বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০০৯

প্রচারমাধ্যম, ভোগবাদ ও মূল্যবোধ ~ পারিজাত ভট্টাচার্য্য

পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক বিকাশের সর্বশেষ স্তর সাম্রাজ্যবাদ দেশে দেশে বিস্তার করেছে এখন দেশে - দেশে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, তার সার্বভৌমত্যের, সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ন্ত্রণের জন্যে আর যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার দরকার নেই ঠান্ডা যুদ্ধের পর, সোভিয়েত দেশে এবং পূর্ব ইউরোপের দেশ গুলোতে সমাজতান্ত্রিক ব্যাবস্থার পতনের ফলে, মার্কিন রাষ্ট্র এক মেরূর বিশ্বায়নের কাজ খুব দ্রুত গতিতে শুরু করে দিয়েছে দেশে দেশে চলছে বাজার দখলের কাজ আর এই পর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের বিশ্বস্ত সহায়ক সর্বগ্রাসী বহুজাতিক ভোগবাদী দর্শনের ধারক ও বাহক প্রচন্ড শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম বা প্রচারমাধ্যম দেশের সাধারণ মানুষ, বুর্জুয়া সংবাদমাধ্যমের “ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট” বা opinion” এর কৃপায় বিভ্রান্ত ও চেতনা বিকাশে দিকভ্রষ্ট হয়ে, গঠনমুলক পরিবর্তন এর সাথে ধ্বংসাত্বক পরিবর্তনের রাস্তা গুলিয়ে ফেলেছে বিশ্বায়ণের আক্রমণ কেবলমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না সাংস্কৃতিক জগতকেও সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন দারূনভাবে প্রভাবিত করছে সাথে প্রভাবিত করছে আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবি মহল কে তৈরি করছে আমাদের দেশে তাদের পচ্ছন্দসই “সুশীল গোষ্টি “ এবং তাদের মুখ ঢেকে দিচ্ছে মেকি এবং অতি বামপন্থার মুখোশ দিয়ে মার্কিন দেশ উন্নত উৎপাদনশীল দেশ , যে সব কিছুর উৎপাদনেই বিশ্বের বাজার দখলের শীর্ষে তার মধ্যে ওনারা “ওপিনিয়ান “ বা জনমত, অর্থাৎ দেশের মানুষের নিজ্বস্ব বোধবুদ্ধি, চিন্তা - চেতনা বিকাশের সব দায়িত্ব হাতে তুলে নিয়েছেন প্রত্যেকটি দেশে জনমত তৈরি করার মহান দ্বায়িত্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বৃন্দ কুক্ষিগত করার চেষ্টায় আছে তাই সব কিছু ম্যানুফ্যাকচারিং এর বিশ্বায়নেরসাথে এই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের আরেক অপ-প্রচেষ্টা, জনমত তৈরি এবং তার প্রধান দ্বায়িত্ব নিয়েছে বাজারি কিছু সংবাদমাধ্যম যাতে দেশ দখল করার আগে কিছু বুদ্ধিজীবিদের মস্তিষ্ক বিকৃত করা যায় সাথে সাম্রাজ্যবাদীদের তৎপরতা থাকে যেকোনো ভাবে ইতিহাস এর প্রকৃত ঘটনা র বিকৃতি ঘটিয়ে জনমত তৈরি করার এই ফর্মূলাতে কমিউনিষ্ট দের জনসমক্ষে কাটগড়ায় দাঁড় করানো এবং নিজেদের তৈরি জনমতের ভিত্তিতে কমিউনিষ্ট নিধন যজ্ঞ চালানো

প্রচারমাধ্যম ও এন জি ও দের ভূমিকা

সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের প্রধান হাতিয়ার তাই কমিউনিষ্ট এবং শান্তিকামী গনসংঘঠন গুলি র বিরুদ্ধে ‘ঘৃণাজর্জ্রিত প্রচার-অভিযান ’ জারি রাখা এবং এর জন্যে খোলা হয়েছে দেশী - বিদেশী প্রচুর প্রচারমাধ্যমে, চ্যানেল, ওয়েবসাইট, ব্লগ ইত্যাদি বিশ্বায়নের মানবিক মুখ বা “Globalization with a Human Face” বা “Millennium Goal “ এর দর্শন প্রচার করতে ব্যাঙ্গের ছাতার মতন জন্ম নিচ্ছে এক গুচ্ছ এন জি ও এদের কাজই হচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ নীপিড়িত, বিশ্বায়নের দ্বারা শোষিত শ্রেনীর ক্রোধ প্রশমণ করা এবং শ্রেণী সংগ্রাম ও বিক্ষোভ হতে এদের বিমুখ ও ভ্রান্ত করা এরা দ্বায়িত্ব সহকারে প্রচার করছে যে মানুষের দুঃখ্য, কষ্ট প্রশমন করতে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের প্রবক্তারা কতোটা উদগ্রীব এবং তাই অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সংগ্রামে গিয়ে কোনো লাভ নেই মানুষের কষ্ট , দুঃখ্য লাঘব করতে পারে একমাত্র এই এন জি ও গুলি বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্থা (উজ্জ্বল উদাহারণ হিসেবে বিল গেটস ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট) তাদের শোষিত লাভ্যংশের একটি ছোট অংশ এই এন জি ও মারফত কিছু -মিছু খরচা করে প্রমাণ করতে চাইছে যে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের ত্বত্ত্ব কতটা মহার্ঘ এবং তাদের সৃষ্ট প্রচার মাধ্যম কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ্য শ্রেনী বিভক্ত সমাজে কেউ শ্রেনী নিরপেক্ষ্য নয় এই নিরপেক্ষ্যতার মুখোশের আড়ালে এই “স্বাধীন” প্রচারমাধ্যম সাথে এন জি ও গুলি অন্তরিক্ষে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করছে এবং প্রভুত সম্পত্তি লুন্ঠন করছে শ্রমজীবি সর্বসাধারণকে তাদের শ্রেনী সংগ্রাম থেকে বিমূখ করার প্রচেষ্টা এই “স্বাধীন” ও “নিরপেক্ষ্য” প্রচারমাধ্যমের আরেকটি কাজ হলো নানান দেশের আভ্যন্তরীন রাষ্ট্র ব্যাবস্থায় নাক গলানো সম্প্রতি চিনের সিংজিয়াং প্রদেশে হান এবং উইঘুর সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দাতা হিসেবে এই প্রচারমাধ্যমের ভূমিকা মারাত্মক রকমের গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ওনাদের দেশের একটি তথাকথিত “গনতান্ত্রীক” সংস্থা (NED National Endowment for Democracy) মাধ্যমে দেশে দেশে “গনতন্ত্র” প্রতিষ্টায় পরিত্রাতা হয়ে অবতরণ করেছেন এই নেড আমেরিকান উইঘুর কংগ্রেসের সভাপতি রেবিয়া কাদির কে যথেষ্ট উস্কানী এবং মদত দিয়ে সিংজিয়াং প্রদেশ কে চিন থেকে আলাদা করার চেষ্টা করছে অন্তরিক্ষে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সি আই এ যথেষ্ট তৎপর উদ্দেশ্য একটাই সিংজিয়াং প্রদেশকে আলাদা রাস্ট্র করে , চিন কে অর্থনৈতিক ভাবে দূর্বল করা এবং কাজাখাস্তান, তুর্ক্মেনিস্থান ক্রিমিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্র থেকে তেলের দখল কায়েম করা এই হচ্ছে প্রচারমাধ্যমের নিরপেক্ষ্যতার উদাহারণ ঠিক এরকমই এন জি ও ও প্রচার মাধ্যমের “হেট ক্যাম্পেনের” মাধ্যমে মার্চ ২০০৮ সালে লাসা তে “ক্রিমসন” বিপ্লব, বার্মা- মায়ান্মারে “গেরুয়া বিপ্লব” , যুগোস্লাভিয়ায় ‘বুলডোজার- বিপ্লব’ , জর্জিয়ায় ‘গোলাপ- বিপ্লব’ , ২০০৪-০৫ সালে ইউক্রেনে কমলা বিপ্লব, ২০০৫ সালে কির্গিস্তানে ‘টিউলিপ - বিপ্লব’ ইত্যাদি নামে ষড়যন্ত্র হয়েছে নানাবিধ প্রতিক্রিয়াশীল , বিভেদকারী রঙ্গীন বিপ্লবকে অন্তরিক্ষে প্ররোচণা দেওয়া এবং সাম্রাজ্যবাদী দর্শনে দেশে গুলির সার্বভৌমত্ব কে ভেঙ্গে দিয়ে আর্থনৈতিক, তেলের, প্রাকৃতিক গ্যাস লুন্ঠন কে ত্বরান্বিত করা আমাদের দেশ থুড়ি আমাদের রাজ্যে “মোমবাতি” বিপ্লব কেও এর একটা ছোট উদাহারণ হিসেবে পেশ করা যেতে পারে আশির দশকে নিকারাগুয়েতে অর্তেগার সরকারকে ফেলে দেবার উদ্দেশ্যে এবং মার্কিন পুতুল সরকার প্রতিষ্টার উদ্দেশ্য রেগানের ইরান-কন্ট্রা ষড়যন্ত্র প্রায় সকলেরই জানা বর্তমানে ইরানে গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকার কে বে-আইনি সাব্যস্ত করতে প্রচারমাধ্যম ঊঠে পড়ে লেগেছে এই সব বিপ্লবের তাই অনেক পোষাকই নাম দিয়ে বিশ্বের মানুষকে বিভ্রান্ত করে দেশে দেশে মার্কিন প্রভূত্ব বজায় রাখাই এই প্রচারমাধ্যমের প্রধান লক্ষ্য

আমাদের দেশে ও রাজ্যে প্রচারমাধ্যম ও বিজ্ঞাপন


আমাদের দেশে বা পশ্চিমবঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী মদতে প্রচারমাধ্যমের ভূমিকা যে সব পাপাচার- খুন, কমিউনিষ্ট বিরোধী প্রোপাগাণ্ডা চলছে তা প্রত্যন্ত ভিন্ন ঘটনা নয়, এসব দেখে আশ্চর্য্য হবার মনে হয় কোনো কারণ নেই ইতিহাসের পাতা এবং প্রকৃত তথ্য অনুধাবন করলে জানা যায় যে কমিউনিষ্ট দের হত্যা করার লিষ্ট তৈরি করা হয়েছিলো আগেও, হিটলার এবং তাঁর প্রচারসচিব গোয়াবেলস এই কার্য্যে বিপুল পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন ব্রিটিশ দ্বীপপূঞ্জে ওনার তথাকথিত প্রস্তাবিত এবং কল্পিত “গেস্টাপো” রাজ্য তার সাক্ষ্য বহন করে কমিউনিষ্ট দের হত্যা করা জন্যে লিস্ট তৈরি করা হয়েছিলো শুধু জনমত তৈরি করে সত্য মহার্ঘ শিল্প জনমত তৈরি করার কত মানুষেরই উপকারে না লেগেছিলো কমিঊনিস্ট নিধন যজ্ঞ শুরু হয়েছিলো মানুষকে ভ্রান্ত করে ক্ষেপিয়ে এবং পরবর্তি কালে আক্রমন নেমে এসেছিলো প্রগতিশীল, সৃজনশীল, যুক্তিবাদী , ত্বাত্তিক এবং সাধারণ শান্তি কামী মানুষের ওপর ও বাদ যায় নি সংবাদমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমের এই স্বাধীনতা হরণ আমাদের দেশে ও নতুন নয় আনন্দবাবুদের ও জানার কথা যে একসময় ৭২ থেকে ৭৭ এর জরুরি অবস্থান কালে, তাদের সংস্থার কর্মকর্তাদের ও হাজত বাস করতে হয়েছিলো সেই সময় তো সব সংবাদমাধ্যম কে , পরের দিনের খবর এর প্রীন্ট বা বিষয়বস্তু রাইটার্স ছুইয়ে আনতে হতো ইংরাজি তে যাকে বলে “Vetting” ওনারা ভোলেননি কারণ মানুষকে ভোলাবার “সাধু “ দ্বায়ীত্ব নিয়ে বাজারে নামলেও, ওনাদের তো পেছনে আছে বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি উৎস বৃহৎ কর্পোরেট মহল এর বিপূল পূঁজি তাদের সাথে মানূষ পারবে কিভাবে ? তাই ওনাদের তাৎক্ষনিক দর্শন, সমকালীন, সময়োপযোগী ঘটনাতে মন নিবিষ্ঠ রাখতে হবে, না হলে পিছিয়ে পড়তে হবে ওনাদের সাংবাদিক যখন মাওবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হন, তখন ওনারা চুপ থাকেন কারণ পেছণে আছেন ওনাদের ব্রান্ড মিডিয়ামেড “সর্বেশ্বরী” খেপে গেলেই চাকরি যাবে বূর্জুয়া-জমিদার শ্রেণীর বেতনভোগী সেবাদাস কলমচীদের চাকরী যাবে বেচারা রেলদপ্তরের অফিসার টির করুণ দশা নিশ্চয় এনাদের মনে থাকার কথা আনন্দবাবু দের আনন্দ চিরকালের জন্যে ঘুচে যাবে সাংবাদীকতার মতন একটী সাধু পেশার কি অবমূল্যায়ন! স্বাধীনতার আগেও সর্বশ্রেনী মানুষের ব্যাপক দেশ স্বাধীন করার স্পৃহা সাথে অর্থনৈতিক সংগ্রামকে ওনারা পাত্তা দিতে চাননি এখন বাজারী সংবাদমাধ্যম “বামপন্থার” মুখোশ পরতে চায় সুভাষ বাবুকে “জ়নগনের” নেতা বলে, “ঊচিতবক্তা”, “পার্টি লাইনের বিপরিত ধর্মী” বলে, পার্টী থেকে বিছিন্ন করতে চায় সত্য সাধু উদ্দেশ্য ওনার শ্মশান যাত্রায় এতো লোক হয় কি করে? কালীঘাট হেডকোর্টারের, দিল্লী র আর সাদা বাড়ীর যাবতীয় রাজনৈতিক হিসেব তো গুলিয়ে যাচ্ছে অতহেব নেমে পড় ওনাকে পার্টী থেকে বিচ্ছিন্ন করো পার্টির বিরুদ্ধে “হেট” ক্যাম্পেনিং চালু করার এই তো সুযোগ ওনার ব্যাক্তি জীবনে জনদরদী চরিত্র, জনকল্যানকামী সদিচ্ছার নানান প্রয়াস কে পার্টির আদর্শ থেকে পৃথক করতে হবে জো হুজুর দিদি অথচ প্রকৃতির বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি তে ব্যাক্তি সুভাষ থেকে কমরেড সুভাষ চক্রবর্তীর ছাত্র আন্দোলনে, শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন সংগ্রামে , কমিউণিষ্ট পার্টি, মার্কসবাদ, লেনিনবাদ এর দর্শনে সমৃদ্ধ চিন্তা, চেতনা বিকাশের তীক্ষ্ণতা কে পরিলক্ষিত করার প্রয়াস কোথাও নেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবেই নেই একজন প্রকৃত কমিউনিষ্ট হলেই এতো জনসমর্থন পাওয়া যায় ব্যাতিক্রমী ছিলেন না কমরেড রতণলাল ব্রাম্মীন, কমরেড পি সুন্দরাইয়া, কমরেড মুজফফর আহমেদ এবং আরো অনেকেই সাংবাদিকতার স্বাধীনতার নির্লজ্জ অপব্যাবহার মেকি বামপন্থার মুখোশ পরে বেশী দিন বামপন্থী হওয়া যায় না মজুরশ্রেনী স্বার্থবিরোধী, পূজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যাবস্থার সাথে গোপনে সমঝোতা , স্বার্থান্বেষী মানষিকতা থাকলে, সেই মুখোশ খুলে, কদর্য রুপ বেরিয়ে পড়বেই আসলে অবাক হবার কিছু নেই এদের তো কাজই এটা কমিউনিষ্ট পার্টির এবং তার সদস্য দের নজর বন্দি করে রাখার অন্য সব রাজনৈতিক দল এর আন্ত- সাঙ্ঘঠনিক অবস্থা দেখার দরকার নেই, কারণ এনারা তো শ্রেনী সমঝোতার রাস্তায় চলেন এদের নিয়ে অতো ভয় নেই এদের বলতে এই বাজারী প্রচার মাধ্যমদের ওপর আঙ্কেল শ্যাম দের কড়া নির্দেশ এক্কেবারে ফেউ হয়ে লেগে থাকো কমিউনিষ্ট পার্টির সভ্যদের পেছনে সাথে আছে এদের মদতদাতা “মেকি” , “সজ্জন” এমনকি তথাকথিত উগ্র বামপন্থীরাও কথা, বার্তায়, আচার, আচরনে আতলামি তে ভরপূর এনাদের আতলামী ছাড়া বাজারে এনাদের নাকি market value কমে যাবে কমিউনিষ্ঠ বিদ্বেষ , এটাই তো হালের ফ্যাশন এই ফ্যাশণ টাকে প্রচারের যাবতিয় দ্বায়-দ্বায়ীত্ব এনাদের হাতেই এনাদের একটাই স্লোগান “তবু আমি আঁতেল হবো, এটাই আমার আম্বিশন”, লোকদেখানো সেই আম্বিশন গ্রহণ না করলে তো এনাদের ‘সেল ভ্যালু” কমে যাবে সেটা এনারা বিলক্ষণ জানেন বোধহয় পার্টির আভ্যন্তরের কি চলছে, সবসময় তা জানার জন্যে ডিগবাজী চলছে কত দরদ, কুমিরাশ্রু, দরদে এক্কেবারে প্রান উথলে উঠছে ইসসস, সুভাষ কে পার্টি যোগ্য সন্মান দিলো না যেমন এখন জ্যোতি বাবু কে বলছেন ওনার নাকি আশীর্বাদ পুষ্ঠ সুভাষ এই জ্যোতি বাবু এখন এনাদের কাছে ভগবান বা তার উর্ধেও কিছু অথচ এদেরই ভাষায় একসময় তে তিনি ছিলেন স্বৈরাচারী শাসক ঠিক ওনাকেও পার্টি থেকে আলাদা করার চেষ্টা ত্রিপুরার একজন সদস্য অপসারিত হবার পর, যাত্রা শুরু হয়ে গিয়েছিলো, ফুলের স্তবক নিয়ে তাকে সাদর আমন্ত্রণ, রবিন্দ্রসংগীত, ইত্যাদি সোমনাথ চ্যাটার্জি সদস্য পদ থেকে অপসারিত হবার পর, প্রচারমাধ্যমের কি দরদ এমন ভাবে ওনার জন্মদিন পালন ইত্যাদি বড় বড় নেতা- নেত্রী এক্কেবারে হাজির, শুভেচ্ছা, ফুলের স্তবক নিয়ে, যেন এটা ওনার প্রথম জন্মদিন সেই একই প্রয়াস, পার্টি থেকে বিছিন্ন করার ২০০১ সাল, নির্বাচনের পর এনাদের ভির্মি খাবার জোগাড় এ কি হয়ে গেলো কিন্ত তাতেও ওনাদের স্বস্তি নেই চললো প্রচার, ব্র্যান্ড বুদ্ধ প্রয়াস, সেই বুদ্ধবাবু ইমেজ টাকে আলাদা করার, পার্টি থেকে

শুনে রাখুন আপনাদের তৈরি বুদ্ধিজীবি , সুশীল সমাজ বা সজ্জন গোষ্টির বাইরেও একটা বুদ্ধিজীবিরা আছেন যাদের মস্তিষ্ক এখনো বিকিয়ে যায়নি যাদের পেটে যতটুকু বিদ্যে আছে , তাই দিয়ে তাঁরা সামাজিক ভাবে দায়বদ্ধ, যারা তাদের নিজ বিচার-বুদ্ধি বাজারের কাছে বিকিয়ে দেয়নি আর পার্টির জন্যে আপনাদের অত দরদ দরকার নেই অন্য পার্টির মতন অত নেতা-নেত্রীর সমাগম কমিউনিস্ট পার্টির দরকার নেই এখানে সমষ্টিগত ভাবে কাজ , চিন্তাভাবনা এবং আলাপ আলোচনা করা হয় সে শাখা থেকে ওপরের স্তর অবধি এখানে সবাই দ্বায়িত্ব ভাগ করে নেয় এখানে সবার মধ্যে বন্ধুত্ব, ভাতৃত্বের সম্পর্ক এখানে সবাই সবাই কে কমরেড বলে তার অর্থ সাথী শ্রমজীবিদের সাথে সংগ্রামী আন্দোলনের সাথী এটা বাজারী প্রচারমাধ্যম জেনে রাখুন।। ইতিহাস প্রমান করে যে এরকমই মেকী বামপন্থার মুখোশ পরেছিলেন হিটলার জার্মান দেশের শ্রমজীবি, সর্বসাধারণের কাছে, নিজের তৈরি প্রচারমাধ্যমের “যাদু” তে নিজেকে জাতীয় পরিত্রাতা , শ্রমজ়ীবি সর্বসাধারনের বন্ধু হিসেবে নিজেকে উপস্থীত করেছিলেন সেই মেকি বামপন্থার মুখোশ পরে মানুষকে সাময়িক বিভ্রান্ত করেন হিটলার এবং মানুষকে এই ওপিনিয়ান ম্যানুফ্যাকচারিং এর শিকার বানান পরে মানুষ তাদের ভুল বুঝতে পারে এবং এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতে হিটলার আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন মানুষ সচেতন হয়ে শাস্তি দেন মুসোলিনি কেও ভারত চিন যুদ্ধের সময়তেও দেশের মার্কসবাদী কমিউনিস্টদের, সংবাদমাধ্যম এবং তৎকালীন কংগ্রেস জনমত তৈরি করে , কাঠগড়ায় দাড় করায় ভারতীয় মার্কসবাদী কমিউনিস্টদের তখন বলা হতো চিনের দালাল বা পরবর্তিকালে পাকিস্তানের দালাল সাথে ইন্ধন যুগিয়েছিলো সংশোধনবাদী দক্ষিন পন্থী কমিউনিষ্টরা

দিক-ভ্রান্ত করার প্রয়াস

পুজিবাদী বিশ্বায়ন বা সাম্রাজ্যবাদী শাসক গোষ্ঠির মূল দর্শন হলো মুনাফা, আরো লাভ সেই লাভ করার বিজয় রথ তাদের চালিয়ে নিয়ে যেতেই হবে সে করেই হোক যেকোনো দেশের শ্রমজীবি, মজুর শ্রেনী এই পূজিবাদী ব্যাবস্থাতে সবথেকে অর্থনৈতিক স্তরে নিষ্পেসিত , মারাত্মক রকম শোষিত কিন্ত সেই লাভের ফানুস ফোলাবার জন্যে দরকার এই নীচু শ্রেনীর মানুষের ওপর আরো নীপিড়ন সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন এর এই মূল দর্শন কে প্রচার করার জন্যে দরকার তাই নানান সংবাদমাধ্যম, প্রচার, প্রীন্ট মিডিয়া, দূরদর্শন, ইন্টারনেট, ব্লগ ইত্যাদি উৎপাদন উপায়ের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানো হয়, সাথে ঘটানো হয় তথ্য -প্রযুক্তিতে মারাত্মক বা একভাবে বলতে গেলে “ধ্বংসাত্বক” অগ্রগতি ধ্বংসাত্বক কেন? কারণ এই তথ্য প্রযুক্তির অগ্রগতি ঘটানো হয়, পূজিবাদী অর্থনীতির অভ্যন্তরে অবস্থীত সঙ্কট থেকে মুক্তি পাবার জন্যে এই অগ্রগতি সৃজনশীল কখনই নয় কারন তা ব্যাবহারিত হয় আরো তীব্র শোষন এর তাগিদে আরো মুনাফার তাগিদে এই মুনাফার করার রথ স্তব্ধ হয়ে গেলে, পূজিবাদী ব্যবস্থার সাথে তার মালিকবৃন্দের পতন ও ধ্বংস অবধারিত এই তথ্য প্রযুক্তির অগ্রগতি ঘটাতে গিয়ে এবং ঘটাবার পর, চলে প্রকৃতি যার এক অংশ মানুষ, তার ওপর চলে নির্মম শোষন প্রকৃতির সম্পদ গুলিকে নির্দয় ভাবে নিংড়ে নিয়ে তাকে পরিবর্তন করা হয় ডলারে প্রাকৃতিক নিয়ম বা ব্যাবস্থা নানান দিক দিয়ে সঙ্কটে পড়ে এই ভারসাম্যহীন শোষণে প্রাকৃতিক নিয়ম গুলি বিগড়ে যায় চলতে থাকে মারাত্মক রকম প্রাকৃতিক বিপর্যয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের মুল দর্শন মুনাফা এবং আরও মুনাফা কে তাই সুনিশ্চিত করার জন্যে অবলম্বন করা হয় উন্নত তথ্য-প্রযুক্তির সাহায্য উন্নত ও শক্তিশালী প্রচারমাধ্যমের ভূমিকা যে কোনো দেশের সীমানা মানে না, লগ্নি পূজির অবাধ চলাচলের সাথে এই প্রচারমাধ্যমের অত্যন্ত দ্রুততার সাথে অবাধ চলাচলের তাই দরকার হয়ে পড়ে, তা সে ছাপানো নিউজ প্রিন্ট হোক বা ইন্টারনেট , ব্লগ বা টিভি চ্যানেল গুলি এই মাধ্যম গুলির ঘাড়ে দেওয়া থাকে সবরকমই গুরুদ্বায়িত্ব তা সে যেকোনো রাজনৈতিক বিষয়ে ওপিনিয়ান তৈরি করে মানুষের সামনে পরিবেশন করা অথবা নানান বস্তুসামগ্রী বিপননের তাগিদে বিজ্ঞ্যাপন(কুরুচিকর হলে আরো ভালো-- চিন্তা নেই তার জন্যে মুখ খুলে বসে আছে সহায়ক বহুজাতিক এয়াড এজেন্সী) মাধ্যমে মানুষের মধ্যে মোহ সৃষ্ঠি করা অথবা চরম কুরুচিকর , হিংস্র বা ইতিহাস বিকৃত করে সাম্রাজ্যবাদী (মার্কিন দেবদূত বা এয়াকসান হিরো ইত্যাদি) আমেরিকার প্রয়াসে “শয়তান “ কমিউনিষ্ট নিধনের গল্পাকারে চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষের মনের সুন্দর প্রাকৃতিক গঠন কে স-মূলে ধ্বংস করা, মানুষকে বিভ্রান্ত করা নব্য- গোয়েবেলসীয় কায়দায় মানুষের হৃদয়ে , মস্তিষ্কে, চিন্তায়, মননে তখন গেথে দেবার আপ্রান চেষ্টা চলে যে শয়তান রাষ্ট্র বা কমিউনিস্ট রাস্ট্র কে দমন করার জন্যে এবং সারা বিশ্বে “গনতন্ত্র(?)” বিস্তারের জন্যে মার্কিন প্রভুরা সবসময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আছেন কিন্তু তার ফলে সমাজের সর্বস্তর ছেয়ে ফেলে জঘন্য দূর্নীতি, অনায়াসে খুনোখুনি, যৌনতা ইত্যাদি মানুষের অন্ধকারতম পাপাচারগুলি ইদানিং কালে এই সব বিজ্ঞ্যাপনে কিন্ত দেখা যায় এক অদ্ভূত বিভেদাকারী বা সমাজ জীবনে নিজেদের মধ্যে হিংস্র, স্বার্থপরতা অবলম্বন করার জন্যে দ্যার্থহীন আবেদন আগে যেমন বিজ্ঞ্যাপন গুলি তে দেখা যেত সাধারন মানুষের দ্বারা ব্যাবহৃত পন্যসামগ্রী যথা লন্ঠন, ঝাড়ু, লুংগি, গেঞ্জী ইত্যাদি আজকাল অবশ্য বিজ্ঞ্যাপনী মানসিকতা গরিব বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত্ব ব্যাবহার্য্য পন্য সামগ্রী পরিত্যাগ করেছে এখন টি ভি কিনতে হবে যেখানে লেখা থাকবে “Neighbors envy, owners pride” গাড়ী, দামী আসবাব, দামী মোবাইল দামী পোষাক- আসাক আর কি একটা গাড়ির বিজ্ঞ্যাপন, কোম্পানীর নাম বোধহয় ভোলক্সওয়াগন, গাড়ী আস্তেআস্তে এলো , হোটেল সামনে দাঁড়ানো বেয়ারা যেন হেট হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় যেন সাধারন এক নির্জীব বস্তু হয়েও গাড়ি টি তার প্রভু বা মালিক এই হচ্ছে বহুজাতিক ভোগবাদী মানসিকতার নিদর্শন অঙ্কুরেই বিষ ঢোকানো হচ্ছে সাথে আছে নারী দেহ প্রদর্শনের যেন এক দূর্নিবার প্রতিযোগিতা অর্থের লোলুপতা মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে এই হচ্ছে পূজিবাদী অর্থনীতির প্রবাহমানতার সাথে একনিষ্ট হয়ে চলা প্রকাশ্য যৌনাচারের ব্যাবসা নারী জাতির অসন্মান গরিব মানুষের সীমাবদ্ধতার , দৈনন্দিন জীবনযাপনের যন্ত্রনার তাৎক্ষনিক ঔষধ তাকে দেহ ব্যাবসায় নামানো এই অবৈধ ব্যাবসার চিত্র রুপে দেশে দেশে, বিশেষ করে আমাদের দেশের ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে আবার এটাও শোনা যায় যে এইসব ওয়েবসাইট কোম্পানী গুলি সদর্পে দিনে -দূপুরে দেহ ব্যাবসার দালাল চক্র হয়ে কোটি কোটি অর্থ লুঠছে সীমাহীন অর্থলোলুপতা মানুষের মূল্যবোধ , প্রকৃতি সৃষ্ট সংস্কৃতি কোন পথে যাচ্ছে? আর সোপ-সিরিয়াল গুলোর তো কোনো কথাই নেই রাত নটা বাজলেই বাড়ির গৃহীনি, মেয়ে, বৌদের ভীড় লেগে যায় আজকাল কি সব সিরিয়াল হয়েছে না, কিঁউকি......... ইত্যাদি, সব সিরিয়াল গুলোতেই সেই এক পরিবার, বিশাল উচ্চবিত্ত মানসিকতা, বূর্জুয়া মানসিকতার, দর্শনের প্রদর্শন এবং শিক্ষা একটা অনুষ্ঠানেও অন্তত সাধারণ , গরিব পরিবারের দিন যাপনের, জীবন যাপনের কাহিনি পাওয়া যায় না সবাই কে, এমনকি নিম্ন শ্রেনীর মানুষকেও মোহে আটকে রাখা হয় আর তার সাথে থাকে পালা করে গুরূ-- শিক্ষা বর্ষণের ২৪/৭ এর সমাপ্তিহীন ডু লুপ অমুক বাবা এই বলেছেন, তমুক বাবা এই ওষুধ বাতলেছেন, অমুক বাবা তমুক অসুখ হলে অমুখ ব্যায়ম বাতলেছেন চলতেই থাকে, বেদ, উপনিষদ কে নিয়ে মার্কেটিং এই বাবা বাহিনীর চারিদিকে ঘিরে থাকে রইস ঘরানার স্ত্রী - পুরুষ দের লক্ষ্য লক্ষ্য, কোটি কোটি টাকা দান, ডোনেশন বিজ্ঞ্যান যেন মরে গেছে কোনো বাবা আবার শোনা যায় রাজনীতি তে দাঁড়াবে বাঃ সবই এই প্রচারমাধ্যমের কৃপা

পূঁজিবাদী বিশ্বায়নের এই মুনাফালোলুপতা বা অর্থলোলুপতা এক প্রবল জোয়ার সৃষ্টি করে দেশে দেশে আরো চাপ সৃষ্টি করছে তাদের পন্যের বাজারের চাহিদা এবং বিক্রয় আরো সুনির্দিষ্ট করার জন্যে এরো আবার প্রধান ভূমিকা, রাস্ট্রসমূহের ভ্রান্ত নীতির এবং রাষ্ট্রের আর্থনৈতিক শক্তির অপব্যাবহার কারি প্রচন্ড প্রতাপশালী সংবাদমাধ্যম রাস্ট্রের যুবসমাজ বা তরুন সমাজ বা ছাত্র সমাজের কাছে পরিবেশিত হচ্ছে দামী দামী বৈদ্যুতিন গেজেট, সামগ্রী আই-পড, আই ফোন, ল্যাপ্টপ, এল - সি ডি ইত্যাদি এই প্রলোভনের ফাঁদে ধরা পড়ে ছাত্র, বেকার সহ চাকরী রত মধ্যবিত্ত মানুষ ও শ্রমজীবি শ্রেনী ডলার বা টাকা না থাকলে ক্ষতি কি? বহুজাতিক কোম্পানী তো আছেই ক্রেডীট কার্ড এর পরিষেবার জন্যে কিনুন, আরো কিনুন লোভ তো থাকবেই এখন ভোগ করা যাবে না তো কবে? অর্থ শোধ দেবার ক্ষমতা না থাকলে সেই অর্থ পরিষোধের জন্যে আরো ক্রেডিট কার্ডের ব্যাবস্থা করা যাবে এই করে কারুর কারুর কাছে ১০ থেকে ১২ টা ক্রেডিট কার্ড জমে যায় এক টা শোধ না করতে পারলে আর এক টা এই করে সর্বসাধারণকে দেনার দায়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে কেউ কেউ তো আবার আত্মহত্যার পথ ও বেছে নিয়েছে আর যাদের ঋণ দেবার ক্ষমতা আছে, তাদের কাছ থেকে নানান ছল, চাতুরি এবং শঠতার আশ্রয় গ্রহণ করে, এগ্রিমেন্টের অর্থের থেকে দ্বিগূন বা তিনগুন পরিমান নিয়ে নেওয়া হচ্ছে মানুষের বহু কষ্টার্জিত সঞ্চয় রাতারাতি, মানুষের অজান্তে তার কাছ থেকে আত্মসাৎ করে নিয়ে যাচ্ছে এই হলো বহুজাতিক ভোগবাদের মহার্ঘতা বহুজাতিক ভোগবাদ থেকে জন্ম নেয় স্বার্থন্ধতা ও আত্ম-সর্বস্বতা মানুষ হারিয়ে ফেলে যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত মানবিক মূল্যবোধ এবং মানব সমসষ্টিকে এই আরো অর্থলোলুপতা করে দিচ্ছে আরো আরো অমানুবিক, পাশবিক সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন এবং তার সাথে ভোগবাদ প্রযুক্তির এই অসাধারণ প্রগতির যুগে টি ভি, ইন্টারনেট ইত্যাদি মাধ্যমে যে সংস্কৃতি প্রচার করা হচ্ছে তা হচ্ছে এক অর্থলোভী স্বার্থ সর্বস্ব ও যৌনতা সর্বস্ব সংস্কৃতি এই সংস্কৃতি মানুষকে তার পরিবার , সমাজ বহির্ভূত জীবে পরিবর্তন করছে তার ভোগ-লালসা মেটাবার জন্যে মানুষ উদয়-অস্ত পরিশ্রম করছে তার চাকরি ক্ষেত্রে এবং বহু বি পি ও গুলিতে তাকে মগজধোলাই হয় যে সে একজন সমাজের এলিট শ্রেণী তে পড়ে এবং তাই সে সমাজ কে ভিন্ন হিসেবে, নিজের থেকে আলাদা হিসেবে দেখতে শেখে

পুজিবাদী ভোগবাদী দর্শনের পরিনাম খুন, জখম, যত্রতত্র বলাৎকার,সব কিছুর পন্যায়ন ইত্যাদি এই অবক্ষয়ী সংস্কৃতি মানবজাতির প্রগতির পথে, জীবনের প্রকৃতিক সুস্থ্য,সবল সংগ্রামের পথে এক দারূন বাঁধা সৃষ্টি করে তাই বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে লড়াই কেবলমাত্র আর্থনৈতিক , রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, এই সংগ্রাম কে বিকশিত করতে হয় তাই সাংস্কৃতিক স্তরেও, যাতে প্রকৃতির নিয়মে তৈরি হওয়া সমাজের যা কিছু সুন্দর, সুস্থ্য, স্বাভাবিক এবং মানবিকতা যাতে ধ্বংস না হয়ে যায় এই সাংস্কৃতিক সংগ্রাম কে বিকশিত করতে হবে নানান গনতন্ত্র প্রিয় মানুষ, ছাত্র, যুব সমাজ কে এবং শ্রমজীবি শ্রেনী কে সঙ্ঘঠিত করে, যাতে একটি সুন্দর , হিংসাহীন, আপসহীন সমাজব্যাবস্থা নির্মান করা যেতে পারে এই সমাজব্যাবস্থা তৈরির দ্বায়িত্ব সাধারণ মানুষকেই নিতে হবে এবং ইতিহাস থেকে প্রমানিত যে বর্তমান সমাজে মানুষের এই চেতনার বিকাশ ঘটানোর দ্বায়িত্ব এবং সাংস্কৃতিক স্তরে এই সুন্দর, নির্মল এবং হিংসাহীন সমাজ ব্যাবস্থা গঠনের লক্ষ্যে সাধারণ মানুষকে নীতি আদর্শে সঙ্ঘঠিত করার দ্বায়িত্ব কমিউনিষ্ট দেরই নিতে হয়

সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০০৯

হুল ~ পারিজাত ভট্টাচার্য্য

৩১ আগস্ট, ১৯৫৯ সালে, শহীদ মিনার ময়দানে, খাদ্যের দাবীতে এবং খাদ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের অপসারণের দাবিতে প্রায় তিন লক্ষ্যাধিক ছাত্র, যুব, শ্রমজীবি মানুষের জমায়েত হয়েছিলো। এবং সরকারের স্বৈরাচারী নীতির বিরুদ্ধ সেই জমায়েতই মিছিল এর ওপর পুলিস নারকিয় অত্যাচার করেছিলো। পুলিস সেই মিছিলের ওপর গুলি চালায়। পরের দিন অর্থাৎ ১ লা সেপ্টেম্বর সেই পুলিসী অত্যাচারের প্রতিবাদে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘটি ছাত্রদের ওপরেও পুলিস গুলি চালায় , এবং পরবর্তি পর্যায়ে সরকার কলকাতা এবং শহর তলিতে ১৪৪ ধারা জারি করেছিলো এবং ২ রা সেপ্টেম্বর থেকে কলকাতা এবং হাওড়া তে সেনা নামানো হয়। পুলিস এবং সেনা-আধাসামরিক বাহিনীর অত্যাচারে ৮০ জন শহীদ হন এবং অন্তত ২০০ জন মানুষ নিখোঁজ হন। ২৯ শে সেপ্টেম্বর বিধানসভাতে খাদ্য আন্দোলনের শহীদের প্রতি ১ মিনিট নিরবতা পালন করতেও বিরোধিতা করেছিল কংগ্রেস এবং তার সঙ্গিরা। ২২ শে সেপ্টেম্বর থেকে জেলায় জেলায় ছাত্ররা আইন অমান্য শুরু করেন। ২৬ শে সেপ্টেম্বর সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারে খাদ্য আন্দোলনের শহীদদের স্বরণে স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়।

উল্লেখ্য ২৮ শে সেপ্টেমবর ১৯৫৯ সোমবার রাজ্য বিধানসভাতে বিধান রায়ের মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে কমরেড জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে অনাস্থা প্রস্তাব রাখা হয়। কমরেড জ্যোতি বসু তার ভাষনে সরকার পক্ষ্যকে জুক্তি-তর্কে ধরাশায়ী করে ফেলেন। বস্তুত, এই ঘটনা হবার অন্তত ২ বৎসর আগের থেকে রাজ্যে এই খাদ্য সঙ্কটের বিরুদ্ধে সি পি আই এম সাধারণ মানুষ কে পাশে নিয়ে আন্দোলন, সংগ্রাম সঙ্ঘঠিত করে আসছিলো এবং সরকারকে বার বার সচেতন করা সদিচ্ছা নিয়ে শ্রী বসু সরকারের এর ভ্রান্ত এবং একপেশে পূজিবাদী ব্যাবস্থার তোষণমূলক নীতি বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। রাজ্যেরর আইনসভাতে রাজ্যের মন্ত্রীদের স্বৈরাচারী ভূমিকা এবং নানান ছল-চাতুরি-ধুর্ততা-কপটতা- দুর্নীতি, তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য সেই সময়, মানে কংগ্রেস সরকারের রাজ্যে দ্বিতিয়বার মন্তৃত্বের সময়্কালে , রাজ্য মন্ত্রীমন্ডলির বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগ এনে আইন ও বিচারমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় পদত্যাগ করেছিলেন। ওই সময়ে এবং অন্তত তার পরে, ২৭ শে মার্চ , ১৯৫৮ সালে রাজ্যের বিধাসভার মন্ত্রীমন্ডলীর বিরুদ্ধে বিরোধীদের পক্ষ্য থেকে অনাস্থা প্রস্তাব রাখেন শ্রী বসু। ১৯৫৮ সাল, চারিদিকে দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া। বিধানসভাতে বিরোধীদের প্রশ্নবাণে খাদ্যমন্ত্রী দিশেহারা। প্রশ্নোত্তরে স্পস্টভাষায় তিনি বলছেন যে কন্ট্রোল অর্ডারের ২২/২৩ টাকা দরে বিক্রি হয়, এর থেকে বেশী কি করে হয়, তা তিনি জানেন না। এমনকি তিনি এটাও স্বীকার করলেন যে তিনি খাতাপত্র বা হিসাবপ্ত্র দেখার প্রয়োজনিতা মনে করেন না, এবং হোলসেলের উপর সরকারের অধিকার থকলেও রিটেল বিক্রির ওপর সরকারের কিছু করনীয় নেই। অনেকটা সুরাবর্দী সরকারের আমলে যে দুর্ভিক্ষ্য হয়েছিলো, সরকারের সেই নিরপেক্ষ্য নিরুপায় হবার প্রবৃত্বি, তখন কংগ্রেসীরা প্রাদেশীক সভাতে চুপ থাকতেন। ১৯৫৮-১৯৫৯ সালের এই দুর্ভিক্ষের ভয়ানক অবস্থানকালে, বামপন্থীরা বা বিরোধিরা সরকারকে বারবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন খাদ্যসামগ্রির উঁচু-নীচু দর বেধে দিতে কিন্তু প্রফুল্লবাবু বলেছিলেন যে এখানে সরকারের কিছু ক্ষমতা নেই। কমিউনিস্টরা প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে যখন নতুন চাল উঠেছিল, সেই চাল কিনে নিয়ে সমস্ত জেলায় গুদামজাত করে রাখার জন্যে, কিন্তু সরকার তা না করায়, কালোবাজারী শুরু হয়ে যায় এবং তখনই চালের দাম, ৫ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। সরকার পক্ষ্য থেকে বলা হয় যে এই খাদ্যসঙ্কটের সময়তে কেন্দ্রীয় সরকার টাকা দেবে না। এবং সরকার ৭৫ ভাগ মিল মালিকদের হাথে খাদ্যসামগ্রী ছেড়ে দিয়েছিলেন ফ্রী মার্কেটিং এর নাম করে। ফলে চালের দাম হয় আগুন। লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষ যখন অনাহারে- অর্ধাহারে তখন এই আর্থনৈতিক পান্ডিত্যের আড়ালে ছিলো সুকল্পিত এক পরিকল্পনা। সিদ্ধার্থবাবু একে বলেছিলেন ইন্স্যানিটি কিন্তু শ্রী বসু বলেছিলেন যে দেয়ার ইস এ মেথড ইন দিস ম্যাডনেস। এই সব মিলমালিকদের হাথে যে খাদ্য সামগ্রী ছেড়ে দেওয়া হয় এর পেছনে ছিলো নির্বাচনী তৎপরতা। কংগ্রেস সরকার কে টিকিয়ে রাখার জন্যে বিপরিতে লক্ষ্য লক্ষ্য টাকা পার্টি ফাণ্ডে দান। দেশের বা বাংলার সার্বভৌমত্ব্যকে বিসর্জন দিয়ে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমানো এবং কিছু কিছু আশীর্বাপূষ্ঠমানুষের সম্পদ বৃদ্ধি। এই বাংলার কংগ্রেস প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে বলেছিলেন, শিল্পের ক্ষেত্রে তারা কিছু করবেন কিন্তু প্রথম বার তারা ব্যার্থ। দ্বিতিয়বার আসার সময়তে একই প্রতিশ্রুতি, তাতে নিট ফল, একটা কোক ওভেন প্ল্যান্ট এবং তিনটি স্পিনিং মিল। এই ছিলো তাদের শিল্পের প্রতিশ্রুতি। শিল্পের ব্যাপারে তারা এগোতে পারলেন না , আর সেখানে প্রাইভেট সেক্টর শতকরা ৯৯ ভাগ শিল্প দখল করে বসে আছেন। তাঁরা বড়লোক থেকে বড়লোক হচ্ছেন আর দেশের টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে, অথচ এদের অপর সরকার হস্তক্ষেপ করেনি। গ্রামের কুটির শিল্প ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। কামার, কুমোর তাঁতী সকলে ধ্বংসপ্রাপ্ত। অজয় মুখার্জি তার সেচ ব্যাবস্থা নিয়ে বড় বড় ভাষণ দিতেন কিন্তু তার তথ্য ছিলো ভুলে ভরা। প্রথম টার্গেট প্ল্যান অনুযায়ী ১১ লক্ষ্য একর এবং সাথে আরো ৬ লক্ষ্য একর সেচ ব্যাবস্থা করার। কিন্তু প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে দেখা গেলো মাত্র ২ লক্ষ্য একর জমিতে করা হয়েছে। খাদ্যে হাওড়াকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্যে প্রস্তাবিত কেন্দুয়া খাল , ব্রীটিশ আমল থেকেই প্রস্তাবিত রয়ে যায়, সে আর বাস্তবায়িত হয় না। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে খাদ্যে ওনারা বাংলাদেশকে , ভারতবর্ষকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করবেন। অর্থাৎ খাদ্যের প্রয়োজনে দেশ থেকে টাকা বাইরে না যায়। অথচ প্রকৃত ভূমিসংস্কার জমিদার বা জোতদার দের জন্যে । জমি বা ল্যান্ড রিফর্মের কথা আর না বলাই ভালো। সরকার থেকে বলা হলো যে কৃষকদের জমির মালিক করার জন্যে ৬ লক্ষ্য জমির ব্যাবস্থা করা হবে। তা কমতে কমতে সেই প্রতিশ্রুতি১ লক্ষ্যে তে এসে ঠেকলো। পরে নাকি তাঁরা ৪৮ হাজার বিঘা পেয়েছেন। যে লক্ষ্য লক্ষ্য কৃষক তাদের বাপ ঠাকুরদার আমল থেকে যে জমি চাষ করতেন, তাঁরা যখন জমি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলো তখন তাদের জন্যে সরকারের প্রতিশ্রুতি তাদের নির্বাচন ইস্তেহারের আস্তাকুডেই রয়ে গেলো। সেই বছরেই অর্থাৎ ১৯৫৮ তেই সরকার মানে বাংলা সরকার চালের ব্যাপারে একটা নাকি জোনাল সিস্টেম করে ফেললেন। কানোরিয়া ২ লক্ষ্য মণ চাল আনবার ব্যাবস্থা করেছিলেন শ্রী প্রফুল্ল সেনের সাথে। কারণ তিনিই চালের ব্যাবসাদার। বাইরে থেকে কৃষকরা তো আর নির্বাচনী কাজে চাঁদা দিতে পারবেন না, তাই কানোরিয়ার সাথে ওই ব্যাবস্থা। পান্নালাল সারোগি, ইনি প্রফুল্ল সেনের বেনামদার। কংগেসী ফান্ডে আগের বার নির্বাচনে ১ লক্ষ্য ৫০ হাজার টাকা এনার দান। কংগ্রেস ভবন বোধহয় যেটা থেকে তৈরি হলো। তুলসীরাম রাইস মিল, বীরভূম--- সাড়ে পাঁচ হাজার মণ চাল, এটা শ্রী গোপিকাবিলাস সেন ব্যাবস্থা করে দিয়েছিলেন। সরস্বতী রাইস মিল বীরভূম, তিন হাজার মণ, ইত্যাদি। রানী অব হেতমপুর- ইনি চালের ব্যাবসাদার নন, ওনাকেও পারমিট দেওয়া হয়। সবই গত ইলেকসনের সমঝতা আর কি। সত্যি ভোট বড় বালাই। ১৯৫৬-৫৭ সালে সাড়ে ছয় কোটি টাকা ফেমিন বাজ়েটে ধরা হয়েছিলো এবং তখন ঘাটতি ছিলো ৩ লক্ষ্য টন খাদ্যশস্য, কিন্তু অবাক ব্যাপার, ১৯৫৮-৫৯ সালে যখন রাজ্যে খাদ্য ঘাটতি সাড়ে সাত লক্ষ্য টন, তখন বাজ়েটে টাকা বরাদ্দ্য মাত্র ৫ কোটি ১৪ লক্ষ্য ৪০ হাজার টাকা। সেবার আবার যদি নির্বাচণী বছর হতো তাহলে বোধহয়, রাজ্য সরকার ১০ বা ২০ কোটি বরাদ্দ করতেন। তারা ব লতেন না যে টাকা নেই বা কেন্দ্রীয় সরকার টাকা দিচ্ছেন না। আগেও বলা হয়েছে যে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে কংগ্রেস বলেছিলেন যে দেশ কে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ন করবো এবং বাইরে থেকে খাদ্য আমদানি করা হবে না। কিন্তু তার পর বলা হলো, ১২ লক্ষ্য টন প্রতি বছর খাদ্য আমদানী করতে হবে প্রতি বছর এবং ৬০ লক্ষ্য টন দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে সারা ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে। তারপর আবার শোনা গেলো, যে প্লানিং কমিশন নাকি বলছে, প্রতি বছর ১২ এর জায়গায় ২০ থেকে ৩০ লক্ষ্য টন খাদ্য আমদানি করতে হবে। ১৩৩ কোটি টাকার মেশিনারী পাইভেট সেক্টরে আনতে দেওয়া হয়েছে, তা নাকি না আনলেও চলতো। মেশিনারী মর্ডানাইজেশন, ন্যাশানালাইজেসন এমন জায়গায় করতে যাওয়া হয়েছে তা নাকি না করলেও চলতো। এইবার সরকার বলতে থাকলো তাঁদের নাকি ফরেন এক্সচেঞ্জ কমে যাচ্ছে তাই লোক ছাঁটাই করো এবং লোক ছাটাই করতে হয়েছে দেশকে নষ্ঠ করে, সরকারের দূরদর্শিতার , সদিচ্ছার অভাবে এবং জনবিরোধী নীতির দরূন। কৃষি ব্যাবস্থা সাথে খাদ্যের নিরাপত্তার ব্যাবস্থা, খাদ্য সঞ্চয়ের ব্যাবস্থায়ে সরকারের দূরদর্শিতার অভাব দরূন এই টার্গেট তৈরি করা মূর্খামী এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রনোদিত। পরবর্তিকালে আরো আর্থনৈতিক সঙ্কটের বোঝা তারা চাপিয়েছেন সাধারণ মানুষের ঘাড়ে, পরোক্ষ্য ট্যাক্সের মাধ্যমে, জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে, ইনফ্লেশন করেছেন, মূদ্রাস্ফীতি হয়েছে, মাল উৎপাদনের হিসেব না করে নোট ছাপিয়ে গেছেন এবং ফলত পরিকল্পনা খাতে হিসেব আরও ৯৫০ কোটি টাকা বেড়ে যায়। সেই সময়তে মানে ১৯৫৩-৫৪ সালে একটি নতুন বই, প্রফেসর পাল এয়ন্ড বার্ট আমেরিকান একোনোমিস্ট বলেছেন- দি পলিটিকাল একোনমি অফ গ্রোথ করতে that fifteen per cent of national income could be invested without any reduction in mass consumption. আরো লেখা- “ what is required for this purpose is fullest attainable mobilization of the economic surplus that is currently generated by the country’s economic resources. This is to be found in the more than twenty five percent of Indian’s national income which that poverty-ridden society places at the disposal of its unproductive strata. এর মতে টাকা কোথায় পাওয়া যাবে না টাকা পাওয়া যাবে সেই সব আনপ্রোডাকটিভ স্ট্রাটা থেকে অর্থাৎ তখনকার সোসাইটিতে যাঁরা পূজিপতি, ধনী, যাদের টাকা কোনো প্রোডাক্টিভ কাজে নিয়োগ হয়না এবং যাদের হাথে জাতিয়ো আয়ের শতকরা ২৫ ভাগ। ১৯৫৩-৫৪ সালের জাতিয় আয়ে ন্যাশনাল ইনকাম ওয়েজেস এয়ান্ড স্যালারিজে আছে ২৮৯০ কোটি টাকা, অথচ প্রফিট এয়ান্ড ইন্টারেস্ট এতে ৩০২০ কোটি টাকা মধ্যে ১৫৮৫ কোটি টাকা আসছে এগ্রিকালচারাল প্রপার্টি বড়ো বড়ো জোতদার, জমিদার থেকে তাদের মধ্যে এই টাকা থাকছে। অথচ ঐ ২৮৯০ কোটি টাকা এভাবে জাতিয়ো আয় যেগুলি বাড়তো সেগুলি যদি জনসাধারণের বা জন হিতে , খাদ্যের মধ্যে ভর্তুকি ইত্যসদির মধ্যে বা তাদের জন্যে ব্যায়িত হতো তাহলে হয়তো সেই প্রোডাকটিভ স্রাটার উন্নতি সাধন করা সম্বব হতো এবং এই প্রক্রিয়ায় জাতিয় অর্থনীতিতে স্বচ্ছলতা অবশ্যই আসতো। সেই বিপথের দিনে , দেশের বা রাস্ট্র নায়কেরা ক্যাপিটালিস্ট সিস্টেমের মধ্যে প্রথিত চরম অব্যাবস্থা এবং সঙ্কট পরিলক্ষিত করতে পারেন নি, এবং বিগত উন্নত দেশগুলি থেকে আর্থনোইতিক মন্দার করাল ছায়ায় অনিবার্য ফল থেকেও শিক্ষালাভ করতে পারেনি। ১৯৫৮ সালের কংগ্রেস সরকারের দ্যার্থ ভাষায় প্রচার ও অভিমত। গ্রামের নাকি উন্নতি সাধন হয়েছে, মানে গ্রামীন অর্থনীতিতে। কৃষির ব্যাপারে কথা ছিলো যে তাঁরা ৯ লক্ষ্য ৩২ হাজার টন উৎপাদন করবেন, কিন্তু ১৯৫৬ - ৫৭ সালে ওয়েস্টবেঙ্গল গভর্নমেন্ট প্ল্যানিং কমিশনের কাছে যে রিপোর্ট দিয়েছেন তাতে তাঁরা বলেছেন যে ৮৪ হাজার টন করতে পেরেছেন এবং ১৯৫৭-৫৮ সালে তাঁরা করতে পেরেছেন ১ লক্ষ্য ২৭ হাজার টন বেশী । কোথায় ৯ আর কোথায় ১ আর এই ভাবেই নাকি ওনারা পরিকল্পনাকে স্বার্থক করেছেন । ১৯৫৪ সালে কিছু সারপ্লাস হয়েছিলো কিন্তু সেই সারপ্লাস টা হয়েছিলো প্রয়োজনমতন এবং সময় মতন বৃষ্টিপাত। তার মধ্যে কোনো পরিকল্পনা-টরিকল্পোনা ছিলো না আর সেবার ৭ লক্ষ্য টন বাড়তি হয়েছিলো কিন্তু ১৯৫৮ সালে দেখা যায় যে তখন রাজ্যে সাড়ে সাত লক্ষ্য টন ঘাটতি! এই ভাবেই দেখা যায় ১৯৫৭ সালে ঘাটতি ৪ লক্ষ্য টন, ১৯৫৫ এতে ৫ লক্ষ্য ৪০ হাজার টন, ১৯৫৩ তে ২ লক্ষ্য ৪২ হাজার টন এবং ১৯৫২ তে ৫ লক্ষ্য ৮২ হাজার টন। অন্তত ৯ লক্ষ্য একরে সেচ ব্যাবস্থা সুনিশ্চিত করার কথা ছিলো কিন্তু ১৯৫৮ সাল অবধি মাত্র সাডে তিন লক্ষ্য একর জমিতে সেচ ব্যাবস্থায় জল দিতে পারা গেছে। ময়ূরাক্ষী থেকে ৬ লক্ষ্য একর জমিতে জল দেবার কথা ছিলো কিন্তু ৬ লক্ষ্যের টার্গেট ১৯৫৮ তে ৪ লক্ষ্যে নেমে এসেছে। এই তো ছিল তখনকার পরিকল্পিত গ্রামের উন্নতি এবং দেশ কে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করবার ব্যাবস্থা। তখনকার কংগ্রেস সরকারের প্রচারিত সায়ন্টেফিক কৃষিব্যাবস্থা প্রনোয়নের দাবী দেখলে অদ্ভূত লাগে। ১৯৩৭-৩৮ সালে প্রতি একরে ১২.১৮ ফসল হতো, ১৯৫৩-৫৪ সালে হয়েছে ১৩.৪৮, ১৯৫৪-৫৫ সালে হয়েছে ১০.৪০, ১৯৫৫-৫৬ সালে ১১.১১, অর্থাৎ ১৯৩৭-৩৮ সালে যা ছিলো ফলন তাও ১০ বছরের রাজ্ব্যত্বে কংগ্রেসের চমৎকার কৃষি অর্থনীতিতে অর্ধগত। তৎকালিন পশ্চিমবঙ্গে ১ কোটি ১৯ লক্ষ্য একর জমিতে ফসল হতো তার মধ্যে ১৮ লক্ষ্য একর জমিতে দুই ফসল হতো এবং ১ কোটি একর জমিতে খালি একফসল হতো তার বেশী কিছু হতো না। যখন সরকার বলছিলো ইস্টবেঙ্গল থেকে লোক আসছে, তখন কিন্তু সেই জমিগুলিকে সরকার উদ্যোগ নিয়ে দো-ফসলি করতে পারতেন, এপার-ওপার সবাইকে তারা খাওয়াতে পারতেন। এমোনিয়া সালফেট সার তখন ৪০ হাজার টন প্রয়োজন পশ্চিমবাংলায়, ১৮ হাজার টনের বেশী ব্যাবস্থা করতে পারেনি সরকার। প্রকৃত ভূমিসংস্কার তো দূর অস্ত, নেই অল্প সুদে কো-অপারেটিভ ব্যাবস্থায়, দীর্ঘমেয়াদী ঋণ। কংগ্রেস সরকারেরই ফোর্থ ইভ্যালুয়েসন রিপোর্ট কি বলে - “The major portion among the under – privileged groups is constituted by the agricultural labourers and no improvement is noticed in their economic or social conditions. There has been no activity in the C.D.P movement for the specific benefit of the people. On the contrary the gradual rise in the prices of essential commodities has aggravated their economic condition and they feel also that some rich people who get project contracts and the big cultivators have become richer as a result of making profits in contracts and the increase in the yield of agricultural produce due to the availability of irrigation water from the Mayurakshi Project and a rise in agricultural prices.” মুখ্যমন্ত্রীর এবং তার সরকারের বড় বড় আশ্বাস, সি ডি পি এবং ই এস ব্লক করে দেশের মধ্যে একটা রিভলিউশন নিয়ে আসবেন। দশ বছর ধরে তখন ওনারা রাজ্বত্য করেছেন, দেশের কি রকম রিভলিউশন হয়েছে খাদ্যের বা অন্য জনকল্যানমুলক কাজে। হ্যাঁ , রিভলিউশন ওনারা সত্যি করতে পেরেছিলেন, সংসদীয় গনতন্ত্রের গলা টিপে, তাকে নিষ্পেশন করে, কারণ সংসদীয় গনতন্ত্রের সঙ্কটের জন্যে কখনো জনগনের পক্ষ্য দায়ী নন, দায়ী সবসময় শাসক গোষ্টি , ইতিহাস অন্তত তাই প্রমান করে। বিধানসভাতে কমিউনিষ্টরা ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৫৯ সালে তাই সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব রেখেছিলেন । সরকার জনগনের ওপর অত্যাচার করেছিলো, নীপিডন করেছিলো, সরকার যাদের সেই পচা চাল খাইয়েছিলো, বাধ্য করেছিলো তাদের ১৯ টাকা কন্ট্রোল দরে চাল কিনতে যে চালের দাম হয়ে গিয়েছিলো ৩২ টাকা, তাদের কন্ট্রোল ওর্ডারের ফলে। জনগন তাই সঙ্ঘঠীত হয়েছিলো সবরকম গনতান্ত্রীক শক্তির নেত্রত্বে। এবং সাথে সাথ দিয়েছিলো কমিউনিষ্ঠ পার্টী। সরকার বহুরকম দমননীতি চালিয়েছিলো, এই খাদ্য আন্দোলন কে ধ্বংস করতে। সরকার নানারকম কারণ দেখিয়ে তাদের পক্ষের সমর্থন আদায় করতে চেষ্টা করলো, যথা অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, উদবাস্তুদের আগমন, পাট চাষ বেশী হাওয়ায় ধানের উৎপাদনে জমির পরিমান কমে যাচ্ছে ইত্যাদি কিন্ত তাদের নানান রকম বাহানা, জনগনের কাছে ধোপা টিকলো না। কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে বারো বছরের বেশী রাজত্ব করছিলেন, কিন্তু তাদের আট বছর পরিকল্পনাতে শতকরা তিন ভাগের বেশী জলসেচের ব্যাবস্থা করতে সরকার ব্যার্থ। শতকরা আটাশ ভাগ জমিতে এক ফসল হয়, দুই ফসল হয় না। গড়পড়তা বিঘা প্রতি সাড়ে তিন মন ধান উৎপাদন হচ্ছে। এই অঙ্ক থেকে তাই বোঝা যায় যে যুদ্ধের আগে ১৯৩৯ সালে যা অবস্থা ছিল, উৎপাদনের ব্যাপারে কংগ্রেস আমলে তা গড়পড়তা কমে গেছে। এইসব তথ্য উন্মোচন করতে না দিয়ে সরকার নানান রকম বাহানা অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, উদ্বাস্তু আগমন ইত্যাদি বলে নিজের দোষ ঢাকতে চাইছিলো যা জনগনের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। সরকারের অপদার্থতা, চরম ব্যার্থতা, চরম গাফিলতি এবং দুর্নীতি মানুষের চক্ষুগোচরে প্রতিয়মান হয়েছিলো। রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিবৃতিতে কোনোরকম সামঞ্জস্য ছিলো না। পন্ডিত নেহেরু, শ্রী জৈন, শ্রী পাতিল ই ত্যাদি, এঁনারা বলেছিলেন যে খাদ্য সঙ্কট অন্য ব্যাপার, খাদ্যের যথেষ্ট উৎপাদন হয়েছে, দেশের কোথাও খাদ্য সঙ্কট নেই, পশ্চিমবঙ্গ যা সাহায্য চেয়েছিলো তার অতিরিক্ত পেয়েছে, তাহলে কে সত্যি কথা বলছে, রাজ্য সরকার না তাদের রাজনৈতিক মদতপূষ্ট কেন্দ্রীয় সরকার? কেন্দ্রীয় সরকার বলেছিলো আর ঘাটতি নেই, তাহলে কেনো তখন ৩৪-৩৫ টাকা মন চাল কিনতে হয়েছিলো। আসলে ব্ল্যাক মার্কেটে অনেক খাদ্যসামগ্রী চলে গেছে, ইলেকশন ফান্ড কে সুনীশ্চিত করা দরূন। সাধারণ মানুষ সেটা বুঝেছিলেন। তারা প্রতিবাদ করবেন না, আন্দোলন করবেন না, তাহলে কি তারা নতজানু হয়ে সরকারকে প্রনাম করবেন ?

পশ্চিমবঙ্গে একর প্রতি ধানের ফলন গত ১৪ বছরে বাড়েনি এবং মোট আবাদী জমির সেচপ্রযুক্ত গত দুই পরিকল্পনাতে শতকরা ২০-২১ ভাগ থেকে শতকরা ২৪-২৬ ভাগ হয়েছিলো মাত্র। পুরানো জমিদারী প্রথার অবসান হয়েছিলো ঠিকই কিন্ত খুব কম সংখ্যক কৃষক জমির মালিকানা পেয়েছিলেন এবং হাজার হাজার কৃষক জমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছিলেন। বেশীর ভাগ জমিদার জোতদারেরা নিজেদের বা নিজ আত্মীস্বজনের নামে জমি লিখিয়ে নিয়েছিলো এবং অনেক জমি বেনামে করে নিয়েছিলো, সেখানকার কৃষকদের লেঠেলবাহীনি এবং কংগ্রেসের পূলিসবাহীনি দ্বারা উচ্ছেদ করে। পশ্চিমবঙ্গের গনতনন্ত্র প্রিয়মানুষ, সংগ্রামের মহান ইতিহাসে স্মৃতিতে গর্বিত সর্বাসাধারন , এই তঞ্চকতা ধরে ফেলেছিলেন, গর্জে উঠেছিলেন তাঁরা, সরকারের নানা দমননীতি প্রয়োগ স্বত্ত্বেও , তাঁরা গনসংগ্রামের পথ নিয়েছিলেন। সংসদীয় গনতন্ত্রে তাঁদের যতটুকু সীমাবদ্ধতা ছিল, তার মধ্যে থেকেই তারা ১৯৬৭ সাল এবং তার পরেও জয়যুক্ত করেছিলেন গরীব, শ্রমজ়ীবি মানুষের শ্রেনীবন্ধু কমিউনিষ্ঠ পার্টি এবং তাদের বামপন্থী জ়োটকে। কংগ্রেসীরা নানান ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সেই যুক্তফ্রন্ট সরকারকে দুই বার , অসংবিধানিক ভাবে, অগনতান্ত্রীক ভাবে অপসারিত করেছিলো, কমিউনিষ্ট এবং তাদের জোট সঙ্গীদের মধ্যে ভাঙ্গন ধরিয়ে, কিন্তু ছাই দিয়ে আগুন চাপা রাখা যায়নি। সংগ্রাম, প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিলো, প্রতিবাদের আগুন দাবানল হয়ে হায়নাদের ষড়যন্ত্র জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিলো। ১৯৭৭ সালে আসলো মানুষের বহুপ্রতিক্ষিত বামফ্রন্ট সরকার, মানুষের দুঃখ্য নিবারণের জন্যে এবং এখনো আমরা, এই রাজ্যের মানুষ, শ্রমজীবি মানুষ, কৃষক ভাইয়েরা, ছাত্র, যুব , মহিলা এই সুসংঘঠিত সরকারের সদিচ্ছায়, সুপরিকল্পনায় (নানান সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও)৩ ২ বছরের বেশী শাসনে , গর্বিত, সন্তুষ্ট এবং সমৃদ্ধ।


এই প্রবন্ধের কিচ্ছু তথ্য কমরেড জ্যোতি বসুর সেইসময়কার রাজ্যে বিধানসভাতে প্রতিবাদী ভাষণ এবং অনাস্থা প্রস্তবের ভাষণ থেকে সংগৃহিত ।

বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০০৯

মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০০৯

ফ্যসিবাদ মোকাবিলার দক্ষ জ়েনারেল- এর নাম : সুভাষ চক্রবর্তী ~ আজিজুল হক্‌

সুভাষের সঙ্গে আমার পরিচয় তখন, যখন ভারতে উগ্র জাতিয়তাবাদ- ফ্যসিবাদি রূপ ধারণ করছে। যখন লাল জামা পরার অপরাধে মেয়েদের গায়ে ব্লেড চালাতেও দ্বীধা করতো না এক কংগ্রেসি ছাত্র নেতা, যিনি বর্তমানে সাংসদ। যখন চিনা বাদাম বলার অপরাধে এক ১৬ বছরের হকার কে রাস্তায় ফেলে পেটান হত। ভেঙে দেওয়া হত অবিভক্ত কমিউনিষ্ট পার্টী র পার্টী আফিস। যখন শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধীজীবিরা, আনন্দবাজার-এর নেতৃত্বে মুক্ত সমাজ করে, প্রতিদিন কমিউনিষ্ট নিধনে যুক্তি সরবরাহ করতো। আজকে যারা সুশীল, অনেকেই সেই সময় এর সাথে যুক্ত ছিলেন, এমনকি তাদের অনেকের বাবা-মা-রাও ব্যস্ত থাকতেন উগ্র কমিউনিষ্ট বিরোধীতায়। মনোজ বসুর মত লেখক, তার চিন দেখে এলাম বইটি কলেজ ষ্ট্রীট এ নিজেই পুরিয়ে ছিলেন। পরে অবশ্য ৭৭ এ বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আশার পর, বাম নেতাদেরই পাশে রেখে আবার প্রকাশ করে ছিলেন। ওরকম একটা ফ্যসিষ্ট অভ্যুত্থানের মধ্যেই ওর সাথে আমার আলাপ।

আজ পশ্চিম বাঙলায় আবার ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থানের পদদ্ধনি। বাঙলার গ্রামে গ্রামে প্রাক্তন সামন্ত প্রভুরা কেউ সাংসদ হয়ে, কেউ অঞ্চল প্রধান হয়ে নিজেদের হৃত জমি পুনরুদ্ধারে নেমেছে।

সি পি আই (এম) খ্যদাও অভিযানের নামে, আসলে তাদের যে সমস্ত জমি খাস হয়ে গেছিল, এবং গ্রামের ভুমিহীন ক্ষেত মজুর পাট্টা হিসেবে পেয়েছিল, মেদনিপুর, ২৪পরগনায় সেই সব কৃষকদের ব্যপক উচ্ছেদ করা হচ্ছে। আসলে তারা সামন্তরাজ কেই প্রতিষ্টা করতে চাইছে, গণতন্ত্রের মাধ্যমে। লাল পতাকা কে খতম করার কাজে নেমেছে। এ ষরযন্ত্র অত্যন্ত গভীর। আজ যখন ৯৬ জন বামপন্থী কর্মী খুন হন, ৫৮ টা বামপন্থী দল গুলোর পার্টী অফিস পোড়ে, ৬০০০ লোক উচ্ছেদ হয়, ৩০জন আদিবাসী খুন হন, তখন পশ্চিমবঙ্গ বদ্ধভূমি হয় না। সেগুলো নাকি সব থাকে জনগনের রোষ! অথচ ভাঙরে মানুষ যখন তিতিবিরক্ত হয়ে, অথবা মঙলকোট-এ প্রতিরোধ পাঁচিল গড়ে তোলেন, বা মেদিনিপুর-এ একজন দুজন মরলে, তখন তা হয়ে যায় বদ্ধভূমি।

এক কথায়, ফ্যাসিবাদের এই পুনরুত্থানের সময়, ফ্যসিবাদ মোকাবিলার দক্ষ জ়েনারেল- সুভাষের চলে যাওয়াটা শুধু ক্ষতিকারক নয়, অন্যায় হয়েছে। অন্যায় বলছি, কারন- দিল্লী থেকে কেমো নিয়ে ফিরে আসার পর, নেতাজি ইন্ডোর ষ্টেডিয়াম-এ কতগুলো গণতন্ত্রিক জন্তু জানোয়ারদের সাথে বৈঠকে পাঠানোটা পার্টীর অন্যায় হয়েছে। সেদিনই রমলা কে জিগ্যেস করেছিলাম এটা তুই কি করে allow করলি? ওখানে কোন আলোচনা হয়নি। সুপরিকল্পিত ভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। যেটা ওর কেমো নেওয়া শরীর আর সহ্য করতে পারেনি। একে বলে গণতান্ত্রীক পদ্ধতি। মিটিং থেকে ফিরেই ও অসুস্থ হয়ে পরে। খুব বেদনা দায়ক। আজ মনে হয়, সেদিন যদি আর একটু জোর দিয়ে ওকে ওই সব গণতান্ত্রীক জন্তু জানোয়ারদের সাথে, যাদের কেউ সাংসদ, কেউ বিধায়ক, তাদের সাথে বৈঠকে যাওয়া থেকে আটকাতে পারতাম, তা হলে হয়তো আজ ওকে হারাতে হত না। মৃত্যুপথ যাত্রী মানুষ এর যন্ত্রণা টা যাদের কাছে বড় নয়, মস্তানি দেখানো টাই বড়।

জ্যোতি বাবুর পর, জননেতা বলতে যদি কাউকে বোঝায়, সে ছিল সুভাষ। তার ভেতর এবং বাইরে কোন অমিল ছিল না। কোন ভন্ডামীর ধার ধারত না। যা মনে করতো, তাই বলতো, এবং সেটাই করার চেষ্টা করতো। সেটা আমাদের পছন্দ হতেও পারে, নাও পারে। কিন্তু সুভাষ ভন্ডামী করে নিজের বিপ্লবীয়ানা বা বামপন্থা কে বজায় রাখার চেষ্টা করতো না।

একটা জিনিষ মানতেই হবে, মনের প্রসারতা- চেয়ারম্যান মাও যেতাকে বলেছেন কমিউনিষ্ট-দের প্রথম গুন, অন্য কি গুন ছিল কি ছিলনা জানিনা, কিন্তু এ ব্যাপারে সে ছিল ঈর্শ্বনীয়।

ওর সাথে অনেক ব্যাপারেই মত পার্থক্য হয়েছে। কিন্তু পারস্পরিক সন্মান সহযগিতা কমেনি কখনও। আমার বাড়ির সামনে দিয়ে মিটিং শেষে অনেকেই লাল বাতি লাগানো গাড়ীতে চেপে চলে যান। কখনও নামেন না কেউ। এই কদিন আগে, সুভাষ হঠাৎ এসে হাজির। এসে যথারীতি পূরনো ফর্মেই বলেছিল- তোকে আর এই ঘরে এভাবে থাকতে দেব না। উত্তরে বলেছিলাম- আমার কেউ ভাল করতে পারবে না। সুভাষও পারলো না। চলেই গেল। যেটা বোঝাতে চাইছি, মতাদর্শের পার্থক্য থাকা সত্বেও দলমত নির্বীশেষে সবার পাশে দাঁড়ানোর সাহস, একমাত্র সুভাষই দেখাতে পারত।

সেদিন যাওয়ার আগে ও বলেছিল- ছটা মাস যদি বাঁচি, সব দেখবি ঘুরিয়ে দেব। কিন্তু ছটা মাস ওকে বাঁচতে দিল না। এটা un natural death! ঠিক যেমন EVM মেশিনের কারচুপি কখনো প্রমান করা যাবে না, এটাও প্রমান করা যাবে না।

ভাবছি- এবার এভাবে আর কে বলবে? আজ সুভাষ-এর বড় প্রয়োজন। সুভাষ-দের বড় প্রয়োজন। নিশ্চয়ই ইতিহাস যেমন একদিন সুভাষ কে তৈরী করেছিল, তেমনি আবার কাউকে তৈরী করে নেবে। ফ্যসিবাদ-এর চামচারা আজ উল্লাসিত। তবু একদিন মেহনতি মানুষের জয় হবেই।।

রবিবার, ২ আগস্ট, ২০০৯

সিরাজ শিকদার : ভুল বিপ্লবের বাঁশীওয়ালা ~ অমি রহমান পিয়াল

(ডিসক্লেইমার : ইহা অবশ্যই একটি মধ্যবিত্ত পাতি-বুর্জোয়াসুলভ আলোচনা)

সিরাজ শিকদার বাংলার রাজনীতিতে একজন কিংবদন্তী। কারো মতে বাংলার চে গুয়েভারা। আবার কেউ তার মধ্যে একজন সন্ত্রাসবাদী ছাড়া আর কিছু খুঁজে পাননি। তার অনেক কমরেডই তাকে একনায়ক হিসেবে আখ্যা করে দল ছেড়েছেন। অনেক প্রবীন নেতা তার কাজকর্মকে এডভেন্চারিস্টের তকমা দিয়েছেন, বলেছেন হঠকারী, বলেছেন সিআইএর দালাল। তারপরও লাল বই পড়ে বিপ্লবী হতে ইচ্ছুকদের কাছে সিরাজ শিকদার নমস্যই রয়ে গেছেন। সর্বহারা তথা প্রলেতারিয়েতের এত সুন্দর বাংলা এর আগে কোন বিপ্লবী নেতাই করতে পেরেছেন, কোন বাংলায়! এই বাংলাদেশে যেখানে চালটা-ডালটা-নুনটার সঙ্গে জঙ্গীটা এবং কমরেডশিপ ও তাদের থিসিসটাও আমদানী হয় ভারত থেকে, সেখানে সিরাজ শিকদার তার সর্বহারা তত্ব লিখেছিলেন এই বাংলাকে মাথায় রেখেই। এইখানেই তিনি আলাদা। বিপ্লবী কিংবা সন্ত্রাসী যাই হোন- এই একটা জায়গায় তিনি খাঁটি বাঙালী। পূর্ব বাংলার বাঙালী। এই পোস্টটি তাকে হেয় করতে কিংবা তাকে আকাশে তুলতে লেখা হচ্ছে না। প্রচলিত মিথের বাইরে কিছু চমকপ্রদ ব্যাপার নজরে এসেছে লেখকের। সেটা তুলে ধরার পাশাপাশি কিছু অবান্তর বিতর্ক খন্ডনের চেষ্টা থাকবে। তবে কোনো ক্ষেত্রেই ইতিহাস থেকে বিচ্যুতির কোনো চেষ্টা নেই- এ ব্যাপারে লেখক নিজের কাছে দায়বদ্ধ।

ষাটের দশকের শেষার্ধে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে অসাধারণ কিছু ঘটনা ঘটে যায়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার নামে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ফাসানো হয় লে.কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন ও তার সঙ্গীদের। এ নিয়ে স্বাধীনতার আগে কিছু চমকপ্রদ ঘটনা নামে সিরিজ লেখা হয়েছে আমার ব্লগে। এই মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয় শেখ মুজিবর রহমানকেও। তিনি সেই মুহূর্তে বেশ আলোচিত তার ৬-দফা নিয়ে। এই মামলা দিয়েই পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদের কিংবা স্বাধীনতার সামরিক ও রাজনৈতিক অভিপ্রায় কিংবা যড়যন্ত্র প্রকাশ্যে চলে আসে।

বামপন্থীদের মধ্যে সে সময় দুটো ধারা-রুশ ও চীনাপন্থী। মূলত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যেই তা প্রবল ছিলো। নেতা পর্যায়ে তা ছিলো ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ব্যানারে। কারণ পাকিস্তানে তখন কম্যুনিস্ট পার্টি ছিলো নিষিদ্ধ, অতএব গোপন। রাশিয়া এবং চীনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক চুক্তিতে লেনিন এবং মাও সেতুংয়ের রচনাবলী তখন সহজপ্রাপ‌্য। সুবাদেই দলের প্রবীন নেতারা বিপাকে। এদের বেশীভাগই স্বদেশী করা আন্দামান ফেরত সন্ত্রাসী। নতুন পড়ুয়ারা বিভিন্ন তত্ব নিয়ে তর্ক করে তাদের নাজেহাল করে। রুশপন্থীদের ঝামেলা কম। তারা কর্মীদের নানা ধরণের অসাম্প্রদায়িক গান-বাজনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্যস্ত রাখে। তিন জনের সেল পদ্ধতিতে (যেখানে কর্মীরা একাধিক সেলের সদস্য) পার্টি ম্যানিফেস্টোর প্রচারণা চলে। সমাজতন্ত্রের পথে শান্তিপূর্ণ রূপান্তরে বার্মা তাদের কাছে মডেল। শৃংখলা ভাঙ্গার সুযোগ তাই নেই। অন্যদিকে চীনাপন্থীরা সোভিয়েত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কে বেশী সাম্রাজ্যবাদী, কাকে শ্রেনীশত্রু ও সংস্কারবাদী ধরা হবে এই নিয়ে বিতর্কে ব্যস্ত। ভিয়েতনাম যুদ্ধে সংস্কারপন্থীদের সঙ্গে নিয়ে লড়াইয়ে তাদের মন খারাপ হয়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদী উন্মেষ তাদের চোখ এড়ায়। ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে তারা পাকিস্তানের সঙ্গে গলা মেলায় বটে, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্বার্থের পক্ষে তাদের রা সরে না।

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময়ই তাদের এই রূপটা অবশ্য পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো। চীন পাকিস্তানের বন্ধু বলে তারা পাকিস্তানের পক্ষে গলা মিলিয়েছে। শোনা যায় ভাসানী কয় দিনের জন্য নিখোজ হয়ে গিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন পিকিংয়ে (বেইজিং) আইউব খানের জন্য সামরিক সাহায্যের দেনদরবার করতে। যদিও এই দাবির স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি কেউ। এই দশকের শেষ দিকে পশ্চিম বঙ্গ কাঁপিয়ে দিলেন চারু মজুমদার। নকশাল বাড়ি আন্দোলনের সেই জোয়ার পিকিং রিভিউর সৌজন্যে রোমাঞ্চিত করে তুললো চীনাপন্থী তরুণ তুর্কীদের। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র সিরাজ শিকদার তাদের একজন। ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) লিয়াকত হল শাখার সভাপতি তিনি। মার্কসবাদ সম্পর্কে তার প্রচুর জ্ঞান। পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টির (মার্কস-লেনিন) সদস্যপদও পেয়েছেন। নকশালবাড়ির আন্দোলনকে পার্টির নেতারা হঠকারিতা বলে রায় দিয়েছেন। আর এর প্রতিবাদে তরুণদের একটা দল বেরিয়ে এসে গঠন করলেন রেডগার্ড। ঢাকা শহরে চিকা পড়লো- বন্দুকের নলই সকল ক্ষমতার উৎস/ নকশালবাড়ী জিন্দাবাদ।

সিরাজ শিকদার তাদের অন্যতম। তার চোখে তখন মাও সেতুং হওয়ার স্বপ্ন জেঁকে বেসেছে। এমনিতে তার খুব বেশী বিলাসিতা নেই সানগ্লাসটা ছাড়া। প্রিয় খাবার বলতে মশুরের ডালে বিস্কিট ডুবিয়ে খাওয়া। ধুমপানের বদভ্যাস নেই। বিপ্লবী হওয়ার প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণে এ যাবত তোলা যত ছবি সব পুড়িয়ে ফেললেন। তারপর তখনকার ফ্যাশন মেনে কৃষকদের জাগিয়ে তোলার জন্য গেলেন নিজের এলাকা মাদারীপুরের ডামুড্যায়। কিন্তু শ্রেনী সংগ্রামের বিভেদ বোঝাতে গিয়ে বিপাকে পড়লেন। সার্কেল অফিসারের ছেলে, ইঞ্জিনিয়ার, পাত্রের বাজারে দাম লাখ টাকা। এক কৃষক তাকে চ্যালেঞ্জ করে বসলেন গরীবের প্রতি তার দরদ পরীক্ষায়। চ্যালেঞ্জ মেনে কৃষকের মেয়ে হাসিনাকে বিয়ে করলেন। স্বভাবতই পরিবার সেটা মেনে নিলো না। তাতে থোড়াই বয়ে গেছে শিকদারের। এবং হঠকারিতা অর্থে এটিই তার প্রথম নয়।

বিপ্লবের আরো প্রস্ততি হিসেবে মার্শাল আর্ট শেখা ধরলেন। এরপর ৭ সঙ্গী নিয়ে টেকনাফ হয়ে গেলেন বার্মা (মায়ানমার)। সেখানকার কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা থান-কিন-থাউর সঙ্গে দেখা করলেন নে-উইনের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রামের স্বরূপ জানতে। রেডগার্ডের মাহবুবুল করিমকে চিঠি দিয়ে জানালেন পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় তিনি বিপ্লবীদের মূল ঘাটি তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আরো সদস্য পাঠাতে। আর বাকী কমরেডদের নিয়ে লেগে গেলেন পাহাড় কেটে সুরঙ্গ তৈরিতে। চীনা দুতাবাসে এর আগে টানেল ওয়ারফেয়ার নামে একটা তথ্যচিত্র দেখেছেন তারা। সে ধাচেই তৈরি হবে বিপ্লবী সদর। সঙ্গীরা সব অল্প বয়সী, কেউ ২০ পেরোয়নি। মধ্যবিত্ত ঘরের আদুরে সন্তান। পাহাড়ের খাদে ওই খেয়ে না খেয়ে ঝড় বৃষ্টিতে মশার কামড় খাওয়া আর সাপের সঙ্গে শোয়া বিপ্লব তাদের সইলো না। ৭ জনের মধ্যে ৫ জন পালালেন। রেডগার্ড নেতা মাহবুবের ভাই মাহফুজ তাদের একজন। রয়ে গেলেন বিহারী দুই ভাই। এদের মধ্যে কায়েদ-ই আযম কলেজের বিএসসির ছাত্র আজমী সিরাজ শিকদার অন্তপ্রাণ। তার স্বপ্ন লিন বিয়াও হওয়া। ক্ষুব্ধ সিরাজ তাকে ছেড়ে আসা ৫ জনের বিশ্বাসঘাতকতায় মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করলেন। মাহবুব তার ভাইর পক্ষ নিলেন। সিরাজের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলো রেডগার্ড।

পুরো ঘটনাকাল ১৯৬৭-৬৮ সালের। এর মধ্যে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছিলো মাও সেতুং থট রিসার্চ সেন্টার বা মাও সেতুংয়ের চিন্তাধারা গবেষণা কেন্দ্র। সে বছরই মালিবাগে এটি প্রতিষ্ঠা করেন সিরাজ শিকদার। পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টির প্রকাশনা স্ফুলিংঙ্গের বিশেষ সংখ্যায় (১৯৮১) এই সময়কালের কথাই বলা হয়েছে। একই সময় জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ সিরাজ শিকদার পুর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের ব্যানারে সর্বদলীয় এক বিপ্লবী ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়াস নেন। আর মাও থট সেন্টার ছিলো তার একটি ওপেন ফ্রন্ট। অন্যদিকে কমরেড রোকন তার স্মৃতিকথায় ব্যাপারটা উল্লেখ করেছেন অন্যভাবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের এডভেঞ্চার শেষে ঢাকায় ফেরার পর খানিকটা হতাশ ছিলেন সিরাজ শিকদার। তার মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করার মতো কোনো ক্যাডার তখন ছিলো না। আর রেডগার্ডের সেই অংশ অর্থাৎ মাহফুজ, মাহবুব, নুরুল ইসলামসহ বাকিরা পূর্ব বাংলা বিপ্লবী কম্যুনিস্ট আন্দোলন নামে আলাদা সংগঠন গড়ে তোলেন। আর সেই ঘাটতি পূরণ করতেই মাও থট সেন্টারের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ করার দায়িত্ব পান রোকন। সেই অর্থে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের ব্যানারেই পার্বত্য চট্টগ্রামে সুরঙ্গ খোড়ার সেই বিখ্যাত এডভেঞ্চারটি ঘটিয়েছিলেন সিরাজ শিকদার। ফজলুল আমিনের সঙ্গে সাক্ষাতকারের উল্লেখ করে তার বয়ানে রোকন জানান- সিরাজ শিকদারের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব নয় কারণ তিনি হঠকারী (এডভেঞ্চারিস্ট)। এই বিষয়ে আরো ইঙ্গিত রয়েছে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে যা সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে পাঠকদের।

বিতর্ক এই পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের গঠনের স্থান নিয়েও। ১৯৬৮ সালের ৮ জানুয়ারি একটি সম্মেলনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে সংগঠনটি। রোকন জানাচ্ছেন লিয়াকত হলে সিরাজ সিকদারকে সেক্রেটারি করে জন্ম নেয় ইবিডাব্লুএম। অন্যসূত্রের বয়ানে ঢাকা জুটমিলের একজন শ্রমিকের বাসায় আয়োজিত হয় সম্মেলনটি যাতে অংশ নেন মাও থট রিসার্চ সেন্টারের প্রায় ৫০জন অনুসারী। এই সম্মেলনেই সিরাজ তার বিখ্যাত থিসিসটি পরিবেশন করেন যাতে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের উপনিবেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই থিসিসেই সিরাজ প্রধান ও মূল সংঘাতগুলো (কনট্রাডিকশনস) উল্লেখ করার পাশাপাশি একটি সফল বিপ্লবের বিভিন্ন পর্যায় ও তা সম্পন্নের রূপরেখা দেন। সম্মেলনে উপস্থিত সবার অনুমোদন পায় তা। থিসিস অনুযায়ী জাপানের বিরুদ্ধে চীনের যুদ্ধের আদলে বিপ্লবের সিদ্ধান্ত হয়।

সুবাদেই গঠিত হয় ইস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট ও ইস্ট বেঙ্গল রেভুলেশনারী আর্মি (পূর্ব বাংলার বিপ্লবী সেনাবাহিনী)।

এখানে চমকপ্রদ ব্যাপার আছে আরো। রোকন জানাচ্ছেন থিসিস অনুযায়ী ১৯৫৮ সাল থেকে পাকিস্তান সামরিক-সামন্তবাদী উপনিবেশবাদ চালাচ্ছে পূর্ব বাংলার উপরে। তার আগ পর্যন্ত শোষণের ধরণটা ছিলো জাতীয়তাবাদী। তাই স্বাধীনতার একমাত্র উপায় সশস্ত্র সংঘাত। মাও সেতুংয়ের পদ্ধতির এই লড়াইয়ে পাকিস্তানের ভূমিকা জাপানের। শেখ মুজিবর রহমান চিয়াং কাইশেক। পূর্ব বাংলা যেহেতু পাকিস্তানী উপনিবেশবাদী সেনাবাহিনীর অধিকৃত অঞ্চল, দখলমুক্তি ও স্বাধীনতার এই লড়াইয়ে তাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অনুচর শেখ মুজিবকে মিত্র মানা যেতে পারে।

এরপর মাঠে নামলো ইবিডাব্লুএম। মাওর বিখ্যাত উক্তি নিয়ে চিকা পড়ে : “Power comes from the barrel of a gun” (বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস”।পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনা এরপরই ঘটেছে, কারণ এর পর কর্ণেল আবু তাহেরের মাধ্যমে সামরিক ট্রেনিং নেয় পূর্ব বাংলার বিপ্লবী সেনাবাহিনী। ‘৬৮ সালের মাঝামাঝি প্রথমবার গেরিলা অপারেশনে নামে ইবিডাব্লুএম। দিলখুশার এক অফিস থেকে একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন ছিনতাই করে তারা। উদ্দেশ্য পার্টির ইশতেহার ছাপানো। এর আগ পর্যন্ত বায়তুল মোকাররমের ইসলামী ফাউন্ডেশন থেকেই এসব কাজ সারতেন সিরাজ শিকদার। শুরু হয় দলের মুখপত্র লাল ঝাণ্ডার প্রকাশনা। পাশাপাশি সদস্য সংগ্রহের কাজও চলতে থাকে পুরোদমে। এর মাঝে জামাতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের তোপের মুখে পড়ে মাও থট সেন্টার। যদিও হামলাটি শেষ পর্যন্ত সামাল দেয় সেখানে থাকা কর্মীরা।

বাংলাদেশের আইনে ‘কাফকা কেইস’ বলে যে কিছু আছে তা জানা ছিলো না। কিন্তু ‘৭৪ সালের শেষে সিরাজ শিকদার ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত এই মামলাতেই হয়রানি হয়েছেন তার বেশ ক’জন পার্টি কর্মী। মামলার ব্যাখ্যাটি সরল- সিডুসিং আ হাউজ ওয়াইফ। আরেকজনের বউকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মামলা। আর সিরাজ শিকদারের বিপ্লবী জীবনে একটি মোটা দাগের অধ্যায় এটি, যা খুব সহজে কারো মুখে শোনা যায় না।

সেই গল্পে আসার আগে আরেকটু বলে নেয়া যাক। বড় মেয়ে শিখার জন্মের পর স্ত্রীকে নিয়ে খিলগাওয়ে বাবার বাড়িতে উঠলেন তিনি। সঙ্গে ছোট তিন ভাইবোন- নাজমুল, শামীম ও শিবলী। আর বড় ভাইর স্ত্রী। ডাক্তার বড় ভাই দিনাজপুরে পোস্টিং। সিরাজ তখন তেজগাঁ টেকনিকাল কলেজে সাড়ে চারশো রুপিতে প্রভাষকের চাকুরি করছেন। পার্টিতে ছদ্মনাম রুহুল আলম। ছেলে সঞ্জীবের জন্মের পর শিল্পপতি জহুরুল ইসলামের ফার্মে ১৪০০ রুপি বেতনে চাকুরি নিলেন সিরাজ। স্ত্রী ছেলেমেয়ে নিয়ে উঠলেন রামপুরার এক পাকা বাড়িতে।

১৯৬৯ সালে পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন মোটামুটি জমিয়ে ফেলেছেন সিরাজ। ন্যাপ ভাসানীর ছাত্র ফ্রন্টের বেশীরভাগ কর্মীই যোগ দিয়েছেন তার সাথে। এদেরই একজন রোকনউদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের ছাত্র। তার কাজিন জাহানারা। পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ব্রিগেডিয়ার হাকিমের স্ত্রী। মহিলাদের পত্রিকা মাসিক বেগমে লেখালেখি করতেন। স্ত্রীর নারীবাদী চিন্তাভাবনা পছন্দ ছিলো না হাকিমের। তার চলাফেরার উপর তাই নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন। দুই সন্তানের জননী জাহানারা রোকনউদ্দিনের সহয়তায় বাড়ি থেকে পালালেন। রোকন শরণ নিলেন নেতা সিরাজ শিকদারের। খালেদা ছদ্মনামে দয়াগঞ্জে এক শেলটারে রাখার ব্যবস্থা হলো তাকে। এনএসআইর একঝাক গোয়েন্দা নেমে পড়লো জাহানারার খোঁজে|

এদিকে বাংলার মাও সিরাজ তার অর্ধশিক্ষিত স্ত্রী হাসিনার মাঝে যা পাননি, তা পেলেন জাহানারার মাঝে। জিয়াং কুইং জাহানারার আরেকটি ছদ্মনাম নিলেন রাহেলা। কারণ এনএসআই তার খালেদা নামের খোজ পেয়ে গেছে। আর অনেকটা মজা করেই সিরাজ নাম নিলেন হাকিম ভাই। সবুজবাগে একটা ভাড়া বাসায় দুজনে একসঙ্গে থাকতে শুরু করলেন। রাতে বেরোতেন একসঙ্গেই। পার্টি সদস্যদের মধ্যে এ নিয়ে কানাকানি এবং একসময় অসন্তোষ সৃষ্টি হলো। চরমপন্থাতেই এই বিদ্রোহ দমন করলেন সিরাজ। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর এবং পেয়ারা বাগানে দুর্দান্ত যুদ্ধ করা সেলিম শাহনেওয়াজ খান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক হুমায়ুন কবিরকে মরতে হলো জাহানারা-সিরাজের সম্পর্কের বিরুদ্ধাচরণ করায়। তবে এসব স্বাধীনতার অনেক পরের ঘটনা। ৩০ ডিসেম্বর ১৯৭৪ সিরাজের সঙ্গেই গ্রেপ্তার হন জাহানারা ওরফে খালেদা ওরফে রাহেলা। তাকে কুমিল্লায় ভাইয়ের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আর দুজনের সন্তান অরুণের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিরাজ শিকদারের পিতাকে। (চলবে)

পাদটীকা : সূত্র সূত্র করে পাগল বানিয়ে ফেলেছেন অনেকে। কিছু ঘটনাকাল সহ কিছু সূত্র দিয়ে দিলাম।

১৯৬৭ : নক্সালবাড়ী, রেডগার্ড ও মাও থট সেন্টার গঠন
১৯৬৮ : পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সুরঙ্গ কাটা অভিযান, পুরানো কমরেডদের সঙ্গে বিচ্ছেদ ও লাল ঝাণ্ডার প্রকাশনা
১৯৬৯ : জাহানারার সঙ্গে পরিচয় এবং লিভ টুগেদার


বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিভিন্ন কীর্তিমানদের নিয়ে অনেককালই বিতর্ক সইতে হয়েছে স্বাধীনতাত্তোর প্রজন্মকে। সরকারী নিয়ন্ত্রণের প্রচারযন্ত্র ও পাঠ্যপুস্তকে যখন যার খুশী তাকে নায়ক বানিয়েছে। তবে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ হয়েছে এই ভূমিকা। সে কারণেই চাঁদপুরের চাঁন মিয়া নিজেকে স্বাধীনতার প্রথম ঘোষক বলে দাবী করলেও সেটা ধোপে টেকেনি। রেফারেন্স, দলিল, উপাত্ত এসবই নির্ধারণ করে দিয়েছে সত্যিকার ঘোষকের নাম।

সেই বিচারে সিরাজ শিকদার এবং পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলনকে বঞ্চিতই বলতে হবে। পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তর পরিসরে তাদের ডাকটা সেভাবে পৌঁছেনি কিংবা তা চাপা পড়ে গেছে শেখ মুজিবর রহমানের ব্যক্তিত্ব ও আওয়ামী লীগের তখনকার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কাছে। ১৯৬৮ সালে EBWM তাদের প্রথম থিসিস দেওয়ার পর থেকেই পূর্ব বাংলার বিচ্ছিন্নতা আদায়ের লড়াইয়ে নেমে পড়ে। এই লক্ষ্যেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এর কর্মীরা। গ্রামাঞ্চল এবং মফস্বল শহরগুলোতে জনভিত্তি স্থাপনে প্রচারণায় নামে। ১৯৭০ সালের ৮ জানুয়ারী সংগঠনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে স্বাধীন পূর্ব বাংলার পতাকা ওড়ানো হয়। ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ ও ময়মনসিংহে ওড়া এই পতাকায় সবুজ জমিনের মাঝে লাল সূর্য্য। বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় পতাকারই অনুরূপ! ১৯৭০ সালের ৬ জুন জহুরুল হক হলের (তখন ইকবাল হল) ১১৬ নম্বর রুমে যে পতাকার পরিকল্পনা ও ৪০১ নম্বর রুমে যার নকশা হয়েছে বলে শিবনারায়ণ দাশ দীর্ঘ বঞ্চনার পর কৃতিত্ব ফিরে পান, EBWM সেটা করে ফেলে অনেক আগেই। আর সেই নকশার মূল পরিকল্পকদের একজন ছিলেন সাইফুল্লাহ আজমী। যার পরিবার বিহার থেকে অভিবাসী হয়ে এসেছিলেন এদেশে।


বিতর্ক এড়াতে এখানে একটি কথা বলে নেওয়া ভালো, শিবনারায়ণের পতাকায় লাল সূর্য্যের মাঝে হলুদ মানচিত্র ছিলো বাংলাদেশের। গোটা মুক্তিযুদ্ধকালে উড়েছে এই পতাকাই। রূপটা বদল হয় ১৯৭২ সালে, ১৭ জানুয়ারি। পতাকার মানচিত্র দু’পাশ থেকে দু’রকম দেখায় এবং একরকম করতে গেলে জটিলতার সৃষ্টি হয় বলেই মানচিত্র বাদ দেয়া হয়।

সে বছর ৬ মে কার্লমার্ক্সের জন্মদিনে পাকিস্তান কাউন্সিলে দুটো হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায় EBWM, যা নিজেই ছুড়েছিলেন বলে দাবি করেছেন কমরেড রোকন। তার মতে পাকিস্তানের দুই অংশের যুবক যুবতীদের মধ্যে বিয়েকে উৎসাহিত করতে ৫০০ রূপী ভাতা চালু করেছিলো এই কাউন্সিল। স্মৃতিকথায় একই কাউন্সিলে দ্বিতীয়বার সিরাজের নির্দেশে আরেকজন কমরেডকে পাঠান রোকন। তার একহাত পঙ্গু ছিলো। পাকিস্তান কাউন্সিলের চারপাশে কড়া পাহারা দেখে তিনি পাশের এক ডাস্টবিনে বোমা ফেলে দেন। আর তা কুড়িয়ে পেয়ে খোলার সময় বিস্ফোরণে মারা যায় দুটো অল্পবয়সী শিশু।

অক্টোবর নাগাদ ব্যুরো অব ন্যাশনাল রিকনস্ট্রাকশন, আমেরিকান ইনফরমেশান সেন্টারসহ আরো বেশ কিছু জায়গায় বোমা হামলা চালায় EBWM, যাতে হতাহতের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে জাতীয় শত্রু খতম কর্মসূচী চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। পার্টির স্বার্থবিরোধী এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা বিরোধীদের এই খতম তালিকায় রাখা হয়। পার্টির প্রথম খতমের শিকার হন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির এক চা বাগানের সহকারী ম্যানেজার হারু বাবু। ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে সংগঠিত এই হত্যাকাণ্ডই ছিলো EBWM-এর প্রথম খতম অভিযান।


দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন গোষ্ঠীর অবস্থান ও তৎপরতা যথাযথ মূল্যায়ন পায়নি। এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিপিকারদেরও দেখা গেছে গা বাচিয়ে চলতে। প্রথাগত লাইনের বাইরে তারা হাটেননি। যে কারণে বিভিন্ন ইতিহাস বইয়ে সিরাজ শিকদার ও তার বাহিনীর জন্য দুই লাইনের বেশী বরাদ্দ হয় না। লেখা হয় : এ ছাড়া সিরাজ শিকদার ও তার বাহিনী পেয়ারা বাগান অঞ্চলে পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। একটা কারণ হতে পারে স্বাধীনতার পরও তা মানতে সিরাজের অস্বীকৃতি। দেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক বিজয় দিবসে হরতাল আহবান কিংবা মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে অন্য পিকিংপন্থী কম্যুনিস্টদের আদলেই তার অবস্থান। নির্দিষ্ট করে বললে অক্টোবরে সিরাজ শিকদার নতুন থিসিস দেন এবং আহবান জানান আওয়ামী লীগ, ভারতীয় বাহিনী ও পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুগপত লড়াই চালাতে। তার দলের আক্রমণের শিকার হন মুক্তিযোদ্ধারাও।

কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টির (এম-এল) তোয়াহা, হক, মতিনদের এই লাইন কিন্তু সিরাজ শুরুতে একদমই নেননি। বরং EBWM-এর প্রথম থিসিসে শেখ মুজিবর রহমানকে কৌশলগত মিত্র হিসেবে উল্লেখ করে তাকে সহায়তা করার সিদ্ধান্তই ছিলো তার। ১ মার্চ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যথন সংসদ অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণা দেন, উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা বাংলা। পরদিন ২ মার্চ EBWM-এর এক ইশতেহারে শেখ মুজিবকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু করার আহবান জানান সিরাজ শিকদার। সেখানে সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অস্থায়ী বিপ্লবী জোট সরকার গঠন এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ পরিষদ গঠনের অনুরোধ ছিলো। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য সেদিনের পত্রপত্রিকায় গোলাম আযম থেকে শুরু করে সবুর খানসহ শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সব রাজনৈতিক নেতাই ইয়াহিয়াকে অনুরোধ জানান মুজিবের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে। কিন্তু সিরাজ বুঝেছিলেন যুদ্ধ ভিন্ন পথ নেই। মুজিব প্রত্যাখ্যান করলেন তার প্রস্তাব।

ক্ষেত্রে এটাও মনে রাখতে হবে সিরাজ শিকদার তখনও মুজিবের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাজনীতিক নন। তার দলও নয়। ৭০ এর সময়কালে আওয়ামী লীগের বেশ কজন উচ্চপর্যায়ের নেতা এবং নির্বাচিত সাংসদ হত্যার জন্য মুজিব খুবই ক্ষুব্ধ ছিলেন চীনাপন্থী কমিউনিস্টদের ওপর। ‘৭১এর জানুয়ারিতে মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেও বসেন : এরপর আমার একজন লোক মরবে, আমি ওদের তিনজনকে মারবো। তাছাড়া ভিয়েতনাম স্টাইলে গেরিলা যুদ্ধের পরিকল্পনাটাও পছন্দ ছিলো না তার। ১৯৭০ সালের জুনেই তিনি পরিষ্কার করে দেন তার মনোভাব যার উল্লেখ রয়েছে মার্কিন দুতাবাস থেকে পাঠানো টেলিগ্রামে। মুজিবের উদ্ধৃতি দিয়ে সেখানে লেখা হয় : If the army, civil service, and “vested interest” continued to play this game, threatened Mujib, “I will proclaim independence and call for guerilla action if the army tries to stop me. It is primarily fear of communist exploitation a Vietnam type situation which has kept me patient this long. (Source: The American Papers- Secret and Confidential India.Pakistan.Bangladesh Documents 1965-1973, The University Press Limited, p.367)

অবশ্য বাংলাদেশের পক্ষে এমনিতেও ভিয়েতনাম হওয়া সম্ভব ছিলো না। “The scope of Pakistan Army’s military problem can be seen in comparison of Vietnam. There a million man South Vietnamese army plus American troops and massive fire-power must try to control a population of 17 million, many basically sympathetic to the Government. Here only 60,000 West Pakistani troops are trying to control a thoroughly hostile population of 75 million. East Pakistan, moreover, is surrounded on three sides by India, which is giving sanctuaries and supplies to the guerrillas. The Pakistan army’s supply routes from West Pakistan to the East must circumvent by sea and air, 1200 miles of India. Of course, the Mukti Bahini is not Viet-Cong. For one thing the guerrillas are not communists. For another they are not-or not yet-very effective fighters. They have been at it for less than four months.”_The Wall Street Journal, July 27, ’71.

সিরাজের এই সহযোগী মনোভাব অবশ্য আগস্ট পর্যন্ত ছিলো। সে মাসের শুরুতে তার ডান হাত সাইফুল্লাহ আজমীসহ ৫জন যোদ্ধাকে সাভারে পাঠিয়েছিলেন মুজিব বাহিনীর সঙ্গে সমঝোতায় আসতে। কিন্তু তাদের উল্টো হত্যা করা হয়। এ ঘটনাই পুরোপুরি বিগড়ে দেয় সিরাজকে। অবশ্য মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটমেন্টের সময়ই ভারতীয় সরকারের বিশেষ নির্দেশে যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারকে সতর্ক থাকতে হয়েছে কম্যুনিস্ট অনুপ্রবেশের ব্যাপারে। মাইদুল ইসলাম তার মূলধারা ৭১ বইয়ে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন : তরুণদের ট্রেনিং দেওয়ার ব্যাপারে অবশ্য ভারতীয় প্রশাসনের সকল অংশের সমান উৎসাহ ছিল না। যেমন ট্রেনিং প্রদান এবং বিশেষত ‘এই সব বিদ্রোহী ও বামপন্হীদের’ হাতে অস্ত্র সরবরাহের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন ভারতীয় সামরিক কর্তৃপক্ষের আপত্তি প্রথম দিকে ছিল অতিশয় প্রবল। এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, নক্সালবাদী, নাগা, মিজো প্রভৃতি সশস্ত্র বিদ্রোহীদের তৎপরতা-হেতু পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতীয় পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা সম্পর্কে এদের উদ্বেগ। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দকৃত অস্ত্র এই সব সন্ত্রাসবাদী বা বিদ্রোহীদের হাতে যে পৌঁছবে না, এ নিশ্চয়তাবোধ গড়ে তুলতে বেশ কিছু সময় লাগে। মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং-এর ব্যাপারে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় তাতে এই নিশ্চয়তাবোধ ক্রমে গড়ে ওঠে।প্রথম দিকে রিক্রুটিং সীমাবদ্ধ ছিল কেবল আওয়ামী লীগ দলীয় যুবকদের মধ্যে। পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এ ব্যবস্হা ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীরও মনঃপূত। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানে আগ্রহীদের বিরাট সংখ্যার অনুপাতে ট্রেনিং-এর সুযোগ ছিল নিতান্ত কম। ট্রেনিং-এর আগে পর্যন্ত তরুণদের একত্রিত রাখা এবং তাদের মনোবল ও দৈহিক সুস্হতা বজায় রাখার জন্য সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় ‘যুব শিবির’ ও ‘অভ্যর্থনা শিবির’ স্হাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সব শিবিরে ভর্তি করার জন্য যে স্ক্রীনিং পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়, তদনুযায়ী ‘বহির্দেশীয় আনুগত্য’ (Extra Territorial Loyalty) থেকে যারা মুক্ত, কেবল সে সব তরুণরাই আওয়ামী পরিষদ সদস্যদের দ্বারা সনাক্তকৃত হবার পর ভর্তির অনুমতি পেত। পাকিস্তানী রাজনৈতিক পুলিশের এই বহুল ব্যবহৃত শব্দ ধার করে এমন ব্যবস্হা খাড়া করা হয় যাতে এই সব শিবিরে বামপন্হী কর্মীদের প্রবেশের কোন সুযোগ না ঘটে।
যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব যখন ভারতে আশ্রয় নিয়ে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন, তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধকারীদের অন্যতম ছিলেন সিরাজ শিকদার ও তার দল। বরিশালের বানারিপাড়া অঞ্চলে (এখানেই জন্মেছিলেন ২৫ মার্চ রাতে নিহত বুদ্ধিজীবি অধ্যাপক জে.সি দেব) অবস্থান নেয় EBWM, ৩০ এপ্রিল গঠন করে জাতীয় মুক্তিবাহিনী যা দখলমুক্ত করে পেয়ারাবাগানের খানিকটা। এই মুক্তিবাহিনী পরিচালনা করতে সিরাজ শিকদারকে প্রধান করে সর্বোচ্চ সামরিক পরিচালনামন্ডলী গঠন করা হয়। ৩ জুন ১৯৭১, পেয়ারা বাগান যুদ্ধক্ষেত্রেই EBWM নতুন নাম নেয় পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি। সিরাজ শিকদার এর আহবায়ক নির্বাচিত হন। তবে জুনের মাঝামাঝি পাকিস্তানী আক্রমণ প্রবল হওয়ায় সর্বহারা পার্টি পেয়ারা বাগান থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। (সূত্র : স্ফুলিঙ্গ, বিশেষ সংখ্যা মে ১৯৮১, পৃ: ৭১-৮৫)

যুদ্ধক্ষেত্রে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিলেন সিরাজ। কেউ তাকে চিনতো সালাম নামে, কেউবা মতি মিয়া। বানারিপাড়া অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধকারী বেণীগ্রুপের অধিনায়কসহ অনেকের মু্খেই সাক্ষ্য মিলেছে এর। মুক্তিযুদ্ধের মৌখিক ইতিহাসের রেকর্ড ঘেটে এমনি কয়েকজনের সাক্ষাতকার থেকে কিছু অংশ তুলে দেওয়া হলো :

বর্তমানে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত মুজিবল হক মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৭-১৮ বছর বয়সী ছাত্র। তার বক্তব্য ছিল :

প্র: আপনি বলছিলেন যে, ‘পূর্ববাংলা সর্বহারা’ নামে পরিচিত একটি দল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করতেছিল। এই দলটিতে কারা নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং তাদের কার্যক্রম কি রকমের ছিল?

উ: প্রথম অবস্থায় যখন মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ সব জায়গায় গঠিত হয়নি, সেই সময় কুরিয়ানায় এবং পরে আলতা, ভিমরুলি এলাকায় ‘পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি’ সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন যে দল সেই দলের ক্যাম্প ছিল আতা স্কুলের পিছনে। আমি সেখানে তাদের সাথে লিয়াজো করার জন্য কয়েকবার গিয়েছিলাম বানারীপড়া থানা এটাক করার জন্য। কেননা তখন বানারীপাড়া থানায় অনেক অস্ত্র ছিল। বানারীপাড়া থানায় একটা শক্ত ঘাঁটি ছিল পাক আর্মির। আমাদের হাতে অস্ত্র কম ছিল, সেই জন্যে তাদের শরণাপন্ন হলাম। তারা আর আমরা একত্র হয়ে বানারীপাড়া থানা কয়েকবার আক্রমণ করেছিলাম। তারা স্বাধীনতার পক্ষেই কাজ করেছিল। পরবর্তীতে কি হয়েছে আমি জানি না। তবে ঐ সময় প্রথম দিকে তারা পাকিস্তানি জান্তার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। তখন সেই দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা ছিল সেলিম শাহনাজ। সেলিম শাহনাজ তার বাড়ি সম্ভবত ঝালকাঠিতে। তিনি ছিলেন স্থানীয় নেতা। ওখানে একবর সিরাজ সিকদার সাহেবও এসেছিলেন। আমরা তখন পাঞ্জাবি মিলিটারি সহ একটা স্পিডবোট গুলি করে দখল করেছিলাম। সেই সময় দশ এগারো জন পাক আর্মিকে হত্যা করা হয়। সেই স্পিডবোটে সেলিম শাহনাজ সাহেব অন্য জায়গায় চলে গিয়েছিলেন। আমি তখন ওখানে ছিলাম।

১৯ বছর বয়সী শোভারাণী মন্ডল এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন, সদ্য বিধবা হয়েছেন। তার কাছে জানা যায় আরো বিস্তারিত :

প্র: আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন ?

উ: আমার স্বামীকে পাক বাহিনী মেরে ফেলেছে সেই প্রতিশোধ নেয়ার জন্য।

প্র: আপনি কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে এলেন ?

উ: সিরাজ শিকদার এই এলাকার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলো। সেই আমাকে ট্রেনিং দিয়েছে। সেই আমাকে বুঝাইয়া শুনাইয়া মুক্তিবাহিনীতে নেয়। আমাদের এই বাড়ির পাশের একটা বাড়িতে তারা থাকতো। সেখানে সে ছেলেমেয়েদের ট্রেনিং দিতো এবং বিভিন্ন জায়গায় অপারেশন করতে পাঠাইতো।

প্র: আপনি বলছিলেন যে, একটি বাড়িতে সিরাজ শিকদার আপনাকে ট্রেনিং দিতো। বাড়িটি ঠিক কোথায় এবং বাড়িটির নাম মনে পড়ছে কি ?

উ: এই বাড়িটি আতা গ্রামে। সম্ভবত মিস্ত্রী বাড়ি বলা হতো। এর চতুরপাশে পেয়ারা বাগান, মাঝখানে এই বাড়িটি।

প্র: এখানে আপনারা প্রথম কতজন মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং নিয়েছিলেন ?

উ: বাইশ জন একত্রে।

প্র: ঐ সময়কার আর অন্য কারো নাম মনে পড়ছে কি ?

উ: একজন মনিকা, তারপরে আরো ৪/৫ জনের নাম আমার মনে আসছে, কিন্তু তারা বেঁচে নেই। একজন ছিলো সুনীল, বাড়ি আতা। বাকি নামগুলো মনে পড়তেছে না।

প্র: আপনারা ওখানে এই বাইশ জনের মধ্যে কতজন পুরুষ এবং কতজন মহিলা ছিলেন ?

উ: ১৮ জন পুরুষ এবং ৪ জন মহিলা।

প্র: এরপরে আপনি কিভাবে যুদ্ধে অংশ নিলেন ?

উ: প্রশিক্ষণের পরে যখন আমরা খবর পেতাম যে আর্মি আসছে তৎক্ষণাৎ আমরা সেখানে গিয়া ঝোপঝাড়ের ভিতরে, রাস্তার ধারে, গাছের আড়ালে বা পেয়ারা বাগান থেকে তাদের আক্রমণ করার চেষ্টা করতাম।

প্র: আপনি কোথায় কোথায় পাক বাহিনীর সাথে লড়াই করেছেন ? সেখানে আপনাদের কি ফলাফল হয়েছিলো ?

উ: প্রথম পাক বাহিনীর ওপর আক্রমণ করা হয় কুরিয়ানা গ্রামের একটু নামায়। একটা স্পীডবোটে ৪ জন পাক বাহিনী আসছিলো একটা মেয়েকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। মেয়েটিকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পথে আমি গ্রেনেড নিক্ষেপ করি সেই স্পীটবোটের উপরে। তখন বোটটা ডুবে যায়। আরো লোকজন আমার সাথে ছিলো, তারা ওদের ধরে ফেলে এবং বেয়নেট দিয়া কইচ্চা [কেটে] নদীতে ফালাইয়া দেয়।

প্র: পাক বাহিনীর ৪ জনকে হত্যার পরে আপনি আর কোথায় কোথায় গেলেন?

উ: তারপরে গরাঙ্গলে আক্রমণ করেছি। গরাঙ্গলে যে আক্রমণ করেছি সেখানে একটা ছোট লঞ্চে পাক বাহিনী যাইতেছিলো। সেটা আক্রমণ করার পরে পিছন থেকে তিনখানা গানবোট আসায় আমরা পিছাইয়া যাই। কিন্তু তখন যে কয়জন মারা গেছে তা আমি বলতে পারবো না। তবে মারা গেছে। লঞ্চ থেকে যে রক্ত ঝরছে সেটা আমরা দেখছি।

প্র: আপনি যে দু’টো মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপে অংশগ্রহণ করেছিলেন সেই দু’টো গ্রুপের উচ্চ পর্যায়ে অর্থাৎ লিডিং পর্যায়ে কারা ছিলেন ?

উ: শেষের গ্রুপটায় লিডিং পর্যায়ে ছিলেন বেণীলাল দাশগুপ্ত। আর প্রথম পর্যায়ের লিডিং ম্যান ছিলেন সালাম ভাই ওরফে সিরাজ শিকদার। সেই ছিলো প্রথম ম্যান। দ্বিতীয় ম্যান ছিলো মজিবুল হক, তৃতীয় ম্যান ছিলো ফিরোজ কবির। কবিতা লেখে যে হুমায়ুন কবির তারই ভাই ফিরোজ কবির। আর কারো কথা আমার তেমন মনে নাই।

২২ বছর বয়সী শ্রমিক ফরহাদের ভাষ্য :

প্র: আপনি বলছিলেন যে, থানার অস্ত্রগুলো একটি পার্টি নিয়ে গেছে? এই পার্টি কি স্বাধীনতার পক্ষে ছিল? না বিপক্ষে ছিল?

উ: স্বাধীনতার পক্ষের পার্টি ছিল। কমরেড সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন ‘পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি’ তাদের নেতৃত্বে সেই অস্ত্রগুলো নেওয়া হয়েছিল। তারা দেশের মাটিতে থেকেই স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করার অঙ্গীকার করেছিল। তাদের ঘাঁটি ছিল কুরিয়ার পেয়ারা বাগানে।

২৯ বছর বয়সী শিক্ষক বেনীলাল দাশগুপ্ত বানারিপাড়া অঞ্চলে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে খ্যাতিমান। তারও অভিজ্ঞতা হয়েছে সিরাজ শিকদারের সঙ্গে লড়াইয়ের :

সিরাজ সিকদার তখন এই এলাকায় মতি নামে পরিচিত। সিরাজ সিকদার,সেলিম শাহনেওয়াজ এখন সব বেঁচে নেই। নিজেদের দ্বন্দ্বে ওদের মরতে হয়েছিলো স্বাধীনতা পরবর্তীকালে। তাদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে মিলে আমরা বানারিপাড়া থানা আক্রমণ করেছিলাম। সেদিন আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো বানারিপাড়া থানা আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে ওখানে পিস কমিটির মিটিং-য়ে আমরা হানা দেবো। তখন থানার পাশে সাহা বাড়িতে পিস কমিটির মিটিং হচ্ছিলো। কিন্তু এই কথাগুলি কেমন করে যেন ফাঁস হয়ে যায়। আমরা এখনও জানি না এই রহস্যটা। আমরা যখন থানা আক্রমণ করলাম তখন থানা থেকে আমাদের লক্ষ্য করে প্রতি আক্রমণ করলো। আমাদের অস্ত্র যেহেতু তাদের মতো ছিলো না,এমুনিশন খুব কম ছিলো,তাই আমরা সেখান থেকে রিট্রিট করি। এই আক্রমণে দুইজন পুলিশ মারা যায়। আমার অসিত্বকে সেদিনই ওরা ধরতে পারলো। তারা জানলো যে আমি একটা বিরাট দল নিয়া এখানে একটিভ। ঐ রাতেই আমরা আমাদের ক্যাম্প থেকে যে ক্যাম্পটি বুড়ির বাড়ির ক্যাম্প বলে পরিচিত ছিলো সেই ক্যাম্প থেকে স্পীডবোটে সিরাজ সিকদারের কাছে চলে যাই আটঘর কুরিয়ানায় নিরাপদ অঞ্চলে। আমরা জানতাম যে,আমাদের ক্যাম্প আক্রান্ত হবে কালকেই। তখন আমার দলের একটা গোয়েন্দা গ্রুপ ছিলো। তারা আমাকে খবর দিয়েছিলো যে পাকিস্তানিরা রাত্রেই হয়তো আক্রমণ করতে পারে। আমি সিরাজ সিকদারকে এই কথাটা বলেছিলাম। উনি বলেছিলেন যে, এক ডিভিশন সৈন্য ছাড়া এতোবড় অঞ্চলে তারা আক্রমণ করতে পারবে না। কিন্তু দেখা গেলো যে, রাত্র সাড়ে তিনটার সময় আমরা যেখানে ছিলাম তার চারিদিকে অজস্র মানুষ এসে গেছে। তাদের একদল সহযোগী পেয়ারা বাগান সাফ করতে লাগলো। এক সময় পেয়ারা বাগান সব কেটে ফেললো। আখের খেত শেষ করলো। সমস্ত জায়গা তখন একটা উদাম বা খালি অঞ্চলে পরিণত হলো। পেয়ারা বাগানের দুই পাশে কতকগুলি খাল ছিলো-যেখানে দশ বারো হাত পানি জমা থাকতো প্রায় সব সময়। এই খালের ভিতরে হাজার হাজার মানুষ প্রাণের ভয়ে লুকাতে চেষ্টা করলো। এদিকে শর্ষিনা পীর সাহেবের মাদ্রাসার প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার ছাত্র এবং চারিদিকের ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের সরবরাহকৃত অনেক লোকজন নিয়া এই অঞ্চলটাকে পাকিস্তানি আর্মি ঘিরে ফেললো। অসংখ্য মানুষ তারা হত্যা করলো। পাকিস্তানিরা সেদিনই মেয়েদের ধরলো,যারা অল্প বয়সী মেয়ে বা ৪৫ বছর পর্যন্ত বয়স তাদের ধরে নিয়ে কুরিয়ানা স্কুলে একটা ঘাঁটি করলো। সেই ঘাঁটিতে পাকিস্তানিরা বেশ কয়েকদিন থাকে এবং ধারাবাহিক অত্যাচার করতে থাকে। তারা যাকে পায় তাকেই হত্যা করে। লুটপাট করে। ঐ অঞ্চল তখন এক বিরান ভূমিতে পরিণত হলো। কয়েকদিন থাকার পর পাকিস্তানি আর্মি এখান থেকে চলে যায়।


পেয়ারা বাগানের যুদ্ধ বিষয়ে ৭ জুন ১৯৭১ একটি প্রচারপত্র ছাড়ে পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি। এতে বলা হয় : পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন (সর্বহারা পার্টির অঙ্গ শ্রমিক সংগঠন) প্রতিনিয়ত আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীসহ সকল দেশপ্রেমিক পার্টি ও জনসাধারণের প্রতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে সঠিক পথে সংগ্রাম পরিচালনা করতে আহবান জানায়। বরিশাল জেলার ঝালকাঠির মুক্তিবাহিনী ও আওয়ামী লীগের দেশপ্রেমিকরা এতে সাড়া দেয়। তাদের অংশগ্রহনসহ অন্যান্য দেশপ্রেমিকদের নিয়ে স্থানীয় মুক্তিফ্রন্ট গঠন করা হয়। ঐক্যবদ্ধ মুক্তিবাহিনী তপশিলী হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত পূর্ব বাংলার বৃহত্তম পেয়ারাবাগান, কুরিয়ানা, ডুমুরিয়া, ভীমরুলী এলাকায় গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করে।” এরপর সর্বহারারা কেনো পেয়ারা বাগান থেকে অবস্থান গুটিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লো এর কোনো ব্যাখ্যা সেখানে ছিলো না। তবে সেই মুহূর্তে সত্যিকার অর্থেই মিত্র খুজছিলেন সিরাজ। স্হানীয় পর্যায়ের মুক্তিবাহিনী কমান্ডারের সঙ্গে ফ্রন্ট গঠনের চেয়ে বৃহত্তর পরিসরের নেতৃত্বে আসার ইচ্ছেটা তীব্র হয়ে উঠেছিলো তার। কিন্তু আগের পর্বেই বলা হয়েছে, সাড়া মেলেনি। উল্টো মুজিব বাহিনীর হাতে নিহত হন তার ডানহাত সাইফুল্লাহ আজমী।

সত্যিটা হচ্ছে সে সময় মুক্তিবাহিনীর বিশ্বস্ততা অর্জনে আসলেই ব্যর্থ হয়েছিলো মাওপন্থী দলগুলো। এমনিতেই তারা তখন বিভিন্ন অংশে বিভক্ত। পাকিস্তানের প্রতি চীনের পক্ষপাতে বিভ্রান্তও। যদিও সিরাজ ‘৬৮ সালের প্রথম থিসিসেই নিজেদের আলাদা বলে দাবি করে হক-তোয়াহা-মতিনদের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টিকে সংশোধনবাদী বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এবং পাল্টা বিবৃতিতে তাদের সিআইএর দালাল বলে অভিহীত করা হয়। এর মধ্যে চারু মজুমদারের নেতৃত্বাধীন নকশালবাদীদের সঙ্গে হক-তোয়াহা গ্রুপের ঐক্য গড়ে ওঠার পর মুক্তিবাহিনী তাদের আক্রমণের শিকার হয়। নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পেরোলী গ্রামে আবদুল হকের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টির শ্রেণীশত্রু খতমের নামে কয়েকশ স্বাধীনতাকামী বাঙালী হত্যার খবরও মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরে পৌছে গেছে। জুনে পূর্ব পাকিস্তান প্রশ্নে তার চতুর্থ থিসিসে চারু স্পষ্টই সমর্থন দিয়েছেন হক-তোয়াহাদের। তাই মাওপন্থী হিসেবে সিরাজকে মিত্র ভাবার আলাদা কোনো কারণ ছিলো না মুক্তি বাহিনীর। এই পর্যায়ে এসে সিরাজও পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টির লাইন গ্রহণ করেন এবং অক্টোবরের থিসিসে মুক্তিবাহিনীকেও প্রতিপক্ষ হিসেবে ঘোষণা দেন। এই হঠকারিতার জের সিরাজকে শেষ পর্যন্ত দিতে হয়েছে যে কারণে স্বাধীনতার পর দলের জন্য গ্রহণযোগ্য একটি শক্তি এবং ভিত্তি তৈরিতে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। চেয়ারম্যান মাওর থিওরীতে বিপ্লব হবে দীর্ঘস্থায়ী, তাই তারা তখন জোর দিলেন ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য অস্ত্র সংগ্রহে। এবং তা ছলে বলে কৌশলে।

দেশ স্বাধীন হলেও তা আসলে রুশ-ভারতের সম্প্রসারণবাদের শিকার, মুজিব সরকার পুতুল সরকার এবং তাদের উৎখাতের জন্য বিপ্লব চলবে- এই লাইনে এগোতে থাকে সর্বহারা। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালেই ঢাকায় যখন বিজয় উৎসব চলছে তখন তারা লিফলেট বিতরণ করে এটি উল্লেখ করে। ‘৭৪ সালে এসে এই ব্যাপারে খুব সরল এক নীতি গ্রহণ করেন সিরাজ। এক থিসিসে বলেন- মুজিব সরকারের উপর ক্রমাগত আঘাতে একে টলিয়ে দিতে হবে যাতে ভারতীয় বাহিনী নাক গলাতে বাধ্য হয়। আর তারপর শুরু হবে সত্যিকারের বিপ্লব। সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক লিফলেটে লেখা হয়: Even though our enemies have increased pressure on us through army, BDR and Rokkhi Bahini, they have not been able to harm us and our rainy season attacks continue. Our guerillas are killing national enemies and grabbing hold of thanas and police faris. Eventually we will form a regular army and create liberated areas. This is the right answer to smash the teeth of the puppet government of Bangladesh. Eventually these puppets will be forced to call in the Indian army to save them. When the colonialist Indian army enters East Bengal, all the masses will join our national liberation struggle.

সে লক্ষ্যেই ২০ এপ্রিল ১৯৭৩ গঠন করেন পূর্ব বাংলা জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট। লক্ষ্য দ্বিতীয় বিপ্লব। আর তা করতে একের পর এক বোমা হামলা, পুলিশ ফাড়ি দখল, পুলিশ ও রাজনীতিবিদ হত্যা চলতেই থাকে। সঙ্গে শ্রেণীশত্রু খতম।

কিন্তু এই শ্রেণীশত্রুরা তার দলেও ছিলো বৈকি। ১৯৭২ সালের ১২ থেকে ১৬ জানুয়ারি প্রথম জাতীয় কংগ্রেসে নতুন রাজনৈতিক লাইনের ব্যাপারে স্পষ্ট ঘোষণা দেন সিরাজ। এতে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, রুশ সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তব্যবাদ এবং রুশ ভারতের দালালদের পূর্ব বাংলার জনগনের মূল শত্রু হিসেবে গণ্য করা হয়। এই থিসিস সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়। একই সঙ্গে দলের গঠনতন্ত্রও ঘোষণা করা হয় যা কিছু সংশোধনীর পর কার্যকর হয়। এতে সিরাজ শিকদারকে চেয়ারম্যান করে ৭ সদস্যের প্রেসিডিয়াম গঠিত হয় যা দায়িত্ব নেয় কংগ্রেস পরিচালনার। এরপর গোপন ভোটে সিরাজ শিকদারকে চেয়ারম্যান করে ৬ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার ছাত্র মাহবুবুর রহমান ওরফে শহীদ (কমরেড রোকন) ও মুক্তিযোদ্ধা সেলিম শাহওনেওয়াজ ওরফে ফজলু নির্বাচিত হন সদস্য। বিকল্প সদস্যপদ পান বুয়েট ছাত্র ফজলুল হক ওরফে রানা, বিএর ছাত্র মাহবুব রহমান ওরফে সুলতান এবং টিচার্স ট্রেনিং কলেজের ইনস্ট্রাকটর নাসিরউদ্দিন ওরফে মজিদ।

জাহানারার সঙ্গে সিরাজের অনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে পার্টিতে শুরু হয় কলহ। এইসময় অভিযোগ ওঠে আজম, রিজভী ও মোহসিনসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে সঙ্গী করে সিরাজকে বহিষ্কার করার উদ্যোগ নেন ফজলু ও সুলতান। এদের কুচক্রী হিসেবে চিহ্নিত করে ১৯৭২ সালের মে মাসে বহিস্কার করেন সিরাজ। জুনের প্রথম সপ্তাহে কাজী জাফর গ্রুপের কিলার খসরুকে দিয়ে সেলিম শাহনেওয়াজ ওরফে ফজলু এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুমায়ুন কবিরকে হত্যা করা হয়। হুমায়ুন কবির হ্ত্যাকান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে সিআইডি জেরা করে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফরহাদ মাজহারকে। এর মধ্যে মাহবুবুর রহমান ওরফে শহীদ গ্রেপ্তার হন পুলিশের হাতে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করেছেন এই সন্দেহে তাকে সেন্ট্রাল কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয় ‘৭৩ সালের শুরুতে। এর মধ্যে পার্টি বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে সংশোধনের শিকার হতে হয় আরো অনেককে। এর মধ্যে বহিষ্কার এবং মৃত্যু দুটোই বরণ করতে হয় তাদের। ‘৭৪ সালে গ্রেপ্তার হন মজিদও। এবং রানা সিরাজ শিকদারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন। নেতৃত্ব সংকটে পড়া কেন্দ্রীয় কমিটি ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর একটি জরুরী বৈঠকে রানার সদস্যপদ স্থগিত করেন। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউদ্দিন, জ্যোতি, মতিন, মাহবুব, রফিক ও রানাকে দিয়ে দুটো সহযোগী ও সমন্বয়কারী দল গঠন করা হয়। এভাবে সিরাজের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব অক্ষুন্ন থাকে।

‘৭৩ সালকেই ধরা হয় সিরাজ শিকদারের স্বর্ণ সময়। এ সময়ই সরকারের প্রশাসনিক দূর্বলতা এবং বাংলাদেশে দূর্ভিক্ষের আসন্ন ছায়াকে কাজে লাগিয়ে নিজের ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন তিনি। ভাবমূর্তি বলতে এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে লড়িয়ে এক রবিনহুডের। এর মধ্যে ঢাকার অদূরে বৈদ্যেরবাজারসহ বেশ কটি ব্যাঙ্ক লুট করে সর্বহারা। গল্প ছড়িয়ে পড়ে সিরাজ ব্যাঙ্ক লুট করে অভাবী মানুষকে খাবার দিচ্ছেন। দখল করা হয় ময়মনসিং মেডিকেল কলেজ, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও টাঙ্গাইলের পাথরাইল পুলিশ ফাড়ি। মাদারিপুরের এএসপি সামাদ মাতবর, মগবাজারের রক্ষীবাহিনীর কর্মকর্তা ফজলুল হক, বরিশালে সাংসদ মুকিম, শেখ মুজিবর রহমানের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী মহিউদ্দিন, টেকেরহাতের নেতা শাহজাহান সরদার, ভোলার রতন চৌধুরী, মাদারিপুরের নিরুসহ অনেকেই খতম তালিকায় নাম লেখান। এরপর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে আবার হরতাল ডাকেন সিরাজ। বিজয় দিবসকে ঘোষণা করেন কালো দিবস হিসেবে। এবার নড়েচড়ে বসে মুজিব সরকার। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদউল্লাহ মাওবাদী চরমপন্থীদের অরাজকতার দোহাই দিয়ে সারা দেশে জরুরী অবস্থা জারি করেন।

বাংলাদেশে মাওবাদীদের বিপ্লবের স্বর্ণক্ষেত্র হিসেবে ১৯৭৪ সাল উপস্থিত হলেও সিরাজ তার সুযোগ নিতে পারেননি। জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ক্রমাগত তাড়া খেয়ে তখন কোথাও কয়েকঘণ্টার বেশী থাকার উপায় নেই তার এবং জাহানারার। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক হাইডআউটেই জন্ম নেয় দুজনের সন্তান অরুণ। আর দলের মধ্যে কলহ লেগেই আছে। পার্টির অনেক ক্যাডারই দলীয় নীতি ভুলে যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াচ্ছেন। সেবছর ভারতীয় রাষ্ট্রপতি গিরির সফরের সময় হরতাল ডাকেন সিরাজ এবং বোমায় কাঁপে সারা দেশ। এ সময়টাতেই ভারতের মার্কসবাদীদের মুখপাত্র বলে কথিত সাপ্তাহিক ফ্রন্টিয়ারে (২০ জুলাই, ১৯৭৪) সিরাজ শিকদারের দলের তীব্র সমালোচনা করে লেখা হয় যে চারু মজুমদার যা ভুলভ্রান্তি করেছেন তা সিরাজের নখের সমানও নয়। চীনা বিপ্লবের ভুল পাঠ নিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি লুটপাটের মাধ্যমে সদস্যদের পকেটভর্তি এবং ব্ল্যাক মেইলের অভিযোগও ওঠে। এবং অন্য মাওবাদীরা তাকে সিআইএর এজেন্ট বলছেন এমন কথাও লেখা হয়। সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে গোটা সময়টায় সিরাজ শিকদারের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছেন শিল্পপতি জহুরুল ইসলাম। ফেরারী অবস্থায় তার নাভানা মটরসই ছিলো সিরাজ ও জাহানারার নিরাপদ আশ্রয়।

আগেই বলেছি সঙ্গীদের মধ্যে রুশ পন্থী কমিউনিস্টরা থাকলেও স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে মাওবাদীদের কোনো তফাত দেখতেন না মুজিব। ১৯৭১ সালের ১১ জানুয়ারি পটুয়াখালী সফরে এক বক্তৃতায় মাওবাদীদের হাতে পাবনার এক সাংসদ এবং খুলনার এক নেতার মৃত্যু প্রসঙ্গে বলেছিলেন : রাতের আধারে চোর-ডাকাতের মতো মানুষ হত্যা করে এরা যদি মনে করে জনগনের উপকার করছে, তাহলে ভুল ভাবছে। এসব বিপ্লবী আর চরমপন্থীদের আমার চেনা আছে। এরা মানুষের মতামতের যেমন মূল্য দেয় না তেমনি জনগনের উপর আস্থাও রাখে না। এর ফল তারা ঠিকই পাবে। (দ্য ডন, ১২ জানুয়ারি, ১৯৭১)

১৯৭৪ সালে ডিসেম্বরের ৩০ তারিখ গ্রেপ্তার হন সিরাজ শিকদার। এ বিষয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা আছে। বলা হয় তার ঘনিষ্ঠ কোনো কমরেডই বিশ্বাসঘাতকতা করে ধরিয়ে দিয়েছেন তাকে। পাশাপাশি এও বলা হয় যে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা সফলভাবেই সর্বহারা গ্রুপে ইনফিলট্রেট করে এবং তারই ধারাবাহিকতায় গ্রেপ্তার হন সিরাজ। এরপর তাকে ঢাকা নিয়ে আসা হয়। নাইম মোহাইমেন তার গেরিলাজ ইন দ্য মিস্ট নামে সিরাজকে নিয়ে লেখা আর্টিকেলে প্রাক্তন সর্বহারা সদস্যদের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন কেউ বলে তাকে প্রাইভেট বিমানে করে উড়িয়ে আনা হয়েছে, কেউ বলেছেন হেলিকপ্টারে। বিমানের গল্পে সিরাজের চোখ বাধা, এটা দেখে পাইলটদের বিমান চালাতে অস্বীকৃতির অধ্যায় আছে। এয়ারপোর্টে সিরাজের পানি খেতে চাওয়া এবং তাকে কষে লাথি মারার গল্প আছে। এবং সবচেয়ে নাটকীয়টি হচ্ছে মুজিবের মুখোমুখি রক্তাক্ত সিরাজের উক্তি : বি কেয়ারফুল মুজিব, ইউ আর টকিং টু সিরাজ শিকদার। এরপর মুজিবের তাকে লাথি মারা। কিন্তু কোনটারই সত্যিকার অর্থে প্রমাণ দিতে পারেননি কেউই।

তবে সবচেয়ে বিখ্যাত হয়ে আছে মুজিবের উক্তি : কোথায় আজ সিরাজ শিকদার? ২ জানুয়ারী সাভারে নিহত হন সিরাজ শিকদার। সরকারী ভাষ্য গাড়ি থেকে পালানোর সময় গুলিতে নিহত হন তিনি। বাংলাদেশে ক্রসফায়ারের (এটাও ভারত থেকে আমদানী যা নকশালদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে খ্যাতিমান হয়ে গিয়েছিলেন সাবইনন্সপেক্টর রুনুগুহ নিয়োগী) প্রথম উদাহরণ। তবে কমরেড রোকনের স্মৃতিকথায় একটি গুরুত্বপূর্ন ঘটনার উল্লেখ আছে। ১৯৭৩ সালে মাদারিপুরে একবার ধরা পড়েছিলেন সিরাজ শিকদার। কিন্তু দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তা মোহসিন তাকে পালানোর সুযোগ দেন। কারণ ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও ক্ষিপ্ত ছিলেন। ২ জানুয়ারি সাভারে সেই একই টোপ হয়তো তাকে দিয়েছিলেন এসপি মাহবুব (মুজিবনগর সরকারের গার্ড অব অনারের দায়িত্বে থাকা বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুন্সিগঞ্জের সাংসদ), কে বলতে পারে।

শেষ করবো মুজিবের বিখ্যাত উক্তিটির ঘটনাটি দিয়ে। প্রচলিত গল্প হচ্ছে সিরাজ শিকদার মারা যাওয়ার পরদিন সংসদে দাড়িয়ে মুজিব সদম্ভে ঘোষণাটা দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সে বছর সংসদ অধিবেশন বসে ২৫ জানুয়ারি। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস করানোর পর তার দ্বিতীয় বিপ্লবের (বাকশাল) বিশ্লেষণ করার এক পর্যায়ে (বক্তৃতার মাঝামাঝি) মুজিব বলেন : স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হওয়ার পর যারা এর বিরোধীতা করেছে, যারা শত্রুর দালালী করেছে, কোনো দেশেই তাদের ক্ষমা করা হয় নাই। কিন্তু আমরা করেছি। আমরা তাদের ক্ষমা করে দিয়ে বলেছি দেশকে ভালোবাসো। দেশের স্বাধীনতা মেনে নাও। দেশের কাজ করো। কিন্তু তারপরও এদের অনেকে শোধরায়নি। এরা এমনকি বাংলার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে বিদেশ থেকে টাকা নিচ্ছে। ওরা ভেবেছে আমি ওদের কথা জানি না! একজন রাতের আঁধারে মানুষ মেরে যাচ্ছে আর ভাবছে তাকে কেউ ধরতে পারবে না। কোথায় আজ সিরাজ শিকদার? তাকে যখন ধরা গেছে, তখন তার সহযোগীরাও ধরা পড়বে। আপনারা কি ভেবেছেন ঘুষখোর কর্মকর্তাদের আমরা ধরবো না? যারা বিদেশীদের থেকে টাকা নেয় তাদের আমরা ধরবো না? মজুতদার, কালোবাজারী আর চোরাকারবারীদের ধরবো না? অবশ্যই ধরবো। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার। তারা কিছুই হজম করতে পারবে না। ইনশাল্লাহ, পাপী একদিন ধরা পড়বেই…’

মোটামুটি এই হলো সিরাজ শিকদারের মিথ। এ ব্যাপারে যারা আরো বিস্তারিত জানতে চান, লিংকগুলোতে গুতোবেন। আরো জানতে পারবেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি সিরাজ শিকদার ভুল বিপ্লবের মোহে হেঁটেছেন। আর তার বাঁশীর সুরে মোহগ্রস্থ হয়ে আত্মাহুতি দিয়েছে প্রতিভাবান অনেক যুবক। সে সময় জনযুদ্ধের যে চীনা থিওরি প্রচলিত ছিলো তার লেখক লিন বিয়াও এবং মাওর মতবাদের প্রচারণায় থাকা চার কুচক্রী- দু পক্ষই চীনে প্রতিবিপ্লবী হিসেবে কলঙ্কিত হয়েছেন। তাহলে তাদের অনুকরণে কি বিপ্লব ঘটাতেন সিরাজ শিকদার! আরেকজন পলপট হতেন হয়তো। আর সর্বহারারা খেমারুজদের মতো শ্রেণীশত্রু খতমের নামে আরো ৩০ লাখ মানুষ মারতেন হয়তো। এসব ভূল স্বপ্নকেই হয়তো ইউটোপিয়া বলে, বিপ্লব না।


Courtesy (copy paste from):

http://www.amarblog.com/omipial/71459
http://www.amarblog.com/omipial/71515
http://www.amarblog.com/omipial/71683
http://www.amarblog.com/omipial/71728
http://www.amarblog.com/omipial/72022
http://www.amarblog.com/omipial/72459
http://www.amarblog.com/omipial/73771