামার হলিডেতে কোথাও ঘুরতে গেছিলে তোমার?"
"না। সামার তো শেষই হয়ে গেলো।"
যাক, মনোসিলেবলের গেরোটা কেটেছে। জ্জয়ক্কালী। হাত দিয়ে ঘাম মুছে অতি সন্তর্পণে পরের প্রশ্নে যাই। 
" তা দুর্গাপুজোতে কোথায় যাচ্ছ তোমরা?"
" এইবার? দার্জিলিং ", এইবার খুশিতে মুখটা ঝলমল করে উঠলো, যেন সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় উড়ে গেলো একঝাঁক রঙীন প্রজাপতির দল। আহা, কে  লিখেছিলেন গো, মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি? "আমি, আমরা সবাই, আর সানিয়া আর ফারহা আর সানিয়া ফারহার পেরেন্টসরা, আর.."

"সে কি? তুমি দুর্গাপুজোতে কলকাতায় থাকবে না?" ছদ্মবিষ্ময়ে বলি।

"না তো,  আমরা প্রত্যেকবার কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাই। লাস্ট ইয়ার কেরালা গেছিলাম। পরের বছর কুলু মানালি যাবো। তাই না মা?" তিনি সমর্থন খোঁজার জন্যে ওদিকে ফেরেন।

" মৌ, আঙ্কলকে ঘুমোতে দাও এবার। অনেক বকবক করেছো, খাবে এসো, খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ো",  মাতৃদেবীর কড়া নির্দেশ ভেসে আসে। দেখতে পাই ওদিকে ডিনার প্যাক খোলা হয়ে গেছে।

অগত্যা, তিনি গুটিগুটি পায়ে অগ্রসর হন, ফিসফিস করে বলেন, "আচ্ছা, দুগগা ঠাকুরের দশটা হাত, আর কি বড় বড় চোখ, আমাদের হেডমিস্ট্রেসের মতন। তোমার ভয় করেনা?"

রাত দশটায় পাঁচ বছরের শিশুকে মা দুর্গার দশপ্রহরণধারণের তাত্ত্বিক ব্যাখা শোনানোটা নেহাৎ চাইল্ড অ্যাবিউজ হয়ে যাবে বলে নিজেকে শাসন করতে বাধ্য হই। খেয়েদেয়ে, পর্দাটা টেনে দিয়ে মোবাইলে 'অয়ি গিরিনন্দিনী' শুনতে শুনতে গভীর ঘুম।

পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙলো দেরিতে, তাও তিনি আমার চুল ধরে টানছিলেন বলে। উঠেই দেখি কামরায় একটা ব্যস্ত হুড়োহুড়ির ভাব, সবাই তৈরি হচ্ছেন নামার জন্যে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি ডানকুনি ক্রস করে যাচ্ছে ট্রেন, মানে আর আধঘণ্টার মধ্যে হাওড়া পৌঁছবো। তড়াক করে উঠে  বেসিনে গিয়ে চোখেমুখে জল দিয়ে আসি। ফিরে এসে সিটে বসে জুতো পরছি, এমন সময় তিনি এলেন, এসেই চ্যালেঞ্জের সুরে, " কাল তুমি আমাকে তো বললে না তুমি কোথায় থাকো?" 
গালটা টিপে দিয়ে বলি, " আমি লেকটাউনে থাকি মৌ। কেন তুমি কি আমাদের বাড়ি আসবে?" 
খানিকক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তিনি কি ভাবেন, তারপর বলেন, "আগে তুমি আমাদের বাড়িতে এসো, তারপর ভেবে দেখছি।" সেই গুরুগম্ভীর গিন্নিবান্নী হাবভাব দেখে এবার ফিক করে হেসে ফেলি, "আচ্ছা তোমাদের বাড়ি কি করে যেতে হয় বলো, দেখি। আমি অ্যড্রেসটা নোট করে নিই। বলো, " বলে মিছিমিছি কিছু টাইপ করার ভঙ্গিতে মোবাইল বাগিয়ে ধরি। তিনিও বলতে থাকেন, "লিখে নাও, ভালো নাম শবনম আখতার, ডাক নাম মৌটুসি, খিদিরপুর সেকেন্ড বাই লেন, বাড়ির নাম পার্ক প্যালেস, আর আমার নাম করলেই সব্বাই দেখিয়ে দেবে, না চিনলে বলবে মোগলি যাদের বাড়ি থাকে। ও তোমাকে মোগলির কথা কিছু বলিনি, না? মোগলি হচ্ছে আমাদের সোসাইটির সওওওবচেয়ে কিউট বেড়াল। লেজখানা তো দেখোনি, এই ইয়্যাত্তোবড়....."

কোথাও কি সূক্ষ্ম কিছু ঘটে গেলো আমার মধ্যে? মানে নামটা শোনামাত্র কি এই নিষ্পাপ অপাপবিদ্ধ শিশুটির যে চারিত্রিক অবয়ব আমার চেতনায় ও ইন্দ্রিয়ে ছিলো, তাতে কি আমারই অবচেতন মন থেকে অনাবশ্যক কিছু রঙের ছিটে এসে পড়লো? কোথাও কি সামান্য হলে, অতি সামান্য হলেও একটা অস্বচ্ছন্দ দূরত্ব তৈরি হলো? মানে যদি সত্যিই এর নাম মৌটুসিই হতো, পদবী হতো মুখার্জি কি মণ্ডল,নিদেনপক্ষে গঞ্জালভেস কি কউর, তাহলে কি আমার এই যে হঠাতই "ও আচ্ছা, মেয়েটা মুসলিম?" চিন্তাটা মাথায় আসতো?

না, বোধহয় আসতো না। কোথায় যেন আমরা দুপক্ষই একে অন্যকে অন্যভাবে দেখাটা অভ্যেস করে ফেলেছি। এ দায় কার কে জানে!

জোর করে এই অস্বস্তিকর চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছি, এমন সময় আরেকটা চিন্তা মাথায় উদয় হলো, ও আচ্ছা, মুসলিম ফ্যামিলি। তাই দুর্গাপুজোয় কলকাতায় থাকে না, তাই মা দুর্গাকে দশ হাতে অত ভয়ঙ্কর লাগে তাই না?

এবং মুহূর্তের মধ্যেই বুকের ভেতরে বসে থাকা আদ্যন্ত মদ্যপ, খিস্তিবাজ, লজিক্যাল, এবং কাউকে রেয়াত না করা কিঞ্চিৎ উদ্ধত লোকটা বলে উঠলো, "বটে? তোমার মামাশ্বশুররা যে গুষ্টিসুদ্ধ ফিবছর পুজোতে বেড়াতে যায় তার বেলা? আর এর পদবী আখতার বলে বিচার করছো দুগগাঠাকুরকে কি বললো, বলি তোমার নিজের মেয়ে গত বছর ভদ্রমহিলাকে পলিগন বলে ডেকেছিলো, সে কথাটা মনে আছে?"

খানিকক্ষণ মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিলাম। না হে, ভুলই করছিলাম বোধহয়, বুদ্ধিশুদ্ধি সোজা রাখা খুবই জরুরি,খারাপকে খারাপই বলতে হয়, কিন্তু  ঘণ্টাকর্ণ হওয়াটা কোনও কাজের কথা নয়।

এমন সব ভাবছি, এমন সময় তিনি খুবই অন্তরঙ্গ ভাবে এসে কোলে উঠে বললেন, "শোনো না, তুমি এলে সাতাশ তারিখে এসো কেমন? মানে ঈদের দিন এসো বুঝলে? অনেক রান্নাবান্না হবে তো, আর তুমি যা হ্যাংলা..হি হিহি...আর শোনো, তোমার সঙ্গে ফারহা সানিয়া মল্লিকা ঈশানী এদের সঙ্গে ফ্রেণ্ডশিপ করিয়ে দেবো, কেমন?  তোমারও অনেকগুলো নতুন ফ্রেণ্ড হয়ে যাবে, তাই না?"
এমন লাভজনক প্রস্তাবে একমত হবো না এমন পাষণ্ড এখনও হইনি, ফলে দ্রুত সম্মতি দিয়ে ফেলি। তারপর কি একটা মনে পড়ে যেতে ফিসিফিসিয়ে জিজ্ঞেস করি, "আচ্ছা মৌটুসি, তুমি ঈদে ঈদী কি নেবে?"
তিনি অপাঙ্গে মায়ের দিকে চেয়ে নেন, তারপর আরও ফিসফিস করে বলেন, "অ্যানা আর এলসার দুটো ডল এনো কেমন?", বলেই চকাম করে একটা হামি খেয়ে ফেলেন! চোখ বুজে সেই হামি উপভোগ করতে থাকি, একটা মিষ্টি দুধেদাঁতের শিশুগন্ধ বুকের মধ্যে নরম অমাভুক জ্যোৎস্নার মতই ছেয়ে যায়। কচি গলায় কে যেন ভেতরে বলে ওঠে এক্সপেক্টোওওও পেট্রোনাম...

বলেছিলাম না, মায়ের প্রসাদ, যা পাওয়া যায় তাইই ভালো!

রবিবার, ১৮ জুন, ২০১৭

পাহাড় হাসছে ~ অবীন দত্তগুপ্ত

মনে করুন ,সেই সেদিনের কথা । আপনি দার্জিলিং গেছেন । গুরুং আপনাকে "মা" বলে ডেকে আহ্লাদে গলে পড়ছেন । আপনি সব কথা মেনে নিচ্ছেন গুরুং-এর । একটা গুন্ডাকে রাজনৈতিক বৈধতা দিচ্ছেন । জি টি এ- চুক্তিতে মেনে নিচ্ছেন গোর্খাল্যান্ডের দাবী । আপনার স্বার্থ কি ? কেন, তরাই আর ডুয়ারস-এ গোর্খা ভোট । এর আগে আদিবাসীদের ভাগ করে ফেলেছেন ,আদিবাসী বিকাশ পরিষদকে ধুয়ো দিয়েছেন ডুয়ারসে । তারও আগে কুচবিহারে কামতাপুরিদের সাথে জোট করেছেন । কামতাপুরিদের বাংলা ভাগের দাবিকে হাওয়া দিয়েছেন , গুরুঙ্গের বাংলা ভাগের দাবিকে হাওয়া দিয়েছেন । আপনি এই সমস্ত করেছেন স্রেফ অঙ্কের খাতিরে । যে কোন উপায় সিংহাসন চড়ার লোভে । যে আগুন উস্কে দিয়ে , সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়া এক দেহের উপর তান্ত্রিকের আসন পেতে বসেছিলেন - সেই আগুনেই দেখুন আপনার নিজের আসনটাও পুড়তে বসেছে । আপনার চেয়েও ঘৃণ্য বেনিয়ার দল বি জে পি ,বাংলা ভাগের আপনার পুরানো খেলাটাই আরও নোংরা ভাবে খেলতে চাইছে । দেখুন , সেদিনের আপনার সাথে একমাত্র তফাৎ যাদের করতে পারছেন , তারা আপনার চিরশত্রু , কমিউনিস্ট পার্টি । রাজ্যের এই ভয়ঙ্কর পরিণতির সামনে দাঁড়িয়ে , ওরা দেখুন আপনার মতো শবসাধনা করছেন না । মনে রাখবেন ,দুশো জন কমিউনিস্টের রক্ত লেগে আপনার আলগা হাসির পাহাড়ে । মনে রাখবেন ,স্রেফ ক্ষমতার জন্য বিচ্ছিন্নতাবাদকে প্রশ্রয় দেয় না বামপন্থা । একটু বামপন্থীদের থেকে শিখুন - অদূর ভবিষ্যতে ক্ষমতা হারাবেন যখন ,কাজে দেবে ।

কৃষি ঋণ ~ সুশোভন পাত্র

- দিস ব্লাডি ইউনিয়ন কালচার ইস ক্র্যাপ। 
আপিস ফেরত পথে চিলড্ বিয়ারে চুমুক দিয়ে বলেছিল অসীম। কেতাদুরস্ত মাল্টিন্যাশন্যালে প্রজেক্ট ম্যানেজার অসীম। ব্যালেন্স শিট, ডেটা মাইনিং, ক্লায়েন্ট মিটিং'র কচকচানি, তার উপর বিরক্তিকর ট্রাফিক, আর গোদের উপর বিষ ফোড়া শ্রমিক'দের 'নূন্যতম মজুরি বৃদ্ধির' দাবি তে ট্রেড ইউনিয়নের মিছিল। ফর্ক দিয়ে ক্যাপসিকামটা সরিয়ে একটুকরো পনির টিক্কা মুখে তুলে, একরাশ ক্ষোভ উগরে অসীম এক নাগাড়ে বলে গেল, 
- প্রফেশেনালিজম চাই। চাই ডিসিপ্লিন, ডেকোরাম। ঐ 'শ্রমিক ঐক্য' দিয়ে কিস্যু হবে না। 'দুনিয়ায় মজদুর' আর কবে এক হবে? মিছিল, মিটিং, ধর্মঘট... যতসব ডিসগাসটিং এলিমেন্ট। ডেভলাপমেন্ট করতে একটা 'ওয়ার্ক কালচার' লাগে রে। আই মিন.. 'কর্ম সংস্কৃতি'।
গত পরশু প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন অফিসে গিয়েছিল অসীম। নবগঠিত তথ্য-প্রযুক্তি কর্মী'দের ফোরামের প্রতিনিধি হিসাবে ¹। গত মাসে দেশের তথ্য-প্রযুক্তি সেক্টরে যে ব্যাপক কর্মী ছাটাই হয়েছে অসীম সেই হতভাগা'দের একজন। খবরে প্রকাশ, দেশের শীর্ষ ৭টি তথ্য-প্রযুক্তি কোম্পানি তে আগামী একবছরে রেকর্ড হারে আরও ৫৬ হাজার কর্মী ছাটাই হবে ² । আপিস পাড়ায় কান পাতলেই 'টার্মিনেশন লেটার' আর 'ফায়ারিং নোটিশে'র ফিসফিসানি। 
আজ ট্রেড ইউনিয়ন আর তথ্য-প্রযুক্তি কর্মী'দের ফোরামের সমন্বয় মিটিং প্রথম বক্তৃতা করেছে অসীম। আগামী রবিবার সকল হতভাগ্য'দের মিছিলে পা মেলাতে আহ্বান জানিয়েছে। একরাশ ঘেন্না নিয়ে গলার শিরা ফুলিয়ে অসীম মাইকে বলেছে,   
-দিস হোল ব্লাডি সিস্টেম ইস ক্র্যাপ। 
আজ অসীম বুঝতে পারে ধর্মঘটের মানে। বুঝতে পারে ঝাঁ-চকচকে তথ্য-প্রযুক্তি দপ্তরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিনে বসে অ্যালগোরিদিমের পলিনমিয়াল কমপ্লেক্সটি ক্যালকুলেশন করার থেকে দেশের অসংগঠিত শ্রমিক'দের জীবনটা আরেকটু ঝুঁকির। কাজটা আরেকটু পরিশ্রমের। আর স্থায়ী রোজগারের নিশ্চয়তাটা আরেকটু কম। সেন্ট্রাল লেবার ব্যুরোর তথ্যানুসারে শুধু ডিমনিটাইজেশেনের পরবর্তী তিনমাসে কাজ হারিয়েছেন দেশের ১.৫২ লক্ষ অসংগঠিত শ্রমিক ³ । আর গত আর্থিক বছরে ২.৩ লক্ষ ⁴ । ২০১৫-১৬'তে দেশের বেকারত্বের হার ৫% -গত পাঁচ বছরের সর্বোচ্চ ⁵। কেন্দ্রীয় সরকারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রকল্পেও কাজ কমেছে ৯.৭% হারে ⁶। কিন্তু এমনটা একেবারেই হওয়ার কথা ছিল না। বরং কথা ছিল, ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থানের। কথা দিয়েছিলেন স্বয়ং নরেন্দ্র মোদী ⁷।  লেখা হয়েছিল, "২৫ কোটি নতুন কর্মসংস্থান লাগাম টানবে ক্রম ঊর্ধ্বমুখী বেকারত্বে" ⁸। লেখা হয়েছিল, খোদ বি.জে.পি'র নির্বাচনী ইশতেহারে। কিন্তু  রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে সেদিনের সেই বক্তৃতা আর নির্বাচনী ইশতেহার প্রতিশ্রুতি বানের জলে ভেসে গেছে কবেই।  
অবশ্য এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভ্যাস বিক্ষিপ্ত নয়। ১৫'ই এপ্রিল ২০১৪, গুজরাটের সুরেন্দ্রনগরের জনসভায় নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন "বি.জে.পি ক্ষমতায় এলে, কৃষকদের বীজ, সেচ, বিদ্যুৎ, সার এবং কৃষির জন্য ব্যবহৃত অন্য দ্রব্যাদির মূল্য অন্তর্ভুক্ত করেই উৎপাদন মূল্য নির্ধারণ করব। এবং তার সাথে কৃষকদের ৫০% মুনাফা সহ শস্যের সহায়ক মূল্য ঘোষণা করব ⁹।"  আসলে মিডিয়ার পোষ্টার বয় সেদিন কোন নতুন কথা বলেননি। 
আজ থেকে ১১ বছর আগে বামপন্থী'দের কমন মিনিমাম প্রোগ্রামের দাবী মেনেই প্রথম ইউ.পি.এ সরকার সার্বিক কৃষি ব্যবস্থা পুনর্গঠনের জন্য স্বামীনাথনের নেতৃত্বে 'ন্যাশনাল কমিশন অফ ফার্মার্স' গঠন করে। সেই কমিশনের রিপোর্টে বলেছিল অবিলম্বে শস্যের উৎপাদন মূল্যের উপর কমপক্ষে ৫০% মুনাফা যোগ করে সহায়ক মূল্য ঘোষণা এবং সেই সহায়ক মূল্যের সঠিক বাস্তবায়ন করা দরকার। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় দেশের সমস্ত রাজ্যে ব্যাপক ভূমি সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে ¹⁰। কিন্তু  দেশের আরও পাঁচটা কমিশনের মতই স্বামীনাথন কমিশনের রিপোর্টের জায়গা হয়েছিল সেই ডাস্টবিনেই। 
আর হয়েছিল বলেই আজ, ১৯৯১'র 'ফ্রি-মার্কেট ক্যাপিটালিজম' আমদানির ২৬ বছর পর, দেশের জি.ডি.পি তে কৃষির অবদান ৩৫% থেকে কমে এখন ১৩%'এ। ১স্কয়ার কিলোমিটার চাষযোগ্য জমির অংশীদার ২৬৭ জন থেকে বেড়ে এখন ৩২৪  ¹¹।  সরকারের ধার্য করা সহায়ক মূল্য পান দেশের মাত্র ৬% কৃষক ¹² । বেড়েছে কৃষিতে বিদেশী বিনিয়োগ, বেড়েছে বিদ্যুৎ সার, কীটনাশক ডিজেলের দাম। আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কৃষক আত্মহত্যাও। ১৯৯৫-২০১৬ অবধি ভারতবর্ষে প্রতি ৩০ মিনিটে একজন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন ¹³ । মোট ৩,১৬,৪৬৬ জন। সংখ্যাটা ইডেন গার্ডেনসের কানায় কানায় পূর্ণ দর্শক সংখ্যার ৫ গুণ। ভারতবর্ষের প্রমাণ মাপের ট্রেনের, মোট যাত্রী সংখ্যার ২১১ গুণ এবং যেকোনো এয়ারবাসের সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতার ৬৩৪ গুণ ¹⁴ । 
আজ থেকে ৭৫ বছর আগে রাতের অন্ধকারে মহারাষ্ট্রের শেলনী'র জঙ্গলে ব্রিটিশ পণ্যবাহী এক ট্রেন কে আটকে প্রচুর টাকা, অস্ত্র ও অন্য মূল্যবান সামগ্রী উদ্ধার করে গরীব কৃষক'দের বিলিয়ে দেয় 'তুফান সেনা'। বিস্তীর্ণ সাতারা অঞ্চলে গোরা'দের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা হয় পরের দিন সকালেই। ব্রিটিশ'দের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্বাধীনতার আগেই গঠিত হয় কৃষক'দের সমান্তরাল সরকার ¹⁵। 
দিল্লীর মসনদে বসে যে বেণীমাধবরা আজকে কৃষক'দের ফসলের ন্যায্য মূল্য না দিয়ে দশলাখি স্যুট গায়ে বিদেশ সফরে রায় বাহাদুর'দের পদ লেহন করে বেড়াচ্ছেন, রাজ কোষগারের দখল নিয়ে যে বেণীমাধবরা আজকে শ্রমিকের শ্রমের মজুরি বকেয়া রেখে সেনসেক্স আর জি.ডি.পি'র বালখিল্যতায় উন্নয়নে রঙিন গল্প শোনাচ্ছেন, কৃষকের লাশের পাহাড়ে চেপে যে বেণীমাধবরা আজকে বিজয় মালিয়া'দের 'নন পারফর্মিং অ্যাসেট' কে 'রাইট অফ' করার নীতি নির্ধারণ করছেন, শ্রমিক'দের রক্ত-ঘামের বিনিময়ে পুষ্ট রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে যে বেণীমাধবরা আজকে আদানি'দের বিদেশে জমি কিনতে সস্তা সুদে ঋণ দিচ্ছেন -কেমন হবে বেণীমাধব এক একটা মন্দসৌরের বারুদ গুলো আজ যদি আগুন হয়ে জ্বলে? কেমন হবে বেণীমাধব সেই আগুন গুলোই আজ যদি হরিয়ানা থেকে রাজস্থানে, মহারাষ্ট্র ঘুরে তামিলনাড়ু তে দাবানল হয়ে গেলে? কেমন হবে বেণীমাধব চা-বাগানের হাভাতে গুলোর মজুরি আদায়ের মিছিল যদি সেই দাবানলে মেলে? কেমন হবে বেণীমাধব শ্রমিক-কৃষক 'তুফান সেনা' দিল্লীর রাইসিনা হিলে হিসেব চাইতে গেলে? কেমন হবে বেণীমাধব বেকার গুলো সব এককাট্টা হয়ে পার্লামেন্টের গেটে তালা ঝুলিয়ে দিলে?















সোমবার, ১২ জুন, ২০১৭

দেশদ্রোহীদের 'চিনে' নিন



এক যে ছিল রাজনৈতিক দল | দলটার জন্মমুহূর্ত থেকে আজ অবধি বিভিন্ন সময়ে নানা দেশবিরোধী কাজে যুক্ত | তাই কখনো তারা 'দেশদ্রোহী' কখনো 'চীনের দালাল' কখনো পাকিস্তানের চর | আসুন আজ কিছু চীনের দালাল 'দেশদ্রোহী' দের চিনে নি যারা স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দালালি করেবলে চাদ্দিকে খবর |

১) মুজফ্ফর আহমেদ - মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় ব্রিটিশ সরকার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়, যার মধ্যে ৩ বছর সেলুলার জেল এ কাটে| স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য |  সুতরাং চীন ও পাকিস্তানের দালাল |

২) গণেশ ঘোষ-  চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের অন্যতম নায়ক | সূর্য সেনের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জালালাবাদ পাহাড় এ লড়াই করেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে |১৬ বছর সেলুলার জেলে সশ্রম কারাদণ্ড | পরবর্তী কালে সিপিআই এর এম এল এ ৩ বারের জন্য ও সিপিএম এর এম পি| চীনের দালাল |

৩) কল্পনা দত্ত-  প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এর সহোযোগিনী এবং চট্টগ্রাম বিদ্রোহের অন্যতম মুখ | ৬ বছর এর দ্বীপান্তর | ফিরে এসে কমিউনিস্ট পার্টি তে যোগ দেন ও ভোটে দাঁড়ান |  চীনের দালাল |

৪) সুবোধ রায় - চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন | জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধে কনিষ্ঠতম সৈনিক | ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়, যার মধ্যে ৬ বছর সেলুলার জেল | সিপিএম রাজ্য কমিটি সদস্য আজীবন | চীন ও পাকিস্তানের দালাল |

৫) অম্বিকা চক্রবর্তী-  চট্টগ্রাম বিদ্রোহের জন্য ১৬ বছর সেলুলার জেলে সশ্রম কারাবাস | স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট পার্টি তে যোগদান ও নির্বাচিত এম এল এ  |

৬) অনন্ত সিং - চট্টগ্রাম বিদ্রোহের জন্য ২০ বছর (১৬  বছর সেলুলার জেলে ) সশ্রম কারাবাস | স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট পার্টি তে যোগদান |  যিনি বোধয় কিউবার দালাল| 

৭) শিব ভার্মা - ভগৎ সিংএর সহযোগী | লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় একসাথে গ্রেপ্তার হন| ভগৎ সিং এর ফাঁসি হয় ও এনার যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর আন্দামানে | ১৭ বছর পর ফিরে কমিউনিস্ট পার্টি তে | পরে সিপিএম উত্তর প্রদেশ রাজ্য কমিটির সেক্রেটারি | কারো একটা দালাল নিশ্চই |
 
৮) হরেকৃষ্ণ কোনার- ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপ এর জন্য ৬ বছর আন্দামানে এ দ্বীপান্তর | আন্দামানে বিপ্লবীদের নিয়ে কমিউনিস্ট কনসোলিডেশন গঠন ও পরে কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রধান মুখ | নিঃসন্দেহে চীনের দালাল | 

৯) লক্ষী সায়গল - আজাদ হিন্দ বাহিনীর রানী ঝাঁসি রেজিমেন্ট এর ক্যাপ্টেন | আজাদ হিন্দ বাহিনীর হয়ে ইমফল ও কোহিমা ফ্রন্টে লড়াই করেন | স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট পার্টি তে আসেন | আমৃত্যু সদস্য ছিলেন | কিসের দালাল সংঘ পন্থীরা ভালো জানবেন |
 
১০, ১১, ১২ ) জয়দেব কাপুর , অজয় ঘোষ ও কিশোরীলাল-  ভগৎ সিংএর সহযোগী | লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় একসাথে গ্রেপ্তার হন এবং যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয় আন্দামান সেলুলার জেলে | স্বাধীনতার পর মুক্তি পেয়ে কমিউনিস্ট পার্টি তে | এঁরা বোধয় রাশিয়ার দালাল| 

১৩) সতীশ পাকড়াশী - মেছুয়াবাজার বোমা মামলায় ১০ বছর এর জন্য সেলুলার জেল এ | ফিরে কমিউনিস্ট পার্টির  সদস্য ও সিপিএম বিধায়ক | দেশদ্রোহী |

১৪) পি সি  জোশি- মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় যাবজ্জীবন, যদিও মেয়াদের আগে মুক্তি পান | ৩ বছর কাটান সেলুলার জেলে | কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম জেনারেল সেক্রেটারি | ইংরেজ এর দালাল নাকি?

১৫)অরুণা আসাফ আলী - ১৯৪৬ এর নৌ বিদ্রোহের সংগঠক| কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ৬৬ টা যুদ্ধ জাহাজ ও ১০০০০ নৌ সেনা নিয়ে গড়ে ওঠা ব্রিটিশ বিরোধী যে বিদ্রোহ কংগ্রেস,  মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভার পিছন থেকে ছুরি মারায় অঙ্কুরে বিনাশ পায় | এই বিদ্রোহী দের মধ্যে আরো অনেক ' দেশদ্রোহী কমিউনিস্ট ' ছিলেন যারা ব্রিটিশ এর গুলিতে মারা যান, আর বাকিরা পরে চীনের দালাল হয়ে যান | উৎপল দত্তের 'কল্লোল ' নাটকে এর বিস্তারিত বিবিওরণ পাওয়া যায় |

১৬) বি টি রণদিভে - ১৯২৫  থেকে ১৯৪২ , ১৭ বছর ধরে ব্রিটিশ সরকার এর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে কৃষক শ্রমিক কে সংগঠিত করেছেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে| নৌ বিদ্রোহের সমর্থনে সারা ভারত ব্যাপী হরতাল সংগঠিত করেন ও ব্রিটিশ সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা করেন | স্বাধীনতার পর সিপিআই এ, পরে সিপিএম কেন্দ্রীয় কমিটি তে 

১৭) ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ - ১৯৩৪ - ১৯৪২ ব্রিটিশ সরকারের ' ওয়ান্টেড লিস্ট' এ |  প্রায় গোটা যৌবন তাই আত্মগোপন করে কাটিয়ে দিয়েছেন | পরে কেরালার প্রথম কমিউনিস্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী |
১৮, ১৯ ) বীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ও সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর  - ছাত্রাবস্থায় পালিয়ে যান জার্মানি তে | ইন্ডিয়ান ইনডিপেনডেন্স লীগ এর বার্লিন কমিটি এর সদস্য হয়ে ভারত বর্ষের বিপ্লবীদের  অস্ত্র যোগান দেওয়ার দায়িত্ব নেন | নাত্সি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ কারাবাস জার্মানিতেই | কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য |

২০ ) শওকত উসমানী- মীরাট  ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান অভিযুক্ত | কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য 

 আরো অসংখ্য নাম বাকি থেকে গেলো | আর তথ্য জোগাড় এর ধৈর্য ও ছিল না|  মোদ্দা কথাটা হলো এঁরা সবাই কেন কে জানে , এত্ত সব দেশপ্রেমিক দল বাদ দিয়ে চীনের দালালি করা দলটাকেই বেছে নিলেন .... এমনকি চীন যুদ্ধের সময়েও চটজলদি  'দেশপ্রেমী' হতে পারলেন না | আসলে তখন তো সোশ্যাল মিডিয়া এর এত রমরমা ছিলোনা, তাহলে জানতে পারতেন....... যে কোনো উপায়ে দেশ এর এর সরকার ও সেনাবাহিনী কে অন্ধভাবে সমর্থণ করার নাম দেশপ্রেম... নিজের দেশের পেশী ফুলানোর ছবি সোশ্যাল মিডিয়া তে প্রচার করাই দেশপ্রেম.....এটাও জানতেন না যে, দেশ আসলে দেশের মানুষ দিয়ে তৈরী হয়না. তৈরী হয় দেশের সেনা, প্রধানমন্ত্রী আর দেশের সীমানার কাঁটাতার দিয়ে | এঁরা বেজায় বোকা | ভেবেছিলেন, যে দেশের জন্য প্রায় গোটা জীবন দিয়ে উৎসর্গ করেছেন, সেই দেশের কোনো অবস্থান ভুল মনে হলে সমালোচনা করার অধিকার আছে... দেশের সরকার এর বিরোধিতা করার বা সেনাবাহিনীর কাজকর্মের বিরোধিতা করার অধিকার ও আছে | যেহেতু আমি এই দেশে জন্মেছি , তাই এই দেশ এর সেনাবাহিনী অবশ্যই দুর্দান্ত  ভালো..... এই দেশের সরকার এর সব অবস্থান সর্বদাই একদম কেয়াবাত মার্কা প্রশংসার যোগ্য , সবসময় 'সাব্বাশ!'.বলে পিঠ চাপড়ে যেতে হবে.... এই সহজ দেশপ্রেম এর ধারণা টা এদের বোধগম্য হয়নি | আর তাই আজ রাম শ্যাম যদু মধু খুব সহজেই এদের দিকে, আঙ্গুল  তুলে দেয় 'দেশদ্রোহী' ' দালাল' বলে. কখনো ফেসবুকে তে এদের গালে জুতো মারার প্রস্তাব দেয় অতি বড়ো কোনো 'দেশপ্রেমী' | একবার ভেবে দেখার দরকার হয় না যাদের উদেশ্য করে বলছি তাদের সংগ্রামের আর আত্মত্যাগের ইতিহাস টা উল্টে দেখি... সত্যি কি আমার কোনো যোগ্যতা আছে এদের নিয়ে প্রশ্ন তোলার বা এঁরা কোন পরিস্থিতিতে কি অবস্থান নিয়েছেন সে সম্বন্ধে বিচারকের রায় দেওয়ার |  আর কি জানেন, দেশ টাকে নিজের বলে ভালোবাসলেই দেশের ভুলভাল কাজকম্মো গুলো খুব গায়ে লাগে...... পড়শীর বাচ্চাকে কখনো সুস্থ স্বাভাবিক লোক শাসন করে না, নিজের বাচ্চা কেই করে |  যাকগে, অনেক বাজে বকলাম | একটা ছোট্ট অনুরোধ দিয়ে শেষ করবো | ঢাক ঢোল বাজানো 'দেশপ্রেমী' পার্টির যারা আছেন তারা একটু তাদের দলের স্বাধীনতা সংগ্রামী সদস্য দের লিস্ট যদি দেন বড়ো ভালো হয় | এত্ত বড়ো দেশপ্রেমী দল.....নিশ্চয়ই এর চেয়ে অনেক বড়ো বড়ো আত্মত্যাগী লোকজনের লিস্ট ওদের কাছে থাকবে | গুগল করে কিন্তু কিছু পেলাম না বিশ্বাস করুন | সাকুল্যে ২-৩ টি নাম,  তাও পাতে দেওয়া যায় না | ( নো অফেন্স ) |   ............. আর ইয়ে, একটা কবিতার লাইন কেন কে জানে মনে পড়ে যাচ্ছে.... " তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ.....আমি আজ চোর বটে "... 

তথ্যসূত্র ----- ১) উইকিপেডিয়া   ২) শহীদ স্মৃতি , লেখক শিব ভার্মা , ন্যাশনাল বুক এজেন্সী  ৩) মৃত্যুঞ্জয়ী -- তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ - পঃ ব: সরকার                   
                ৪) আজাদ হিন্দ ফৌজ, লেখক এস এ আয়ার, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট ৫) কল্লোল, লেখক উৎপল দত্ত l

শুক্রবার, ৯ জুন, ২০১৭

বুদ্ধিজীবী ~ কণিষ্ক ভট্টাচার্য

পিয়ের ক্যুরি ছিলেন ফরাসি ফিজিসিস্ট। ক্রিস্টালোগ্রাফি, রেডিয়েশন বিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক। রেডিয়েশন নিয়ে গবেষণার জন্য ১৯০৩ সালে নোবেল পুরষ্কার পান অরি বেক্যুইরেল আর মারিয়া সালোমেয়া স্ক্লোডোস্কার সঙ্গে যৌথ ভাবে কাজ করে। 

স্লাভিক স্ক্লোডোস্কারা থাকতেন পোল্যান্ডে। মারিয়া সালোমেয়া স্ক্লোডোস্কা পোল্যান্ড থেকে প্যারিস ইউনিভার্সিটিকে পড়তে এসে পিয়ের এর সঙ্গে আলাপ। পরে প্রেম ও বিয়ে। এবং অবশ্যই যৌথ গবেষণা। নোবেল পাওয়ার সময় তার নাম মেরি ক্যুরি।

মাত্র ৪৬ বছর বয়েসে পিয়ের এর মৃত্যু হয় নোবেল পাওয়ার তিন বছর পরে। মারিয়া সালোমেয়া স্ক্লোডোস্কা ক্যুরির গবেষণা কিন্তু থামেনি। তিনি প্রথম নারী যিনি নোবেল পান এবং একমাত্র নারী যিনি দুবার নোবেল পুরস্কার পান। প্রথম বার ফিজিক্সে দ্বিতীয় বার কেমিস্ট্রিতে। রেডিয়াম, পলোনিয়াম, রেডন, থোরিয়াম আবিষ্কারের জন্য। 

পিয়ের আর মেরির দুটি মেয়ে। নাম আইরিন আর ইভ। ছোটো মেয়ে ইভ সঙ্গীতজ্ঞা। বড়ো মেয়ে আইরিন হলেন কেমিস্ট্রি গবেষক। বিয়ে করলেন ফরাসি ফিজিসিস্ট জাঁ ফেড্রিক জোলিয়টকে। আইরিন - জোলি পরমাণুর গঠন আর আর্টিফিশিয়াল রেডিও অ্যাক্টিভিটির ওপরে কাজ করার জন্য ১৯৩৫ সালে নোবেল পান। 

এর আগেই ১৯৩৩ সালে প্রগতিশীল সব কথা বলে গণতান্ত্রিক নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমেই জার্মানির ক্ষমতায় এসেছে অ্যাডলফ হিটলার। সেই সময়ে বিজ্ঞানীদের কাজকর্ম নিয়ে রাজনীতিকরা তেমন ভাবত না আর বিজ্ঞানীরাও রাজনীতি নিয়ে তত মাথা ঘামাননি। কিন্তু হিটলারের উত্থানের পপর দেখা গেল তথাকথিত "আর্য রক্তের বিশুদ্ধতা", 'ইহুদী চরম শত্রু" ইত্যাদি কথা বলে আইনস্টাইন থেকে শুরু করে সব বিজ্ঞানীদের দেশ ছাড়া করল। তখনই এই বুদ্ধিজীবী সমাজ রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত হয়ে পড়লেন। বুঝলেন যে পক্ষ না নিলে গতি নেই।

সেই সময়ে জার্মানির বহু বুদ্ধিজীবী হয় উদ্বাহু হয়ে 'আহা হিটলার, বাহা হিটলার' করলেন, না হয় বালিতে চোখ গুঁজে ''আমি কিন্তু কিচ্ছু দেখতে পাইনি'' ভাব করে চুপ করে থাকলেন। আরেকদল নানা কুযুক্তিতে অতীত ইতিহাস টেনে এনে এই অমানবিকতাকে জাস্টিফাই করতে লাগলেন। মুখ লুকিয়ে ফ্যাসিবাদের দালালি করলেন। আর বিরোধী ...। বিরোধীদের জন্য ছিল হিটলারের দলীয় হিংস্র বাহিনির হাতে চূড়ান্ত অত্যাচারিত হয়ে অবধারিত মৃত্যু।

কিন্তু গণতান্ত্রিক পথে প্রগতিশীল কথা বলে স্বৈরতন্ত্র এলেও সাধারণত তা গণতান্ত্রিক পথে যায় না। কারণ স্বৈরতন্ত্র গণতন্ত্রের, প্রতিবাদের কোনও স্পেস তার রাস্ট্রে রাখে না। ফলে যারা হিটলারের জন্য নৃত্য করেছিল, হিটলারের অমানবিকতাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল কুযুক্তিতে। কিংবা চুপ করে ছিলেন তাঁদের সবার স্থান হয়েছিল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে, গ্যাস চেম্বারে। হিটলার প্রয়োজন মত স্তাবকদের ব্যবহার করলেও, তাঁদের কাজ ফুরোতেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।

হিটলারের বাহিনি প্যারিস ঘিরে ফেলার সময়ে নোবেল লরিয়েট দম্পতি আইরিন ক্যুরি আর ফেড্রিক জোলিয়ট কিন্তু প্যারিসের মুক্তি বাহিনির সঙ্গে হাতে মেশিন গান নিয়ে হিটলারের বাহিনির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে দ্বিধা করেনি। সরাসরি স্ট্রিট ফাইট যাকে বলে তাই করেছেন দুজন নোবেল লরিয়েট। রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে। বুদ্ধিজীবী বলতে এঁদেরই বুঝি।

০৯-০৭-২০১৭

বৃহস্পতিবার, ৮ জুন, ২০১৭

স্বামী কাবাব ~ লোপামুদ্রা মিত্র পাল

আজ একটি খাওয়া দাওয়া সংক্রান্ত ফেসবুক গ্রুপে এক জেঠু স্বামী কাবাবের রেসিপি জানতে চেয়েছিলেন। দিলাম। এখানেও দিয়ে দিলাম কারো কাজে লাগতে পারে ভেবে।
স্বামী কাবাব - এই স্বামী কাবাব উপকরন অর্থাৎ স্বামীর প্রকৃতি, তখনকার পরিবেশ ইত্যাদির উপর নির্ভর করে ঠিক করতে হবে। যেমন ধরুন ছিটপিটিয়ে ওঠা কাবাব নাকি পোড়া পোড়া কাবাব নাকি ওপরে কিচ্ছুটি বোঝা যাবে না কিন্তু ভেতরে আংরা টাইপ রেশমী কাবাব। আচ্ছা গৌরচন্দ্রিকা ছেড়ে রেসিপি দেই।
রেসিপি
উপকরণ  - ১) আস্ত স্বামী (সদ্য বিয়ে হলে হবে না।  কমপক্ষে দু বছরের পুরোনো হতে হবে যাতে বিগলিত টাইপ না হয়)
২) পরিবেশ - বেশ দমবন্ধ (মানে বিগত কয়েকদিন ধরেই ঝামেলা চলছে যে কোন ইস্যুতে) কিম্বা ব্যাপক গরম,  মাসের শেষ, অথবা খুব ইন্টেরেস্টিং খেলা বা ভাটের রাজনীতিগত বকবক হচ্ছে টিভিতে
৩) আপনার তিরিক্ষি মেজাজ, বাচ্চার বায়নাক্কা, অফিসে বা রাস্তায় ঝামেলা সাথে শানানো ক্ষুরধার মড়া মানুষ জ্যান্ত করার মত বাক্যবাণ।
এবার পদ্ধতি - 
ক) ছিটপিটানো কাবাব - প্রচন্ড গরমে ঘেমে নেয়ে বাড়ি ফেরা মাত্র বলতে হবে এই আন,  সেই আন এমন হাজার জিনিষের লিস্টি। ব্যাস........
খ) রোস্ট বা পোড়া কাবাব - ওই খেলা কি রাজনীতিগত টিভির ভাড়ামি প্রবল মনোযোগ সহ দেখার সময় ফটাস করে টিভি অফ করে বলতে হবে বাচ্চাকে প্রজেক্টে হেল্প করতে।
গ) মখমলি রেশমী কাবাব- সাংসারিক আলোচনায় পুনঃপুনঃ মনে করিয়ে দিলেই হবে কি কি জিনিষ তোমায় খরচ করে করতে হয়েছে আর কি কি সে করেছে। বা ফ্ল্যাট কেনার সময়,  গাড়ি কেনার সময় নিজের ভিস আ ভিস তার শেয়ারটা আর যে বড় খরচগুলো আসতে চলেছে তার সিংহভাগ তাকেই বহন করার আহ্বান।  ব্যাস কাজ সারা।এবার তাড়িয়ে তাড়িয়ে কানে হেডফোন গুঁজে মাঝে মাঝে আড় চোখে ফলাফলটা দেখে নিন।

কয়েকটা ইমেজ ~ অর্ক ভাদুরী

কয়েকটা ইমেজ মাথার মধ্যে ঢুকে বসে থাকে, বেরতে চায় না। অসম্ভব শীত করে, ভয় হয়। আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যেতে থাকে সব।

গুরগাঁওয়ের কাছে একজন মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। রাত্রিবেলা বছর কুড়ির ওই মহিলা তাঁর একরত্তি মেয়েকে নিয়ে একটা অটোয় উঠেছিলেন। কিছুদূর যাওয়ার পরেই অটোচালক গাড়ি ঘুরিয়ে অন্যদিকে নিয়ে যান। তিনি এবং দুই সহযাত্রী ওই মহিলাকে যৌন হেনস্থা করতে শুরু করেন। বাচ্চাটা মায়ের বুকে ঘুমোচ্ছিল। ধস্তাধস্তিতে তার  ঘুম ভেঙে যায়। চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। ওই মহিলা জানিয়েছেন, বাচ্চাটির কান্নায় ধর্ষকরা আরও অ্যাগ্রেসিভ হয়ে ওঠে।

 এরপর একটা অন্ধকার এবং ফাঁকা জায়গায় অটোটিকে দাঁড় করানো হয়। অটোচালক দুই পুরুষ যাত্রীর একজনের উদ্দেশ্যে বলেন, "হরি, খানা লা।" এরপর ওই মহিলাকে টেনে নামানো হয়। তাঁর বুক থেকে বাচ্চাটিকে কেড়ে নেওয়া হয়। সে তখনও চিৎকার করছে। কান্না থামাতে একজন তার মুখ চেপে ধরে। এবার পরপর তিনজন ওই মহিলাকে পালা করে ধর্ষণ করে। বাচ্চাটির মুখও পালা করে চেপে রাখা হয়।

ওই মহিলা এফআইআরে জানিয়েছেন, ধর্ষণ করার পর ওরা বাচ্চাটিকে রাস্তার ধারে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তাঁর কথায়, " কার্যত বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলাম, আমার সন্তানকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। রাস্তার ডিভাইডারে ওর কচি মাথাটা থেঁৎলে যাচ্ছে।"

এই পর্যন্ত সব ঠিক আছে। ঠিক থাকার কথা নয়, কিন্তু ঠিক আছে। এই বিষয়গুলিতে আমি অভ্যস্থ। আমার গবেষণার বিষয়, গণআন্দোলন দমনে যৌন হিংসার ব্যবহার। ফিল্ড ওয়ার্ক করতে গিয়ে অসংখ্য রেপ সারভাইভারের সঙ্গে কথা বলেছি। মায়ের সামনে মেয়ে বা মেয়ের সামনে মায়ের উপর হওয়া নির্যাতনের কথা ধর্ষিতাদের মুখ থেকেই শুনেছি। পেশাগত কারণেও অসংখ্যবার 'ধর্ষণ করে খুন' শিরোনামে খবর লিখে কফি খেতে গিয়েছি। সমস্যা হয় না, অথবা হলেও নিভৃতে পুড়িয়ে দেয় মাত্র।

সমস্যাটা শুরু হল এর পরেই। ওই মহিলা জানিয়েছেন, ধর্ষকগুলো অটো চালিয়ে চলে যাওয়ার পর তিনি কুচোটার কাছে যান। দেখেন, সে চুপটি করে আছে। মাথার পিছনটা চ্যাটচ্যাট করছ। মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে ওই অন্ধকারের মধ্যে হাঁটতে শুরু করেন তিনি। রাত তখন দু'টো। কিছুদূর হাঁটার পর একটি কারখানায় আশ্রয় নেন। সেখানকার নিরাপত্তারক্ষী তাঁকে জানায়, ভোর পর্যন্ত কোনও যানবাহন মিলবে না। ভোর না হওয়া পর্যন্ত মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে থাকেন মা। তখনও কোনও শব্দ করছে না সে।

ভোর হয়। তখনও পর্যন্ত নিজের যন্ত্রনা চেপে রেখেছেন মা। সকালে নিস্তব্ধ মেয়েকে নিয়ে দিল্লির এক ডাক্তারের কাছে যান। ডাক্তার জানান, বাচ্চাটি ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছে। এতক্ষণ তিনি মরা মেয়ের লাশ বইছিলেন। বিশ্বাস হয়নি মায়ের। আরেকজন ডাক্তারের কাছে যান। তিনিও একই কথা বলেন। এতক্ষণ কাঁদেননি। এবার ভেঙে পড়েন তিনি।

............

মধ্যরাত্রের অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে একজন সদ্যধর্ষিতা মা তাঁর সন্তানকে খুঁজছেন। একরত্তি সন্তানের লাশ বুকে আঁকড়ে হেঁটে যাচ্ছেন আশ্রয়ের খোঁজে। মাথার গভীরে গেঁথে যায় এই ইমেজ।বমি পায়। নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে। মায়ের চুল, আঁচল, স্তন আর আঙুলের ছবি ভিড় করে আসে। প্রিয়তম মেয়েটির মুখ, তার গলা, চোখ, হাসি আর কানের লতির কথা মনে পড়ে।

মনে হয়, কেন বেঁচে আছি অকারন!

বুধবার, ৭ জুন, ২০১৭

পুলিশের গুলি ~ শতদ্রু দাস

আমি বললাম, "পুলিশের গুলিতে ৬ জন কৃষক মারা যাওয়া নিয়ে টুইটারেও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই কেন? লন্ডনের হামলা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখলাম তো।"

গরুটা  হঠাৎ কেমন গম্ভীর হয়ে গেলো। তারপর মাথা নেড়ে বললো "উঁহু, সে সব বলা আমার কম্মো নয়। গুলদাদা ঠিক ঠিক বলতে পারবে।" 

আমি বললাম, "গুলদাদা কে? তিনি কি করেন?"

গরু বললো, "গুলদাদা আবার কি করবেন? গুল মারেন।"

আমি বললাম, "কিন্তু কোথায় গেলে তার সঙ্গে দেখা করা যায়?"

গরু বললো, "সেটি হচ্ছে না, সে হওয়ার জো নেই। কিরকম জানো? এই ধরো তুমি তামিল নাড়ুর চাষি, তাঁর সাথে দেখা করতে দিল্লি গেলে, তিনি তখন থাকবেন শ্রী লংকায়। যদি শ্রী লংকা যাও, তাহলে শুনবে তিনি প্রিয়াংকা চোপড়ার সাথে জার্মানিতে। আবার জার্মানি গেলে দেখবে তিনি গেছেন রাশিয়ায়। দেখা হওয়ার জো নেই।"

আমি বললাম, "তা হলে তোমরা কি করে দেখা করো?"

গরু বললো, "সে অনেক হ্যাঙ্গাম। আগে হিসেব করে দেখতে হবে দেশে কোনো বড় বিক্ষোভ টিক্ষোভ হচ্ছে কী না। যদি হয় তাহলে ধরে নিতে হবে তিনি দেশে নেই। তারপর হিসেব করে দেখতে হবে দাদা কোন কোন দেশ একবারের বেশি যায়নি। তারপর দেখতে হবে দাদা কোন দেশে  আছে। তারপর দেখতে হবে হিসেব মতো, যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছবে, তখন এদেশে আবার কোনো নির্বাচন চলে এসেছে কী না ..."

আমি তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বললাম, "সে কিরম হিসেব?"

গরু বললো, "সে ভারি শক্ত। দেখবে?" এই বলে সে ঘাসের ওপর লম্বা আঁচড় কেটে বললো, "এই মনে করো গুলদাদা।" বলেই খানিকক্ষণ গম্ভীর হয়ে চুপ করে বসে রইল। 

তার পর আবার ঠিক তেমনি একটা আঁচড় কেটে বলল, "এই মনে কর তুমি," বলে আবার ঘাড় বাঁকিয়ে চুপ করে রইল।

তার পর হঠাৎ আবার একটা আঁচড় কেটে বলল, "এই মনে কর কৃষকদের বিক্ষোভ।" 

এমনি করে খানিকক্ষণ কি ভাবে আর একটা করে লম্বা আঁচড় কাটে, আর বলে, "এই মনে কর প্রিয়াংকা চোপড়ার পা—" "এই মনে কর গুলবৌদি এখনো অপেক্ষা করছে—" "এই মনে কর ২০০০ টাকার নোটের  চিপ —" "এই মনে করো মুকেশ আম্বানি—" "এই মনে করো রামমন্দির—" "এই মনে করো বিজয় মাল্য—" 

এইরকম শুনতে-শুনতে শেষটায় আমার কেমন রাগ ধরে গেল। আমি বললাম, "দূর ছাই! কি সব আবোল তাবোল বকছে, একটুও ভালো লাগে না।"

গরু  বলল, "আচ্ছা, তা হলে আর একটু সহজ করে বলছি। চোখ বোজ, আমি যা বলব, মনে মনে তার হিসেব কর।" আমি চোখ বুজলাম।

চোখ বুজেই আছি, বুজেই আছি, গরুর  আর কোনো সাড়া-শব্দ নেই। হঠাৎ কেমন সন্দেহ হল, চোখে চেয়ে দেখি গরুটা  ল্যাজ খাড়া করে কতগুলো পুরোনো পাঁচশো আর হাজার টাকার নোট চিবোচ্ছে  আর ক্ৰমাগত ফ্যাচ্‌ফ্যাচ্‌ করে হাসছে।           

(উইথ এপোলোজিস টু হ-য-ব-র-ল।")

মঙ্গলবার, ৬ জুন, ২০১৭

"আমার মাটি ,আমার মা - জমি হাঙরের হবে না " ~ অবীন দত্তগুপ্ত

জগন্নাথ ঘোষ রোডে আক্রমণ এই প্রথম নয় । এর আগেও বহু আক্রমণ হয়েছে ,এবং প্রতিবার ওখানকার মানুষ প্রতিহত করেছে । এখানে বলে রাখা ভালো (আমি যদ্দুর ওখানকার প্রায় মিথ্‌ পর্যায় পৌঁছে যাওয়া সংগঠকদের থেকে জানি) , জগন্নাথ ঘোষ বা কলুপাড়া বা বড়বাগান বস্তির লড়াইটা কিন্তু তৃনমূলি লুম্পেনদের সাথে নয় ,পুলিশের সাথে । তৃণমুলি লুম্পেনরা নিতান্তই শিশু ,এবং প্রতিবারই এরা পিতৃতুল্য পুলিশের আশ্রয়ে বেঁচে থাকেন । আমার মনে আছে ২০১৫-এ বন্‌ধের দিন একিরকমের ঘটনা ঘটেছিল । বন্‌ধ ভাঙতে ব্যর্থ তৃনমূল শেষ-মেষ পুলিশকে লেলিয়ে দেয় । পুলিশ প্রথমে চেষ্টা করে , ব্যরিকেড ভাঙ্গতে ব্যর্থ হয় এবং এলোপাথাড়ি লাঠি চালাতে থাকে । এরই মধ্যে একজন পার্টি এল সি এম-কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ,এবং তাকে রাস্তায় ফেলে পেটাতে থাকে । জনশ্রুত ,অন্য এক কমরেড মাটি থেকে অনেকটা লাফিয়ে উঠে হাই-কিক্‌ মেরে কসবা থানার ওসি-র দাঁত ফেলে দেন এবং গ্রেপ্তার হন । 

এর প্রতিবাদের চিত্তরঞ্জন গার্লস স্কুলের সামনে থেকে মিছিল হয়েছিল সেদিন বিকেল বেলা । আমি সেদিন জয়দার বাইকে চেপে গেছিলাম । সেই অভিজ্ঞতা আমার মধ্যবিত্ত জীবনে ভোলার নয় । আমি দেখেছিলাম , ২০ জনের মিছিল কিরম চোখের পলকে ২০০ থেকে ৫০০ হয়ে ১০০০ হয়ে গেছিল । প্রতিটা ঘর থেকে ,ঝুপড়ি থেকে মেয়েরা বেরিয়ে আসছে (বেশীরভাগ পুরুষেরাই সেদিন পাড়ায় নেই) ,সাথে তাদের কম বয়সী ভাই , ছোট্ট সন্তান , বয়স্ক বাবা-মা । প্রতিটা বাড়ি থেকে লাল ঝান্ডা হাতে মানুষ বেরিয়ে আসছে ।প্রতিটা বাঁকে লোক বাড়ছে , ঝান্ডা বাড়ছে । ওরকম তেজি মিছিল কিছু জায়গায় ভোটের সময় দেখেছি , কিন্তু এ পুরো অন্য গোত্রের বিষয় । আসলে একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের অদম্য বেঁচে থাকার জেদের মিছিল । স্রেফ এই জেদের জোরেই প্রচুর ছাপ্পা মারার পড়েও ৮০%-এর বেশী বস্তির মানুষ লাল ঝান্ডা কে জিতিয়ে দেয় । ফ্ল্যাট নিবাসি মধ্যবিত্ত-এর হারানোর অনেক কিছুই আছে , তারা স্বাভাবিক ভয় পান বন্দুক নাচানো ডেমোক্রেসি-তে অংশ নিতে - জগন্নাথ ঘোষ পায় না । প্রতিদিন সকাল থেকে রাত যাদের বেঁচে থাকাই যুদ্ধের তাদের পায়ের তলার একচিলতে মাটি তারা সর্বস্ব পণ করে রক্ষা করবেন , সেটাই স্বাভাবিক । 

প্রসঙ্গত এই বস্তি উচ্ছেদের চেষ্টা চালাচ্ছে কিছু অসাধু ব্যক্তি বহুদিন ধরেই । মাটি কেউ কেড়ে নিতে এলে যুদ্ধ তো হবেই । 
বাংলাদেশের মৌলবাদ বিরোধী বামপন্থীদের মিছিল দেখছিলাম । অনবদ্য স্লোগান শুনলাম - " আমার মাটি ,আমার মা - পাকিস্তান হবে না । " জগন্নাথ ঘোষ যদি স্লোগান দেয় - "আমার মাটি ,আমার মা - জমি হাঙরের হবে না " ,তবে কি স্লোগানের প্রতি অবিচার করা হবে ? 

"আপোষ না সংগ্রাম । 
সংগ্রাম সংগ্রাম "

সোমবার, ২৯ মে, ২০১৭

আয় ফজল আল গুলো কেটে ফেলি ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়


মেঘ নেই, মেঘ করেনি,
এ বছর বৃষ্টি আসবে না।
এবার ধান জমি, কচি ধান,
হাঁটু জলে ভাসবে না।
আকাশে মেঘ নেই,
জল নেই, প্রান নেই।
তবু আছে।
রক্ত আছে, শুকনো জমি আছে,
পাড়াগাঁ আছে, আদিবাসী আছে,
মমতা-মাও-রাম আছে
জমি তে আল আছে।
জমি তে হাল নেই, হাল চলে না,
শুকনো মাটিতে শুধু
পেট ভরা খিদে জন্মায়।

জমিতে আল আছে,
আলের ওধারে,
ওটা ওর জমি, এটা আমার।
ওর ঈদের দিনে নতুন লুঙ্গি,
আমার পুজোয় নতুন জামা,
হচ্ছে না এবারে।
আল দিয়ে ভাগ করা গ্রাম,
পাশের গ্রাম, বাংলা,
তামাম মুলুক।

বৃষ্টি তে আল দেওয়া যায়নি কেবল।
রোদেও আল দিতে পারিনি আমরা।
এটা সত্যিই ব্যর্থতা।
অনেক বছর আগে কেউ বলত,
ঠিক আকাশের মত,
জমির আল থাকবে না।
যৌথ হবে সবকিছু, বৃষ্টির মত।
ও পেলে, আমিও পাবো,
আমরা সবাই পাবো।


আয় না ফজল তোর কোদাল নিয়ে
একশ দিনের কাজ নেই? 
চল, কেটে ফেলি আল।
আকাশের মত, বৃষ্টির মত,
জমি আর ভাগ হবে না।
একশ দিনে সবাই আল কাটলে
ঠিক পৌঁছে যাবো দিল্লি।
ওখানে এখন বন্যা হচ্ছে।
এদেশ কৃপন নয়, কোথাও না কোথাও
ঠিক দিয়েছে, প্রয়োজনের চেয়ে ঢের বেশি।

আল না থাকলে, সে বানের জল
আটকাবে কিসে?
জল ছড়িয়ে পড়বে গোটা মুলুকে,
আমাদের বাংলাতেও আসবে।
জল আসবে, ধান হবে, জামা-লুঙ্গি হবে।
আমরা নবান্নের দিন
খুব ধুমধাম করব সবাই মিলে।
আয় ফজল, আল গুলো কেটে ফেলি।

রোব্বারের সকাল ~ আর্কাদি গাইদার

রবিবার সকাল বলতেই মনে পড়ে ধোঁয়া ওঠা গোবিন্দভোগ চালের গলা ভাত। আলুসেদ্ধ, ডিমসেদ্ধ। ডিমের কুসুমটা নরম থাকতে হবে। হাসের ডিম হলে তো কথাই নেই। গরমকালে আমুলের মাখন, শীতকালে ঘী। আর সাথে দাত দিয়ে কাঁটার জন্যে একটা কাঁচালংকা। তবে শুরুটাই এটা দিয়ে হতো না।

সকাল হলেই দাদুর সাথে হাত ধরে বাজার। সেখানে বাজারের গেটের খবরের কাগজ বিক্রেতার থেকে কেনা হতো একটা নারায়ন দেবনাথ বা ডায়মন্ড কমিক্স। তারপর সেই কমিক্স হাতে ধরিয়ে দাদু আমাকে বসিয়ে দিতো মাছ কাটবার গৌতমদা'র চাতালের পাশের খালি জায়গায়। এরপর দাদু বাজার ঘুরতো, আড্ডা মারতো, চা খেতো, বোর্ডে গনশক্তি লাগাতো। আর আমি হাতে কমিক্স নিয়ে বসে থাকতাম আর গল্প করতাম গৌতমদা'র সাথে, বা উলটোদিকের মাছবিক্রি করা সুভাষ কাকু, সুরেন দা(যে আমার দাদুর থেকেও বড়, কিন্তু দাদু সুরেনদা বলতো তাই আমিও সুরেনদা বলতাম), মুরগীর দোকানের নাসিরকাকুদের সাথে। এবং অবশ্যই যারা বাজার করতে আসছে সেইসমস্ত অঞ্চলের লোকজনদের সাথেও। সেটা গত শতাব্দীর ৯ এর দশকের প্রথম ভাগ। তখনও স্থানীয় মানুষজন একে অপরের মুখ চিনতো। লোকসংখ্যায়ও কম ছিলো। এরপর বাড়ি ফিরে মাকে দেখানোর জন্যে পড়তে বসা। মানে টুলে বই রেখে ঝিমোনো। দশটা অবধি এই নাটকটা করে যেতেই হতো। দশটা বাজলেই টিভিতে জাঙ্গল বুক শুরু। জাঙ্গল বুকের সাথেই সাথেই চলে আসতো ওপরে বর্ণিত ভাত, ডিম, আলুর স্বর্গীয় কম্বিনেশন। গোটা বাড়ির লোকজনই ওটা খেতো। সেইসময় লোকজন লো-কার্ব, লো-কোলেস্টেরলের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিলো না। তখন টিভিতে মোটে দুটো চ্যানেল। তবে আমাদের মতন ছোটদের জন্যে রবিবার সকালে ওই দুটো চ্যানেলই স্বর্গরাজ্যের দ্বার। সাড়ে দশটা থেকে সাড়ে এগারোটা ডিজনির জগত। টেল স্পিন। ডাক টেলস। এরপর সাড়ে এগারোটা থেকে পাড়ার মাঠ। সেই মাঠে একসাথে খেলতে আসতো ফ্ল্যাটবাড়ি, কমপ্লেক্স, বস্তি, বিভিন্ন আর্থসামাজিক স্তরের শিশুরা। ফুটবলে খরচা কম। ক্রিকেটে খরচা বেশি। তবুও ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে ক্রিকেট বেশি জনপ্রিয় ছিলো।
মোটামুটি বাড়িগুলো থেকে চিৎকার করে ডাকাডাকি শুরু না হওয়া অবধি খেলা চলতো। এই খেলার দ্বিতীয় অধ্যায় আবার শুরু হতো বিকেল ৪টে থেকে। অন্ধকার নামা অবধি খেলা চলতো, যতক্ষন অবধি খালি চোখে বল দেখা যায়। 
আসলে হঠাত করে cliched স্মৃতি রোমন্থন করছি কেন? আজকেও রবিবার সকালে উঠে ভাবলাম যে আমার বয়েসি একজন আজকের দিনটা ঠিক কি ভাবে কাটাবে? বাঙালী এখনও বাজারে যায়, কিন্তু বিগবাস্কেট বা ডেলিবাজারের প্রসার ফেলে দেওয়ার মতন নয়। এরপর সকালে টিভি, ফোনে ফেসবুক, ওয়াটসএপে নিজস্ব বৃত্তের মধ্যেই রাজনীতি নিয়ে আলোচনা থেকে শুরু করে প্রেম, আড্ডা, ঝগড়া চলবে। বিছানায় গড়িয়ে নিতে নিতে হয়তো স্পিকারে গান চালিয়ে কেউ কেউ খবরের কাগজ বা বই পড়বে, অনেকের হাতে থাকবে ট্যাব। এরপর দুপুরের খাওয়ার পালা। বাড়িতে রান্না হলে ভালো, নাহলেও এই গরমে বাইরে যাওয়ার দরকার নেই, স্যুইগি, ফুডপান্ডা at your service. এরপর দুপুরটা কাটিয়েই বিকেলে একটা উবের বা ওলা বুক করে পাব, বা মল, বা সিনেমা হল, বা বন্ধুর বাড়ি, বা রেস্তোরা। 
গোটা ব্যাপারটা এরকম। একটা গেটেড কমিউনিটির প্রাচীর টপকিয়ে কাঁচতোলা গাড়ির হিমশীতল অন্দরমহলে চড়ে আরেকটি প্রাচীর তোলা জায়গায় টুক করে ঢুকে পড়া। এই গোটা ব্যাবস্থাটা এতটাই মসৃণ, যে বাইরের বিশাল জগতের বাস্তবতার সাথে কোনরকম ঈন্দ্রিয়ের যোগাযোগ স্থাপন না করেও এটা করা যায়। কানে একটা হেডফোন লাগিয়ে নিন, বা ড্রাইভার কে বলুন গান চালিয়ে দিতে। চোখ বন্ধ করে সীটে দেহটা এলিয়ে দিন। দেখবেন বাইরের শব্দ, গন্ধ, দৃশ্য কোনটাই আপনাকে সহ্য করতে হচ্ছে না। একটা গোটা শহরকে বাইপাস করে আপনি নির্বিঘ্নে নিজের অস্তিত্বের খোলসের মধ্যে থাকতে পারবেন। 

এরকমটা কিন্তু হওয়ার কথা ছিলো না। প্রযুক্তির প্রতিশ্রুতি ছিলো মানুষকে একে অপরের আরও কাছে আনবে। চ্যাপলিন ৭০ বছর আগে বলেছিলেন - The aeroplane and the radio have brought us closer together. The very nature of these inventions cries out for the goodness in men - cries out for universal brotherhood - for the unity of us all. টেলিফোন, টিভি, ইন্টারনেট - প্রযুক্তির প্রতিটা ধাপেই মানুষের মধ্যে অদৃশ্য দেওয়ালগুলো ভেঙে পড়বার স্বপ্ন দেখিয়েছিলো, তার জায়গায় আরও নতুন নতুন দেওয়াল খাড়া হয়েছে। প্রযুক্তির এই অধঃপতিত মডেলে বিভিন্ন আর্থসামাজিক স্তরের মানুষদের মধ্যে যে এক হওয়ার পরিসরগুলো ছিলো, shared spaces, যার সুত্র ধরে একটা ভৌগলিক অঞ্চলের সমস্তরকম মানুষের মধ্যে moral commons  গড়ে ওঠবার যে সুযোগ, তা আস্তে আস্তে হারিয়ে গেছে। এখন আর আমাদের কোন সমষ্টিগত বাস্তবতা নেই, যার স্বাদ আমারা একে অপরের সাথে ভাগ করে নিতে পারি। পাড়ার খেলার মাঠে ফ্ল্যাটবাড়ির শিশু আর রিকশাওয়ালার শিশুর সাথে খেলে না। খেলার মাঠটাই আর নেই। দুজন এখন নিজেদের আলাদা পরিসরে খেলাধুলো করে। আমাদের শপিং মলগুলোতে বস্তির লোকেদের ঢোকার বিরুদ্ধে অলিখিত নিয়ম আছে। এরজন্যে সাইনবোর্ড টাঙ্গাতে হয় না। মলের মধ্যে প্রাইস ট্যাগগুলোই সেই সাইনবোর্ডের কাজ করে। একবিংশ শতাব্দীর apartheid চামড়ার রঙ দেখে হয় না, মানিব্যাগের ওজন দেখে হয়। আর শুধু বাস্তব জগতে কেন! আপনার ফেসবুকের ফ্রেন্ডলিস্টের নামগুলো কাদের? আপনি কাদের সাথে ওয়াটসএপে কানেক্টেড? তার মধ্যে আপনার আর্থ-সামাজিক স্তরের বাইরের কটা লোক আছে? তাহলে একটাও দেওয়াল কি সত্যিই ভাঙতে পারলেন? একবিংশ শতাব্দীর এই উপহার আমরা পেয়েছি প্রযুক্তির এই স্বীকৃত মডেলের থেকে, উন্নয়ন যেখানে রিপ্লেস করেছে empathy কে। একে কি বলে জানেন? alienation। এই যে সামাজিক এলিয়েনশন, যার ফলস্বরুপ আসবে মানসিক এলিয়েনেশন, এর কথা মার্ক্স বহু বছর আগে লিখে গেছিলেন। প্রযুক্তি রয়েছে, এমনকি উৎপাদন প্রক্রিয়ার সব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ অব্যাহত, কিন্তু সেই প্রবেশের শর্ত ঠিক করা হচ্ছে একমাত্র প্রফিট মোটিভের শর্ত মেনে। প্রযুক্তি তাই আর মানুষকে কাছে আনা নিয়ে ভাবিত নয়, তার এক এবং একমাত্র লক্ষ্য - মুনাফা। মানুষের কায়িক শ্রমকে লঘু করবার কথা ছিলো যার - অটোমেশন - সে আজ মানুষের পেটে লাথি মারতে উদ্যত। একজন শ্রমিককে ডেকে বলা হচ্ছে - তোমার শ্রমের আর প্রয়োজন নেই। You are redundant. একটা মেশিন বা একটা এলগোরিদিম উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে একজন মানুষের অস্তিত্ব এক মুহুর্তে ছিন্ন করে দিচ্ছে। সে আর শ্রমিক নয়। উৎপাদন ব্যাবস্থায় তার আর কোন ভূমিকা নেই। সে অপ্রয়োজনীয়। প্রযুক্তির এই বর্তমান মডেল আমাদের যে সারসত্য উপহার দিয়েছে -
 Automation is the highest form of alienation. নীল কলার থেকে সাদা কলার, কেউই সুরক্ষিত না। প্রযুক্তি আমাদের ভিত্তি, এলিয়েনেশন আমাদের ভবিষ্যৎ। 

এর মধ্যেও, এখনও, তাও কেউ কেউ লড়ে যায়। জেনে বা অজান্তে। সেদিনকে একটি মেয়ের সাথে একটি কাজ নিয়ে কথা বলছিলাম। আলোচনার শেষে বললাম, আমি অমুক তারিখের পর তোকে ফেসবুকে ইনবক্স করে জানাচ্ছি। একটু লাজুকভাবে বললো, আমি রাতে বাড়িতে গিয়ে মাঝেমধ্যে পিসি থেকে লগ ইন করি, ইনবক্সে পাঠালে হয়তো মিস করে যাবো। তুমি ফোন করে জানিও। 
কিছুক্ষন হতবাক হয়ে গেলাম। আমার চেয়ে দশ বছরের ছোট একটি মেয়ে, ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। এরা পরের প্রজন্ম। কি অবলীলায় সারাদিন 'কানেক্টেড' থাকবার এ যুগের দাবীকে অস্বীকার করে টিকে রয়েছে। 
হয়তো এদের হাত ধরেই প্রযুক্তির সেই উন্নতর মডেলকে আমরা পাবো, যা মানুষকে ব্রাত্য নয়, মুক্ত করবে। ৭০ বছর আগে চ্যাপলিন যেমন বলেছিলেন - More than machinery we need humanity. More than cleverness we need kindness and gentleness. Without these qualities, life will be violent and all will be lost….

রবিবার, ২৮ মে, ২০১৭

নবান্নটি ভীষন উপদ্রুত ~ সোমনাথ


নবান্নটি ভীষণ উপদ্রুত
কখনো ভেক, কখনো ছলছুতো
ভাঁড়ারে নেই তোমার কোন যুক্তি

বিদ্রোহীরা স্লোগান দিতে পারে
জীবন, তাকে পণ রেখে এই বারে
লিখছে না আর শান্তি আনার চুক্তি

আপোষ হওয়া কঠিনই, দুঃসাধ্য
লাল ঝান্ডার লোকগুলো নয় বাধ্য
জানি তুমি আঁটছ কুটিল ফন্দী

যুদ্ধ হবে নখর এবং দন্তে
শ্রমিক-কৃষক সেই লড়ায়ের অন্তে
নবান্নতেই করবে তোমায় বন্দী

শুক্রবার, ২৬ মে, ২০১৭

বিজেপি আইটি সেল ইন্টারভিউ ~ সতদ্রু দাস

- গুড মর্নিং স্যার। মাইসেলফ মহেশ, ফ্রম হরিণঘাটা।
- মর্নিং। লেখাপড়া কদ্দুর?
- স্যার তিন বার উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছি, তারপর ডিপ্লোমার জন্য চেষ্টা করছি, আশা করছি...
- ওভার-কোয়ালিফায়েড।
- আজ্ঞে?
- ডিপ্লোমা হয়ে গেলে ওভার-কোয়ালিফায়েড হয়ে যেতেন। যাজ্ঞে, কম্পিউটার ব্যবহার কতটা পারেন?
- স্যার ওয়ার্ড, স্প্রেডশিট, পাওয়ার পয়েন্ট, সামান্য ভিডিও এডিটিং আর জা..
- ফটোশপ? পারেন?
- হ্যাঁ অল্প স্বল্প পারি।
- অল্প স্বল্পতে হবে না। এনিওয়ে, ওটা শিখিয়ে দেওয়া হবে। এবার আপনাকে কয়েকটা ছবি আর ভিডিও দেখাবো, আপনাকে বলতে হবে এটা কিসের ছবি আর ভিডিও। রেডি?
- ওকে স্যার।
- ছবি নম্বর ওয়ান। এটা কোন জায়গা?
- স্যার এটা তো দেখে মনে হচ্ছে নিউ ইয়র্কের ম্যানহ্যাটান।
- আপনি শিওর?
- হ্যাঁ, ওই তো এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং।
- ভুল। এটা আমেদাবাদের আশ্রম রোড।
- কিন্তু স্যার...
- নেক্সট, এটা কিসের ভিডিও?
- ইসসস! কী ভয়ংকর! আইসিস জঙ্গি বা মেক্সিকান ড্রাগ ওয়ারের ভিডিও মনে হচ্ছে স্যার। জানেন স্যার মেক্সিকোর ড্রাগ মাফিয়ারা এরকম গলা কেটে ডজন ডজন মানুষকে ঝুলিয়ে রাখে রাস্তার মোড়ে...
- কিন্তু এটাকে কী বলে চালাতে হবে?
- মানে স্যার..
- ধুর! এটাকে বলতে হবে পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের হাতে হিন্দু খুনের ভিডিও। আপনার পারফরম্যান্স এখনো অবধি ডিসাপয়েন্টিং। যাই হোক, পরের ছবিটা দেখুন। এটা কি?
- সিপিএমের মিছিল মনে হচ্ছে স্যার। টিয়ার গ্যাস শেল তুলছে হাত দিয়ে।
- তারপর?
- এটাকেও বিজেপির মিছিল বলবো? কিন্তু স্যার পতাকাটা?
- এখানেই তো ফটোশপ স্কিল! সবই বলে দিতে হচ্ছে আপনাকে। পরের ভিডিওটা দেখুন। 
- এটা দেখেছি, উত্তর প্রদেশে দলিতদের হাত কেটে দিচ্ছে ঠাকুররা। এই জাতি দাঙ্গা কবে থামবে কে ...
- আমাদের কাজে কী ভাবে আসতে পারে?
- বুঝলাম না। অখিলেশের আমলের ঘটনা বলবো?
- হুঁ, সেটা বলা যেতে পারে তবে তার চেয়েও ভালো হবে যদি বলেন মুসলমানদের হাতে দলিত খুন।
- লোকে বিশ্বাস করবে?
- বার বার করে বললেই করবে। এই ছবিটা চেনেন?
- হ্যাঁ কি যেন নাম? পুলিশের হেফাজতে মরে গেলো। বাম রাজনীতি করতো। সুদীপ্ত না কি...
- আমরা কি বলবো?
- কি বলবো স্যার? আমরা বামেদের হয়ে প্রচার করবো নাকি?
- উফফ! আপনি তো মহা উজবুক! এর নাম হবে সত্যনারায়ণ আগরওয়াল। এবিভিপির কর্মী। মমতার পুলিশ খুন করেছে। নাঃ আপনাকে দিয়ে হবে না। পরীক্ষায় কোনোদিন টুকেছেন?
- না স্যার। বাবা বলতেন "যা নিজে পারবে তাই...
- বোঝা গেছে। আপনি আসতে পারেন। জয় শ্রী..?
- রাম!
- হর হর..?
- মহাদেব!
- মহাদেব না, মোদি। ওই জন্যই বললাম আপনাকে দিয়ে হবে না। আসুন।

বৃহস্পতিবার, ২৫ মে, ২০১৭

মিছিল ~ কৌশিক দত্ত

অনেক কিছু দেখার ছিল আজ, সেই হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দিন। নকশালবাড়ি হত্যার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে কেন জাতীয়তাবাদী বিজেপি নগর-পুলিশের সদর দপ্তরে কামান দাগতে নামল, তা নিয়ে কৌতূহল ছিল না। রাজনৈতিক গুরুত্বে পিছিয়ে না পড়ার তাড়না বড় বালাই, অত দিনক্ষণ খেয়াল রাখা যায় না। হঠাৎ সিদ্ধান্তের পর অল্প দিনে কত লোক জোগাড় করতে পারে, কোথা থেকে এবং কোন ধরণের মানুষ মিছিলে আসেন, সেসব রাজনৈতিক কৌতূহলের বিষয় হলেও আমার আগ্রহ ছিল অন্য কিছু বিষয়ে। 

১) বিজেপি কীভাবে মিছিল করে, ইটপাটকেল ছোঁড়ার পথে যায় কিনা, বিশেষত এমন এক সময়ে যখন কাশ্মীরে পুলিশের দিকে পাথর ছোঁড়া এমনই বড় এক সমস্যা, যার মোকাবিলায় পেলেট গান এবং হিউম্যান শিল্ডকেও সমর্থনযোগ্য প্রশাসনিক পদ্ধতি বলা হচ্ছে তাদের নিজেদেরই তরফে! 

২) পুলিশ কীভাবে মিছিলের মোকাবিলা করে? আগের দিনের মতো পেটানো এবং না পেটানো, দুটোই সমস্যাজনক রাজনৈতিক সংকেত বহন করবে, এরকম পরিস্থিতিতে সরকার ও পুলিশের ভূমিকা দেখার ছিল। 

৩) যাই ঘটুক, বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবির থেকে কেমন প্রতিক্রিয়া আসে, তাও আমাদের গণচরিত্র বোঝার জন্য এক মূলবান উপাদান।  

যা দেখা গেল, তার মধ্যে অপ্রত্যাশিত চমক বিশেষ নেই। জাতীয়তাবাদীরা ইট ছঁড়লেন, সাথে দু-একটা বোমাও। বোমাগুলো নিরীহ ধোঁয়া বোম ছিল, মিছিলে মিশে যাওয়া পুলিশের এজেন্টও ছুঁড়ে থাকতে পারে, কিন্তু ইটপাটকেল ছুঁড়েছে মিছিল (যা আগের দিনও ছোঁড়া হয়েছে) এবং জ্বালানো হয়েছে গাড়ি (যা আগের দিন হয়নি, তবে আগেরও আগে প্রায়শই হত)। সমস্যা হল, আজকের ভারতে বিজেপির মিছিলের এই কাজকর্ম বিভিন্ন উত্তেজনাপ্রবণ এলাকায় সরকারবিরোধী আন্দোলনে এই জাতীয় হিংসাত্মক কার্যকলাপকে বৈধতা প্রদান করে। সংবাদ পরিবেশনের কৌশলের কারণে হতে পারে, আজ মিছিল বিশেষ দেখতে পেলাম না, শুধু গণ্ডগোলই দেখা গেল।  

পুলিশ খানিক শিখেছে, কায়দা বদলেছে দেখা গেল। মারপিট করেছে, কিন্তু "ডিস্ক্রিশন" ব্যাপারটা রপ্ত করেছে তিনদিনেই। উল্লেখযোগ্য উন্নতি হল সাংবাদিকদের না পেটানো। পুলিশ তার তাৎক্ষণিক সুফলও পেয়েছে। আজ সব চ্যানেলে একজন আহত পুলিশকর্মীর কাতরতার দৃশ্য অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হয়েছে। ভদ্রলোকের অবস্থা সত্যি বেশ খারাপ মনে হল, তাঁর আরোগ্য কামনা করি।  

মানুষের প্রতিক্রিয়া আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ। আজ যাঁরা মাথাফাটা যুবকের রক্তাক্ত ছবি দিয়ে পুলিশকে অত্যাচারী বলছেন, ২২ তারিখ তাঁদের দেখেছিলাম "মাকু"রা মার খাওয়ায় উল্লসিত হতে। আবার সেদিন যাঁরা পুলিশের হিংস্রতার প্রতিবাদে আগুন ঝরিয়েছিলেন স্লোগানে কলমে, আজ তাঁদের ভূমিকা অন্যরকম। কেউ সম্পূর্ণ নীরব, কেউ পুলিশের লাঠিচার্জকে ন্যায়সঙ্গত বলে যুক্তি পেশ করছেন, কেউ বিজেপি কর্মীদের আহত হবার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অস্বীকার করছেন (বিজেপির অবিমৃশ্যকারী আইটি সেল ফেক ছবি পোস্ট করে তাঁদের হাতে অস্ত্র দিয়েছে), কেউ আবার "চাড্ডি"রা মার খাওয়ায় বেশ আনন্দিত। আবার দুই দিনই পুলিশের ভূমিকাকে যাঁরা নিঃশর্তে সমর্থন করছেন, তাঁরা মূলত তৃণমূল সমর্থক। আর দু'মাস পর তাঁদের মনে পড়বে (প্রতি বছরের মতো) যে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযান করতে গিয়ে পুলিশের মারে আহত হয়েছিলেন তৎকালীন যুকং নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, থ্রি-নট-থ্রি বুলেটের ঘায়ে নিহত হয়েছিলেন ১৩ জন। তখন রাজ্যের তখতে আসীন ছিলেন তাঁরা, যাঁরা তিনদিন আগে শহরের রাস্তায় বেপরোয়া লাঠির শিকার হলেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রশক্তির চরিত্র বদলের জন্য বা অত্যাচারের প্রতিবাদের জন্য রাজনীতি নয় আমাদের; রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে মেশিনারিটিকে নিজের স্বার্থে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারাই প্রকৃত লক্ষ্য। নইলে আজ অব্দি বিভিন্ন রাজনৈতিক মিছিলে নানা রঙের পতাকা হাতে নিয়ে অঙ্গ বা প্রাণ হারিয়েছেন যাঁরা, তাঁরা তো সাধারণ মানুষই। তাঁদের রক্ত আনন্দ দিয়েছে যাঁদের, তাঁরাও সেই একই বিরাট ব্র‍্যাকেটের অন্তর্ভুক্ত...  "সাধারণ মানুষ"! 

আবার "পুলিশ"কে রাষ্ট্রের দমননীতির বাহক ভাবতে অভ্যস্ত আমাদের রাজনৈতিক সত্তা উর্দির আড়ালে থাকা ব্যক্তি মানুষটিকে মানুষ হিসেবে চিনতে নারাজ। দলমতনির্বিশেষে তাই আমরা যখন বিরোধী শিবিরে থাকি, মিছিলে থাকি, তখন ব্যক্তি পুলিশ কন্সটেবল বা সার্জেন্টকে রক্তাক্ত লুটিয়ে পড়তে দেখে যুদ্ধজয়ের আনন্দ পাই। অথচ সেই মানুষটি হয়ত মাসের শেষা আমাদের চেয়েও কম মাইনে পাওয়ার জন্য চাকরি বাঁচাতে জ্যৈষ্ঠ-দুপুরে রাস্তায়। সে আর বাড়ি না ফিরলে তার মেয়েটির স্কুলে পড়তে যাওয়া ঘুচবে। উর্দি, কি অপূর্ব কৌশলে, মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেয়! 

বোঝা যায়, "contradiction within the people", আমরা চাই বা না চাই, রীতিমত antagonistic এখনো। মানুষের জন্য ততটা নয়, যতটা কিছু মানুষের প্রতি ঘৃণার বশে আমাদের রাজনীতি। ঘৃণার রাজনীতির ভিত্তিই হল "শত্রু" নির্মাণ, আর "সাধারণ মানুষ" যেহেতু কোনো সমসত্ত্ব দ্রবণ নয়, তাই ব্যক্তি-গোষ্ঠীর স্বার্থের সংঘাতকে অবলম্বন করে "শত্র"র তালিকায় ঢুকে পড়ে কিছু সাধারণ মানুষই। কোনো দলই তাই শেষ পর্যন্ত মানুষকে রিপ্রেজেন্ট করে উঠতে পারে না। অত্যন্ত সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করলেও আনুগত্য বাঁধা পড়ে রঙের কাছে, ভালবাসা হারিয়ে যায় ঘৃণার স্রোতে। 

ঘৃণাকে পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মিছিলে হাঁটতে চাই। আমি নিশ্চিত, সেই মিছিলে কিছু লোক হবে। যাঁরা আজ আমার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন বা আমার দলীয় আনুগত্যহীনতাকে বিদ্রূপ করবেন, তাঁদেরও কেউ কেউ সেই মিছিলে পা মেলাবেন, স্বপ্ন দেখি।

বুধবার, ২৪ মে, ২০১৭

নবান্ন অভিযান ~ অবীন দত্তগুপ্ত

গতকালের নবান্ন অভিযানের পর থেকে বিভিন্ন মিডিয়া (যারা এতোদিন বোবা কালা হয়ে ছিলেন ) ,তারা হঠাত-ই প্রচণ্ড উত্তাজিত হয়ে উঠেছেন । গত পরশু অব্দি তাদের বক্তব্য ছিল বাংলার রাজনীতি মূলত ধর্ম ভিত্তিক । গত পরশু অব্দি ,প্রতিটি পাড়ায় প্রতিটি অঞ্চলে লাল ঝান্ডার মিছিল-মিটিং নিয়ে , বিশাল বিশাল জেলা ভিত্তিক কেন্দ্রিয় জমায়েত নিয়ে কোন খবর হয় নি । অতএব , ওদের হঠাত করে পাশ ফিরে শুতে অসুবিধা হবেই । বিজেপি- ফিজেপি যে আদতে টাকায় তৈরি হওয়া কাগুজে বাঘ , যার মনিবের নাম তৃণমুল স্বিকার করতে অসুবিধা হবেই । অতএব মানুষের জীবন জীবিকার দাবী নিয়ে তৈরি হওয়া আন্দোলন , যার একটি মৌলিক ধাপ এই নবান্ন অভিযান তা মেনে নিতে (ঢোঁক গেলা অবস্থাতেও) তাদের অসুবিধে হবে এটাই স্বাভাবিক ।সুতরাং লক্ষ লক্ষ মানুষের ব্যারিকেডকে, ১০০ দিনের কাজের প্রাপ্য দাবীর লড়াইকে ,ক্ষেতমজুরের বর্ধিত মজুরির দাবীকে , ফসলের বর্ধিত মুল্যের দাবীকে , বেকারের চাকরীর দাবিকে , শ্রমিকের লক্‌ আউটের বিরুদ্ধের আন্দোলনকে , বিদ্যুতের অনবরত বেড়ে চলা দাম কে এরা স্রেফ পেশী সঞ্চালনের সাথে তুলনা করবে এটাই স্বাভাবিক । আমি তাই আরও একবার নবান্ন অভিযানের মৌলিক দাবীগুলি , যার জন্য মানুষ কাল কুকুরের মতো মার খেলো- বাঘের মতো প্রতিরোধ করলো , শেয়ার করছি । না করলে ইতিহাস ক্ষমা করতো না । পড়লে পড়ুন , না পড়লে - হাল্কা আনফলো ।



আমাদের দাবি:

১। ধান কেনায় বোনাস তুলে দেওয়ার কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করো। কুইন্টাল প্রতি ২০০ টাকা বোনাস চাই। ন্যূনতম ৫০ টাকা পরিবহণ খরচ দিয়ে সহায়ক মূল্যে ধান কিনতে হবে। চেক ভাঙানোর হয়রানি বন্ধ করতে নগদে ধান কিনতে হবে। প্রতি গ্রাম পঞ্চায়েতে একাধিক ক্রয়কেন্দ্র খুলতে হবে। অভাবী বিক্রির সময় ধান কেনা হলো না কেন রাজ্য সরকার জবাব দাও।
২। স্বামীনাথন কমিটির সুপারিশ মেনে ধান, পাট ও গমের সহায়ক মূল্য স্থির করতে হবে। গম আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক তুলে দিয়ে কৃষক মারার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ কর। হিমঘরে রাজ্য কোটায় সরকারকে আলু রাখতে হবে। রাজ্য সরকারকে কুইন্টাল প্রতি ৭০০ টাকা দরে আলু কিনে চাষিদের সহায়তা করতে হবে।
৩। রবি ও বোরো চাষে বর্গাদারসহ সব কৃষককে ৮ সুদে ব্যাঙ্ক বা সমবায় ঋণ দিতে হবে। মৌজা ভিত্তিক শস্যবিমা চালু করা বর্গাদারসহ সব চাষিকে কৃষি বিমার আওতায় আনতে হবে। পেট্রোল, ডিজেল, রান্নার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি বন্ধ কর। কেরোসিনের বরাদ্দ কমানো হলো কেন — কেন্দ্রীয় সরকার জবাব দাও। ছোট-মাঝারি কৃষক ও বর্গাদারদের চাষ জমির বিদ্যুতের লাইন কাটা নয়, ভরতুকি দিতে হবে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এবং বর্গাদারদের চাষ ও ফসল তোলায় রেগা প্রকল্প চালু করতে হবে।
৪। তিস্তা প্রকল্পের কাজ অবিলম্বে শেষ করতে হবে। পানীয় জলের স্বার্থে ভূগর্ভস্থ জলোত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করো। নদী, খাল, বিল সংস্কার করো। সুন্দরবনের বাঁধ নির্মাণ হচ্ছে না কেন রাজ্য সরকার জবাব দাও। নদী ভাঙনরোধে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
৫। সমস্ত গ্রাম পঞ্চায়েতে রেগার কাজ চালু করতে হবে। রেগায় বছরে ১০০দিনের কাজ ও দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরি চাই। অবিলম্বে রেগার বকেয়া মজুরি, ভাতা ও অন্যান্য বকেয়া দিতে হবে। ১০০দিনের কাজসহ ত্রিস্তর পঞ্চায়েতে দুর্নীতির তদন্ত চাই। ৬০ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে সব কৃষককে মাসে ৩,০০০ টাকা পেনশন দিতে হবে।
৬। কোনো গরিব মানুষকে খাদ্য সুরক্ষা তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। খাদ্য সুরক্ষা থেকে গরিব মানুষের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে কেন — রাজ্য সরকার জবাব দাও। খাদ্য সুরক্ষার বরাদ্দ কমানো বা অনিয়মিত হচ্ছে কেন রাজ্য সরকার জবাব দাও। সকলকে ডিজিটাল রেশনকার্ড দিতে হবে। সব মানুষকে গণবণ্টন ব্যবস্থার আওতায় রাখতে হবে।
৭। সব বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়োগে দুর্নীতি বন্ধ করো। মেধা তালিকা প্রকাশ না করে এস এম এস মাধ্যমে নিয়োগ চলবে না। সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে সমকাজে সমমজুরি চালু করতে হবে।
৮। বাস্তুহীনদের বাস্তুজমি দিতে হবে। সমস্ত গৃহহীনদের প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার আওতায় আনতে হবে।
৯। বনাঞ্চলের অধিকার আইন কার্যকর করতে হবে। আদিবাসীদের জন্য ল্যাম্প সোসাইটিগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।
১০। সব আত্মহত্যাকারী কৃষক পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা হারে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
১১। দুর্নীতিরোধে সব মানুষ এক হও। সমস্ত চিট ফান্ড, শিলিগুড়ি উন্নয়ন পর্ষদ, নারদ, ব্রিজ কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে এক হও। সাহারা ও বিড়লা ঘুষকাণ্ডের তদন্ত করতে হবে। ব্যাপমসহ কেন্দ্র ও রাজ্যে দুর্নীতির তদন্তকারী কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর উপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করো। রাজনী‍‌তিতে দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করো।
১২। রাজ্যে ধর্ষণ, নারী ও শিশু পাচার বাড়ছে কেন — মুখ্যমন্ত্রী জবাব দাও। ধর্ষণ ও পাচারকাণ্ডে যুক্তদের কঠোর শাস্তি চাই। রাজ্যে নিয়ম না মেনে ব্যাঙের ছাতার মতো নার্সিংহোম হলো কেমন করে — স্বাস্থ্যমন্ত্রী/মুখ্যমন্ত্রী জবাব দাও।
১৩। বিকল্প ব্যবস্থা না করে নোট বাতিল হলো কেন — প্রধানমন্ত্রী জবাব দাও। বিদেশি ব্যাঙ্কে জমা টাকা ফেরত এলো না কেন — প্রধানমন্ত্রী জবাব দাও। নোট বাতিলের আগে রাজ্য বি জে পি জানলো কেমন করে — প্রধানমন্ত্রী জবাব দাও।
১৪। ২০১৩ সালের আইন মেনে সরকারকে জমি করতে অধিগ্রহণ হবে। জমি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কৃষক সমাজ জোট বাঁ‍ধো। ভাঙড় আন্দোলনে ধৃতদের বিনাশর্তে মুক্তি চাই। কর্পোরেট হাউসদের হাতে খাস জমি না দিয়ে গরিবদের জমির পাট্টা দিতে হবে। কর্পোরেট হাউসদের ঋণ ও সুদ ছাড় নয় — মাঝারি কৃষক পর্যন্ত সব কৃষকের ঋণ মকুব করতে হবে। ই পি এফ-এর সুদ কমানো চলবে না। কর্পোরেটদের সাথে চুক্তি চাষ বন্ধ করো।
১৫। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ও উভয় মৌলবাদের বিরোধিতায় ঐক্যবদ্ধ হও। সাম্প্রদায়িক ও উভয় মৌলবাদ-নিপাত যাক। উদারনীতি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে শামিল হও। সংখ্যালঘু ও দলিতদের বিরুদ্ধে সঙ্ঘ পরিবারের হামলা বন্ধ করো।
১৬। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের গণতন্ত্র ধ্বংসকারী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও। সংবিধান প্রদত্ত গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা চলবে না। রাজ্যে মানুষের গণতন্ত্র হরণ করা হচ্ছে কেন — রাজ্য সরকার জবাব দাও।
১৭। পলাশী চিনিকলের অব্যবহৃত জমি ভূমিহীন ও গরিব কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।
১৮। জমির মিউটেশন ফি বাড়ানো চলবে না। জমি হাঙরদের রক্ষা করতে দ্রুত জমির চরিত্র বদলের চক্রান্ত বন্ধ কর।

#Banglabiponna

মঙ্গলবার, ২৩ মে, ২০১৭

শ্রেনীযুদ্ধ ~ আর্কাদি গাইদার

আমরা যারা বামপন্থী রাজনীতি করি, আমাদের কাছে একটি অতি পরিচিত শব্দ - প্র‍্যাক্সিস।
প্র‍্যাক্সিস - অর্থাৎ থিওরি এবং প্র‍্যাক্টিস, বেশ মজার জিনিস। একটা বাদ দিয়ে শুধু অন্যটা দাঁড়ায় না।

এই যেমন আজকে নবান্ন অভিযানে ব্রিজে ওঠবার মুখে পুলিশের ব্যারিকেডের কাঠামোটাকে দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে যখন ঝাকানো হয়, পাশে হাত লেগে যায় দক্ষিন ২৪ পরগনা থেকে আগত লুঙি-শার্ট পড়া এক শীর্ণকায় বৃদ্ধ ক্ষেতমজুরের হাতে, দুজনের ঘাম একসাথে  লেপ্টে যায় ওই ব্যারিকেডের ধাতব দেহে, আর ঝাকাতেই থাকি, ঝাকাতেই থাকি, কারন ওই ব্যারিকেডটা ভাঙতে পারলেই একদিন পেড়ে ফেলবো রাষ্ট্রযন্ত্রকে, আর ঝাকাতে ঝাকাতে একটা তাল খুজে পাই সকলে, সেই তালে বারবার মাথার মধ্যে বিদ্যুতের মতন ঝিলিক দিয়ে ওঠে - শ্রেনী।
আর ব্যারিকেডটা ভাঙার পরের মুহুর্তেই যখন পুলিশ শুরু করে লাঠিচার্জ,  তখন প্রাথমিকভাবে পিছু হটবার জন্যে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়। তার মধ্যেই মানুষের স্রোতের উলটোদিকে সাঁতরে আসেন কিছু মানুষ, তাদের দেখে থমকে যায় মানুষ, থমকে যায় পুলিশের লাঠি, ছত্রভঙ্গ লালঝান্ডার ভিড় আবার একটু একটু করে এদের ঘিরে জমাট বাধতে থাকে রাস্তা জুড়ে, যেন চাপ চাপ রক্ত, এবং আবার পজিশন নিয়ে শুরু হয় লড়াই - ভ্যানগার্ড!
কোথা থেকে যেন জড়ো হয়ে যায় ইট, পাথর, চাঙড়, এবং কিছুক্ষনের জন্যে কলকাতার রাজপথ হয়ে ওঠে কাশ্মীর।
হঠাত টায়ার ফাঁটার মতন আওয়াজ করে টিয়ার গ্যাস সেলের বর্ষন শুরু হয়, লাল ঝান্ডা হারিয়ে যায় ধোয়ার মধ্যে, আর চারিদিকে ধ্বনি ওঠে - 'রুমাল ভিজিয়ে মুখে বাধুন কমরেড!' একদল ছাত্র, মুখে রুমাল বাধা, এই ভিড়ের মধ্যেই এদিক ওদিক দৌড়ে তপ্ত টিয়ার গ্যাস শেল সংগ্রহ করে ছুড়তে থাকে পুলিশের দিকে, আর প্রখর রোদে ফিনফিন সিল্কের মতন কাঁপতে থাকা হাওয়া আর ধোয়ায় চোখ নাক জ্বলতে থাকা অবস্থায় হঠাত যেন কলকাতা পালটে হয়ে যায় প্যালেস্তাইন, বা সিয়াটেল।

এরও অনেক পড়ে, হাসপাতালে এমার্জেন্সিতে পাশাপাশি রক্তাক্ত অবস্থায় রুমাল চেপে বসে থাকেন এক বৃদ্ধ পুলিশকর্মী আর এক ছাত্রী। ছাত্রীটি মনে মনে বলতে থাকে - 'আপনি রাষ্ট্রযন্ত্রের চাকরি করেন, আপনার ভূমিকা পালন করেছেন। আমি কমিউনিষ্ট পার্টি করি, আমার ভূমিকা পালন করেছি।' তারপর ফোন বার করে মা'কে ফোন করে - 'তোমরা কোনদিকটায় চলে গেলে? বেশি লাগেনি তো?'

বাইরে রাস্তায় এখন রোদ মরে গিয়ে বিকেল নেমেছে। পিচের ওপর পড়ে রয়েছে রক্ত, ঘাম, টিয়ার গ্যাসের শেল আর ভাঙা ব্যারিকেডের টুকরো। কয়েকটা ছেড়া চটি। একটা প্লাস্টিকের ফ্রেমের চশমা। কলকাতা আজ ফ্রন্টিয়ার সিটি। শ্রেনীযুদ্ধ।

সোমবার, ২২ মে, ২০১৭

বাইশে মে ~ বাল্মীকি ঘোষ

কোনো এক ২১শে জুলাই নিজের দলের সাধারণ কর্মীদের তাতিয়ে দিয়ে পালিয়েছিলেন (যাতে করে পরে লাশের সিঁড়ি বানিয়ে তরতর করে উপরে ওঠা যায়!) 
আজকে "অবলুপ্ত/মৃতপ্রায়" বামদলগুলির আন্দোলনের ভয়ে, পুলিশ নামক উর্দিধারী তৃণমূলী গুন্ডাদের লেলিয়ে দিয়ে, শহর ছেড়ে পালালেন। বাম নেতৃত্ব কর্মীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামনে থেকে লড়াই করে গেলেন, পুলিশের লাঠির বাড়ি আর কাঁদানে গ্যাসের যন্ত্রনা কর্মীদের সাথে ভাগ করে নিলেন। লড়াই সাচ্চা হলে আর হাতে লাল ঝান্ডা থাকলে মানুষ পালায়নি কখনো, পালাবেন না । সে তাঁরা নেতা হোন বা কর্মী। বাংলার মানুষের অধিকার অর্জনের লড়াই জারি রইলো।বাম কর্মীরা ২২ মে কে ইতিহাসের পাতায় ঢুকিয়ে দিয়ে গেলেন নিজেদের রক্ত ঝড়িয়ে!
"জননেত্রী" মনে রাখুন:
Those who make peaceful demonstrations impossible, make violent revolutions inevitable!"
#BanglaBiponna
#CholoNabanna

শনিবার, ২০ মে, ২০১৭

তৃণমূল এবং বি জে পি—‘মেড ফর ইচ আদার’

পশ্চিমবাংলায় বি জে পি-আর এস এস-এর ভিত তৈরির জন্যই কংগ্রেস ভেঙে জন্ম হয়েছিল তৃণমূল নামে দলটার। তৃণমূল তৈরির আগে থেকে আজ পর্যন্ত এই দল এবং দলের সুপ্রিমোর গতি-প্রকৃতি একটু তলিয়ে বিচার করলেই সেটা সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে। ঘটনাপ্রবাহ বলছে বি জে পি-আর এস এস 'মুখ', আর তৃণমূল 'মুখোশ'-এর কাজ করে চলেছে বিভিন্ন সময়। যেখানে এবং যখন 'মুখ' দেখিয়ে কাজ হবে না, তখন 'মুখোশ' দেখাও! কিছু লোকদেখানো নাটকবাজি সঙ্গে যুক্ত করো, ব্যাপারটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য! আসুন একটু খতিয়ে দেখি: 
• ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর। গোটা বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ঐতিহ্যকে কলঙ্কিত করে ধূলোর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হলো চারশো বছরের পুরনো বাবরি মসজিদের ইমারতকে। মমতা ব্যানার্জি তখন কংগ্রেসে, কেন্দ্রে নরসিমা রাও সরকারের মন্ত্রী। তখন তো নয়ই, আজও পর্যন্ত টুঁ শব্দটি করেননি বি জে পি-আর এস এস-র এই ঘৃণ্য ধ্বংসকান্ডের বিরুদ্ধে। কেন?
• ১৯৯৬ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ীর ১৩দিনের সরকারের পতন হলো। গঠিত হলো সংযুক্ত মোর্চার সরকার। এই সময় জাতীয় রাজনীতিতে বি জে পি যখন একেবারে কোনঠাসা, কার্যত আঞ্চলিক দলগুলি যখন বি জে পি-কে একঘরে করে দিয়েছিল, ঠিক তখনই বি জে পি-কে বাঁচাতে মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে মমতা ব্যানার্জির। কংগ্রেস ভেঙে তখন তিনি নতুন দল গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তৃণমূল তৈরি হওয়ার আগেই, ১৯৯৭ সা‌লের ডি‌সেম্বর মা‌সে, মমতা ব্যানার্জি্ই প্রথম বলেন, ''বি‌ জে ‌পি অচ্ছুৎ নয়''। ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক মানুষদের অনেকেই তখন অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু নতুন দল গড়ার মদতটা কোন জায়গা থেকে এসেছিল, তা বুঝতে কারো অসুবিধা হয়নি। 
• ১৯৯৮সা‌লের লোকসভা ভো‌টে জোট বাঁধ‌লেন বি‌ জে ‌পি-র স‌ঙ্গে। বি জে পি সভাপতি লালকৃষ্ণ আদবানি তখন বলেছিলেন, ''পশ্চিমবঙ্গে বি জে পি-র সঙ্গে তৃণমূলের এই জোট একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।'' নির্বাচনের পর প্রথম এন ডি এ সরকারের রেল মন্ত্রকের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারপারসন হয়ে ক্ষমতার অলিন্দে। ১৯৯৯ সালে আবার বি জে পি-র সঙ্গে জোট, আবার সরকারে, এবার রেলমন্ত্রী।
• ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ফয়দা তোলার জন্য এন ডি এ থেকে বের হয়ে এসে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধেন। কিন্তু কলকাতা কর্পোরেশনে সেই সময়েও তাদের সঙ্গে বি জে পি-র জোট পুরোদস্তুর বহাল ছিল। তৃণমূলের সুব্রত মুখার্জি মেয়র এবং বি জে পি-র মীনাদেবী পুরোহিত ডেপুটি মেয়র।   বিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর মমতা ব্যানার্জি আবার ফিরে যান এন ডি এ-তে। এবার হন কয়লামন্ত্রী। 
• এন ডি এ আমলেই ২০০২ সালের গোড়াতে হয় গুজরাটে সংখ্যালঘু গণহত্যা, ভারতের ইতিহাসে বর্বরতম ঘটনা। বিশ্বজুড়ে এর নিন্দা হয়েছিল। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি এই হত্যাকান্ডের কোনও প্রতিবাদ করেননি। তখন তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, 'এটা বি জে পি-র অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।' ওই বছরই গুজরাটে বিধানসভা নির্বাচনে বি জে পি আবার জয়ী হলে মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ফুলের তোড়া পাঠিয়ে সবার আগে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি।  
• ২০০৩ সা‌লে ১৫ই সেপ্টেম্বর নয়া‌দি‌ল্লি‌তে আর এস এস-এর মুখপত্র 'পাঞ্চজন্য'-র সম্পাদক তরুণ বিজয়ের সম্পাদিত 'কমিউনিস্ট টেররিজম' নামে সংকলন পুস্তক প্রকাশ অনুষ্ঠা‌নে উপ‌স্থিত থে‌কে, মমতা ব্যানার্জিট ব‌লেন, ''ক‌মিউ‌নিস্ট‌দের বিরু‌দ্ধে আপনা‌দের লড়াই‌য়ে আমরা আ‌ছি। য‌দি আপনারা আমায় ১শতাংশ সাহারয্য ক‌রেন, আমরা ক‌মিউ‌নিস্ট‌দের সরা‌তে পার‌বো।'' মমতা ব্যানার্জির আহ্বা‌নে আর এস এস স্বয়ংসেবকরা খুবই উৎসা‌হিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মোহন ভাগবত, মদনদাস দেবী, এইচ ভি শেষাদ্রি-র মত কট্টর হিন্দুত্ববাদী শীর্ষ নেতারা। তাঁদের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠানে মমতা বলেন, ''..আপনারাই হলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক।...কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমি আপনাদের পাশে আছি।'' ‌বি‌ জে পি-র তৎকা‌লীন রাজ্যসভা সাংসদ বলবীর পুঞ্জ, ওই সভা‌তে ব‌লেন,''আমা‌দের প্রিয় মমতাদি‌দি সাক্ষাৎ দুর্গা।''
• আর এস এস-এর অনুষ্ঠানে গিয়ে তাদের 'খাঁটি দেশপ্রেমিক' বলে যে সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি, তা কিন্তু স্বয়ংসেবকরা ভোলেনি। গত লোকসভা নির্বাচনের কিছুদিন আগে, ২০১৩সালের ৪ঠা আগস্ট 'সঙ্ঘ পরিবার' টুইট করে জানিয়েছিল যে মমতা সেদিন তাঁদের 'প্রশংসায় পঞ্চমুখ' হয়েছিলেন! মমতা ব্যানার্জির প্রতি সঙ্ঘ পরিবারের কৃতজ্ঞতা এখনও যে ম্লান হয়নি, তা ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরেও তারা জানিয়েছে। 
• ২০০৪-র লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বি জে পি-র সঙ্গেই ছিল। ২০০৪ সা‌লে ৮ই এপ্রিল নয়া‌দি‌ল্লি‌তে বিজে‌পি নেতৃত্বাধীন এন‌ ডি এ-র লোকসভা নির্বাচ‌নের ইশ‌তেহার প্রকা‌শিত হয়। প্রকাশ ক‌রেন অটলবিহারী বাজ‌পেয়ী। ইশ‌তেহা‌রে রামম‌ন্দির ‌নির্মা‌ণের ইস্যু, গো হত্যা বন্ধের মতো বিষয় লেখা হ‌য়ে‌ছিল। আবার সরকা‌রে এলে কয়লাখ‌নি বেসরকারী হাতেণ যা‌বে, সেকথাও বলা হয়েছিল। ‌বি‌ জে ‌পি-র এতগু‌লো ইচ্ছাপূরণের লক্ষ্য উ‌ল্লেখ ক‌রে‌ছি‌ল ওই ইশতেহার। ওইদিন মঞ্চেি হা‌জির ছি‌লেন, এন‌ ডি এ-র ১১টি শ‌রিক দ‌লের মধ্যে মাত্র ৫টি দলের প্রতি‌নি‌ধি। সেই ৫জনের মধ্যে একজন হ‌লেন মমতা ব্যানা‌র্জি। সে‌দিন ইশ‌তেহার প্রকা‌শিত হওয়ার আ‌গেই সম্ম‌তি জা‌নি‌য়ে তাতে সই করে‌ছি‌লেন তি‌নি।
• ২০০৫ সা‌লের ৪ঠা আগস্ট সংসদে প‌শ্চিমব‌ঙ্গে 'অনুপ্রবেশ'-এর অভিযোগ তুলে, এবিষয়ে আর এস এস-র বহুলপ্রচারিত বক্তব্যই আওড়াতে থাকেন মমতা ব্যানার্জিা। আসলে তার মাধ্যমে তিনি সঙ্ঘ পরিবারকে বার্তা দিতে চাইছিলেন: ''আমি তোমা‌দেরই লোক।''
• ২০০৬-র বিধানসভা নির্বাচনেও তৃণমূল বি জে পি-র সঙ্গে জোট বেঁধেই এরাজ্যে লড়েছিল। নির্বাচনের পরে ওই বছরের ২৫শে ডিসেম্বর ধর্মতলায় অনশন মঞ্চে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। বামফ্রন্টবিরোধী যাবতীয় ষড়যন্ত্র, হিংসাশ্রয়ী আন্দোলনে তৃণমূলকে মদত জুগিয়েছে  বি জে পি–আর এস এস।
• এমনকি ২০০৯-র লোকসভা ভোটে এবং ২০১১সালের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূল জোট বাঁধলেও বি জে পি-আর এস এস বামফ্রন্টকে পরাস্ত করতে তৃণমূলের হয়েই যে গোপনে কাজ করেছিল, পরে বি জে পি-আর এস এস-র নেতারা বিভিন্ন প্রকাশ্য সভায় তা বলেছেন। চরম বামপন্থী থেকে উগ্র দক্ষিণপন্থী-মাওবাদী থেকে আর এস এস-সমস্ত শক্তির তখন একটাই লক্ষ্য ছিল বামফ্রন্টকে হটানো। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখলের পর ২০১২ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর তৃণমূল দ্বিতীয় ইউ পি এ মন্ত্রিসভা থেকে সরে যায়।   
• আবার ২০১১-য় রাজ্যে তথাকথিত 'পরিবর্তন'-র পরে মমতা ব্যানার্জিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। মোদী তখনও প্রধানমন্ত্রী হননি। তবু 'কমিউনিস্ট' নিধনের আহ্বানটিই যেন মমতা ব্যানার্জিকে মনে করিয়ে দিয়ে নরেন্দ্র মোদী তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রীর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন —''প্রথম রাতেই বেড়াল মেরে দিন।''
• ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট সরকারের পরাজয়ে উল্লসিত আর এস এস তাদের পশ্চিমবঙ্গ কমিটির মুখপত্র 'স্বস্তিকা'র ২৩শে মে, ২০১১ তারিখের সম্পাদকীয়তে লেখে: ''অবশেষে দুঃশাসনের অবসান।...ইহা স্বীকার করিতেই হইবে, পশ্চিমবঙ্গের মার্কসবাদী সরকার ও ক্যাডারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁহারই নেতৃত্বে তৃণমূল জোটের এই বিরাট জয়।'' 
• ২০১৩সালে হাওড়া লোকসভা কেন্দ্রের উপ-নির্বাচনে বি জে পি প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। দেওয়ালে বি জে পি প্রার্থীর নাম লেখাও শুরু হয়েছিল। এই অবস্থায় দিল্লিতে বি জে পি সভাপতি রাজনাথ সিংয়ের বাড়িতে হাজির তৃণমূলের প্রভাবশালী সাংসদ, চিট ফান্ড মালিক কে ডি সিং। বি জে পি'র সাধারণ সম্পাদক রাজীব প্রতাপ রুডির উপস্থিতিতে আঁতাত সম্পন্ন। একেবারে শেষ মুহূর্তে বি জে পি প্রার্থীর নাম প্রত্যাহার।  
• ২০১৩সালের পঞ্চায়েত ভোটেও তৃণমূল-বি জে পি সুযোগ বুঝে আঁতাত করেছে। যেমন, পাঁশকুড়ার চৈতন্যপুর-১নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতে বি জে পি-কে সঙ্গে নিয়েই পঞ্চায়েত গঠন করেছে তৃণমূল। প্রধান বি জে পি-র। উপপ্রধান তৃণমূলের! মিনাখাঁ, বামনপুকুর, চৈতল—তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েতই চলছে তৃণমূল-বি জে পি-র যৌথ বোঝাপড়ায়, একেবারে প্রকাশ্যে। উদাহরণ আরও আছে।
• সারদাকান্ড চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি এবং নারদ ঘুষকান্ডে এই দুই দলের গোপন বোঝাপড়া দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে। ২০১৪সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদী বিভিন্ন বক্তৃতায় চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি নিয়ে অনেক বড় বড় বলেছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি, যেমন সি বি আই, ই ডি, এস এফ আই ও কি করেছে? চার বছর ধরে ক্রমাগত টালবাহানা করে এই তদন্ত বিলম্বিত করে চলেছে। 
• ২০১৭ সালে বিধানসভা নির্বাচনের পর মণিপুরে বি জে পি-র সরকার গড়তে সমর্থন করে একমাত্র তৃণমূল বিধায়ক। আস্থাভোটে বি জে পিকে সমর্থন করার পর ওই তৃণমূল বিধায়ক বলে 'দলের নির্দেশেই সমর্থন।' আজ পর্যন্ত সেই বিধায়ককে তৃণমূল বহিষ্কার করেনি। তৃণমূলের সমর্থনেই সরকার চলছে বি জে পি-র।     
• ২০১৭ সালের ২৯শে মার্চ  রাজ্যসভায় অর্থবিল পাশ করাতে তৃণমূল ওয়াক-আউট করে। রাজ্যসভায় অর্থবিলের বিরুদ্ধে তৃণমূল ভোট দিলে তা অনুমোদন হতো না, বেকায়দায় পড়তো মোদী সরকার। কিন্তু সমস্ত বিরোধী দল ভোট দিলেও তৃণমূল অধিবেশন বয়কট করে ওই বিল অনুমোদনের সুযোগ করে দেয় বি জে পি-কে।
• নারদকাণ্ডের জেরে গঠিত লোকসভার এথিক্স কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন বি জে পি-র বর্ষীয়ান নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি। 'এক্স ফাইলস'-এর ভিডিও ফুটেজে তৃণমূলে যে সব সাংসদকে দেখা গিয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখবে এই কমিটি। লোকসভায় নারদা স্টিং অপারেশনের টেপ জমা পড়ার ১বছর বাদেও কোনও পদক্ষেপ নেওয়া তো দুরের কথা, একটি বৈঠকও ডাকা হয়নি। শুধু তাই নয়, রাজ্যসভায় এথিক্স কমিটি গঠনের বিরোধিতা করেছে স্বয়ং মোদী সরকার।
• প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিকে নথিপত্র দেওয়ার পরেও চিট ফান্ড মালিক তৃণমূল সাংসদ কে ডি সিংয়ের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকার কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না?
• ২০১৬সালের বিধানসভা নির্বাচনেও যে অন্তত ১০০টা কেন্দ্রে বি জে পি প্রার্থীরা বিরোধী ভোট কেটে তৃণমূলকে সহযোগিতা করেছে, কলকাতায় এসে সেকথা বলেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী উমা ভারতী। বি জে পি না থাকলে তৃণমূলের দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসা যে সহজ হতো না তা মাঝেমধ্যেই বলে থাকেন দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। আর এস এস-র সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত বিধানসভা ভোটের আগে সায়েন্স সিটি প্রেক্ষাগৃহে সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকদের সভায় খোলাখুলি বলেন, ''আমরা এখানে এমন কিছু করতে পারি না, যাতে কমিউনিস্টরা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে।'' 
• তৃণমূলের নীতির কারণেই পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক শক্তির বাড়বাড়ন্ত। বি জে পি-র হিন্দুত্বের সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু মানুষকে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে উস্‌কানি দিচ্ছে তৃণমূল, যাতে সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িকতাই আরও পুষ্ট হচ্ছে। 
• তৃণমূল শাসনে পশ্চিমবঙ্গে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার আগে বামফ্রন্ট সরকারের সময় বাংলায় আর এস এস-র শাখা ছিল মাত্র ৪৭৫টি। কিন্তু গত ছয় বছরে এই উগ্র সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদী সংগঠনটির শাখা পশ্চিমবঙ্গে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৫০টি, যা প্রায় তিনগুণ বেশি। 
• রাজ্যে আর এস এস পরিচালিত প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা বর্তমানে ৩০৯টি। এছাড়া ১৬টিতে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনা হয়। আর এরমধ্যে ১৫টি গড়ে উঠেছে গত পাঁচ বছরে। এই তিনশোর বেশি হিন্দুত্ববাদী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৬৬হাজার ৯০ জন। ৫০০টি শিশুমন্দির ও ৫০টি বিদ্যালয়মন্দির (হাইস্কুল) প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়ে দ্রুত এগোচ্ছে আর এস এস। 
• তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের অপসারণ আর এস এস-র লক্ষ্য নয়। আর এস এস মমতা ব্যানার্জির 'আত্মশুদ্ধি' চায়। চায় তৃণমূল কংগ্রেসের 'রিফর্ম'। ২০১৬ সালের অক্টোবরে হায়দরাবাদে তিনদিনের জাতীয় কার্যনির্বাহী বৈঠকে এই সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালের ১৪ই জানুয়ারি ব্রিগেডের সভাতেও আর এস এস-র সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেননি। 

সংক্ষেপে জন্মলগ্ন থেকে এই হলো তৃণমূলের ইতিহাস। বি জে পি এবং সর্বোপরি আর এস এস-এর হয়ে কিভাবে এই দল কাজ করছে, বি জে পি-আর এস এস কিভাবে তৃণমূলকে টিঁকিয়ে রেখেছে, তা বুঝতে হয়তো একটু সময় লাগ‌বে, কিন্তু তৃণমূল যে বি‌ জে‌ পি-র 'মু‌খোশ' তা মানুষ নিশ্চয়ই একদিন বু‌ঝবেন।  
***************

#TMC_BJP_made_for_each_other #মুখ_ও_মুখোশ