বুধবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৭

ভূতচতুর্দশী ~ অর্ক ভাদুরী

ভূতচতুর্দশীর রাতে পৃথিবীতে আত্মারা নেমে আসে। কাতারে কাতারে, ধোঁয়া ধোঁয়া। আঙুলকাটা হাত তুলে গোঙাতে গোঙাতে নেমে আসেন পূর্ববঙ্গের নীল চাষি। তাঁকে সঙ্গ দেন পাবনা আর রংপুরের কৃষক। আসেন বীরসা মুন্ডা, তিতুমীর, সিধু-কানহুর লোকজন, ওয়াহাবি আর মোপলা বিদ্রোহের শহীদ। বেনিয়ানে পিস্তল লুকিয়ে কলেজ স্ট্রিট থেকে কলুটোলার দিকে চলে যায় ঝকঝকে যুবক। বউবাজার মোড়ের শহীদবেদি ভেঙে বেরিয়ে আসেন লতিকা, প্রতিভা, অমিয়া, গীতা। মির্জাপুর স্ট্রীট ধরে হেঁটে যায় শান্তি-সুনীতি, টেগরা আর ক্ষুদিরাম। হিন্দ সিনেমার সামনে রডা কোম্পানির অস্ত্র লুঠের কুশীলবেরা-  শ্রীশ মিত্র, গিরীন বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপীন গাঙ্গুলি, আশুতোষ লাহিড়ি। বিনয়-বাদল-দিনেশ আর মেজর সত্য বক্সীর পাশাপাশি হেঁটে আসছে শহীদ রামেশ্বর। জানবাজারের পুজোমন্ডপের পাশে বিড়ি ধরালেন কানপুরের সিপাহী, গলায় ফাঁসির দাগ। হেদুয়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বেথুন কলেজের প্রীতিলতা। ব্যারাকপুর থেকে, আলিপুর থেকে, বরাহনগর-কাশীপুর থেকে, ব্যারাকপুর যখন ব্যারাকপুর নয়, সেই চনকের নৌকোঘাট থেকে, রামপ্রসাদ সেনের ধুঁতির খুঁট থেকে, চল্লিশের কঙ্কালসার লাশের গন্ধ থেকে, দক্ষিণের সোনারপুর, যাদবপুর থেকে, কাকদ্বীপ থেকে উঠে আসছেন বৃদ্ধ-অতিবৃদ্ধ আত্মারা। ভূতচতুদর্শীর সন্ধ্যে রাতের দিকে বেঁকে যাচ্ছে।

ভূত চতুর্দশী ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য

ভূতপেত্নি দৈত্যদানো
আজকে সবাই দারুণ খুশি
পঞ্জিকাতে পষ্ট লেখা
আজকে তো ভূত চতুর্দশী।।

ভূতের ছেলে বায়না ধরে
ক্যাপ পিস্তল আতসবাজি
শাস্ত্রে এসব বারণ আছে
ব্রহ্মদৈত্য তাতেই রাজি।।

পান্ত ভূতের খুড়শাশুড়ি
বনগাঁ যাবেন লোকাল ট্রেনে
মুড়কি নাড়ু সঙ্গে নেবেন
ফেমাস ভীষণ, সবাই চেনে।।

কিপটে ভূতের ঘুম আসেনা
নিমগাছে কি পয়সা ফলে
সখ দেখে গা পিত্তি জ্বলে
বাজার করে শপিং মলে।।

জম্মে যে ভূত চান করে না
সে'ও দেখি আজ সাবান মাখে
খড়ম পায়ে,গগস চোখে
ডান পকেটে রুমাল রাখে।।

ভূতের মেয়ে সবুজ সাথী
সাইকেলে যায় হাই ইস্কুলে
আজকে সেও খুব সেজেছে
ঘাগরা চোলি কানের দুলে।।

আনন্দে আজ নৃত্য করে
ক্লান্ত ভূতের শান্ত পিসি
ভূতের শ্বশুর গাইছে ভজন
আজকে তো ভূত চতুর্দশী।।

সোমবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৭

মশা ও ডারউইন ~ আর্কাদি গাইদার

মশাদের জগতে একটা বেশ মজার ঘটনা ঘটে চলেছে। ধরুন প্রথম যখন মশা মারবার জন্যে মানুষ কোন কীটনাশক আবিষ্কার করলো। সেই সময় যত মশা ছিলো তার মধ্যে ৯৫% এর ওপর এই কীটনাশক কাজ করে। বাকি ৫% এর ওপর করে না। এবার কীটনাশক আবিষ্কারের আগে এই ৫%কে সেই ৯৫% এর সাথে প্রতিযোগীতা করে টিকে থাকতে হতো। মশার জগতে তাদের অনুপাতও ওই ৫% এর আশেপাশেই থাকতো। এবার কীটনাশক আবিষ্কারের পরে এই ৯৫% এর মধ্যে অনেক মশা ধ্বংস হতে শুরু করলো। একটা পরিসরে তখন এই ৫% যারা ছিলো, তাদের বৃদ্ধি ঘটতে শুরু করলো। বেশ কিছু প্রজন্ম পরে দেখা গেলো যে ওই ৫% কীটনাশক-প্রতিরোধী মশারা বৃদ্ধি পেয়ে এখন সংখ্যাগুরু। তাই মশা ধ্বংস করবার কাজে ওই কীটনাশকের উপকারিতা নিম্নগামী। এখন মানুষকে নতুন কীটনাশক তৈরি করতে হবে। 
এই হলো Darwinism. এইতো কয়েকদিন আগেই বিজেপির অঘোষিত মুখপত্র 'স্বরাজ্যম্যাগ' একটি সম্পাদকীয় লিখে আমাদের আলোকিত করলো - বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার নাকি আমাদের ওপর এই Darwinism প্রয়োগ করতেই একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে। সরকার চায় এই 'চ্যালেঞ্জ'গুলোর দ্বারা পরীক্ষিত হয়ে দেশের মানুষ শক্তিশালী হোক, উন্নততর হোক। আমাদের কান্নাকাটির কোন মানে নেই। কারন সবশেষে, এই সুবিশাল Darwinian experiment এর পর, যে মানুষগুলো টিকে থাকবে, তারা হবে fittest. যেটা উহ্য রাখা হয়েছে, সেটা হলো যে যারা fittest না, তাদেরকে এই এক্সপেরিমেন্টের স্বার্থে খরচের খাতায় ফেলতে হবে। তারা expendable. কারন তারা যথেষ্ট fit নয়।
Darwinism কে সহজভাবে বোঝাতে অনেকেই survival of the fittest বলে এক লাইনে অভিহিত করেন। এটা বৃহৎভাবে ভুল বোঝাপড়া। Darwin নিজে কোনদিন এই লাইনটা ব্যাবহার করেননি। ওনার থিওরীকে যদি এক লাইনে প্রকাশ করতেই হয় - তাহলে সেটা হতে পারে survival of the most adaptable. কিন্তু ডারউইন নিয়ে বিতর্কের জন্যে এই লেখা না। এই লেখা মশা আর কীটনাশক নিয়ে। 
মশা - যার নাম সোনিকা কুমারী। ১১ বছর বয়স। দূর্গা পুজোর ছুটি বলে স্কুল বন্ধ। মিড ডে মিল নেই। আধার কার্ড নেই বলে বাড়িতে রেশন বন্ধ হয়ে গেছে। ৮দিন অভুক্ত থেকে মারা গেছে। 
 যদিও সুপ্রীম কোর্ট রায় দিয়েছে যে আধার কার্ডের সাথে কোনরকম বেনিফিট লিংক করা যাবে না। তাও। কারন উন্নততর দেশ বানানোর লক্ষ্যে সুপ্রীম কোর্ট, সোনিকা কুমারী, এদের নিয়ে মাথা ঘামালে চলবে না। কীটনাশক তৈরি আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা একের পর এক কীটনাশক তৈরি করে যাবো। এবং প্রতিবার যারা টিকে থাকবে তাদের জন্যে তৈরি হবে নতুন কীটনাশক। নোটবন্দী। আধার। জিএসটি। সব শেষে যারা টিকে থাকবে তারাই হবে উন্নততর ভারতের উন্নততর নাগরিক। তাদের বেচে থাকতে রেশন লাগবে না। গ্যাসে ভর্তুকি লাগবে না। চাষে নূন্যতম মূল্য নির্ধারন লাগবে না। সারে ভর্তুকি লাগবে না। মিড ডে মীল লাগবে না। ১০০ দিনের কাজ লাগবে না। হাসপাতালে অক্সিজেন লাগবে না।
তাদের শুধু লাগবে ১০০ কোটি টাকার রামমূর্তি। তার পদতলে বসে তারা গান করে, আড্ডা মেরে, হাওয়া খেয়ে সুখে দিন কাটাবে। আর লাগবে আধার কার্ড। মরার পর গলায় কার্ড ঝুলিয়ে চুল্লিতে বা কবরে প্রবেশ করবে। সোনিকা কুমারীর যদিও আধার কার্ড নেই। তাই না খেয়ে মরে গেছে। আপাতত সরকারি ব্যাবস্থায় দাহও করা যাবে না বোধহয়। চলুন স্লোগান তুলি - জয় শ্রী ডারউইন।

শুক্রবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৭

ফুটবলার সেজমামা ~ চন্দন গোস্বামী

এই ফুটবলারটিকে চিনতে পারছেন? ইনি হচ্ছেন সেই ছাগলের সেজমামা।
মনে পড়ছে না, তাইতো? 
হযবরল স্মরণ করুন।

''...বলতেই ব্যাকরণ শিং ব্যা ব্যা করে ভয়ানক কেঁদে উঠল ।
আমি বললাম, 'আবার কি হল ?' ছাগল বলল, 'আমার সেজোমামার আধখানা কুমিরে খেয়েছিল, তাই বাকি আধখানা মরে গেল ।' আমি বললাম, 'গেল তো গেল, আপদ গেল । তুমি এখন চুপ কর।''

হে পাঠক, বাকি আধখানা মরে নাই, যুবভারতীর সামনে ফুটবল খেলিতেছিল।

দিদির কল্যাণে আজ পুনরায় দৃশ্যমান হইল।

রবিবার, ১ অক্টোবর, ২০১৭

কুমারী পূজা ~ তপব্রত ভাদুরী

আদিম কৃষিভিত্তিক সমাজের প্রধান দেবতা ছিল পৃথিবী৷ পৃথিবী শস্য ও উদ্ভিজ্জপ্রাণের উৎস৷ তাই আদিম সমাজে পৃথিবী হয়ে ওঠে আদিমাতা (Primordial Mother)৷ পাশাপাশি মানুষ দেখেছে, নারী সন্তানের জন্ম দেয়৷ এ-ব্যাপারে  পুরুষের ভূমিকা সম্পর্কে আদিম সমাজ ছিল অজ্ঞ৷ লোকবিশ্বাসে রহস্যময় সৃষ্টিক্ষমতার গৌরবে নারী ক্রমে আদিমাতা পৃথিবীর সমকক্ষ ও প্রতিভূ হয়ে ওঠে৷ এইভাবে ধরিত্রীমাতা ও নারীর প্রজননশক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে প্রাচীন এক ধর্মমত – উর্বরতাবাদ (Fertility Cult)৷ এর সূচনা হয়েছিল মাতৃতান্ত্রিক সমাজে৷ প্রজননশক্তির অধিষ্ঠাত্রীরূপে লোকবিশ্বাসে কল্পিত হয়েছিল বিভিন্ন নারীদেবতা৷ নানা দেশে  নানা নামে৷ ননা, অনৎ, অল্লৎ, ইশতার, সিবিলি, আইসিস, মা, মাইয়া, আর্তেমিস প্রভৃতি৷ নারীই হতেন সে দেবতার পূজক তথা পুরোহিত৷ যৌনক্রিয়া ছিল পূজানুষ্ঠানের অঙ্গ৷ সেইসঙ্গে হত পশুবলি৷ 

গোড়ায় এই আদিমাতা ছিলেন অবিবাহিতা চিরকুমারী৷ পরে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ যখন পিতৃতান্ত্রিক সমাজে রূপান্তরিত হল, তখন নারীদেবতাদের পুরুষসঙ্গী কল্পিত হল৷ পরবর্তী যুগে ক্রমে ক্রমে তাঁরা পুরুষদেবতার সঙ্গে বিবাহসম্পর্কে আবদ্ধ হলেন৷ পিতৃতান্ত্রিক সমাজে দেবতার পূজার অধিকার নারীর হাত থেকে চলে গেল পুরুষের হাতে৷ মন্দিরের নারীপূজকরা পরিণত হলেন পবিত্র গণিকায়৷ নতুন পুরোহিতদের বিধানে সমাজের অন্য নারীদেরও বিয়ের আগে অন্তত একবার দেবমন্দিরে বারাঙ্গনা বৃত্তি অবলম্বন করতে হত (উপেন্দ্রকুমার দাস, শাস্ত্রমূলক ভারতীয় শক্তিসাধনা, প্রথম খণ্ড, পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ : ১৩৯১, তৃতীয় পুনর্মুদ্রণ : আগস্ট ২০১০, রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার, কলকাতা, পৃ. ২২-২৩)৷ 

কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরবর্তী যুগে উর্বরতাশক্তির এই দেবীদের যুদ্ধদেবতা রূপেও উপাসনা করা হত৷ এসব ক্ষেত্রে যিনি সৃষ্টিশক্তির দেবী, তাঁকেই একাধারে ধ্বংসের দেবতা রূপেও কল্পনা করা হয়েছে (উপেন্দ্রকুমার দাস, শাস্ত্রমূলক ভারতীয় শক্তিসাধনা, প্রথম খণ্ড, পৃ. ২০)৷ দৃষ্টান্তস্বরূপ গ্রিসের দেবী এথেনা, সুমের বা মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের দেবী ননা, প্যালেস্টাইন অঞ্চলের দেবী অনৎ এবং ব্যাবিলন ও আসিরিয়া অঞ্চলের দেবী ইশতারের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে৷ ভারতের দেবী দুর্গাও সৃষ্টিশক্তির প্রতিভূ আদিমাতার একটি রূপ৷ একই সঙ্গে তিনি রণদেবী৷ এথেনা আর্তেমিস প্রভৃতি পৃথিবীর অন্যা্ন্য প্রান্তের মাতৃকা দেবতাদের মতো দুর্গাও গোড়ায় ছিলেন কুমারী মাতা (Virgin Mother)৷ দেবতাদের তেজঃপুঞ্জ থেকে তিনি কুমারী নারী রূপেই আবির্ভূত হন৷ পরবর্তী কালে দেবীকে শিবজায়া রূপে কল্পনা করা হয়েছে৷ কিন্তু বৃহন্নীলতন্ত্রের মতো প্রাচীন শাস্ত্রে আছে, শিব দেবীর পুত্র – 'ব্রহ্মাবিষ্ণুশিবানাঞ্চ প্রসূতে করুণাময়ি'৷ দেবী নিজ পুত্র শিবকে পতিত্বে বরণ করেন (উপেন্দ্রকুমার দাস, শাস্ত্রমূলক ভারতীয় শক্তিসাধনা, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৯)৷

তন্ত্রশাস্ত্রবিহিত কুমারী পূজার মধ্যে  কুমারী আদিমাতার উপাসনার প্রত্নস্মৃতি লুকিয়ে আছে৷ কুমারী এক্ষেত্রে দেবীর প্রতিভূ ও প্রজননশক্তির বিগ্রহ৷ আগম মতে, পূজার জন্য মনোনীত কুমারীকে অবশ্যই হতে হবে 'অজাতপুষ্পা' (হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বঙ্গীয় শব্দকোষ, প্রথম খণ্ড, সপ্তম মুদ্রণ, ২০০৮, সাহিত্য অকাদেমি, পৃ. ৬৫০) ৷ 'রজোদর্শনের পূর্বপর্যন্ত কুমারী পূজ্যা৷' (সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, শক্তিরঙ্গ বঙ্গভূমি, প্রথম সংস্করণ, ডিসেম্বর ১৯৯১, আনন্দ পাবলিশার্স, পৃ. ৯৬)  অর্থাৎ, যার মধ্যে প্রজননশক্তি এখনও সুপ্ত অবস্থায় আছে, পরিস্ফুট হয়নি, এমন বয়সের কুমারী কন্যাই পূজার জন্য উপযুক্ত৷  প্রজননশক্তির প্রতীক রূপে নারীর পূজা এবং সে পূজার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রজোদর্শনের টাবু নারীর পক্ষে শ্লাঘনীয় কিনা, সে বিচারের ভার নারীর উপরেই ছেড়ে দিলাম৷ 

আধুনিক কালে কুমারী পূজার শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যকে নতুন করে প্রবর্তিত করেন বিবেকানন্দ ও তাঁর রামকৃষ্ণ মিশন৷ সেই 'জ্যান্ত দুর্গা'র পূজার আড়ম্বরের অন্তরালে নারী সম্পর্কে এঁদের দৃষ্টিভঙ্গি আসলে ঠিক কী, তা জানার জন্য ঔৎসুক্য বোধ হওয়া স্বাভাবিক৷ রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা যে দশনামী   সম্প্রদায়ের অন্তর্গত, তার প্রতিষ্ঠাতা আদি শঙ্করাচার্য তাঁর 'মণিরত্নমালা'য় লিখেছিলেন, 
'কিমত্র হেয়ং? – কনকঞ্চ কান্তা৷'
অর্থাৎ, মুমুক্ষু ব্যক্তির পক্ষে কোন্ কোন্ বিষয় পরিত্যাগের যোগ্য? – ধন ও স্ত্রী৷
'কা শৃঙ্খলা প্রাণভৃতাং হি? – নারী৷'
অর্থাৎ, জীবের দুশ্ছেদ্য বন্ধন কী? – নারী৷
'ত্যাজ্যং সুখং কিং? – রমণীপ্রসঙ্গঃ'
অর্থাৎ, কোন্ সুখ সম্যকরূপে পরিত্যাজ্য? – স্ত্রীসম্ভোগ৷
'দ্বারং কিমাহো নরকস্য? – নারী৷'
অর্থাৎ, নরকের দ্বার কী? – নারী৷
'বিজ্ঞান্মহাবিজ্ঞতমোঽস্তি কো বা? –
নার্য্যা পিশাচ্যা ন চ বঞ্চিতো যঃ৷'
অর্থাৎ, এই জগতে বিজ্ঞ থেকে মহাবিজ্ঞতম কে? – যাঁকে পিশাচীরূপিণী নারী বঞ্চনা করতে পারেনি৷
'মণিরত্নমালা'র এই উদ্ধৃতিটি আছে বিপিনবিহারী ঘোষাল প্রণীত  'মুক্তি এবং তাহার  সাধন' বইতে ( অষ্টম পুনর্মুদ্রণ, মে ২০১৫, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, পৃ. ১২১) ৷ বইটির ভূমিকায় স্বামী হিরণ্ময়ানন্দ লিখেছেন, রামকৃষ্ণের সংগ্রহে এই বইটি ছিল৷ তিনি তাঁর তরুণ শিষ্যদের বইটি পড়তে দিতেন৷ রামকৃষ্ণের বহুল ব্যবহৃত বইটি বর্তমানে বেলুড় মঠের গ্রন্থাগারে রক্ষিত আছে৷

নারীকে রামকৃষ্ণও 'কামিনী' রূপে দেখেছিলেন৷ কথামৃতে একাধিক জায়গায় 'কাঞ্চন' আর 'কামিনী' সম্পর্কে ভক্তদের সতর্ক করা হয়েছে৷ বিশেষ করে 'সন্ন্যাসীর বড় কঠিন নিয়ম৷ স্ত্রীলোকের চিত্রপট পর্যন্ত দেখবে না৷' ('সন্ন্যাসী ও কামিনী – ভক্তা স্ত্রীলোক', শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত,  চতুর্থ ভাগ, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথম প্রকাশ, জানুয়ারি ২০০২, দে'জ পাবলিশিং, পৃ. ৬৮৩) রামকৃষ্ণের উপলব্ধিতে " অত পাশ করা, কত ইংরাজী পড়া পণ্ডিত, মনিবের চাকরী স্বীকার করে তাদের বুট জুতার গোঁজা দু'বেলা খায়৷ এর কারণ কেবল 'কামিনী'৷" ('কামিনী-কাঞ্চন জন্য দাসত্ব', শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত,  প্রথম ভাগ, চতুর্থ খণ্ড, চতুর্থ পরিচ্ছেদ, পৃ. ৬৮৩) 'মেয়েমানুষ থেকে অনেক দূরে থাকতে হয়, তবে যদি ভগবান লাভ হয়৷' ( 'ঘোষপাড়ার স্ত্রীলোকের হরিপদকে গোপালভাব – কৌমার বৈরাগ্য ও স্ত্রীলোক', শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত,  দ্বিতীয় ভাগ, ঊনবিংশ খণ্ড, পৃ. ৩৫২) রামকৃষ্ণ বিচার করতে বলেছেন, 'কামিনীকাঞ্চনই যোগের ব্যাঘাত৷ বস্তু বিচার করবে৷ মেয়েমানুষের শরীরে কি আছে – রক্ত, মাংস, চর্বি, নাড়ীভুঁড়ি, কৃমি, মুত, বিষ্ঠা এই সব৷ সেই শরীরের উপর ভালবাসা কেন?' ( "ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও যোগতত্ত্ব – যোগভ্রষ্ট – যোগাবস্থা – নিবাতনিষ্কম্পমিব প্রদীপম্' – যোগের ব্যাঘাত", শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত,  তৃতীয় ভাগ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ৪৬৩)

ব্রাহ্মণ্য পিতৃতন্ত্রের স্মৃতিশাস্ত্র থেকে শুরু করে সেকালের শঙ্করাচার্য  হয়ে একালের রামকৃষ্ণ পর্যন্ত বয়ে আসা নারীঘৃণার এই অসুস্থ বিকৃত বিপজ্জনক আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত সন্ন্যাসী সঙ্ঘ আর তাদের 'জ্যান্ত দুর্গা'র পূজা পরস্পরের প্রতিবাদ করতে করতে বছর বছর চলে আসছে৷

শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

বিষয়- সাগু ~ কৌশিক মজুমদার


জনমেজয় কহিলেন, হে মহর্ষে! আপনি কহিলেন যে, কলিযুগে সাগু নামে এক প্রকার মনুষ্যেরা পৃথিবীতে আবির্ভূত হইবেন। তাঁহারা কি প্রকার মনুষ্য হইবেন এবং পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া কি কার্য্য করিবেন, তাহা শুনিতে বড় কৌতূহল জন্মিতেছে। আপনি অনুগ্রহ করিয়া সবিস্তারে বর্ণন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে নরবর! আমি সেই বিচিত্রবুদ্ধি; ফেসবুককুশলী সাগু তথা সাহিত্য গুন্ডাগণকে আখ্যাত করিব, আপনি শ্রবণ করুন। আমি সেই চস্‌মাঅলঙ্কৃত, উদরচরিত্র, দেড় ব্যাটারি, অপভাষী, কুৎসাপ্রিয় সাগুদিগের চরিত্র কীর্ত্তিত করিতেছি, আপনি শ্রবণ করুন। হে রাজন্, যাঁহারা বিচিত্রস্তাবকাবৃত, সর্বদা খরগহস্ত, বিশ্বজ্ঞানী, এবং মহাপাদুক, তাঁহারাই সাগু। যাঁহারা কুবাক্যে অজেয়, কুভাষাপারদর্শী, মাতৃভাষার বানানে অপটু, তাঁহারাই সাগু। মহারাজ! এমন অনেক মহাবুদ্ধিসম্পন্ন বাবু জন্মিবেন যে, তাঁহারা ঘুটুবাজি ব্যাতীত অন্য কাজে অসমর্থ হইবেন। যাঁহাদিগের দশেন্দ্রিয় অপ্রকৃতিস্থ, অতএব অপরিশুদ্ধ, যাঁহাদিগের কেবল রসনেন্দ্রিয় লেখকবিশেষনিষ্ঠীবনে পবিত্র, তাঁহারাই সাগু। যাঁহাদিগের মস্তক বুদ্ধিহীন শুষ্ক গোময়ের ন্যায় হইলেও কুবাক্যে সক্ষম; হস্ত দুর্ব্বল হইলেও কি বোর্ড ধারণে এবং ভারচুয়াল বিপ্লবে সুপটু; চর্ম্ম কোমল হইলেও পরদ্রব্যবিশেষের প্রহারসহিষ্ণু; যাঁহাদিগের ইন্দ্রিয়মাত্রেরই ঐরূপ প্রশংসা করা যাইতে পারে, তাঁহারাই সাগু। যাঁহারা বিনা উদ্দেশ্যে দল বাঁধিয়া কলহ করিবেন, কলহের জন্য স্ক্রিনসট দিবেন, স্ক্রিনসটের জন্য  ইনবক্স করিবেন, ইনবক্সের জন্য গায়ে পড়িয়া আলাপ জমাইবেন, তাঁহারাই সাগু।
মহারাজ! সাগু শব্দ নানার্থ হইবে। যাঁহারা কলিযুগে ফেসবুকাভিষিক্ত হইয়া, মেম্বার নামে খ্যাত হইবেন, তাঁহাদিগের নিকট "সাগু" অর্থে সাহিত্য গ্রুপের অ্যাডমিন  বুঝাইবে। নির্বোধদের নিকটে "সাগু" শব্দে অপেক্ষাকৃত জ্ঞানী বুঝাইবে। লেখকের নিকট "সাগু" অর্থে আপদ বুঝাইবে। এ সকল হইতে পৃথক্, কেবল সাগুজন্মনির্ব্বাহাভিলাষী কতকগুলিন মনুষ্য জন্মিবেন। আমি কেবল তাঁহাদিগেরই গুণকীর্ত্তন করিতেছি। যিনি বিপরীতার্থ করিবেন, তাঁহার এই মহাভারত শ্রবণ নিষ্ফল হইবে। তিনি লেখকজন্ম গ্রহণ করিয়া সাগুদিগের ভক্ষ্য হইবেন।
হে নরাধিপ! বাবুগণ দ্বিতীয় অগস্ত্যের ন্যায় গ্রুপরূপী মেম্বারদের শোষণ করিবেন, কি বোর্ড ইঁহাদিগের গণ্ডূষ। কিছু লেখক প্রকাশক ইঁহাদিগের আজ্ঞাবহ হইবেন-"বই উদ্বোধন" এবং "ফিতাকাটা" নামক দুইটি অভিনব বিষয় আশ্রয় করিয়া রাত্রি দিন ইঁহাদিগের গ্রুপে ছবি লাগাইতে থাকিবেন। ইঁহাদিগের যেমন মুখে অগ্নি, তেমন জঠরেও অগ্নি জ্বলিবেন। এবং গেট্টু নাম দিয়া পেটোয়া মেম্বার লইয়া তৃতীয় প্রহর পর্য্যন্ত ইঁহাদিগের রথস্থ যুগল প্রদীপে জ্বলিবেন। আলোচিত সঙ্গীতে এবং কাব্যেও অগ্নিদেব থাকিবেন। তথায় তিনি "মডার্ন" এবং "পোস্ট মডার্ন" রূপে পরিণত হইবেন। ফেবুবাসীদের মতে ইঁহাদিগের কপালেও অগ্নিদেব বিরাজ করিবেন। যেকোন লেখককেই ইঁহারা নস্যাৎ করিবেন-ভদ্রতা করিয়া সেই দুর্দ্দর্ষ কার্য্যর নাম রাখিবেন, "রিভিউ"। কেবল বিনা পয়সায় বই দেওয়া লেখক ও প্রকাশকদিগকে ইঁহারা পূজা করিবেন। সেই মন্দিরের নাম হইবে "অ্যাডভেঙ্চার"।
হে নরশ্রেষ্ঠ! যিনি কাব্যরসাদিতে বঞ্চিত, সঙ্গীতে দগ্ধ কোকিলাহারী, যাঁহার পাণ্ডিত্য শৈশবাভ্যস্ত ফেবুগত, যিনি আপনাকে অনন্তজ্ঞানী বিবেচনা করিবেন, তিনিই সাগু। যিনি কাব্যের বা সাহিত্যের   কিছুই বুঝিবেন না, অথচ কাব্যপাঠে এবং সমালোচনায় প্রবৃত্ত, যিনি বারযোষিতের চীৎকার মাত্রকেই সঙ্গীত বিবেচনা করিবেন, যিনি আপনাকে অভ্রান্ত বলিয়া জানিবেন, তিনিই সাগু। যিনি রূপে কার্ত্তিকেয়ের কনিষ্ঠ, গুণে নির্গুণ পদার্থ, কর্ম্মে জড় ভরত, এবং বাক্যে সরস্বতী, তিনিই সাগু। যিনি অন্য গ্রুপ দখলের জন্য কলহ করিবেন, বন্ধুর ইনবক্স পাইয়া পায়ে পা লাগাইবেন, গ্রুপের স্থাপককে বাহির করিয়া দিতে সচেষ্ট হইবেন এবং না পারিলে চোখের জল মুছিয়া নতুন গ্রুপ খুলিবে, তিনিই সাগু। যাঁহার গমন অনাহুত সভায় এবং আহার প্যাকেটের সিঙারা, তিনিই সাগু। যিনি মহাদেবের তুল্য তান্ডবপ্রিয়, ব্রহ্মার তুল্য চতুরানন, এবং বিষ্ণুর তুল্য লীলা-পটু, তিনিই সাগু। হে কুরুকুলভূষণ! বিষ্ণুর সহিত এই বাবুদিগের বিশেষ সাদৃশ্য হইবে। বিষ্ণুর ন্যায় ইঁহারাও দিবারাত্র ফেবুতে অনন্তঅনলাইন হইবেন। বিষ্ণুর ন্যায় ইঁহাদিগেরও দশ অবতার-যথা, কেরাণী, মাষ্টার, প্রকাশক, রিভিউয়ার, ফেবুলেখক, উকিল, আই টি, পা চাটা, সম্বাদপত্রসম্পাদক এবং নিষ্কর্ম্মা। বিষ্ণুর ন্যায় ইঁহারা সকল অবতারেই অমিতবলপরাক্রম লেখকগণকে বধ করিবেন। 
মহারাজ! পুনশ্চ শ্রবণ করুন। যাঁহার বাক্য মনোমধ্যে এক, কথনে দশ, লিখনে শত এবং কলহে সহস্র তিনিই সাগু। যাঁহার বল হস্তে একগুণ, মুখে দশগুণ, পৃষ্ঠে শতগুণ এবং লেখনকালে অদৃশ্য, তিনিই সাগু। যাঁহার বুদ্ধি বাল্যে পুস্তকমধ্যে, যৌবনে বোতলমধ্যে, বার্দ্ধক্যে গৃহিণীর অঞ্চলে, তিনিই সাগু। যাঁহার ইষ্টদেবতা নিজ স্বয়ং, গুরু অন্য অ্যাডমিন, বেদ  ফেবু এবং তীর্থ "জীবনানন্দ সভাঘর" তিনিই সাগু।  যাঁহার যত্ন কেবল পরিচ্ছদে, তৎপরতা কেবল উমেদারিতে, ভক্তি কেবল কলহে, এবং রাগ কেবল সদ্‌গ্রন্থের উপর, নিঃসন্দেহে তিনিই সাগু।
হে নরনাথ! আমি যাঁহাদিগের কথা বলিলাম, তাঁহাদিগের মনে মনে বিশ্বাস জন্মিবে যে, আমরা তাম্বূল চর্ব্বণ করিয়া উপাধান অবলম্বন করিয়া সভা সমিতিতে গিয়া, দ্বৈভাষিকী কথা কহিয়া, এবং লেখকদের গুষ্টি উদ্ধার করিয়া বাংলা সাহিত্য পুনরুদ্ধার করিব।
জনমেজয় কহিলেন, হে মুনিপুঙ্গব!সাগুদিগের জয় হউক, আপনি অন্য প্রসঙ্গ আরম্ভ করুন।

বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

রোহিঙ্গা ~ অবিন দত্তগুপ্ত

৪৭-এর দেশভাগের সময় অসংখ্য মানুষ , পায়ে হেঁটে ট্রেনে চেপে ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় এসেছিলেন । দুরন্ত জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন । বুকের রক্ত দিয়ে সেচ্‌ দিয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ফসল বুনেছিলেন । তাদের এই যুদ্ধ , কিন্তু ধর্মীয় ঘৃণা দ্বারা পরিচালিত হয় নি ... বেঁচে থাকাকে ভালবেসেই তারা লড়ে গেছিলেন । সেদিন, তাদের ঘৃণাকে উস্কে দিয়ে তাদের দ্বিতীয়,তৃতীয় বা অজুতবার খুন করতে চেয়েছিল আর এস এস এবং জাতিয় কংগ্রেসের একাংশ । কিন্তু তারা হেরে গিয়েছিল । ভয়ঙ্কর যুদ্ধে বন্ধু খুঁজতে শিকড়হীন মানুষের ভুল হয়নি । ভালোবাসার পক্ষে , বেঁচে থাকার পক্ষে ,তারা বামপন্থীদের হাত ধরে ছিলেন । মা ঈগলের মতো তাদের স্বার্থের লড়াই লড়েছে লাল ঝান্ডা ।

৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় , বর্ডার খুলে দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী । রাজাকার আর খান সেনার হাতে অত্যাচারিত লক্ষ মানুষ সেদিন ভারতের কাছে আশ্রয় নিতে এসছিলেন । মাথা বড় , ছোট শরীরের অভুক্ত বাচ্চাদের কোলে নিয়ে , মায়েরা যশোর রোড ধরে লঙ মার্চ করেছিলেন - হাতে বন্দুক । প্রতিপদে রক্তাক্ষয়ি যুদ্ধ চালিয়ে , সন্তানদের নিয়ে ভারতের জন্য পাড়ি জমিয়েছিলেন অজুত উদবাস্তু জননী । এদের জন্য টাকা তুলতে গিয়ে ৭১এর আজাদগড়ে সি আর পি-র গুলি খেয়ে খুন হয়ে যান বামপন্থী যুবক । আজাদগড় কলোনী - উদবাস্তু রক্তে সেচ্‌ দেওয়া উদবাস্তু ভবিষ্যৎ ।

বহুপরে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সময় ,খবরের কাগজে একটা ছবি বেরিয়েছিল । এক সিরিয় বাবা তার সন্তানকে কোলে নিয়ে বর্ডার-এর দিকে দৌড়াচ্ছে । তাকে পেছন থেকে লাথি মেরে ফেলে দিচ্ছেন এক ইউরোপীয় সাংবাদিক । বাচ্চাটার মাথা বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টায় মাথা আগলে রেখেছেন বাবা । আমার ঠামি তখনই প্রায় ৯০,বলেছিল - "ওরা কি ট্রেনটা ধরতে পেরেছে ? " মনের কোন গহিন কোনের স্টেশনের ট্রেন , কোন সীমান্ত পেরনো ট্রেন জানা নেই । তবে ট্রেনে চড়ার ফলাফল যে শিকড় হারানো আর ট্রেনের গন্তব্য যে বেঁচে থাকার এক ফালি আশিয়ানা , এ বিষয় কোন সন্দেহ নাই । আসলে একবার যে উদবাস্তু , তার শিকড় বরাবরের মতো বাঁধা পড়ে যায় শিকড় হারানোয় ।

রোহিঙ্গার মায়েরা তাদের সন্তানদের কোলে নিয়ে ,এভাবেই লড়াই করছেন - বেঁচে থাকার আশিয়ানার খোঁজে । রোহিঙ্গার মানুষ (হিন্দু,মুসলমান এবং বৌদ্ধ) আদতে আমাদেরই উদবাস্তু অতিতের বর্তমান বাসিন্দা । ভারতের ঐতিহ্যের প্রতি তারা আস্থা রেখেছেন । ভারত কখনোই অন্যায় ভাবে ছিন্নমূল মানুষকে ( যে কোন ধর্ম বা ভাষার বা জাতের) ফিরিয়ে দেয় নি । ওরা ভরসা রেখেছেন ভারতের উপর । ভারতের এক কোনে এক চিলতে জমিতে , রক্তের সেচ্‌ দিয়ে ওরা আবার ওনাদের ভবিষ্যতের চাষ করবেন । বরাবরের মতোই এবারও লাল ঝান্ডা ঈগল পাখির মতোই রক্ষা করবে ছিন্নমূল মানুষের অধিকার । কাল ছাত্র ফেডারেশন ও যুব ফেডারেশনের মিছিল , মায়ানমার দুতাবাস-এর লক্ষ্যে । মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার , সবচাইতে বড় গণতান্ত্রিক অধিকার ।গণতান্ত্রিক অধিকারের মিছিল । আমার ঠামির এখন জানা-বোঝার আর ক্ষমতা নাই । থাকলে রোহিঙ্গাদের ট্রেনটা কোন স্টেশনে থামবে ,সেই খবরটা অবশ্যই নিতেন ।

সোমবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

বাঙ্গালীর দুগ্গাপুজো

"কৈলাস হতে বাপের বাড়ি এসেছে পার্বতী,
সঙ্গে গনেশ, কার্তিক আর লক্ষ্মী সরস্বতী। "

মহালয়ার আর হপ্তা খানেক বাকি। পূজোর আগের লাস্ট উইক এন্ড। কৈলাসে মর্ত্যে যাবার প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে। এমন সময় কার্তিক ফেসবুকে স্ক্রোল করা থামিয়ে উত্তেজিত গলায় বলল "খবর শুনেছ?  ইন্দ্র আমাদের মামারবাড়ি যাওয়া নিয়ে ইনজাংশান জারি করছে।"
 সরস্বতী খবরের কাগজ পড়ছিল বিরক্ত মুখে বলল "কেতো ফেসবুক পড়ে ফালতু গুজব ছড়াস না, মর্ত্যের কিছু ভক্ত বাঙালিদের দূর্গাপুজোর ধরনধারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, ভক্ত অসন্তোষের ব্যাপারটা নিয়ে ইন্দ্রের সভায় আলোচনা হয়েছে, ব্যাস এইটুকুই,সব কিছুকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ফেসবুকে গুজব ছড়ায়।

মা ব্ল্যাকবেরীটা চেক করতে করতে একটু চিন্তিত গলায় বললে "শুধু আলোচনা নয়, ইন্দ্র ম্যাসেজ পাঠিয়েছে, কাল দেবতাদের পাঁচ সদস্যের এক কমিটি দূর্গাপুজোর ধর্মীয় ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে কৈলাসে আসবেন। আমরা যেন কোওপারেট করি।"

লক্ষ্মী রেগে টং, "মা নিজের বাপের বাড়ি যাবে আমরা মামার বাড়ি যাব, তাতে কমিটি কি করবে? আসলে হিংসে। তেত্রিশ কোটির আর কারো তো এরকম মামারবাড়ির আদর নেই।"

গনেশ সবসময় অন দ্য টপ অফ এভরিথিং থাকে। বলল "মা আমি মর্ত্যের ট্রেন্ড টা দেখলাম, সকলে সনাতন হিন্দু ধর্মের দিকে ঝুঁকছে, আমাদের কাল কমিটির কাছে প্রেসেন্ট করতে হবে আমরাও খুব সনাতন।" মা বললেন "কত পুরোনো?  বৈদিক যুগ? মহামায়া রূপে ফিরে যাব?" গনেশ আরে না অতটা না ওই মধ্যযুগের শেষের দিকটা যখন অরাজকতার দরুন কুসংস্কার খুব বেড়েছিল।"

যাই হোক মা আর ছেলেমেয়েরা ঠিক করলেন কমিটির সামনে দূর্গাপূজার সনাতন রূপ তুলে ধরবেন। মা ভেবেছিলেন কমিটিতে অগ্নি, বরুন, পবন ইত্যাদি দেবতারা থাকবেন কিন্তু দেখলেন এসেছেন তিরুপতি, বৈষ্ণোদেবী, স্বামী নারায়ন, সিদ্ধি সাঁইবাবা,  পদ্মনাভন।
গনেশ ফিসফিস করে বললেন এঁরাই এখন স্বর্গের টপ ফাইভ রেভেনিউ জেনারেটর।

প্রশ্নোত্তর পর্ব আরম্ভ হল।

ভক্তির প্রথম স্টেপ হল মূর্তি, সেটার মেটেরিয়ালটা কি? মা জানালেন খড়, মাটি, রঙ। ওঁরা বললেন "ওসব নয় সোনা, রূপা, অষ্টধাতু, রত্নের বিগ্রহ হয়?" মা জানালেন ওসব হয় না তবে কাঠ, কাগজ, শোলা, সিমেন্ট,পাট, দড়ি, পেরেক, ঘুড়ি,ছাতা, ননী, ছানা, বাবলগাম, তাস,  ভাঁড় ইত্যাদি মেটেরিয়াল মূর্তি বা প্যান্ডেলে ব্যবহার হয়। কমিটি একটু হেঁচকি তুললেন।

দ্বিতীয় হল খাওয়া দাওয়া। ভক্তরা কতটা খাওয়ার কৃচ্ছ্রসাধন করে? উপবাস? লবন বিহীন অন্নগ্রহণ, ননভেজ না খাওয়া, ভক্তরা এর মধ্যে কোনটা করে? মা বললেন এগুলো ঠিক করে না তবে বাছারা পূজোর সময় ঢেড় খাওয়ার কষ্ট সহ্য করে। আরসালানের সামনে আড়াই ঘন্টা লাইন দিয়েও মাটন বিরিয়ানি না পেয়ে চিকেন বিরিয়ানি খায়, পুজোর কদিন রোজ সন্ধ্যেবেলা আধকাঁচা এগবিহীন এগরোল খায়, অম্বলে গলা জ্বলে গেলেও ষষ্টি থেকে দশমী ফুচকা খাওয়া ছাড়ে না।"
এহেন কৃচ্ছ্রসাধনের বিবরণে কিন্তু কমিটির মন গলল না। তারা গম্ভীর মুখে পরের প্রশ্নে গেলেন। 

"নামগান কিরকম করে ভক্তরা?" এবার সরস্বতী হাল ধরলেন। পাছে মা প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বাজা "তোদের ঘুম পেয়েছে বাড়ি যা" বা "এ তুমি কেমন তুমির" কথা বলে বসে, তাই সরস্বতী ঘরোয়া পূজোয় বাজা রবীন্দ্রসংগীত গুলো এগিয়ে দিল। কিন্তু গান গুলো রিভিউ করতে গিয়ে কমিটির মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। একে তো নিরাকার উপাসক কবি,তায় মুসলমানের মত জোব্বা পড়া, বড় বড় দাড়ি। তার উপর ঔদ্ধত্য দেখ? লিখেছে "আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর তোমার প্রেম হত যে মিছে।"
নাম গানের ঘরে ঢ্যাঁড়া পড়ল।

পরের টপিক ভক্তের পরীক্ষা, কে কত কষ্ট সহ্য করতে পারে দেবতার জন্য। মাথার চুল দান করে? দন্ডি কাটে? ঠান্ডা কনকনে জলে ডুব দেয়, কাঠফাটা রোদে খালি পায়ে হাঁটে? 
মা সোতসাহে জানালেন শরীরপাত করে বইকি? ঠাকুর দেখতে হোল নাইট জাগে, হাই হিল জুতো পরে মাইলের পর মাইল হাঁটে, বাঁশবাঁধা লাইনে দাঁড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অন্যের কনুইএর গুঁতো খায়। কিন্তু মনের খুশিটা কিছুতেই যায় না। একে অন্যের পা মাড়িয়ে, প্যান্ডেলের লাইনে অন্যের ঘামে ভেজা টিশার্টে মুখ ঘষেও হাসিমুখে মায়ের প্রতিমার সাথে সেল্ফি তোলে।

মা এবং ছেলেমেয়েরা সভয়ে দেখলেন ভক্তের কৃচ্ছ্রসাধনের ঘরেও গোল্লা বসল। এদিকে সরস্বতীর টেবিলে এবছরের পূজোসংখ্যা গুলো রাখা ছিল কমিটির সে দিকে নজর পড়ল। সরস্বতী জানালেন ওগুলো দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে স্পেশালি ছাপা হয়। কমিটি ভাবলেন স্তবস্তুতি প্রার্থনামন্ত্র হবে। খুলে লেখার নমুনা দেখে চক্ষুচরকগাছ। এখানে বড়ই কনফ্লিক্ট হল। কমিটিও কিছুতেই বুঝতে পারছে না ধর্মের সাথে সম্পর্ক বিযুক্ত এইসব সাহিত্যের পুজোর সময় কিসের দরকার? এদিকে মা আর ছেলেমেয়েরাও বুঝতে পারছে না পূজোসংখ্যা ছাড়া দুর্গাপূজো হয় নাকি?

অবশেষে কমিটি শেষপ্রশ্নে পৌঁছল। দুর্গাপূজায় রেভেনিউ জেনারেশন কেমন হয়? গনেশ খাতাপত্র খুলে বসল। এইতো দেখা যাচ্ছে প্রচুর চাঁদা ওঠে, প্লাস পুজোর মাসে বাঙালি গৃহস্থের খরচাপত্র খুব বেড়ে যায়, কর্তাদের নাভিশ্বাস ওঠে। কমিটি জানতে চাইলেন প্রণামীর বাক্স সেকথা বলছে না কেন? মায়ের মন্দির কই? সে মন্দিরের ট্রাস্টফান্ডে সম্পদ কই? রেভেনিউ যাচ্ছে কোথায়? গনেশ জানালো ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়, খানিক থীম শিল্পির ঘরে, খানিক কুমোরটুলিতে, আর্টকলেজে, প্যান্ডেলের মজুরের ঘরে, ঢাকীর ছেলের ধোঁয়াওঠা গরম ভাতে, তাঁতশিল্পির ঘরে, শাড়ীর দোকানদারের মেয়ের বিয়ের খরচে, কাজের লোকের বকশিশে, রক্তদান শিবিরে, কম্বল বিতরনে, অষ্টমীর খিচুড়ি ভোগে, ফুচকাওয়ালার ময়লা পকেটে ছড়িয়ে পড়ে এই রেভিনিউ।
কমিটি হতভম্ব হয়ে গেলেন। এরম ভাবে দেবতারা বর দেন নাকি? ওঁদের সব সোজা হিসাব। মন্দিরে সোনার বিগ্রহ দিলে ব্যাংক্রাপ্টসির হাত থেকে বাঁচিয়ে লন্ডনে পাঠিয়ে দেব, পাঁচসিকের পুজো দিলে ছেলের সর্দি সারিয়ে দেব, মাথার চুল মানত করলে আমেরিকার ভিসা, সোমবার উপোষ করলে এন আর আই বর। এতেই ভক্তের মনে ভয়, ভক্তি জাগে। থীম পুজোর প্যান্ডেলে জন খেটে রোজগারের টাকায় ছেলের চিকিৎসা হলে মানুষ ভগবানকে শ্রদ্ধাভক্তি করবে কেন?

মা মৃদু হেসে বললেন ভক্তি তো চাইনি ভালোবাসা চেয়েছি, স্তব পাইনি, "নবমী নিশি পোহাইও না রে" আকুল আবেদন পেয়েছি, ভক্তের মস্তকমুন্ডন চাইনি, থীমের পূজোয় নিউ হেয়ার স্টাইল পেয়েছি, প্রণামী চাইনি, শিউলি চেয়েছি, বর দিতে চাইনি, আনন্দ দিতে চেয়েছি, ভক্তের শুদ্ধশুচি উপবাস চাইনি বচ্ছরকার দিনে ছেলেপুলের হাতে নারকেল নাড়ু দিয়ে চেয়েছি, মহিষাসুরমর্দিনী হতে চাইনি উমা হতে চেয়েছি।"

তাই বলে কি মায়ের এমন মর্মস্পর্শী বক্তৃতায় কমিটির রায়দানে কোনো হেরফের হল? ওরকম হলে আল্লা, গডের সাথে পাল্লা দিয়ে সনাতন ধর্ম টিকিয়ে রাখা যেত না। কমিটি জানালেন ওঁরা দুর্গার মর্ত্যের ট্যুরের উপর স্থগিতাদেশ জারি করবেন। বাঙালিরা পূজোর নামে এই যে অধর্মীয় কাজ করছে সেটা বন্ধ করা দরকার।
কৈলাসে অন্ধকার নেমে এল। মা জানেন "আর অসুর দমন করব না" বলে ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। অসুরদের সাথে দেবতাদের তলায় তলায় সমঝোতা হয়ে গেছে।

ভোলানাথ ক্যাসুয়ালি ইন্দ্রের সভায় গিয়ে জানালেন "গলাটা বড়ই ট্রাবল দিচ্ছে হে, এতদিন ধরে হলাহল গলায় ধরে রাখা তো চাট্টিখানি কথা নয়। অন্যবার মহামায়া বাপের বাড়ি গেলে কয়েক হাজার ছিলিম গাঁজা চড়িয়ে ব্যাপারটা ম্যানেজে রাখি। তা এবার তো ওদের যাওয়া বন্ধ, হলাহল টা নাহয় ইন্দ্রলোকেই নামিয়ে রাখি?"

ইন্দ্র আমতা আমতা করে বললেন "ইয়ে মানে যাওয়া বন্ধ নয় তো, কতগুলো ব্যাপারে কমিটি আপত্তি করেছে, ব্যাপারটা আলাপ আলোচনার মধ্যে মিটিয়ে নেওয়া যায়।"

মহাদেব বললেন "বাঙালিদের একে আঠারো মাসে বছর, তায় এমনি ল্যাদখোর কিন্তু বাঙালের গোঁ খুব, ওদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে ভদ্র হিন্দু করতে সময় লাগবে। ততদিন হলাহলটা তুমিই ধারণ কর না হয়।"

এই কথোপকথনের আধঘন্টার মধ্যেই মায়ের মোবাইলে ইন্দ্রের ম্যাসেজ এল যে কমিটির সবাই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, মায়ের বাপেরবাড়ি যাওয়া নিয়ে তেত্রিশকোটির কারোর আপত্তি নেই।
প্রতিবারের মত গৌরী এবারেও বাপেরবাড়ি আসছেন। মা মেনকা পান্তাভাত আর কচুরশাক রেঁধে রেখেছেন।

(সংগৃহীত)

বৃহস্পতিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

সরকারি কর্মচারী ~ সুভাশীষ

পরিবর্তনের সরকার মানুষের আকাঙ্খাতেই ক্ষমতা এসেছিল। আর পূর্বতন সরকার আর পার্টির নানা ত্রূটিবিচ্যুতি ছিল, সে তো তারাই পরবর্তীকালে নানা লেখাপত্রে আত্মসমালোচনা করেছেন। এই দুটো প্রতিপাদ্য নিয়ে আমি কোনও বিবাদ করিনি। কিন্তু গোল বেঁধেছে অন্যত্র। সরকার আর কর্মচারী সংগঠনের আন্ত:সম্পর্ক নিয়ে যে বিশ্লেষণ শুনছি, সেটা নিয়ে কিছু আলোচনা করা দরকার। 

এটি ঠিক যে বামফ্রন্ট সরকারকে রক্ষা করার স্লোগান এই রাজ্যের কর্মচারী সমাজের একটা বিরাট অংশ দিয়েছিলেন। কেউ কেউ অতি উৎসাহে 'চোখের মনির মত রক্ষা করার' কথাও বলতেন। সরকারী কর্মচারীদের সার্ভিস রুলে দলীয় রাজনীতি করার অধিকার নেই। সেটা ব্রিটিশ সার্ভিস রুলে আছে। কিন্তু দেশের  রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারী কর্মচারী ও তাদের পরিবারের ভাগ্য যেহেতু অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত আছে, তাই নির্বাচনে তাঁরা নির্বিকল্প ভূমিকা পালন করতে পারেনা। আবার সরাসরি কোনও পক্ষকে ভোট দিতে বললে সেটা সার্ভিস রুলে আটকায়। তাই খেয়াল করলে দেখা যাবে নির্বাচনের সময় সংগঠন বলেছে 'জীবন ও জীবিকার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সপরিবারে ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন।' 

এটা ঠিকই যে ২০১১ সালে বামফ্রন্টে নির্বাচনী বিপর্যয়ের বছরেও কর্মচারীদের ভোট বিপুলভাবে বামফ্রন্টের পক্ষেই গিয়েছিল।  বাম সরকারের প্রতি কর্মচারীদের এই পক্ষপাত তো তাদের অভিজ্ঞতাসঞ্জাত। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল  কর্মচারীদের সঙ্গে বামপন্থীদের এই মৈত্রী কিন্তু গড়ে উঠেছিল বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার বহু পূর্বে সুদীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। সর্বস্তরে  গণতন্ত্রের প্রসার, জমি বা খাদ্যের দাবিতে বিপুল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। দুর্ভাগ্য আজকের প্রজেন্মর জানাই নেই যে এই সব সংগ্রামের মধ্যে ওতোপ্রতোভাবে বামপন্থীরা লড়াই করেছিলেন সরকারী কর্মচারীদের দূরাবস্থা নিরসনেও। লোকসভায়, বিধানসভায় এবং রাস্তায়। 

সরকারি কর্মচারীদের দাবির সমর্থনে আইনসভাগুলিতে জ্যোতি বসু, হরেকৃষ্ঞ কোঙার, ভূপেশ গুপ্ত, জ্যোতির্ময় বসু, এ কে গোপালন, ইন্দ্রজিত গুপ্তদের বহু স্মরণীয় ভাষণ এখনও রোমাঞ্চ জাগায়। 1958 সালে এসপ্লানেড ইষ্টে সরকারি কর্মচারীদের অভিযান  আটকাতে জমায়েত তিন দিক থেকে ঘিরে নিয়েছিল সশস্ত্র পুলিশ। অবধারিত জালিওয়ানাবাগের পরিস্থিতিতে ধূমকেতুর মত আবির্ভূত হয়ে অসীম সাহসে মিছিল বার করে নিয়ে গিয়েছিলেন ৫ ফুট ২ ইঞ্চির এক খর্বকায় বাঙালী। জ্যোতি বসু! 

স্বাধীনতার পর ৭৭ -পূর্ববর্তী পুরো সময়টাই ছিল সরকারী কর্মচারীদের কাছে একটা কালো অধ্যায়। ডাঃ বিধান রায়ের মত মানুষ প্রকাশ্যেই বলতেন, সরকারী কর্মীরা সরকারের গোলাম। বলতেন, কর্মীরা  দাবি নয়; সরকারের কাছে প্রার্থনা করতে পারে। সে সময় কুখ্যাত Service Conduct Rule ছিল। গ্রুপ ডি কর্মীদের অফিসে  বসার অধিকার ছিলনা। সাহেবের ঘরে জুতো খুলে ঢুকতে হত। অধস্তন কর্মচারীরা উপরওয়ালাকে চিঠি শেষ করতেন 'your most obedient servant' বলে। গণতান্ত্রিক পথে আন্দোলন করলে নেমে আসত নির্মম শাস্তির খাঁড়া। পুলিশের লাঠি, গ্রেপ্তারি, হুমকি, বাড়িতে আক্রমণ,  বদলী, পে কাট, সুপারসেশন, সাসপেনসন,  ইনক্রিমেন্ট কাট; মায় সংবিধানের ৩১২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি বরখাস্ত। 

অনেকে নিশ্চই জানবে সে সময় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষের আন্দোলনের সঙ্গে সরকারী কর্মচারীদের আন্দোলন মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। তাই অবলীলায় সরকারী কর্মীদের মহার্ঘ ভাতার দাবিতে মিছিলে নামতেন সাধারণ মানুষ। এই পটভূমিতেই ৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে রাজ্যের অন্যান্য অংশের মানুষের সাথে মুক্তির স্বাদ পেয়েছিলেন সরকারী কর্মচারীরাও। তারপর যা হয়েছিল তা ইতিহাস! নিছক পাওনা-গন্ডা ছেড়ে দিলাম, মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন সরকারি কর্মীরা। বাতিল হয়েছিল সার্ভিস কন্ডাক্ট রুল,  অফিসে বসার অধিকার ও মাথার উপর ফ্যান পেয়েছিলেন গ্রুপ ডি কর্মীরা। 'সরকারের গোলাম' থেকে 'জনগণের সেবকে' উত্তীর্ণ হয়েছিলেন কর্মচারী সমাজ। ফেরৎ এসেছিল মাথা উঁচু করে সংগঠন করার অধিকার। দলমত নির্বিশেষে রাইটার্সে, কালেক্টরেটগুলিতে সংগঠনের কাজ করার জন্য অফিসঘর দেওয়া হয়েছিল প্রশাসনের লিখিত অর্ডারে।  কো-অর্ডিনেশন পেয়েছিল, ফেডারেশনও।  সংগঠন মন্ত্রী-আমলাদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে দ্রূত সময় দিতে হবে, সংগঠন চিঠি দিলে উত্তর দিতে হবে--- আদেশনামা বার করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। মুখ্যমন্ত্রীরা কর্সমচারীদের সম্বোধন করতেন  'প্রিয় সহকর্মী' বলে। জ্যোতি বসু সার্ভিস রুল পাল্টে ধর্মঘটের অধিকার দিয়েছিলেন রাজ্য কর্মীদের (জরুরি পরিষেবা ছাড়া)। যেটা ভূভারতে নেই। অনেকে মানা করেছিলেন। শোনেননি। আমি নিজের কানে শুনেছি, রাজ্য কর্মীদের সভায় বলেছেন, "ধর্মঘটের অধিকারটা ছাড়বেন না। বামফ্রন্ট সরকারের হাতেও নয়।" 

তাই বলছিলাম, বাম সরকারকে রক্ষা করার শ্লোগানটা কেউ ফতোয়া জারী করে দেয়নি, ওটা উঠে এসেছিল কর্মচারীদের ভিতর থেকে, তাঁদের জীবনলব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে। ঠিকই, সময়ের সাথে সাথে যেমন ষাট-সত্তরের দশকের স্মৃতি কর্মচারীদের মধ্যে ফিকে হয়েছে, তেমনই সরকারের মতাদর্শগত অবস্থানও কোথাও-কোথাও শিথিল হয়েছে। কিন্তু ঘটনা হল, সেটা নিয়ে মন্ত্রিসভার সঙ্গে কো-অর্ডিনেশন কমিটির তুমুল সংঘর্ষও হয়েছে। আমরা তাঁর সাক্ষী। ২০০৫ সালে সূর্যকান্ত স্বাস্থ্য দপ্তর বেসরকারী করে হেল্থ কর্পোরেশন গঠন করতে চেয়েছিলেন।পাঁচ হাজার কর্মী নিয়ে স্বাস্থ্য ভবন ঘেরাও করেছিল কো-অর্ডিনেশন কমিটি। সিদ্ধান্ত রদ হয়েছিল। 

জ্যোতিবাবুর সময়কাল থেকেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীরা যেতেন কো-অর্ডিনেশনের সম্মেলনে। বাছাই করা বক্তাদের মঞ্চে তুলে দেওয়া হত সরকারের সমালোচনার জন্য। ২০০৪-এর পুরুলিয়া সম্মেলন। সম্মেলন চলাকালীন  প্রলয়াঙ্করি  সুনামি হল এশিয়ায়। সম্মেলনের ভিতরেও সুনামি। অবসরের পর আমলাদের গণহারে পুনর্ণিয়োগসহ নানা ইস্যুতে সরকারকে তুলোধোনা করছেন উত্তর দিনাজপুরের শম্ভু চক্রবর্তী, মুর্শিদাবাদের আশিস বাগচী , উত্তর ২৪পরঘনার খগেন নাগেরা। সেই সময় আমাদের রেজিস্ট্রার ছিলেন এন জি চক্রবর্তী। অবসরের পর তিনিও রি-এমপ্লয়েড হয়েছিলেন  আর সি এস পদে। কো-অর্ডিনেশন সব সংগঠনের কাছে রি-এমপ্লয়েড আমলাদের তালিকা চেয়েছিল। আমরা এন জি চক্রবর্তীর নাম পাঠিয়েছিলাম। কেউ একজন দপ্তর ধরে ধরে এই সব আমলাদের নামের তালিকা পড়ছেন আর আর থমথমে মুখে শুনছেন বুদ্ধবাবু। অথচ কী বৈপরিত্য; তার আধঘন্টা আগে। মঞ্চে উঠেছেন মুখ্যমন্ত্রী। নিরাপত্তারক্ষীদের নানা কায়দা-কানুনের জেরে ১৫মিনিট বন্ধ হয়ে আছে অমন সুশৃঙ্খল সম্মেলন। শেষে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল স্মরজিতদার। (তৎকালীন সাধারণ সম্পাদকের)। মাইক টেনে বললেন, নিরাপত্তা অফিসারদের বলছি, "আমাদের মুখ্যমন্ত্রী, আমরাই নিরাপত্তা বুঝে নেব। আপনারা দয়া করে নেমে যান।'। সম্মেলন কক্ষ ফেটে পড়ল করতালিতে। বিব্রত হয়ে নেমে গেলেন এসপিজি অফিসারেরা। 

সমবায় ক্ষেত্র। রাজ্য সরকার বৈদ্যনাথন কমিটির সুপারিশ কার্যকর করবেই। আমরা বামফ্রন্টের রাজনৈতিক দলিল খুঁজে দেখিয়ে দিলাম কেন্দ্রীয় সরকারের শর্ত মেনে মৌ স্বাক্ষর করলে তা বামফ্রন্টের নীতি বিরোধী হয়ে যাবে। মৌলালীতে সংগঠন আলোচনাসভা আহ্বান করল। বিনয় কোঙারকে বসিয়ে রেখে ক্ষুরধার বক্তব্য রাখলেন প্রণব চট্টোপাধ্যায়। শেষে অসীম দাশগুপ্ত ডেকে পাঠালেন। কো-অর্ডিনেশন কমিটির জেনারেল সেক্রেটারিকে নিয়ে দেখা করলাম। বললেন আপনাদের অবস্থান সঠিক। তবে অনেকগুলো টাকা দেবে। সর্বভারতীয় চাপ আছে। তবে আমরা আইনের ন্যূনতম সংশোধন করব। যদি দেখা যায় নতুন আইনে খুব ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে, আবার  পর্যালোচনা করব। এই ছিল বামফ্রন্ট সরকারের সঙ্গে কর্মচারীদের সম্পর্ক।

এ থেকে কী প্রমাণিত হয়? বামফ্রন্ট সরকারের সঙ্গে কর্মচারীদের লড়াই হয়নি? প্রকৃত প্রস্তাবে সরকার রক্ষা নয়, সেটা ছিল আদতে বামফ্রন্টের নীতি রক্ষার লড়াই। মধ্যেকার দ্বন্দ্বটা তাই ছিল ভ্রার্তৃত্বমূলক, নন-অ্যান্টাগনিস্টিক। কর্মচারী জানত খোদ বামফ্রন্ট সরকারটাকেই  উচ্ছেদ করে দিলে বামফ্রন্টের নীতি রক্ষা করা যাবেনা। তাই আলবাৎ সরকারের সঙ্গে আমাদের লড়াই ছিল, কিন্তু তা শত্রুতামূলক ছিল না। আর নিছক পাওনাগন্ডার কথাও যদি ধরি, স্বাধীনতার পর সব কটা পে কমিশন, ৮-১৬-২৫, হেল্থ স্কিমের মত কর্মচারী স্বার্থবাহী বিষয়ে সারা দেশের মধ্যে পাইওনিয়ার ছিল তো বামশাসিত পশ্চিমবঙ্গই। 

এটা ঠিক যে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ আমরা বাম আমলেও কখনও পাইনি, কেবলমাত্র একবার ছাড়া। সবসমই কয়েক কিস্তি পিছিয়ে থেকেছি। কিন্তু মনে রাখা দরকার ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার বছরে রাজ্য কর্মীদের বকেয়া ডিএ ছিল ৭২%। তবে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ পাওয়ার স্বীকৃতিটা এখনকার মত হাই কোর্টে হলফনামা দিয়ে কেড়ে নেওয়া হয়নি। জ্যোতিবাবুতো বটেই, বুদ্ধদেবুও বহুবার প্রকাশ্যে বলেছেন,  কেন্দ্রীয় হারে ডিএ আপনাদের প্রাপ্য। কিন্তু সরকার একটু সমস্যায় আছে। একটু সুযোগ পেলেই দিয়ে দেব। আমরা একটাই পরিবার একটু সমস্যাটা ভাগ করে নিন। এবং ঘটনা হল সে সময় সরকারটা যে সমস্যায় আছে আমরা বুঝতে পারতাম। এই রাজ্যের মন্ত্রী- বিধায়কদের বেতন-ভাতা ছিল সারা দেশের মধ্যে সবথেকে কম। সরকারি অনুষ্ঠানে ফুল দেওয়া অর্ডার করে বন্ধ করে  দিয়েছিলেন অসীম দাশগুপ্ত। সরকারি মিটিং-এ চা-বিস্কুট ছাড়া আর কিছু দেওয়া মানা ছিল। কোনও মন্ত্রী-আমলা ঘর সাজানোয় আড়ম্বর করলে কর্মচারীই রিপোর্ট করত। সেটা পৌঁছে যেত অর্থমন্ত্রীর টেবিলে। মনে আছে একবার বামফ্রন্টের এক মন্ত্রী অ্যাম্বাসেডর ছেড়ে  স্করপিও চড়তে শুরু করায় তুলকালাম করেছিল কো-অর্ডিনেশন কমিটি। আমরা কি এসব বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখব না? 

অনেকে সরকারের সঙ্গে কর্মচারীদের শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের কথা বলে। তাই কী? পৃথিবীর ইতিহাসে কবে কোন  মালিক  সার্ভিস রুল সংশোধন করে শ্রমিককে ধর্মঘটের অধিকার দিয়েছে? দিয়ে আবার বলেছে, এই অধিকারটা ছাড়বেন না! কোন মালিক ক্ষমতা দখলের পর প্রথম তিনটে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের একটা নিয়েছে এই মর্মে যে,  কোনও শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশ যাবেনা! কোথাও একটুও মনে হয়নি, যে এই সরকারটা অন্য রকম? হ্যাঁ এটা মনে করার কোনও কারণ নেই যে বামফ্রন্ট সরকার সর্বগুণসমন্বিত, ত্রূটিবিচ্যুতিহীন একটি ব্যবস্থা কায়েম করেছিল। তারা নিজেরাও কখনও সেই দাবি করেননি। কিন্তু শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে যে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছিল আজ তা মর্মে মর্মে  অনুভব করছে কর্মচারী সমাজ যখন ন্যায্য  দাবিগুলি আজ কুৎসিত ঈঙ্গিতে অনুকম্পার অনুজ্ঞায় বদলে যাচ্ছে। মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। শেষ পর্যন্ত জনগণের উপর বিশ্বাস আমাদের রাখতেই হবে। আর সেটাই তো এত অপমান আর লাঞ্ছনা সত্বেও আমাদের দপ্তরে কাজের অনুপ্রেরণা যোগায়। সিপিএম আমাদের বেতন দেয়নি, টিএমসি-ও দিচ্ছেনা। আমাদের অন্নের সংস্থান হচ্ছে  রাজ্যের দরিদ্র্যতম মানুষটির পয়সায় যে একটা আট আনার দেশলাই কেনার সময়ও ৫ পয়সা ট্যাক্স দিয়ে যাচ্ছে সরকারি কোষাগারে।  আমার ভাষ্যে একমত না হওয়ার অধিকার সবার থাকছে। স্বাভাবিক। আর আমরাদের লড়াইটাতো ভিন্নমত পোষণের অধিকারের  সপক্ষেও বটে। 

মঙ্গলবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

কমিউনিষ্টসুলভ জীবনযাপন ~ আর্কাদি গাইদার

'কমিউনিষ্টসুলভ জীবনযাপন' ইত্যাদি নিয়ে বহু চর্চা চলছে। ইতিমধ্যেই গতকালকে কমিউনিষ্ট পার্টির একজন সদস্য এবিপি আনন্দের স্টুডিওতে এসে ইন্টারভিউতে বলেছেন যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজে তাকে কোথাও যেতে হলে পার্টি থেকে তাকে 'গ্যারেজে' থাকতে দেওয়া হয়েছে। এর থেকে তিনি বাঙালীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ উপলব্ধি করেছেন।

তো যেটা বলছিলাম, জীবনচর্চা বনাম জীবনচর্যা, এগুলো বেশ ধুসর পরিসর অনেকক্ষেত্রেই। তাই এগুলো নিয়ে চর্চা না করে দুটো গল্প বলি।

২০০৭ সাল। তখন সদ্য ব্যাংগালোরে ট্রেড ইউনিয়ন ফ্রন্টের সাথে অল্প অল্প যুক্ত হচ্ছি। তা এরকম সময় হায়দ্রাবাদে ফ্রী সফটওয়ার কনফারেন্সে আমাদের ভলান্টিয়ার করে পাঠানো হলো। বিভিন্ন রাজ্য থেকে যারা ডেলিগেট এসেছেন, তাদের থাকবার ঘর দেওয়া হয়েছে ইউনিভার্সিটির গেস্ট হাউসে। আমাদের কয়েকজনকে সকালে পাঠানো হলো ত্রিপুরার ডেলিগেটকে নিয়ে সেমিনার হলে আসতে। আমরা সেই ডেলিগেটের ঘরের বাইরে পৌছালাম। ঘর মানে হোস্টেলের যেরকম ঘর হয়, সেরকম। উনি ঘর থেকে বেরিয়ে বললেন - আপনারা একটু বসুন, আমার একটু সময় লাগবে। আমরা বললাম - তাহলে আমরা নিচে আছি, চা সিগারেট খাচ্ছি। নিচে বেশ কিছুক্ষন সময় অপেক্ষা করলাম, তখনও উনি নামছেন না। আবার ওপরে গেলাম। দেখলাম সেই ডেলিগেট একটা বালতিতে নিজের গেঞ্জি জাঙিয়া কেচে জানলায় সেগুলো শুকোতে দিচ্ছেন। আমাদের দেখে হেসে বললেন - সরি, এগুলো জার্নিতে নোংরা হয়ে গেছিলো, তাই কাচতেই হলো। 

ও হ্যা বলে রাখা ভালো, ত্রিপুরার ডেলিগেট ছিলেন সেইসময়ের এবং বর্তমানের ত্রিপুরার মূখ্যমন্ত্রী। 'ফ্রী সফটওয়ার ইন ই-গভর্নেন্স' নিয়ে টক দিতে এসেছিলেন।

২০০৮ সাল। ইতিমধ্যে আমি সরাসরি ট্রেড ইউনিয়ন সদস্য। এবার ঠিক হলো ফ্রী সফটওয়ার ন্যাশনাল কনফারেন্স ব্যাংগালোরে হবে। দায়িত্ব পড়লো আমাদের ঘাড়ে। ব্যাংগালোরের সংগঠনে ফ্রী সফটওয়ার কনফারেন্স সংগঠিত করবার বিষয় অভিজ্ঞ লোক কেউ নেই। তাই আমাদের জানানো হলো যে কেরালার স্টেট প্ল্যানিং বোর্ডের সদস্য জোসেফ থমাস ব্যাংগালোরে আসবেন ১০ -১২ দিন আগে থেকে আমাদের সাহায্য করতে। ঠিক সময় ট্রেন থেকে নামলেন উনি। কলেজের ছাত্রের মতন পিঠে ব্যাগ। নেমেই মিটিং হলো ট্রেড ইউনিয়নের অফিসে। তারপর ওনাকে জানানো হলো যে এই কয়েকদিন ওনার থাকবার এবং খাওয়ার ব্যাবস্থা করে হয়েছে দুই কমরেডের বাড়ি, পালা করে। উনি শুনেই বললেন, থাকবেন না। জিজ্ঞ্যেস করলেন - তোমাদের এই অফিসে রাতে থাকায় নিষেধ নেই তো? তাহলে এখানেই থাকবো। কোথাও যদি লাল ঝান্ডার অফিস থাকে তাহলে সেটা ছেড়ে অন্য কোথাও থাকবো কেন? আমরা তো বুঝতেই পারছি না উনি কিভাবে অফিসে ঘুমোবেন। খাট নেই, গদি তোষক কিছু নেই। কিন্তু উনি থেকেছিলেন। ১২ দিন বেঞ্চের এক কোনে ব্যাগ রেখে তাতে মাথা দিয়ে ঘুমিয়েছিলেন রোজ রাতে।

ওপরের দুই ঘটনার দুই ব্যাক্তি, একই পার্টির সদস্য। আমরা জানি, মার্ক্সবাদী রাজনীতিতে যুক্তি সবার ওপরে, আবেগের খুব একটা জায়গা নেই। কিন্তু এই লোকগুলোকে সামনাসামনি দেখে, হয়তো আবেগে আক্রান্ত হয়েই, মনে হয়েছিলো এই দলটাই করা যায়। এই লোকগুলোকেই কমরেড বলে ডেকে চিরকাল গর্বিত হওয়া যায়।

তো যেই কথা থেকে এত কথার উত্থাপন - ইন্টারভিউ এবং জীবনচর্চা। ১০ বছরের আগের এই দুটো ঘটনা আমার মগজে গরম লোহা দিয়ে খোদাই করা রয়েছে। কালকে মার্কেটে যখন নতুন খোরাক আসবে, তোমাকে কালকেই লোকে ভুলে যাবে। যাও, আপাতত গ্যারেজ হও।

বৃহস্পতিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

'ঘেউ ঘেউ' বিষয়ক দুতিনটি কথা যা আমি জানি ~ কণিষ্ক ভট্টাচার্য


"তোমাকে কেউ খারাপ কথা বললে তুমি তাকে উলটে খারাপ কথা বলবে না। যে খারাপ কথা বলে সেটা তার শিক্ষা-রুচির অভাবেই বলে। তোমার তার অভাব পড়েনি। তা হলে তোমাতে আর তাতে পার্থক্য থাকে না।" বলে আমার মা আমাকে একটি কবিতা পড়তে দিয়েছিলেন। কবিতাটার শেষ চার লাইন আবার আজ আবার মনে পড়ল। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা 'উত্তম-অধম'। তার শেষ চার লাইন ছিল এমন :

"কুকুরের কাজ কুকুর করেছে 
কামড় দিয়েছে পায়, 
তা বলে কুকুরে কামড়ানো কিরে 
মানুষের শোভা পায়? "

আজকে যাকে আমরা কুকুর হিসেবে চিনি সে হল আদিম নেকড়ে। এখন সে যতই ঘেউ ঘেউ করুক না কেন, তার দাঁত আকারে ছোটো হয়ে এলেও, এখনও তার জিনে আত্মরক্ষা আর প্রয়োজনে আক্রমণের তীক্ষ্ণতা আছে। কবীর সুমনের 'বেপরোয়া'  গানটা আমার বড়ো প্রিয়। তার শেষ চারটি লাইন বড়ো ভালো। গানটা শুনতে চাইলে এখানে শুনুন: https://youtu.be/yNA3o62TEBw 

"বেপরোয়া কিছু কুকুরই না হয় হোক
পরোয়া করতে করতে মানুষ মোলো। 
শান্তশিষ্ট ল্যাজবিশিষ্ট লোক
মুখবুজে থেকে প্রভুদের প্রিয় হোক।"

ঘেউ ঘেউ করা কুকুর আমাদের পুরাণ মহাকাব্যের সঙ্গেও যুক্ত। যুধিষ্ঠিরের স্বর্গযাত্রার সঙ্গী ছিল কুকুররূপে ধর্মরাজ। যুধিষ্ঠিরকেও নরক দর্শন করতে হয়। 'ওরিয়ন দ্য হান্টার', যাকে আমরা কালপুরুষ বলি তার পায়ের কাছে রয়েছে 'লুব্ধক', সেও কুকুর। 

লুব্ধক - নবারুণ ভট্টাচার্য
"কোলকাতার ওপরে যে হিংস্র কুকুরটিকে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে সে ঘণ্টায় ১ লক্ষ কিলোমিটার গতিতে এগিয়ে আসছে। তার মাপ ও ওজন এখনই সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। উন্মত্ত কুকুরটি কোলকাতার ওপরে আছড়ে পড়ে ভস্ম হয়ে উবে যাবে, কিন্তু যে মহা-গহ্বরটি সৃষ্টি হবে তা কুকুরটির ব্যাসের দশগুণ এবং গভীরতা দুগুণ। কুকুরটির যা ওজন তার থেকে একশো গুণেরও বেশি পাথর সে আকাশে উড়িয়ে দেবে। প্রথম আঘাত ও বিস্ফোরণের পর কয়েক লহমা কোনও বাতাস থাকবে না। চাপা আগুন হয়ে ধকধক করে জ্বলবে কোলকাতা। তার পরই আসবে লক্ষ ঝড়ের শেষ নিশ্বাস। দাউ দাউ করে জ্বলে, গলে, পুড়ে ছাই হয়ে খাক হয়ে যাবে কোলকাতা। এর পরে ধুলোর মেঘ বর্মের মতো সূর্যকে আড়াল করবে। কতদিন সেই হিমরাত্রি থাকবে তা বলা যাবে না। ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যাবে। এবং অনেক মাস ধরে হিমাঙ্কের নিচেই থাকবে। প্রলয়ান্ধকারে কোলকাতাকে ঢেকে রাখবে প্রলয়মেঘ। এই নির্মম ভবিষ্যদ্বাণী মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করতে করতে কুকুর উপকথা 'লুব্ধক' তার অন্তিম পর্বে পৌঁছিয়াছে। কোলকাতা এখন এক অসাড়, অপেক্ষমাণ পিঁজরাপোল। তার শাস্তি মৃত্যু। ... ঘেউ ঘেউ!"

পাগলী তোমার সঙ্গে ফেসবুক কাটাব জীবন ~ মনিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

সেসব কোনো এক সোনালী অতীতের কথা। তখন আমরা জানতাম যে  "ট্যাবলেট" হল এক ধরনের গোলাকার বস্তু যা শরীর- টরীর খারাপ হলে লোকে বাধ্য হয়ে গেলে, "ডিক" হল গিয়ে টমের ছোটবেলার বন্ধু, কেউ "ফলো'' করছে মানেই সন্দেহজনক ব্যাপার আর  "ফেস'' এর সাথে 'বুক'  (মন্দ কথা ভাববেন না ) মানে বইয়ের কোন সম্পর্ক নেই । অর্থাৎ ,    "ডোন্ট জাজ আ বই বাই ইটস্‌ কাভার"। তা তারপর অনেক বসন্ত কেটে গেছে, কলকাতা তিলোত্তমা বা মিস্‌ ইন্ডিয়া বা মিস্টার লন্ডন কিছুই হতে পারেনি কিন্তু আমাদের অভিধানে বিস্তর নতুন শব্দাবলী সংযোজিত হয়েছে। আর যেমন দাড়িদাদু বলে গেছেন বহু বছর আগে "বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছ, কেমনে দিই ফাঁকি"... আমরা হুবহু তেমনিভাবেই আন্তর্জালের ফাঁসে আট্‌কে পড়েছি। বেরোনোর পথ নেই, আর বেরোলে বেঁচে থাকাই মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে কারণ আমরা এখন ঘুম থেকে উঠে দাঁত মাজার ছবিও ফেসবুকে পোস্ট করি। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কীভাবে সেল্‌ফি তুলতে হয় সে বিষয়ে বিশদ জানার জন্য  দরকার পড়লে এমনকি ডক্টর লোধের সঙ্গেও অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে রাজি হয়ে যাবেন অনেকে। এমনই সংকটাপন্ন অবস্থা! :/  

তা কিছু ত আর করার নেই। জীবন মানে এখন আর জি-বাংলা নয়, জীবন হল ফেসবুক, ট্যুইটার এবং হোয়াটস্‌ অ্যাপ। অস্বীকার করার উপায় নেই মশাই, জীবনের নানা ওঠাপড়া আপনার গায়ে লাগতে দিচ্ছেনা এই এরাই। বোরোলীনের মত চিপকে রয়েছে আপনার সাথে। এরা না থাকলে কিভাবে জানতে পারতেন যে জনতা কত্ত কিছু জা্নে!!কেউ কারো চেয়ে কম যায়না। 
"তুই কুরোসাওয়া নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছিস? জানিস আব্বাস কিয়ারোস্তামি আমাদের বাড়িতে এসে নিজে হাতে ইরানী চা বানিয়ে খাইয়েছে ?"  এবার যারা জানেনা তারা গুগ্‌ল করে মরুক আব্বাস মালটা অ্যাকচুয়ালি কে! শেফ্‌ না  ছবি-করিয়ে নাকি চা বাগানের মালিক !! এভাবে তো আমার-আপনার জ্ঞানভান্ডার-ও বৃদ্ধি পাচ্ছে । হুঁ হুঁ বাওয়া, জীবনের ধন কিছুই যায়না ফ্যালা। 

তবে এসব মোটামুটি সহ্যের মধ্যে। মানে আপনার পোষালে পড়ুন,না পোষালে ইলিশের আমদানি এবছর এত বেশি হওয়ার কারণ কী বা ঠিক কী কী করলে পশ্চিমবঙ্গে অচিরেই আবার লাল গোলাপ বিকশিত হবে সে ব্যাপারে অন্যদের সঙ্গে আপনার মূল্যবান মতামত শেয়ার করুন। কিন্তু আসল মুশকিল হল অন্য জায়গায় …সে বিপদের নাম 'লাইক'। 😑

এই 'লাইক' যে কত-শত ন্যাংটো বেলার বন্ধুর বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে, কত যুবককে হি-ম্যান বা যুবতীকে ক্যাটরিনা এবং আলিয়ার সংমিশ্রণে তৈরি এক উন্নততর মানুষী তে পরিণত করেছে তার হিসেব কে-ই বা রাখে। আপনি যত বেশি "লাইক" করবেন ততই আপনাকে লোকে লাইক করবে। ভয়ংকর এক ভিশাস সার্কেল। ধরুন, আপনি আপনার ফেসবুকিয় বন্ধু্র ছবি 'লাইক' করলেন, সে করতেই পারেন কিন্তু নিয়ম হল শুধু আপনার বন্ধুর ছবি লাইকালেই চলবে না, সে যদি তার পোষা কুকুরের উকুনের ছবি 'ম্যাক্রো' বলে পোস্ট করে সেটাও আপনাকে লাইকাতে হবে, তার মেজ শালার পিসিশাশুড়ির বাঁধানো দাঁতের ছবি দেখেও "হাউ নাইস, হোয়াট আ সাররিয়াল পিকচার!"  বলতে হবে। পারলে ভালো না পারলে আপনার 'আন্‌সোশ্যাল' হওয়া আটকায় কে! এই 'লাইকের' চক্করে পড়ে কত কত চো…মানে মদ্‌না যে নিজেদের কেউকেটা ভেবে সুখে কালাতিপাত করিতে লাগিল তা আপনার ধারণারও অতীত।

যাইহোক, এসব নিয়ে বেশি ভাবতে বসলে আবার ওদিকে হোয়াটস্‌ অ্যাপে এককাঁড়ি মেসেজ জমে যাবে। ট্যুইটারে হাজারখানেক আপডেট মিস হয়ে যাবে …… অতএব সেই ধর্ম -ই ফলো করা যাক। নেট দুনিয়ার সকল ভাল, আমিও ভাল, তুমিও ভাল :-) 

বিঃদঃ – এসব লিখলাম বলে আবার যেন ভুলেও ভেবে বসবেন না আমি 'লাইক', 'ফলো' ইত্যাদি ব্যাপার অপছন্দ করি। খুব-ই মানে……হেঁ হেঁ…বুঝলেন কিনা… 😍

সোমবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

মাইনরিটি ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়


 (পরশুরামের কুঠারটি ধার করেছি) 

-          প্রাতিঃকালে ব্যোমি হয়?

-          আজ্ঞে … না তো

-          হয় হয় ZIনতি পারোনা

-          সায়ান্নে প্যাটে ব্যাথা হয়?

-          আজ্ঞে তাও তো ...

-          হয় হয় ZIনতি পারোনা, চক্ষু ডুম্বুরাইয়া যায়। তা বাবা, অ্যাালোপ্যাথ ছেড়ে এই বুড়ো কবরেজের কাছে কেনো?

-          আজ্ঞে সে কি আর যাইনি? অ্যালোপ্যাথ, হোমিওপ্যাথ সব করে ফেলিচি কবরেজ মশায়

-          তারা কি বলে?

-          আজ্ঞে একজন বললে স্ট্র্যাঙ্গুলেটেড গ্যাংলিয়া, আর একজন বললে আমার মাথায় ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস হয়েছে, তাই এই চিন্তা আর ভয়

-          তা ভয়ডা কিসের শুনি?

-          আজ্ঞে কবরেজমশায়, সব সময়েই মনে হয় আমি চাপে।  আমাকে যেন পিষে ফেলছে, দম নেবার জায়গা নেই। আমি... আমি সংখ্যালঘু

-          আপনে কি ইয়ে? অবিশ্যি দাড়ি আর টুপি দেখে সেটাই মনে হয়......

-          আজ্ঞে হ্যাঁ কবরেজমশায়, মনে হয়, আমার সবাই আমাকে সন্দেহের চোখে দেখে, টেররিস্ট ভাবে

-          তা আপনের কি করা হয় মিঞা সায়েব?

-          আজ্ঞে আমি রসুলপুর প্রোমোদাসুন্দরী প্রাইমারি ইস্কুলে টিচারি করে...

-          ছেলে মেয়ে কটি?

-          আজ্ঞে আমার তো ওই একটিই...... এইবার এইচ এস পাশ করল, ফার্স্ট ডিভিশনে

-          ট্যাহা পহায় চলে?

-          চলে না কবরেজমশায়, তার ওপর এই মনের ব্যামো, অ্যালোপাথি করাবো, সে সামর্থ কই? অবসরের পর কি করব জানিনা...বাড়িতে আরো লোক জন, আমি একলা চাকুরে...

-          বাড়ি কি নিজের?

-          আজ্ঞে ভাড়া বাড়ি, নিজের করার সামর্থ্য হলো কই? ছেলেকে পড়াতেই......

-          আপনে সইংখ্যালঘু এইটে কে কইলো মিঞা সায়েব?

-          মানে, কবরেজমশায়, আমি তো, আমি তো......

-          ট্যাহা পহা নাই, নিরাপত্তা নাই, চাকরি আছে বটে, কিন্তু তাতে চলে না, পোলারে পড়াইবেন, সে সামর্থ্য নাই...

-          না, মানে আমি তো ঠিক সেই অর্থে খেতে না পাওয়া গরীব মানুষ না

-          ইশকুল বন্ধ হইলে, কি তাড়ায়ে দিলে খাবেন কি? যাবেন কই?

-          কোনো চুলো নেই যাবার কবরেজ মশায়, তার ওপরে এই মনের ব্যামো

-          কিস্যূ হয় নাই আপনের। খামোখা আইছেন এহানে। আপনি মাইনরিটি না

-          মাইনরিটি না?

-          আইজ্ঞা না

-          তাহলে?

-          অই যে, ট্যাহা পহা নাই, সরকারে পকেট ফাঁক করতাসে, এই ট্যাক্সো, ওই কর, নোটবন্দি, তার ওপর জমানো কিস্যু নাই, জমি নাই, কাল কি খাইবেন চাকরি গেলে জানা নাই, আপনি সংখ্যালঘু কয় কেডা মিঞা সায়েব? আপনে হইলেন এই দ্যাশের সংখ্যাগুরু, আপনেরা হইলেন নব্বুই ভাগ। আর যাদের আছে, তারা হইল দশ ভাগ। কি বুঝলেন?

-          কথাটা ভুল বলেন নি । তবে......

-          আবার তবে, টুপি দাড়ি আপনের পছন্দের, আপনের ইমানের, ইমানকে দাঁড়ি পাল্লায় চড়িয়ে কম বেশী মাপনের কি দরকার কন দেহি? বরং জোর গলায় কয়েন, আপনি হইলেন সেই সংখ্যাগুরু যাঁদের বাড়ি আজ আছে, কাল নাই। কাল কি হবে , জানা নাই। দেখবেন, মনের ব্যামো উধাও। এক্কেবারে উধাও

-          তাহলে তো ... কবরেজ মশায়...

-          আবার কি হইল?

-          আপনার কথায় বেশ বল পাচ্ছি।

-          পাইবেনই তো। এবার আপনাদের এই নব্বুইজনের বলটা ওই মাইনরিটি ১০ জনেরে একটু টের পাওয়ান দেহি......

 

বুধবার, ৩০ আগস্ট, ২০১৭

খচ্চরের ডিএ ~ অরুনাচল দত্তচৌধুরী

অ্যাই শোন, তোরা কিছু… সরকারি খচ্চর

ডিএ চেয়ে কেঁদেছিস নাকি সারা বচ্ছর?
আজীবন সেবা দিয়ে, প্রাণপাত হর্ষে
কাল যে চাকর, আজ কেন খচ্চর সে?


খচ্চর মানে গালি? মোটেই ভাবিস না
ভারবাহী জন্তু সে, নেই ক্ষিদে তৃষ্ণা।
গাধাদের চেয়ে যদি কিছু চাস বেশি… নে
হলফনামাটি ছাপা সরকারী মেশিনে।


আদালতে গিয়েছিস। ডিএ চেয়ে বাহানা?
চাইলেই পাওয়া সোজা, ব্যাপারটি তাহা না।
এই যে চতুর্দিকে এত পরিবর্তন
উন্নয়নের তাস রুইতন হরতন…


এত মেলাখেলা চলে, দেখেও থাকিস চুপ!
শ্রেণীসংগ্রাম খুঁজে পেল তার অভিরূপ।
এ'তো আর বিধায়ক-সাংসদ ভাতা না!
সরকার তোর বেলা তত বড় দাতা না।


দাম বেড়ে যায় বলে ডিএ পেতে বাসনা?
মূল্যবৃদ্ধি? আহা টমেটো তো খাসও না!
ওই সব দামি চিজ খেলে তোরা জানতি
কাকে যে মূল্য বলে, কীসে বিভ্রান্তি।


হলফনামাতে খুশি, জো হুজুর চামচা
মুখেতে কুলুপ আর পেটে বাঁধা গামছা।
হিটলারপুজো করে কৃমিকীট মচ্ছর।
বৃথা লড়ে যায় একা… ভারবাহী খচ্চর!

সোমবার, ২৮ আগস্ট, ২০১৭

শ্রেণীসংগ্রাম ~ আর্কাদি গাইদার

আইরিশ স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং তার পরবর্তী সময়ের আইরিশ গৃহযুদ্ধ নিয়ে তৈরি কেন লোচের সিনেমা - 'দ্য উইন্ড দ্যট শেকস দ্য বার্লি'। দুই ভাইয়ের গল্প। আইরিশ গৃহযুদ্ধের দুই যুযুধান পক্ষ - ন্যাশনালিস্ট আর সোশ্যালিস্ট। দুই ভাই, যারা স্বাধীনতার জন্যে পাশাপাশি লড়েছে, তারা এই দুই পক্ষে ভাগ হয়ে গেলো। সিনেমার শেষে, যে ভাই সোশ্যালিস্ট, সে ন্যাশনালিস্টদের হাতে বন্দী। ফায়ারিং স্কোয়াডের অপেক্ষায়। কারাকক্ষে দেখা করে অন্য ভাই বারবার বোঝানোর চেষ্টা করে, আমরা একসাথে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়েছি, তোমাদের আমরা মারতে চাইনা, তোমরা অস্ত্র কোথায় লুকিয়েছো জানিয়ে দাও, তাহলে আমি তোমায় বাঁচাতে পারবো। স্মিত হেসে উত্তর আসে - It is important to know what you are fighting against. But it is more important to know what you are fighting for.

বাংলা জুড়ে কানহাইয়ার সভাগুলোকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত কমরেডদের মধ্যে উচ্ছাসের জোয়ার এসেছে - ফ্যাসিস্টদের প্রতিহত করতে পেরে, তাদের ওপর পালটা আঘাত হানতে পেরে, প্রতিটি জায়গায় তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরে - তাদের ফ্যাসিস্টদের প্রতি ঘৃণা নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু শুধু ঘৃণা দিয়ে নিজেদের চেতনার উন্মেষ কতটা ঘটানো যায়, এই বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। প্রেক্ষিত ছাড়া ঘৃণা ক্ষতিকর। চর্চার মধ্যে দিয়ে ঘৃণাকে যদি শ্রেণীঘৃণায় পরিণত করা যায়, তাহলেই তার থেকে আগামী দিনের দীর্ঘমেয়াদী লড়াইর রসদ পাওয়ার সুযোগ থাকে। 

আর শ্রেণীঘৃণার পূর্বশর্তই হলো শ্রেণীপ্রেম। ফ্যাসিস্টদের 'বিরুদ্ধে' লড়ছি, শুধু এইটুকুই যথেষ্ট নয়, শ্রেণীর 'পক্ষে' লড়ছি, এই বোঝাপড়ার জায়গা থেকেই আগামীদিনের লড়াই। শ্রেণীপ্রেম ছাড়া শ্রেণীঘৃণার কোন মূল্য নেই। শ্রেণীশত্রুর প্রতি ঘৃণার থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ন শ্রেণীমিত্রর প্রতি ভালোবাসা। যে শ্রেণীর পক্ষে লড়ছি, সেই শ্রেণীর প্রতি প্রেম, তাদের সাথে একাত্মবোধ, এবং তাদের আগামীদিনের সমস্ত লড়াইতে যুক্ত হওয়া, যুক্ত করা, এটা করতে আমরা কতটা আগ্রহী? ফ্যাসিস্টদের মারতে আমরা যতটা আগ্রহী, গরীব মানুষের পাশে দাঁড়াতে আমরা ততটা আগ্রহী কি? মানুষের বেসিক দাবিদাওয়াগুলো নিয়ে লড়াই সংগঠিত করতে ততটা আগ্রহী কি? দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচী গড়ে তুলতে ততটা সক্রিয় কি?

এই প্রশ্নগুলোর মাঝেই নিচের খবরটা। 
বাঁকুড়া জেলার সিমলাপোলে তালডাঙ্গরা বিধানসভার ভ্যালাইডাহা গ্রাম। ২০১৬ র নির্বাচনের পর পরেই জমিদার জোতদারদের উত্তরসূরিরা জবরদখল করে নিয়েছিলো ১৩৯ জন পাট্টাদারদের জমি। আজকে সংগঠিত ভাবে লাল ঝান্ডার মিছিলে সেইসব জমি আবার পুনর্দখল করলেন পাট্টাদাররা। কোন সংগঠনের ফ্ল্যাগ, নাম করলাম না। সংগঠনের নামে কি এসে যায়? লাল ঝান্ডা তো।

রবিবার, ২৭ আগস্ট, ২০১৭

চিকিৎসার খরচ ~ কৌশিক দত্ত

আপনাদের আগলে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর বিরুদ্ধে লড়েন যে মানুষেরা, তাঁরা যদি দলবদ্ধভাবে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে থাকেন, তবে তা বৃহত্তর অর্থে আপনাদের স্বার্থেই। স্বাস্থ্যক্ষেত্রের পরিবেশ বিষিয়ে দিয়ে আসলে আপনাদের স্বাস্থ্যকেই গভীর অতলে ঠেলে ফেলে দেবার চেষ্টা চলছে। না, কোনো সরকার বা দলের বিরুদ্ধে অভিযোগটা নয়। তাঁদের ভোটকেন্দ্রিক রাজনৈতিক স্বার্থ চিরকাল থেকেছে, আছে, থাকবে, কিন্তু আপনাদের বড় বিপদ সেটা নয়। বড় বিপদ হল, চিকিৎসা পরিষেবাকে আপনাদের নাগালের বাইরে নিয়ে যাবার দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টা চলছে। চক্রান্তটা বহুজাতিক বাণিজ্যগোষ্ঠীগুলির।  

সহজভাবে ভাবুন। একজন চিকিৎসক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চিকিৎসা করলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে নিজের ক্লিনিকাল স্কিল আর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আপনার চিকিৎসা করবেন। যদি তাঁর ভেতর আতঙ্ক ঢুকিয়ে দেওয়া যায় যে পান থেকে চুন খসলে তিনি বিপদে পড়বেন, তাহলে তিনি নিজের ডায়াগনোসিস বা চিকিৎসার পক্ষে যুক্তি বা প্রমাণ সাজানোর জন্য পাঁচরকম পরীক্ষা করাবেন এবং চারজন স্পেশালিষ্টকে রেফার করতে বাধ্য হবেন। পেটে আর বুকে একটু কষ্ট থাকলেই কার্ডিওলজিস্ট, পালমোনোলজিস্ট, গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট। যাঁদের কাছে রেফার হল, তাঁরাও ভয়ে ভয়ে ওপিনিয়ন দেবেন। "তেমন কিছু তো পাচ্ছি না, কিন্তু ইকো আর অ্যাঞ্জিও করিয়ে নিলে হয়।" "পেটে ব্যথা আছে যখন, পেটের একটা সিটি স্ক্যান আর এণ্ডোস্কোপি হোক", কারণ বইতে সেসব লেখা আছে আর না করালে কোর্ট দোষী সাব্যস্ত করবে। ১০০ জন রোগীর মধ্যে একজনের যদি একজনের ক্ষেত্রে কোনো অঘটন ঘটে (এমনকি সম্পূর্ণ অন্য কারণে) তাহলে "ফেঁসে যাবার" ভয়। অতএব ১০০ জনের ক্ষেত্রেই এই পরীক্ষানিরীক্ষা করতে হবে।   তাতে আপনার চিকিৎসার খরচা বাড়বে ৮-১০ গুণ। খেয়াল করে দেখুন, দুই দশক আগের তুলনায় এখন আপনার চিকিৎসার খরচ কতটা বেড়েছে? আরো বাড়বে। 

সম্প্রতি আদালতের নির্দেশ এসেছে আল্ট্রাসাউন্ড গাইডেন্স ছাড়া প্লুরাল ট্যাপ (ফুসফুসের বাইরে জমে যাওয়া জল বের করা) করলে ৪১ লক্ষ টাকা জরিমানা। আমরা প্রত্যেকেই বোধহয় কয়েকশ রোগীর এই প্রসিডিওর করেছি ওয়ার্ডেই, নিখরচায়। আর কোনো ডাক্তার সাহস পাবেন না। এবার থেকে এই কাজটির জন্য আপনার হাজার কুড়ি-ত্রিশ টাকা খরচা হবে। তবে সর্বনাশের উল্টো পিঠেই থাকে পৌষ মাস। হাজার হাজার আল্ট্রাসাউন্ড, সিটিস্ক্যান, এম আর আই মেশিন বিক্রি হবে। সিমেন্স-ফিলিপ্সের রমরমা বাণিজ্য। খরচা সামলাতে আপনারা সকলে ইনসিওরেন্স করাবেন। গ্রাহকসংখ্যা বাড়লেই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে প্রিমিয়াম। একসময় দেখবেন বছরে পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকা স্বাস্থ্যবীমার প্রিমিয়াম জমা দিচ্ছেন এবং চিকিৎসার সময় নানা ছুতোয় আপনার খরচা দিতে অস্বীকার করছে বীমা কোম্পানি। 

এসব আইনি প্যাঁচ নিয়ে তাও সরাসরি কোনো আপত্তি নেই, বিতর্ক থাকলেও। দেশে আইন থাকা উচিত এবং আদালতকে আমরা সম্মান করি। কিন্তু নিত্যদিনের মারপিট? ওয়ার্ড সিস্টার আর মহিলা ডাক্তারের শ্লীলতাহানি? এগুলো আপনারা তো নিজেরা করেন না বা সমর্থনও করেন না। তাহলে আপনাদের নাম নিয়ে যারা এসব করছে, তাদের থামাবেন না? তাদের উদ্দেশ্যটা কী? তাদের উদ্দেশ্য হল চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্ক এতটাই তিক্ত করে দেওয়া, যাতে চিকিৎসকেরা আপনাদের শত্রু ভাবেন, ভয় পান। কোনো চিকিৎসক যাতে আর আপনাদের কথা সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করতে না পারেন। পাশ্চাত্যের বহুজাতিক বাণিজ্যপুঁজিগুলি আসন্ন সঙ্কটের মুখে। তাদের দেশে স্যাচুরেশন এসে গেছে। এখন তৃতীয় বিশ্বের বাজার দখল করতে হবে। এই বাজার থেকে সর্বাধিক মুনাফা লোটা তখনই সম্ভব হবে, যখন এখানকার পারস্পরিক বিশ্বাস নির্ভর সরল মানবিক আদানপ্রদান একেবারে ধ্বংস করে দেওয়া যাবে। ডাক্তার এবং রোগীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি নষ্ট করে দিতে পারলেই স্বাস্থ্যক্ষেত্রকে ব্যবসায়িক মৃগয়াক্ষেত্র বানানো সম্ভব হবে। হচ্ছে ইতোমধ্যে।

গত আড়াই দশক এদেশে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে যে পরিবর্তন এবং অশান্তি চলছে, তা একটি বৃহৎ এবং সুনিপুণ পরিকল্পনার অংশ। নিখুঁত গেমপ্ল্যান। যেসব বুদ্ধিজীবী এবং সংবাদমাধ্যম নিয়মিত আপনাদের উসকাচ্ছেন অশান্তি বাড়ানোর লক্ষ্যে, তাঁদের অনেকেই (সবাই নন) চুক্তি অনুযায়ী অর্থের বিনিময়ে এ কাজ করছেন। এঁদের চিনুন। মুখোশের আড়ালে মুখগুলো দেখুন। ইতিহাস মনে করুন, কীভাবে রেড ইন্ডিয়ানদের মিথ্যায় ভুলিয়ে তাদের জমি-জিরেত লুটে নেওয়া হয়েছিল। এবার ইন্ডিয়ানদের পালা। উসকানিতে নাচবেন কিনা, প্রলোভনে পা দেবেন কিনা, সে সিদ্ধান্ত আপনাদের। 

ডাক্তারকে যতই শত্রু মনে হোক, সত্যিটা হল, আপনার এবং বৃহৎ পুঁজির সর্বগ্রাসী ক্ষুধার মধ্যে যে একমাত্র পাঁচিল দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম চিকিৎসক, কারণ একমাত্র তার সঙ্গেই আপনার সরাসরি মানবিক সম্পর্ক। এই পাঁচিলটিকে ধসিয়ে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে। তখন আপনি বাঘের মুখে। এমতাবস্থায় চিকিৎসকেরা যদি সংগঠিতভাবে এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন, তবে তা রোগী-চিকিৎসকের যৌথ স্বার্থে, কারণ এই দুই গোষ্ঠীর স্বার্থ অনাদিকাল থেকেই যৌথ। আপনি কী করবেন? বাঘের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন, নাকি পাঁচিলটা ভেঙে ফেলার কাজেই হাত লাগাবেন? সিদ্ধান্ত আপনার। ভবিষ্যতও আপনারই।

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭

স্বাধীনতা ~ আর্কাদি গাইদার

স্বাধীন ভারতের ধারনা নিয়ে দ্বন্দ্ব বহুদিনের।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ থেকে স্বাধীনতার জন্যে যারা লড়েছিলেন, তাদের প্রত্যেকের মাথার মধ্যে স্বাধীন ভারতের ধারনা সম্পর্কে অবশ্যই আলাদা মতামত ছিলো। ভগত সিং যেই স্বাধীন ভারতের ধারনা মাথায় নিয়ে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়েছিলেন, আর গান্ধী যে স্বাধীন ভারতের ধারনা বুকে নিয়ে গডসের গুলি খেয়েছিলেন, তার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। চট্টগ্রামের পাহাড়ে সূর্য সেনের নেতৃত্বে যেই সুবোধ রায়, অম্বিকা চক্রবর্তী, গনেশ ঘোষ আর লোকনাথ বল একইসাথে কাধে কাধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশদের তাক করে রাইফেল ছুড়েছেন, স্বাধীন ভারতে তারাই কংগ্রেস আর কমিউনিস্ট - দুই শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়ে একে অপরের বিরোধী হয়ে রাজনীতি করেছে্ন, ভারত নিয়ে তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব ধারনা কে বাস্তবায়িত করতে।

আমরা, স্বাধীন ভারতের নাগরিক যারা, প্রত্যেকেই হয়তো আমাদের এই দেশের কাঙ্খিত চরিত্র সমন্ধে ভিন্ন ধারনা পোষণ করি। এবং এই ভিন্ন ধারনা কে বাস্তবায়িত করতে হয়তো আমরা অনেকেই নিজেদের স্বল্প পরিসরে কোনরকম ভূমিকা পালন করবার চেষ্টা করি। একদিক দিয়ে দেখতে গেলে, আমরা যারা ধারনার জগতে একে অপরের বিরোধী, তারাই আবার সহযাত্রীও বটে। কারন স্বাধীনতা তো কোন গন্তব্য নয়, স্বাধীনতা তো যাত্রা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে যারা লড়ে স্বাধীনতা আনলেন, তারা একটা অধ্যায় সমাপ্ত করলেন, এবং স্বাধীনতা যাত্রার পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা করলেন। এই অধ্যায়ের অনেক বৈরিতার মধ্যেও একটা ধারনা অবিচল রয়েছে - বহুত্ববাদ। আর এই বহুত্ববাদের বিরোধী ভারতের ধারনা যাদের, তারা কেউই স্বাধীনতার জন্যে বিশেষ লড়াই করেননি, মুচলেকা লিখে আর ব্রিটিশদের দালালি করে সময় কাটিয়েছেন। স্বাধীন ভারতের উদ্দ্যেশ্যে লড়াই করা সৈনিকদের ইতিহাসের ভার যদি আমরা স্বেচ্ছায় বহন করবার দায়িত্ব নিই, তাহলে তাদের ভারতের ধারনা যা এই ইতিহাসের মধ্যে প্রবহমান, তাকে আমরা অস্বীকার করি কি করে?

স্বাধীন ভারতের ধারনার লক্ষ্যে আজকে ভারতের বুকে লং মার্চ করছেন কানহাইয়া কুমার এবং তার কমরেডরা, তাদের সাথেই পা মেলাচ্ছেন সদ্য আন্দামান থেকে ফিরে তেভাগার বিদ্রোহ সংগঠির করা সুবোধ রায়, স্লোগানের কোরাসে গলা শোনা যাচ্ছে মাষ্টারদা সূর্য সেনের।
গুরগাঁও তে মারুতি কারখানার যে শ্রমিকরা ইউনিয়নের অধিকারের দাবিতে স্ট্রাইক করে জেল খাটছেন, তাদের সাথেই জেলের ভেতর  ভগত সিং আর বটুকেশ্বর দত্ত বসে ১৯২৯ এ ট্রেড ডিসপুট এক্ট পাশ করবার দিন এসেম্বলিতে বোম মারবার গল্প শোনাচ্ছেন। 
গুজরাটে আহমেদাবাদ থেকে উনা অবধি দলিতদের মহামিছিলের শেষে জিগ্নেশ মেওয়ানি স্টেজে উঠে যখন দৃপ্ত কন্ঠে ঘোষনা করছেন - 'তুমহারা মাতা তুম রাখো, হামে আপনি জমিন দো', তখন আকাশে ছোড়া হাজারটা মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের মধ্যে একটা হাত আম্বেদকারের। 
বস্তারে শোনি সোরি যখন কর্পোরেট মাফিয়ার হাতে আদিবাসীদের জল-জমি লুঠের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে কোন এক থানায় পুলিশের হাতে অত্যাচারিত হয়ে এক কোনে রক্তাত, ক্ষতবিক্ষত, খুবলে নেওয়া দেহ নিয়ে পড়ে আছেন, তখন ওই একই সেলে বন্দী মিত্রর কোলে নিজের কোলে তার মাথা টেনে নিয়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
আগামী নভেম্বরে দিল্লিতে শ্রমিকদের ধর্ণা এবং লাগাতার ধর্মঘটের আহ্বানের সময় সেই মঞ্চের ওপরেই বসে মুচকি হাসবেন নৌবিদ্রোহের সময় বোম্বেতে ধর্মঘট করা শ্রমিকরা। মঞ্চ থেকে মুষ্টিবদ্ধ হাত ছুড়বেন সাত এর দশকে শিবসেনার হাতে খুন হয়ে যাওয়া কমরেড কৃষ্ণ দেশাই। 
দিল্লি ইউনিভার্সিটির পিঞ্জরা তোড় আন্দোলনের মেয়েরা যখন পুলিশ আর এবিভিপির হাতে মার খাবে দেশদ্রোহী হিসেবে, তখন তাদের সাথে কয়েকটা লাঠির বাড়ি পড়বে প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দার আর কল্পনা দত্তর মাথাতেও।
বাংলার বন্যায় যখন ছাত্র, ছাত্রী, যুবক, যুবতীরা ত্রান সংগ্রহ করে পৌছে যাবে জলমগ্ন দুর্গম অঞ্চলে, তখন জলের মধ্যে তাদের হাত ধরে থাকবে ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষে ত্রানের কাজ করা পিপলস রিলিফ কমিটির অরুনা আসফ আলি, মুজফফর আহমেদরা।
দেশের দিকে দিকে দাঙাবাজ এবং খুনিরা যখন নখ দাত বার করে ঝাপিয়ে পড়বে, তখন সাধারন মানুষকে প্রতিরোধের তালিম দেবেন ট্রাম শ্রমিক মহম্মদ ইসমাইল, তেলেঙানার সামরিক প্রশিক্ষক মেজর জয়পাল সিং।
গোরখপুরে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে খুন হয়ে যাওয়া ৯০টি শিশুর রক্তের হিসেব চাইতে একদিন আগুন জ্বলে উঠবে। খুনিদের কাছে হিসেব চাইতে পৌছে যাবে একদল তরুন তরুনী, তাদের হাতে পিস্তল তুলে দেবেন জেনারেল ডায়ারের ঘাতক শহীদ উধম সিং।

স্বাধীনতা নামক মহাকাব্যের বর্তমান অধ্যায়ে এই নাগরিক চরিত্রগুলো যখন দেশ জুড়ে তাদের ভারতের ধারনা কে বাস্তবায়িত করতে মাঠে নেমেছে, 'আজাদি'র যাত্রায় সহযাত্রী হয়েছে, তখন আমরা সহনাগরিক হিসেবে স্বাধীনতার এই যাত্রা কে মহাড়ম্বরে উদযাপন করবো না কেন? আমরা প্রত্যকেই তো লড়ছি এই আজাদির জন্যে - আমাদের ভারতের ধারনা কে রক্ষা করবার জন্যে। এই স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতা দেবেন যে প্রধানমন্ত্রী, তিনি এমন একটি সংগঠনের সদস্য যারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে শুধু খাতায়-কলমে বিরোধিতাই করে থামেননি, মাঠে নেমে তার বিরুদ্ধে লড়েছেন,  এই দেশের পতাকা, সংবিধান কোনটাকেই স্বীকৃতি দেননি। স্বাধীন ভারতের যাত্রায় পায়ে পা মেলানোর এই সন্ধিক্ষনের মুহুর্তের ডাকে সাড়া দেবো না? 

আজাদির যাত্রা থামবে কেন?

মধ্য আগস্টের কবিতা ~ অনামিকা

কী লাভ বলো এই স্বদেশে 
কে দিচ্ছে কার প্রক্সি, জেনে
সেই তো শেষে মরবে শিশু। 
টান পড়বেই অক্সিজেনে।

তার পরে? খুব তদন্ত আর 
চক্ষু মোছার বসবে আসর
চতুর্দিকে ঢোলশহরত 
লজ্জাবিহীন ঘণ্টা কাঁসর।

ভোট হারলে নেই কুছ পরোয়া, 
দখলদারির শিরশিরানি 
পরস্পরের জেরক্স ছবি, 
কেন্দ্রে রাজা, রাজ্যে রাণী। 

ধর্ম অন্ধ নিদান দেবে 
জাতীয় গান গাইতে মানা
ভোট ভিখিরি এ'সব শুনেও
তুলবে না তার কণ্ঠখানা।

ভোট জিতলেই অগাধ টাকা, 
কাজের যা চাপ! তাই তা' মেলে!
ডিগ্রি পেয়েও কাজ পাবে না… 
মরতে থাকবে বেকার ছেলে।

এ টিম বি টিম খেলায় ব্যস্ত, 
লোক ঠকানোর কুমিরডাঙা।
খুব সেজেছেন ডেমোক্রেসি, 
যদিও তাঁর কপাল ভাঙা।

মাঝ আগস্টে রেড রোড ফের 
তিনটি রঙের বিপুল সাজে 
করবে প্রমাণ আমরা স্বাধীন 
সকালবেলার কুচকাওয়াজে।

অবাধ্য এক স্বপ্নে তবু 
মারছে ঝিলিক যৌথখামার…
সত্তর পার স্বাধীনতার 
সমস্তটাই তোমার আমার।

শুক্রবার, ১১ আগস্ট, ২০১৭

যাদবপুর ও ছাত্রসমাজ ~ আর্কাদি গাইদার

আজ সারারাত যাদবপুর ইউনিভার্সিটি জাগছে। তারা ধর্নায় বসেছে।
কেন? 
কারন আমাদের রাজ্য সরকার একটি নতুন আইন আনছে। সেই আইনে বলা আছে যে কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র ইউনিয়ন বলে কিছু থাকবে না। কোনরকম গনতান্ত্রিক নির্বাচন হবে না। কোনরকম সংগঠনের ব্যানার থাকবে না। 
তাহলে কি হবে?
স্টুডেন্টস কাউন্সিল নামে এক প্রহসন। যেখানে কলেজ কতৃপক্ষ নিজেরা কয়েকজন ছাত্রকে মনোনীত করবে এই কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে। সেই ছাত্রদের দ্বারা গঠির স্টুডেন্টস কাউন্সিল ছাত্র ইউনিয়নের জায়গা নিয়ে তাদের ভূমিকা পালন করবে।

আমাদের রাজ্য সরকারকে কিন্তু কেউ বোকা বলতে পারবে না। তারা জানে যে তাদের এরকম আইনের ব্যাপারে এই রাজ্যের বৃহত্তর ছাত্রসমাজের কিছুই যায় আসে না। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি, এবং আরও কয়েকটা হাতেগোনা কলেজে মোটামুটি গনতান্ত্রিক পরিবেশ কিছুটা হলেও বজায় আছে, সেখানে ছাত্ররা সুষ্ঠুভাবে তাদের গনতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে ভোট দেয়, সংগঠনগুলো ক্যাম্পেন করে, ইউনিয়নের সদস্যরা নির্বাচিত হয়। এর বাইরে শহর এবং জেলার বিভিন্ন কলেজে ছাত্র ইউনিয়ন একটা হাস্যকর ব্যাপার। গত ৬ বছর ধরে তৃণমুল ছাত্র পরিষদ নামক সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন এর ধারনাকে একটি ছেলেখেলায় পরিনত করেছে। কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের কাছে ইউনিয়ন মানে তৃণমুলের গুন্ডাদের দাদাগিরি, ঘুষচক্র, গোষ্ঠীদ্বন্দ, মারামারি, তোলা, ছাত্রীদের যৌন হেনস্থা। সুতরাং তাদের কাছে যদি বলা হয় যে রাজনৈতিক ইউনিয়ন উঠিয়ে দিয়ে তার জায়গায় ব্যানারহীন কাউন্সিল আসবে, তারা কোনরকম দুঃখ তো পাবেই না, বরং উলটে আনন্দিত হবে।
এখানে বলে রাখা ভালো, আপনারা বলবার আগেই, যে আগের আমলে বিভিন্ন কলেজে এস এফ আই'র সময় কি স্বর্গরাজ্য ছিলো? একদম না। এই দাদাগিরি, ইউনিয়নের ভোটের নামে প্রহসন, মারামারি এইসব ছাত্র ফেডারেশন বা অন্য কোন রাজনৈতিক ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও ছিলো। কিন্তু তার সাথেও যেটা ছিলো, এসবের মধ্যেই, সেটা হলো কিছুটা হলেও ছাত্র রাজনীতি। মানে ছাত্রদের নিজস্ব দাবিদাওয়া, ইস্যু, শিক্ষাক্ষেত্রের পলিসি, এবং বৃহত্তর সমাজের ইস্যু নিয়ে লড়াই আন্দোলন। এই ইস্যুগুলো নিয়ে মোটামুটি এই দেশের বা রাজ্যের সমস্তরকম ছাত্র সংগঠন, কখনো না কখনো লড়াই আন্দোলনে যুক্ত থেকেছে। এমনকি সংঘ পরিবারের সংগঠন এবিভিপিও বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে লড়াই আন্দোলন করেছে। তাদের সেই ইস্যু বা স্ট্যান্ডের আমি বিরোধী, কিন্তু তার মধ্যে যে রাজনীতি আছে সেটা অস্বীকার করা যায় না। 
ব্যাতিক্রম একটা মাত্র ছাত্র সংগঠন। তৃণমুল ছাত্র পরিষদ। গত ৬ বছরে রাজ্য বা দেশের কোনরকম ছাত্রদের ইস্যু নিয়ে তাদের কোনরকম লড়াই বা আন্দোলন দেখা যায়নি। এমনকি কোনরকম স্ট্যান্ড বা বিবৃতিও দেখা যায়নি। রিসার্চ গ্রান্ট থেকে শুরু করে শিক্ষাক্ষেত্রে বাজেট, এইসব বিষয়ে নিয়ে তারা কোনদিন মাথা ঘামায়েনি। তারা ব্যাস্ত থেকেছে ঘুষ নিতে, তোলা তুলতে বা ইভটিজিং করতে। এরকম অদ্ভুত একটি 'ছাত্র সংগঠন' গত ৬ বছর ধরে আমাদের রাজ্যের সিংহভাগ উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাঁকিয়ে বসে আছে, তার খুব স্বাভাবিক ফল হবে যে এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের ধারনা হবে যে এই রাজনীতির থেকে অরাজনীতি ভালো। 
সার্বিক ভাবে আমাদের মধ্যে যেরকম অরাজনীতির ইনজেকশন ফুটিয়ে দেওয়া হয় - দেখো রাজনীতি কত নোংরা, দেখো রাজনীতির কারনে দেশ রসাতলে যাচ্ছে, দেখো পার্লামান্টে কোন কাজ হয় না, দেখো এই তোমাদের গনতন্ত্র, তোমাদের ভোটাধিকার এগুলোর কোন লাভ নেই, অতএব রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট করো না, নিজের মতন জীবনযাপন করো, নিজেরটা বুঝে নাও - রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপ এই বৃহৎ চক্রান্তের অংশের বাইরে নয়। এবং তাদের সাহায্য করতে গত ৬ বছরের বিভিন্ন কলেজের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস তৈরি রয়েছে।

ইতিহাস শেখায় -  ছাত্ররা সমাজের সমস্ত গুরুত্বপূর্ন লড়াইতে অগ্রনী ভূমিকা পালন করে। সেই ছাত্রসমাজকেই যদি রাজনৈতিক ভাবে পঙ্গু করে দেওয়া যায়, তাদের মাথায় অরাজনীতির পাঠ ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে এই স্থিতাবস্থা বজায় রাখা আরও সোজা হয়ে যাবে। ক্ষমতার কেন্দ্রকে বোকা ভাববেন না। সে জানে, ঠিক কোন কোন পদক্ষেপ পর পর নিলে আস্তে আস্তে সাধারন মানুষ রাজনীতির প্রতি নিস্পৃহ হয়ে পড়বে, এবং ক্ষমতায় টিকে থাকা সোজা হবে।

তাই যাদবপুর ইউনিভার্সিটিকে শুধু আজকের রাত নয়, এরকম অনেক রাত জাগতে হবে। তাদেরকে এই লড়াইটা পৌছে দিতে হবে রাজ্যের প্রতিটা কোনে, প্রতিটি ছাত্র ছাত্রীর মগজে। এই আইন থাকলো কি গেলো তাই দিয়ে তাদের হার-জিতের বিচার হবে না। মেদিনীপুর বা পুরুলিয়ার কলেজের ছেলে মেয়েগুলো এই লড়াইটাকে নিজেদের লড়াই বলে অনুধাবন করতে পারলো কিনা, সেটাই হবে হার-জিতের আসল মাপকাঠি।


রবিবার, ৩০ জুলাই, ২০১৭

আচ্ছে দিন ~ সুশোভন পাত্র

চুনো-পুঁটি'দের দিন গুলো দুরকম। একদিন, যেদিন আপনি বাজারে গিয়ে দেখেন, পটল ৪০ টাকা/কেজি, শসা ৬০ টাকা, আর টোম্যাটো ৮০ টাকা, যেদিন আপনি পাঁচ-দশ টাকার জন্যও দর কষাকষি করেন; সেদিনটা, 'খারাপ দিন'। আরেক দিন, যেদিন আপনি দেখেন, পটল ৫০ টাকা/কেজি, শসা ৭০ টাকা, আর টোম্যাটো ১০০ টাকা, যেদিন আপনি দাম শুনেই আঁতকে ওঠেন; সেদিনটা 'আরও খারাপ দিন'। দাম বেড়ে যাবে আন্দাজ করে কেজি খানেক শসা যদি আপনি আগের দিনই বেশী কিনে রাখতেন, তাহলে সেটা হতে পারতো আপনার 'মাস্টার স্ট্রোক।' বিজনেসের ভাষায় 'রিস্কলেস ইনভেস্টমেন্ট'। ঐ যে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন বলেছিলেন, "এদেশের বিগ-বিজনেস হাউস গুলো বরাবর রিস্কলেস ইনভেস্টমেন্টের সুবিধা উপভোগ করে" -সেই 'রিস্কলেস ইনভেস্টমেন্ট' ¹ । 
রাঘব-বোয়াল'দের দিনগুলো তিনরকম। একদিন, যেদিন আম্বানি-আদানি'রা ব্যবসায় ইনভেস্ট করে, 'শ্রম ও উৎপাদনের' সম্পর্কের বঞ্চনায় সংশ্লেষিত মুনাফা অর্জন করে; সেদিনটা 'আচ্ছে দিন'। আরেক দিন, যেদিন মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হন এবং নির্বাচিত জনকল্যাণকামী সরকার, রিটায়ার্ড বাপের পি-এফে সুদের হার কমিয়ে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে লক্ষ-কোটি টাকার লোন 'রাইট অফ' করে; সেদিনটা আরও 'আচ্ছে দিন'। আর যেদিন, বিজয় মালিয়া ১৮টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে ৯,০০০ কোটি টাকা ঋণ বকেয়া রেখে, গোয়ার প্রাইভেট বিচে জন্মদিনে এনরিক ইগলেসিয়াসের 'ব্যালেন্ডা'র' সুরে কোমর দুলিয়ে, প্লেনে চেপে, হুশ করে লন্ডন উড়ে যেতে পারেন, সেদিনটা আরও আরও 'আচ্ছে দিন' ² । 
রাজন বলেছিলেন "সিস্টেমের কাছে যার এতো ধার বাকি, জন্মদিনের পার্টিতে তাঁর এতো অপব্যয়র বিলাসিতা মানায় না। ³" সমস্ত ব্যাঙ্ক কে নির্দেশ দিয়েছিলেন "অন্যায় সুবিধা না দিয়ে এই বিগ-বিজনেস হাউস গুলির অনাদায়ী ঋণ দ্রুত আদায় করতে হবে। ⁴" এরই মূল্য চোকাতেই সেদিন অর্থমন্ত্রীর সাথে 'লো ইন্টারেস্ট রেট' আর মুদ্রাস্ফীতির তু-তু-ম্যা-ম্যা'র অজুহাতে, রাজন কে তাড়িয়ে উৰ্জিত প্যাটেলের ক্ষমতায়নের ঘোলা জলে মাছ ধরে সম্পন্ন হয়েছিলো 'রিস্কলেস ক্রনি ক্যাপিটালিজম' কে বাঁচিয়ে রাখার আস্ত একটা 'মোডাস অপারেন্ডি'। 
আম্বানি'দের 'ব্যালেন্স শিটে' পরঞ্জয় গুহঠাকুরতার নাম উঠেছে ২০১৪'তেই। যেদিন প্রকাশ পেয়েছিল পরঞ্জয় গুহঠাকুরতার "গ্যাস ওয়ার্স" বইটি। নিখুঁত বর্ণনা, অলঙ্ঘনীয় নথি, আর রিলায়েন্সের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা'দের সাক্ষাৎকারে সেদিন দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়েছিল, কৃষ্ণ-গোদাবরী বেসিনের গ্যাস উত্তোলন, নগদীকরণ, বাজারিকরণ নিয়ে আম্বানি'দের বাণিজ্যিক সংঘাতের কালো অধ্যায়। বে-আব্রু হয়েছিল তৎকালীন ক্যাগ, পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে আম্বানি'দের ব্যাক-ডোর সখ্যতার 'নেক্সাস'। তিনদিনের মাথায় 'ইচ্ছাকৃত মানহানি'র অভিযোগে ১০০ কোটির ক্ষতিপূরণ চেয়ে পরঞ্জয় কে লিগাল নোটিশ পাঠিয়েছিল রিলায়েন্স ⁵। 
কলম থামেনি পরঞ্জয়ের। বরং অ্যাকাডেমিক জার্নাল ই.পি.ডাব্লিউ'র এডিটরের দায়িত্ব নিয়ে একাধিক অনুসন্ধানী আর্টিকেলে তিনি 'ক্রনি ক্যাপিটালিজম' মুখোশ খুলে দেন। জনসমক্ষে আসে 'আদানি পাওয়ার লিমিটেড' কিভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য মালবাহী জাহাজের খরচ ও কাস্টম ডিউটি সহ ইন্দোনেশিয়া থেকে ৩৩৫০ টাকা/মেট্রিক টন মূল্যে 'স্টিম কয়লা' আমদানি করে ৫৪৯৪ টাকা/মেট্রিক টন মূল্যে বিভিন্ন স্টেট ইলেক্ট্রিসিটি বোর্ড গুলিকে বিক্রি করছে। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রীর তথ্যানুসারে যে দুর্নীতির পুঞ্জীভূত অঙ্ক প্রায় ৫০,০০০ কোটি ⁶। শুধু তাই নয়, ২০১৬'র অগাস্টে অর্থমন্ত্রক সংযোজনী এনে এস.ই.জেড এলাকার কোন প্রজেক্টে প্রযোজ্য ট্যাক্সের নিয়ম শিথিল করে এবং রেট্রোস্পেক্টিভ এফেক্টে অতিরিক্ত ট্যাক্স রিফান্ডেবেল ঘোষণা করে। সংসদে সেই সংযোজনী পাশ হবার দু-দিনের মাথায় 'আদানি পাওয়ার লিমিটেড' গুজরাট হাইকোর্টে পি.আই.এল ফাইল করে ৫০০ কোটি টাকার প্রদত্ত ট্যাক্স রিফান্ডের আবেদন করে। এবং ক্রিম অফ দি টপ; উপযুক্ত নথি ছাড়াই হাইকোর্টে সেই আবেদন মঞ্জুরও করে। 'ক্রনি ক্যাপিটালিজমের' নিখুঁত চিত্রনাট্য এবং তার মসৃণ বাস্তবায়ন বোধহয় একেই বলে। শুধু মিসিং ছিল এক চিমটে ট্র্যাজেডি। শেষ পাতে জুটেছে সেটাও। পরঞ্জয় কে ঐ আর্টিকেল লেখার অপরাধে ইস্তফা দিতে বাধ্য করে ই.পি.ডাব্লিউ'র মালিক পক্ষ। ওয়েবসাইট থেকে সরিয়েও নেওয়া হয় আর্টিকেল গুলি। রঘুরাম রাজনের পরে পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা। কট অর্থমন্ত্রক বোল্ড বিগ-বিজনেস হাউস ⁷ ⁸ ⁹ ।  
এবং এর পরেও আপনার মনে হতেই পারে এসব নেহাতই কাকতালীয়। কিন্তু সমস্যা কি জানেন? সমস্যাটা কাকতালীয় ঘটনা গুলোর পৌনঃপুনিকতায়। যেমন ধরুন, ২০১৪'র অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী গৌতম আদানি স্বাক্ষর করলেন কুইন্সল্যান্ড অববাহিকায় কয়লা উত্তোলন প্রোজেক্টে ¹⁰।  কিম্বা ২০১৫'র প্রধানমন্ত্রীর রাশিয়া এবং ফ্রান্স সফরে প্রতিরক্ষা সামগ্রী ম্যানুফ্যাকচারিং'র চুক্তি পেলো রিলায়েন্স ¹¹।  আবার ধরুন, প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরে 'আম্বানি পাওয়ার লিমিটেডের' সাথে মৌ সাক্ষরিত হল বাংলাদেশ পাওয়ার বোর্ডের ¹² । ২০১৭'র আমেরিকা সফরে রিলায়েন্স পেল যুদ্ধজাহাজ মেরামতের বরাত ¹³ । আর ইজরাইল সফরে আদানি'রা করল ড্রোন ম্যানুফ্যাকচারিং ডিলের বাজিমাত ¹⁴ ।  
আপনি যখন ব্যস্ত আছেন হিন্দু-মুসলিম-শিখ-ক্রিশ্চানে বাছতে; আপনি যখন চায়ের আড্ডায় প্রতিদিন ঝড় তুলছেন গরু-শুকর-গোবর-ঘুঁটে নিয়ে; মেয়ের টিউশন ফিস, মায়ের বাত, বউ'র আবদার আর নিজের বিয়ার; একটু গুছিয়ে বসে যখন ভাবছেন 'এই বেশ ভালো আছি'; ঠিক তখনই এই সব কিছুর আড়ালেই বাড়ছে সরকার ও বিগ-বিজনেস হাউসের প্রতিদিনের সখ্যতা। বাড়ছে আম্বানি-আদানিরা। বাড়ছে তাঁদের মুনফা। বাড়ছে ৯৯%'র সঙ্গে ১%'র বৈষম্য।  
কাকতালীয় আজ আপনার মনে হতেই পারে কিন্তু, যে দেশে ঋণখেলাপি বিজয় মালিয়া পায়ের উপর পা তুলে নিশ্চিন্তে লন্ডনে বসে থাকেন, যে দেশে ওত্তাভিও কাত্রোচ্চিরা বোফোর্সের পরও কলার তুলে ঘুরে বেড়ান, যে দেশে ওয়ারেন অ্যাণ্ডারসেনরা ভোপালে নির্বিচারে মানুষ মেরে মন্ত্রীদের প্লেনে চেপে পালিয়ে গিয়ে আমেরিকায় নিশ্চিন্তে মরেন, সে দেশে সত্যেন্দ্র দুবেরা বাঁচতে পারে না, রঘুরাম রাজনরা থাকতে পারেন না, পরঞ্জয় গুহঠাকুরতারা লিখতে পারেন না। 
এবার আপনি ঠিক করুন আপনি কোন পক্ষে। ওত্তাভিও কাত্রোচ্চি-ওয়ারেন অ্যাণ্ডারসেন'দের পক্ষে ? না সত্যেন্দ্র দুবে'দের? আম্বানি-আদানি'দের পক্ষে? না রঘুরাম রাজন-পরঞ্জয় গুহঠাকুরতাদের?  ঠিক করুন আপনি থাকবেন কার সাথে? ঐ ১%'সাথে না  ৯৯%'দের সাথে? নিরামিষ নিরপেক্ষতা তো অনেকদিন হল। এবার না হয় পক্ষ নিন। এবার না হয় বদলে দিন।








-- 





মঙ্গলবার, ২৫ জুলাই, ২০১৭

প্রার্থনা ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

নৃত্য যেথা সারমেয়, পুচ্ছ যেথা বাঁকা 
গরু যেথা বোড়ে, যেথা গেরুয়া পতাকা
কেবলই গায়ের জোরে দিবসশর্বরী
দখল মন্ত্র গায়, আহা মরি মরি
যেথা বাক্য তঞ্চকতা ভরা হতে হতে
বক্তৃতা সাজায়, যেথা মিথ্যাকথা স্রোতে
দেশে দেশে দিশে দিশে কালোটাকা ধায়
বিজয় মাল্য সম চরিতার্থতায়
যেথা উচ্চ পতঞ্জলি প্রহেলিকারাশি
বিজ্ঞানের স্রোতঃপথ ফেলিয়াছে গ্রাসি
সংবিধান করেছে শতধা; নিত্য যেথা
আমোদিত মোদী ভুল বোঝানোর নেতা
নিজ হস্তে পাঠ্যবই ঠিক করে পিতঃ,
ভারতকে সে' নরকে করো হে স্থাপিত।

শনিবার, ২২ জুলাই, ২০১৭

আর এস এস এর শত্রু ~ সুশোভন পাত্র

-কটা বাজে খেয়াল আছে? দুপুরের খাবারটা কি তোদের চায়ের দোকানের ঠেকেই দিয়ে আসবো? 

মহাসপ্তমী'র পুণ্য তিথিতে, খাবারের থালা সাজিয়ে মা তখন জাগ্রত এবং সংহারী। অগত্যা ঝাঁটাপেটা এড়াতে, প্রবল বাগবিতণ্ডার ষোলআনা রাজনৈতিক আড্ডার আপাতত ইতি টানলাম। নব্য আর.এস.এস এবং আমার বাল্য বন্ধু'র গায়ে তখনও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় দিল্লীর মসনদ দখলের ঔদ্ধত্যের গন্ধ টাটকা। একমুখ সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে আর এক আকাশ রয়াব নিয়ে বন্ধু সেদিন বলেছিল 
-ভাই, তোদের কে নিয়েই যা চিন্তা। অন্য রাজনৈতিক দলগুলো কে আমরা জাস্ট ফুঁকে উড়িয়ে দেব। সত্যি বলতে, উই ডোন্ট রিয়েলি কেয়ার অ্যাবাউট দেম।

আলতো হিমেল পরশে মোড়া নভেম্বরের দিল্লী। কেতাদুরস্ত অশোকা হোটেলে বসল 'ওয়ার্ল্ড হিন্দু কংগ্রেস।' তিনদিনের আলোচনার নির্যাস নিংড়ে, আগত প্রতিনিধি'দের হাতে 'থট পেপার' ধরিয়ে জানিয়ে দেওয়া হল, 'হিন্দু সমাজে সবচেয়ে বড় পাঁচ শত্রু'র নাম' –'এম ফাইভ'। না! 'মুসলিম' কিম্বা 'মিশনারি' না! 'এম ফাইভ'র তালিকাতে প্রথম 'এম'; 'মার্ক্সিসিম' ¹। বুঝলাম, বাল্য বন্ধু'র দুশ্চিন্তা নেহাতই বিক্ষিপ্ত নয়। বরং আর.এস.এস'র আদর্শের বাই প্রোডাক্ট হিসেবে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত।

২০১৪'র ওড়িশার বিধানসভা নির্বাচনে এই 'মার্ক্সসিস্ট'রা ভোট পেয়েছিল মেরেকেটে ৮০,২৭৪। শতকরা ০.৪%। আর বিধায়ক কুড়িয়ে বাড়িয়ে ঐ একটা ² । অথচ গত ডিসেম্বরে, ভুবনেশ্বরে, এমনই একটা ক্ষয়িষ্ণু ডেভিড'দের রাজ্য পার্টি অফিস আক্রমণ করল 'পৃথিবীর বৃহত্তম রাজনৈতিক দল', গোলিয়াথ বি.জে.পি ³ । বুঝলাম, বাল্য বন্ধু'র দুশ্চিন্তা নেহাতই কাকতালীয় নয়। বরং আর.এস.এস যাজকতন্ত্রের ধমনীতে অন্তর্নিহিত আশঙ্কা সূত্রে সংক্রামিত। 

২০১১'র আগে, এই নব্য আর.এস.এস বন্ধুই জোর গলায় বলত, "এই রাজ্যে গরু-ছাগল-ভেড়া-কুকুর যেই ক্ষমতায় আসুক আপত্তি নেই; কমিউনিস্ট'দের তাড়াতে হবে।" কমিউনিস্ট'দের তাড়ানোর সেই মনোবাঞ্ছনা নিছকই উদ্দেশ্যহীন ছিল না। ছিল না, কারণ, গরু-ছাগল-ভেড়া-কুকুরের'ও অধম এই 'কমিউনিস্ট'দের' ৩৪ বছরে, আর.এস.এস-জামত'দের জন্য এ রাজ্যের দরজা নিয়ম করে বন্ধ থাকতো। রথে চেপে 'লৌহপুরুষ'দের 'মন্দির ওহি বানায়াঙ্গে'র চ্যাংড়ামি এ রাজ্যের দুয়ারে এসে থমকে যেতো। ৮৪ কিম্বা ৯২, গোধরা কিম্বা গুজরাট; এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা তখন "দাঙ্গাবাজ'দের মাথা ভেঙ্গে" দেবার হিম্মত রাখতো। লড়াইটা এ রাজ্যের 'হ্যাভ নটস' গুলো জাত নিয়ে নয় পেটের খিদে আর হাতের কাজ নিয়েই করতে জানতো। 

'কমিউনিস্ট'দের' ৩৪ বছরে, ধূলাগড়ে কোনদিন নবী'র জন্মদিনে মিছিল করতে হয়নি। তৃণমূলের গুলশান মল্লিকের মত, ধূলাগড়ে, 'কমিউনিস্ট'দের' কোনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কে ভোটের জন্য আইন-প্রশাসনের বিধি নিষেধের তোয়াক্কা না করে সেই মিছিল 'হিন্দু পাড়া'র মধ্যে নিয়ে যেতে উস্কানি দিতে হয়নি। আর.এস.এসের মদত এবং আদর্শপুষ্ট 'অন্নপূর্ণা ক্লাবের' ঢিল ছোড়া দূরত্বে ইসলামের পতাকা টাঙ্গিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বারুদ সাজাতে হয়নি ⁴ । এতে ৩৪ বছরে ইসলাম পালনে কোন বাধা হয়নি। কোরানের সূরার পবিত্রতার দুধে একফোঁটা চোণা পড়েনি। বেহেশতের রাস্তা কণ্টকাকীর্ণও হয়নি। 

জীবদ্দশায় মৌলানা ইয়াসিন মণ্ডল, বারাসতে কোনদিন হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় উত্তেজনার লেশ অনুভব করেননি। ইয়াসিন মণ্ডল বাদুড়িয়ার মিলান মসজিদের ইমাম। সেই মিলান মসজিদ, যে মিলান মসজিদের উল্টো দিকের বাড়িটা ১৬ বছরের শৌভিকের। যে বয়সে শৌভিক'দের ঠাকুমার ঝুলি থেকে বেরিয়ে, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী পেরিয়ে, ক্যালকুলাসের অঙ্কে কিম্বা শেক্সপিয়ারের সনেটে বুঁদ হয়ে থাকার কথা, দু-একটা ইনফ্যাচুয়েশন কে প্রেমে বদলে দেবার কথা; আজকাল সেই বয়সে শৌভিক'রা মনে ঘৃণার বিষ পুষছে। নির্দ্বিধায় অন্যের ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত করে আনন্দ পাচ্ছে। বাড়ি বয়ে এক মৌলবাদের খাল কেটে অন্য মৌলবাদের কুমীর আনছে ⁵। 

নেহেরুর ভ্রান্ত মাশুল সমীকরণ নীতির ⁶ বদন্যতায় পূর্ব প্রান্তের রাজ্যগুলোর শিল্প সম্ভাবনার শশ্মানেই সেদিন সেজে উঠেছিল পশ্চিমের রাজ্যগুলো। ব্যবসায়ী'দের বোম্বে হবু 'বাণিজ্যনগরী'। মালিকের মুনফা আর কারখানার উৎপাদনের ত্রৈরাশিকে প্রতিদিন লেখা হচ্ছে শ্রমিক বঞ্চনার ইতিহাস। শোষিত সেই মুটে-মজুর'দের অধিকার আদায়ের ফিনিক্স স্বপ্ন নিয়ে হাজির হয়েছিলো লাল ঝাণ্ডা। ১৯৬৭'র নির্বাচনে বোম্বে জুড়ে ভোট বাড়াল কমিউনিস্ট পার্টি। দক্ষিণ বোম্বে থেকে সাংসদ হলেন কমিউনিস্ট পার্টির শ্রীপাদ অমৃত দাঙ্গে ⁷। ট্রেড ইউনিয়নের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যে সেদিন প্রমাদ গুনেছিল মালিক-ব্যবসায়ী মহল। শ্রমিক ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে কমিউনিস্ট'দের শায়েস্তা করতে, জরুরী অবস্থায় অন্ধকার দিনে আত্মপ্রকাশ করেছিল শিবসেনা। মালিক'দের টাকা আর কংগ্রেসের ইন্ধনে অল্প কিছুদিনেই নিছক একটা পত্রিকা সম্পাদক থেকে বাল ঠাকরের হয়ে উঠলেন বিষাক্ত রাজনীতির বেতাজ বাদশা ⁸। আর 'অজ্ঞাত পরিচয়' ব্যক্তির ১৬টা গুলি বুকে নিয়ে রক্তাক্ত হলেন শ্রমিক আন্দোলনের পথিকৃৎ 'কমিউনিস্ট' দত্ত সামন্ত ⁹ । 

আসলে 'কমিউনিস্ট'দের সাথে লড়াইয়ে মৌলবাদী'দের বরাবরই একটা মুখোশ লাগে। সেদিনে যে মুখোশের দায়িত্ব কৃতিত্বের সাথে পালন করেছিল শিবসেনা, আজকের বাংলায় সেই গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে। তাই 'কমিউনিস্ট'দের' ৩৪ বছরে, যে রাজ্যে কোনদিন চার দেওয়ালের গণ্ডী পেরিয়ে ধর্ম রাস্তার রাজনীতিতে এভাবে বেআব্রু হয়নি, যে রবীন্দ্র-নজরুল-লালনের মাটিতে গুলশান মল্লিক কিম্বা শৌভিক'দের চাষ হয়নি, সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আজকাল মৌলবাদ চাষের জমি উর্বর করতে যত্ন করে লাঙ্গল দিচ্ছেন। 

তবুও আমার গোলিয়াথ বন্ধু আজও 'কমিউনিস্ট' ডেভিড'দের নিয়ে দুশ্চিন্তা করে। করে কারণ, আজও গোটা বিশ্বজুড়েই মৌলবাদী'দের মুখ আর মুখোশ, দুইয়ের বিরুদ্ধেই 'কমিউনিস্ট'রাই বুক চিতিয়েই লড়াই করে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু'দের উপর অত্যাচার কিম্বা পাকিস্তানে বঞ্চিত শ্রমিকের অধিকার, আমেরিকায় বর্ণবিদ্বেষের শিকার কিম্বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ব্যয়সংকোচ নীতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের জোগাড় –আজও দেশে-বিদেশে লাল ঝাণ্ডাই প্রতিদিন পথে নামে। ইতিহাস সাক্ষী এই 'কমিউনিস্ট'দের' জন্যই দুনিয়া একদিন হিটলারের রক্ত চক্ষুর কাছে মাথা নোয়ায়নি, মুসোলিনির কাছে হারেনি। এই 'কমিউনিস্ট'দের জন্যই আজও জীবন বাজি রেখে আই.এস.আই.এস বিরুদ্ধে কুর্দ'দের লড়াই থামেনি। আর এই 'কমিউনিস্ট'দের' জন্যই বাংলার মাটি পাকিস্তান হয়নি, আর গুজরাটও হবেনা। 

আমার গোলিয়াথ বন্ধু দুশ্চিন্তার করে কারণ, ইতিহাস সাক্ষী, আর.এস.এস'র কিম্বা জামাত -দুনিয়ার তামাম ডেভিড-গোলিয়াথের লড়াইয়ে, গোলিয়াথরা কোনদিন জেতেনি। গোলিয়াথরা কোনদিন জিতবে না।









শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০১৭

হাসপাতালের জার্নাল ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

এই জার্নালে, কাব্য ভারাক্রান্ত কিছু দেব না এই রকমেরই ভাবনা ছিল। এমনিতেই মন খুব খারাপ। চাকরিতে ঢোকার সময় অবসরের জন্য আটান্ন বছর বয়স ধার্য ছিল। ভিআরএসএর অধিকারহীন এই চাকরির বাধ্যতামূলক বয়সসীমা বেড়েই চলেছে। এমতাবস্থায় স্বপ্ন দেখলাম জীবনানন্দ দাশ সরকারি ডাক্তার, তাঁর বয়স তেষট্টি পেরিয়েছে। রিটায়ারমেন্টের বয়স হেঁটে যাচ্ছে অনন্তের দিকে।
ঘুম ভাঙতেই কবিকে প্ল্যাঞ্চেটে ডাকলাম। সমান্তর পৃথিবী থেকে নেমে এসে তিনি লিখে দিয়ে গেছেন যা, সে'টুকু নীচে রইল।
------------------------------------------------------------------------

তেত্রিশ বছর ধরে আমি খেলা দেখাচ্ছি সরকারি সার্কাসে
মেডিকেল কলেজ থেকে সত্তরের বিভীষিকা দশক পেরিয়ে
অনেক ঘুরেছি আমি। ইন্টার্নশিপের সেই ধূসর জগতে,
সেখানে একবছর, আশা প্রহেলিকামাখা হাউসস্টাফ শিপেও
সে'খানে ছিলাম আমি। আরও ঘোর অনিশ্চিত চিকিৎসার রিঙএ,
আমি ক্লান্ত বাঘ এক, রিঙমাস্টারেরা শুধু চাবুক মারেন।
আমাকে দু'দণ্ড শান্তি দিলই না আজব এক হিটলারি ব্রেন।

মাইনে তার কবেকার ডিএ-হীন অতিদীন স্কেলে
চাকরির ক্ষেত্রটুকু মাননীয়াটির দেওয়া উস্কানির পর
আজ নিরাপত্তাহীন। সেই বাঘ হারিয়েছে দিশা
তবু অবসর-লোভ যখন সে চোখে দেখে সার্ভিস বুকের ভিতর,
তখনই ভবিষ্য দোলে অন্ধকারে, বুঝে যাই জেগেছে ভিলেন
বক্তৃতায় অতিদড় গলা যার… মাননীয়া শয়তানি ব্রেন।

তেষট্টি বছর পুড়ে ছাইভরা চিতার মতন
সন্ধ্যা আসে, মাথার মেধা ও স্মৃতি ক্রমশ বাতিল
পৃথিবীর সব রঙ নিভে এলে সিপিএ-র হয় আয়োজন
তখন কেসের ভয়ে ছানি-চোখ করে ঝিলমিল
মৃত্যুপথযাত্রী বাঘ… পাবই না,  পেনশনে প্রাপ্য লেনদেন
থাকে শুধু অন্ধকার, মেরে ফেলে গিলবার শয়তানি ব্রেন।

শুক্রবার, ১৪ জুলাই, ২০১৭

নয়ডা ~ আর্কাদি গাইদার

'কে কখন কোথায় কিভাবে বিষ্ফোরণ ঘটাবে তা জানতে রাষ্ট্রশক্তির এখনো বাকি আছে'
- হারবার্ট, নবারুন ভট্টাচার্য্য

নয়ডাতে মহাগুন মর্ডার্ন সোসাইটি নামক গেটেড কমপ্লেক্স। গেটেড কমপ্লেক্স মানে এই যেমন ধরুন কলকাতার সাউথ সিটি, বা বেংগল অম্বুজা। প্রাচীর ঘেরা জমি, সবুজ লন, তার মধ্যে ছবির মতন সুন্দর অট্টালিকার সমাবেশ। বাইরের নোংরা শহর আর তার ততধিক নোংরা ঘেমোগন্ধওয়ালা মানুষগুলোর থেকে পার্টিশন করা সম্পূর্ন আলাদা একটা জগত। তা এরকমই একটি গেটেড কমিউনিটি মহাগুন মর্ডার্নের কোন একটি ফ্ল্যাটে কাজ করতেন জোহরা বিবি। পরশু থেকে হঠাত নিখোজ হয়ে যান। তারপর কাল তার হদিশ পাওয়া যায়। তার মালিকের দাবি যে জোহরা বিবি নাকি ১০০০০ টাকা চুরি করে বাড়ির বেসমেন্টে লুকিয়ে ছিলেন। জোহরা বিবি জানিয়েছেন, তাকে মালিক গোটা দিন একটা ঘরে আটকে রেখেছিলো। এরপর জোহরা বিবির  বাড়ি যেযে বস্তি/কলোনীতে সেখানকার লোকজন খেপে গিয়ে কমপ্লেক্সে হামলা করেন, ভাংচুর করেন। সিকিওরিটি গার্ডরা হাওয়ায় গুলি চালায়। তারপর পুলিশ আসে। আপাতত ওই বস্তির ৫০ জন পুলিশ হাজতে।

এর পরেই বাজার গরম হয়ে ওঠে বিভিন্ন ভাবে। বেশ কিছু মিডিয়া রিপোর্ট করে যে 'আবাসনের শান্তিপ্রিয় বাসিন্দাদের ওপর 'মব' এর হামলা'। চুরি লুকোতে গা জোয়ারি। ব্যাক্তিগত সম্পত্তি ধ্বংস। সোশ্যাল মিডিয়াতে ভদ্রলোকেরা আতংকিত হয়ে লিখতে শুরু করে - এদের কে কাজে রাখা যাবে না! কি অনাসৃষ্টি! কত সাহস! এমনকি চাড্ডিরাও পিছিয়ে থাকবে না বলে প্রচার শুরু করে দিয়েছে 'হিন্দু মালিকপক্ষের ওপর বেআইনি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী মোল্লাদের হামলা'। চাড্ডিদের নিয়ে আজকাল আর অবাক হইনা, হাসিও পায় না। যে কোন শ্রেনী সংঘাতকে সাম্প্রদায়িক রং দিতে ওরা বিশেষ ট্রেনিং পায় বোধহয়। ভাঙরের ক্ষেত্রেও করেছিলো। তা এই চরম ক্যাকোফোনির মধ্যেও কিছু কিছু মিডিয়া ঘটনার সব দিক তুলে ধরে রিপোর্টিং করবার চেষ্টা করেছে, তার লিংক কমেন্টে দিয়ে দেবো।

এই হলো তথ্য। এরপর আসবে সত্য। আমি দুটো বাক্য কে মূলমন্ত্র মেনে চলি - Seek truth from facts. আর There is no truth but class truth. তাই আপাতত তথ্য থেকে শ্রেনী সত্য উদঘাটনের সামান্য প্রয়াস করি।
প্রথমেই জানাই, জোহরা বিবি মিডিয়াকে জানিয়েছেন যে তিনি কুচবিহারের বাসিন্দা, এবং ভারতের নাগরিক হিসেবে তিনি নিজের আধার কার্ড, ভোটার কার্ড সবই পুলিশ এবং মিডিয়াকে দেখিয়েছেন। এবার চলুন তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম উনি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী মোল্লা। তা ওনাকে কাজে রাখবার সময় তো এইটা নিয়ে কোন অসুবিধে হয়নি। তাহলে আজকে ওনার সাথে বৈরিতার সময় এই তথ্য দিয়ে কি হবে? 
ভারতবর্ষের উচ্চমধ্যবিত্ত কি পরিমানে সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা বহন করে, তার প্রমান আমরা রোজ হাতেনাতে পাই নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে। এ ছাড়া এই বাংলাতেই খবরের কাগজে মাঝেমধ্যেই বাড়ির কাজের লোকের ওপর অত্যাচার নিয়ে কত খবরই বেরোয়। সেখানে নয়ডার মতন জায়গার বড়লোকরা, বিশেষ করে এই আবাসনে থাকা পয়সাওয়ালারা, যাদের অভিজ্ঞতা আছে, জানবেন যে বাকিদের থেকে অনেককাঠি ওপরে। তাই যখন দেখেছি যে গোটা কলোনীর লোক একসাথে আবাসনে হামলা চালিয়েছে, এটা বুঝতে খুব অসুবিধে হয়নি যে এটা দিনের পর দিন পুঞ্জিভূত হওয়া অন্যায়, অপমান ও শ্রেনীঘৃনার বহিঃপ্রকাশ। 'তোমার আছে, আমাদের নেই' স্রেফ এই কারনে তুমি আমাকে নিচু চোখে দেখলে, একদিন আমি ফেটে পড়বোই।
আমার নিরপেক্ষতার প্রতি কোন দায়বদ্ধতা নেই। বৈষম্যের পৃথিবীতে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা মানে ক্ষমতার পাশে দাঁড়ানো। 'নিরপেক্ষতা' দেখানোর জন্যে মিডিয়া আছে, ফেসবুকের বাবু বিবিরা আছে। আমার একমাত্র দায়বদ্ধতা শ্রেনীর প্রতি। তাই আমি ওই মহাগুন মর্ডার্নের তছনছ হয়ে যাওয়া সবুজ লন আর দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে যাওয়া স্থাপত্যগুলো দেখে খুব আনন্দ পেয়েছি। ওই চকচকে ঝকঝকে চামড়াওয়ালা ভীত মুখ গুলো দেখে উল্লাসে ফেটে পড়েছি।
ঠিক যেমন পেয়েছিলাম কয়েকদিন আগে কলকাতার আবাসনে পাশের বস্তি থেকে হামলা করে সব দামী গাড়ি গুড়িয়ে দেওয়াতে। 
জোহরা বিবির বস্তির লোকজন বেশ করেছেন। লাল সেলাম।

There is a storm coming Mr Wayne. You and your friends better batten down the hatches, because when it hits, you are all gonna wonder how you could live so big, and leave so little for the rest of us.