বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০১৫

​ স্মৃতির সরণি বেয়ে মহাপ্রস্থানের পথে ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়


আমি লোকটা ঠিক প্রগতিশীল গোছের নই। বরং বেশ কিছুটা রক্ষনশীল আর গোঁড়া বলতে পারেন। পরিচিত জন জানেন, তাই আমি দু একখানা বামপন্থী বুকনি ছাড়লেই তাঁরা মুচকি হাসেন আমি বাঙালি-গুজরাতি তে তফাত মানি। চিনেদের দেখলে তাদের নাক আমার চেয়ে কতটা চ্যাপ্টা আর সাহারার দক্ষিনের আফ্রিকান দেখলে আমি তার চেয়ে কতটা ফর্সা, মনে মনে তার হিসেব কষি আমি তীর্থস্থানে যাই, দুর্গা পূজো , সরস্বতী পূজোয় অঞ্জলী দিই মাঝে মধ্যে। ভোগ খেতে তো কোন কালেই ছাড়িনা, যে কোনো দেবতার, তা সে যত দুর্ভোগই হোক।
তবে আমার গতি-প্রকৃতি, প্রকৃত অর্থে প্রগতি পরিপন্থি কিনা, সেটা ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারিনি এখনো যাকগে, সেসব নিয়ে আমার নিজেরই মাথাব্যাথা নেই যখন , তখন আর ফ্যানাচ্ছি না। শুধু এইটুকু বলি, যে প্রগতিশীল বলে পরিচিতি থাকলে আমাকে এই লেখা লেখবার আগে তিনবার ভাবতে হতো, আর শেষে হয়তো প্রগতিশীল তকমার জেল্লা বজায় রাখতে গিয়ে এ লেখা মোটেই লেখা হতো না এবারে আসল কথায় আসি। এ গল্পটা একটা রাস্তা নিয়ে। আমাদের এই বাংলাদেশের রাস্তা নয় (বাংলাদেশ মানে শুধুই পূর্ব বাংলা, এতটা প্রগতিশীল হতে পারিনি – "সে আমারই বাংলাদেশ, আমাদেরই বাংলা রে"শ্যামলিমার তফাত নেই যখন, তখন আর...) আমাদের এখানকার রাস্তাঘাট খুবই রোমাঞ্চকর। বিপদ কোথাও গর্ত হয়ে, কোথাও কোমর জলে, কোথাও ম্যানহোলে, কোথায় ইঁট বাঁধাইয়ের ব্যর্থ ইতিহাসে ওত পেতে আছে। কোথাও সে গাঁকগাঁকে বাসের রেশারেশিতে, অটোর অট্টরোলে, ট্যাক্সির চোখ রাঙানিতে তাকলামাকান বা গোবি মরুভুমী পার হবার মতো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে। তা নিয়ে দুদ্ধর্ষ রোমহর্ষক শিহরন জাগানো লেখা, আমার মত প্রাচীন পন্থী মানুষের আসে না। তাই বেছে নিয়েছি, অনেক শান্তশিষ্ট পায়ে হাঁটা একটা রাস্তা। যদিও সে রাস্তা আজ আর নেই। আবার কখনো তৈরি হবে, সে আশাও দেখছি না। খুলে কই।

২০১৩ সালের বর্ষাকাল শুরুর সময় একটা খবর প্রায় সমস্ত খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেলে দেড় দু সপ্তাহ ধরে মুখ্য হয়ে ওঠে। সেটা হলো কেদারনাথের ভয়াবহ বন্যা, ধ্বংস ও প্রানহানী। বিদেশী কিছু জ্ঞানগম্যি বাড়ানোর চ্যানেলে এখনো দেখি হপ্তায় একবার করে এক ঘন্টার তথ্যচিত্র দেখানো হয়, কিভাবে কেদারনাথে বিপর্য্যয় নেমে এসেছিলো। বিজ্ঞানী ও পরিবেশবীদরা বললেন – আগেই বলেছিলাম, পরিবেশের বুকে বসে এই ভাবে গাছ ওপড়ানো আর রাস্তাঘাট-বাড়িঘর তৈরি ভালো না। লোকসভায় তৎকালীন বিরোধীরা সরকার কে তুলোধোনা করলেন একজন মুখ্যমন্ত্রি তো হেলিকপ্টার নিয়ে উদ্ধার করতে চলে গেলেন নিজের রাজ্যের মানুষকে। ইশ্বরদত্ত ক্ষমতা নিশ্চিত, নাহলে ডুবন্ত মানুষের রাজ্যবিচার মোটেই সহজ কাজ না। এই অসাধ্য সাধন করেছিলেন বলেই বোধহয় সেই ভদ্রলোক আজকে ভারত শাসন করছেন। যাই হোক এই বিপর্যয়কে সনাতন ধর্মের মাথারা বললেন কর্মফল। পূবপাশের দেশের অনেক ওয়েবসাইটে দেখলাম এই ঘটনাকে, দুনিয়া থেকে কাফিরি ঘোচানোর ঐশ্বরিক প্রচেস্টা হিসেবে বর্ননা করা হয়েছেখুঁজে দেখতে পারেন, সেসব বাংলাতেই লেখা। বঙ্গীয় প্রগতিশীল মানুষজন কিছুদিন বাইরে রাজ্য সরকারের নিন্দে আর ভেতরে ধর্ম ও তার কুফল নিয়ে ব্যস্ত রইলেন, কিন্তু গাড়োয়ালের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া মানুষের জন্যে তাঁরা কিছু করেছেন বলে মনে পড়ছেনাআর পরিশেষে আমাদের রাজ্যসরকার কি করলেন তা নিয়ে নিরব রইলাম। আমার বয়স বাড়ছে। সব বিষয়ে কথা বলাটা বাচালতার লক্ষন।

টিভির পর্দায় এসব ছবি দেখতে দেখতে কত কথাই মনে পড়ছিলো। ওই রুদ্রপ্রয়াগ, গুপ্তকাশি, গৌরিকুন্ড। ভারতসেবাশ্রম সঙ্ঘ আর তার মহারাজরা। পুরোহিত গোবিন্দ শুক্লা ও তাঁর ছেলে গৌতম শুক্লা। কেদারনাথের এই সেবায়েত পরিবার পুরুষানুক্রমে আমাদের বংশের সঙ্গে যুক্ত। কে জানে কত শ বছর ধরে আমরা ওনাদের যজমান ! কেউ কেদারনাথে গেলে, আমাদের বাড়ি ও বংশের নামটুকু বললেই হলো, এক গাল অমায়িক হাসি, লম্বা সিড়িঙে চেহারা, কপালে সাদা চন্দনের তিলক, মাথায় উলের লম্বাটে টুপি, গায়ে আলোয়ান আর ইষৎ হলদেটে ধুতি নিয়ে হাজির হয়ে যান এই গৌতম শুক্লা। বয়স প্রায় আমারই মতো। হয়ত দু চার বছর এদিক ওদিক। ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা বলেন, কিন্তু তাতে আদর আপ্যায়নের ত্রুটি হয়না কোন। গোবিন্দ শুক্লা গত হয়েছেন। যতদিন তিনি ছিলেন, তিনিই আসতেন। শুধু কেদারনাথে গেলেই যে দেখা হয় তা নয়, প্রতি বছর শীতের সময় নিয়ম করে যজমান বাড়িতে আসেন। সঙ্গে আনেন কেদারনাথের ব্রহ্মকমল, প্রসাদ, চরনামৃত, আর হয়ত কখনো এক খানা বাঁধানো পট। এক কাপ চা খান। দুটো কথা হয়, কখনো কোনো পরিচিত জনের সম্পর্কে, কখনো আবার নেহাৎই ব্যবহারিক জীবনের কথা। এক খানা ধুতি , কেনাই থাকে, আর ১০০ টি টাকা। এটুকুই চাহিদা বড় সামান্যকে জানে কত বছর ধরে এই আসা যাওয়া চলছে। ভরা শীতে কেদারের পুজো কেদারনাথে হয় না। দীপাবলির পর কেদারের ছড়িদার, বা পুরোহিতরা কেদার বিগ্রহকে নামিয়ে আনেন উখিমঠে। কেদারনাথ তখন ঢেকে যায় বরফে। আবার পরের বছর গ্রীষ্মে কেদারনাথ মন্দিরে ফিরে যায় বিগ্রহ। অক্ষয় তৃতীয়ার দিন মন্দিরের দরজা আবার খোলা হয়।

কেদারনাথ আর পাঁচটা তীর্থের মতো না। একটু আলাদা। বাঙালীরা প্রচুর পরিমানে কেদার আসেন। কিন্তু শুধু মাত্র দেব দর্শনের অভিপ্সা নিয়ে আসেন কি? নাকি অন্য কিছুও আছে, যা শয়ে শয়ে বছর ধরে তীর্থযাত্রিদের টেনে নিয়ে চলেছে হিমালয়ের ওই তুষারাবৃত উচ্চতায়? হরিদ্বার থেকে বাস বা গাড়িতে চড়ে বসা। হৃষিকেশ, দেবপ্রয়াগ, রুদ্রপ্রয়াগ, গুপ্তকাশি পেরিয়ে গৌরিকুন্ড। রাস্তার দুরত্ব ২৩৫ কিলোমিটার। এখানে দেখবেন মন্দাকিনির জল সাদা ফেনা তুলে ঘোর গর্জন করতে করতে ভীম বেগে নিচের দিকে বয়ে চলেছে। সে জলের অন্ততঃ ৩০ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে পাশের লোকের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তারস্বরে চেল্লাতে হয়। জল স্বভাবতঃই সাম্যবাদী। মানুষকে ছেড়ে দিলে সে চাইবে ওপরে উঠতে, আর জল কেবল ফিকির খোঁজে কি ভাবে নিচের দিকে নামবে। একটু সুযোগ পেলেই সমতলের দিকে দৌড় মারে। জলে আঘাত করুন, সে আঘাত জলের লাগেনা। তার হারাবার কিছু নেই। আপনার হাতে কেবল জলের স্পর্শ লাগবে। আবার এই জলই ফুঁসে উঠলে সব কিছু ভেঙ্গে তছনচ করে দিতে পারে। সাম্যবাদী হতে গেলে বোধহয় এমনটাই হতে হয়। গৌরিকুন্ড পর্য্যন্তই ছিলো গাড়ি চলার রাস্তা। এর পর থেকে বাকি যা বলবো, তা আজকের দিনে আর দেখতে পাবেন না। প্রলয়ংকর বন্যায় সে সব ধ্বংস হয়ে গেছে। গৌরিকুন্ড আসলে মন্দাকিনির ধারে ছোট্ট একফালি জমি। কোথাও পঞ্চাশ ফুট, কোথাও একশ ফুট চওড়া। তা বাদে দু দিকে পাঁচিলের মত খাড়া পাহাড় উঠে গেছে। গৌরিকুন্ডে উষ্ণপ্রস্রবন আছে। মানে মাটি থেকে গরম জল বের হয়। সেই কুন্ডের চারপাশ পাথর দিয়ে বাঁধানো। আর ঐ ফালি জমিতে কিছু যেমন তেমন করে তৈরি ঘর বাড়ি। তার সিংহভাগই ধর্মশালা। খুব সরু একটা পাথর বাঁধানো রাস্তা, যার বেশিরভাগটাই ধাপ কাটা সিঁড়ি। রাস্তার দু দিকে খুপরি খুপরি দোকান। বেশিরভাগই পুরি-সবজি আর জিলিপি-তেলেভাজার। সামান্য কিছু মনিহারি জিনিষপত্রও রয়েছে। সবকিছুই তীর্থযাত্রিদের জন্যে।

সকাল বেলা হরিদ্বার ছেড়ে সন্ধ্যের কিছু আগে গৌরিকুন্ড পৌঁছে বিশ্রাম। এরকম একটা পরিকল্পনাই করেন সবাই। গৌরিকুন্ডে ওই কুন্ড ছাড়া দেখার কিছু নেই। কুন্ডের গরম জলে চানটা কিন্তু দারুন অভিজ্ঞতা। সারা দিনের যাত্রার ধকলে, আর ঠান্ডায় আড়ষ্ঠ হয়ে পড়া শরীর একেবারে তাজা – চাঙ্গা হয়ে যায়। তার পরে একটা দোকানে ঢুকে এক প্লেট পকোড়া আর মালাইদার চা নিয়ে বসুন। মন প্রানে উৎসাহের জোয়ার আসবে। সমতলের শহুরে মানুষ বিশেষতঃ ৭০% বাঙালি কে আজকাল বাইরে গিয়ে দেখি সন্ধ্যে বেলা মুরগি আর সুরার সন্ধান করছেন, আর রাত্রে বিরিয়ানি। সুধী পাঠক, এর একটাও গৌরিকুন্ডে পাবেন না। শহুরে ভারতবর্ষ, আধুনিক ভারতবর্ষ, নবাবি ভারতবর্ষ, সাহেবি ভারতবর্ষের দুরত্ব, গৌরিকুন্ড থেকে দিল্লির ভৌগলিক দুরত্বের চেয়েও অনেক বেশী। গৌরিকুন্ড এখনো যেন আটকে আছে সাবেকিয়ানায়। সাবেকিয়ানা কথাটা কি ঠিক বললাম? বোধহয় না। গৌরিকুন্ডের পরিবেশ মানে, পুরোনো যুগে আটকে থাকা ভারতবর্ষ নয়। শুধু, অন্যরকম। আমাদের চেনা পরিসরের বাইরে কিছু।
রাত থাকতে উঠে পড়ে তৈরি হয়ে নেওয়া। কারন ব্রাহ্মমুহুর্তে রওনা হতে হবে কেদারনাথের দিকে। গাড়ি চলার রাস্তা গৌরিকুন্ডেই শেষ। এর পরে আপনাকে পায়ে হাঁটতে হবে। তবে কিনা এই ভারতবর্ষে ধর্মকর্মের জন্যে "মূল্য ধরে দেওয়া" বলে একটা নিপাতনে সিদ্ধ বন্দোবস্ত আছে। কাজেই আপনার হয়ে অন্য কেউ পদচালনা করতেই পারেন কিছু মূল্যের বিনিময়েমানুষ ও মনুষ্যেতর স্বেচ্ছাসেবক সর্বদাই প্রস্তুত সে জন্যে। আপনি তাদের কাঁধে চড়েই পৌঁছে যাবেন গন্তব্যে। তবে ডুলির বাহক আর ঘোড়া (খচ্চর, মোটেই ঘোড়া নয়) ওয়ালাদের সঙ্গে মূল্যধরে দেওয়া নিয়ে কিঞ্চিত ধস্তাধস্তি এই যাত্রার একটা অছেদ্য অঙ্গ, এক যদি না আপনি পায়ে হেঁটে চলেনএই ব্রাহ্মমুহুর্তে আলো প্রায় ফোটেনি । অথচ রাস্তাঘাটের ঘুম ভেঙ্গে গেছে। এখানে থাকার জন্যে আছে ধর্মশালা, আর একটা কি দুটো একটু হোটেল গোছের বস্তু। তীর্থযাত্রিরা হাতে লাঠি আর সর্বাঙ্গ গরম জামায় ঢেকে বেরিয়ে আসছেন রাস্তায়। এই লাঠি গুলো এখানে ভাড়া পাওয়া যায়। লাঠির তলার দিকটা ধাতু দিয়ে বাঁধানো আর ছুঁচলো। এদিক ওদিক দোকানগুলোয় চায়ের জল ফুটছে। সর্বত্র একটা নীলচে ধোঁয়াটে ভাব। তার কিছুটা কুয়াশা, আর কিছুটা অসংখ্য চায়ের দোকানের উনুনের ধোঁয়া এই চায়ের সঙ্গে সমতলের চায়ের অমিলই বেশী। বাংলা চায়ের অমিল তো চোখে পড়ার মত দুধ বেশী, লিকার ঘন, আদা বা এলাচ থাকতে পারে চায়েকনকনে হাড়কাঁপানো ঠান্ডায়, এই চা, এক ভাঁড় খেলে, আর এক ভাঁড় খেতে ইচ্ছে করে। ভারতবর্ষের সমতলের গনগনে গরম এখানে অনুপস্থিত। গৌরিকুন্ড প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ফুট উঁচুতে। আর শুধু তাই নয়, এখান থেকে হাত বাড়ালেই হিমালয়ের মূল অংশ, মানে হিমাদ্রী। মন্দাকিনির গা থেকে খাড়া উঠে যাওয়া ঘন সবুজ রঙের পাহাড় গুলোর পেছনে দেখা যাচ্ছে দুধ সাদা শৃঙ্গমালা। হিমালয়ের এত ওপরে বাতাসে ধুলোবালি খুব কম। তাই স্পষ্ট দৃষ্টি চলে বহুদুর। মনে হয় হাতবাড়ালেই ছোঁয়া যাবে বরফ।

পাহাড়ি জায়গা এমনিতে একটু নোংরা হয়। ধোয়াধুয়ির জন্যে জলের বাজে খরচা অনেকেই করেনা। কিন্তু পাশে মন্দাকিনি থাকার জন্যেই বোধহয় গৌরিকুন্ড, অন্যান্য চটির তুলনায় কিছুটা পরিস্কার। তবে কিনা ভোরের আবছা আলোয়, রাস্তায় বেরিয়ে চায়ের গন্ধের সঙ্গে আরো কিছু গন্ধ আপনার নাকে আসবে। এই যেমন ধরুন রাস্তায় ঘোড়ার টাটকা ইয়ে, তখনো হালকা ধোঁয়ার মত বাস্প উঠছে, তার পরে ধরুন ঘোড়া ওয়ালা আর ডুলি বাহকদের অস্নাত দেহজ গন্ধ। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে পচা ফুল পাতা আর বাসি-পচা খাবারের গন্ধ। বাঙালি যাত্রির পেটে গাড়োয়ালি ভাজাভুজি ভালো সহ্য হয়না। অম্বলে ভোগা কিছু বাতকম্মও আশেপাশের বাতাস কে ভারি করেছে। তবে সবই খারাপ এমনটা নয়। ধুপ, টাটকা ফুল, ধুনো এসবের গন্ধও রয়েছে। সেই সঙ্গে টাটকা পুরি সবজি, জিলিপির গন্ধ। সব মিলিয়ে মিশিয়ে এমন একটা কিছু তৈরি হয়েছে, তার তুলনা টানার মত চট করে কিছু খুঁজে পাচ্ছি না।

রাস্তার ওপর গিজগিজ করছে লোক। ওই অত ভোরেও। চায়ের দোকানের সামনে সব চেয়ে বেশী ভিড়। এখানে যাত্রিদের একটা বড় অংশই বাঙালি। তেনাদের বাঁদুরে টুপি, হাল ফ্যাশনের জ্যাকেটের ওপর দিয়ে জড়ানো উলের মাফলার, আর অনভস্ত্য স্নিকার পায়ে আড়ষ্ট হাঁটা দেখে চেনা কঠিন না। এ ছাড়াও আছেন উত্তরাপথের হিন্দিভাষী তীরথ্‌ইয়াত্রি। কিঞ্চিত বয়স্ক একজন নেতা, তাঁর সঙ্গে দল চলেছে কেদারনাথ। নেতা উচ্চস্বরে দেহাতী হিন্দিতে তাড়া দিয়ে ডাকাডাকি-বকাবকি শুরু করেছেন। প্রথমে কয়েক মিনিট একপেশে বকাবকির পরে অপরদিকের আর্টিলারি জবাবি ফায়ার শুরু করে। ইনি গুলাবী ফুলওয়ালি শাড়ির অবগুন্ঠনের নিচে গায়ে জড়িয়েছেন আলোয়ান। নিচে বোধহয় বেগুনী সোয়েটার। কিন্তু বুড়ির জবাবি হামলার এতটাই জোর, দেখলাম দেহাতী বুড়ো, উলটো মুখে ঘুরে লাঠি হাতে কেদারের দিকে একাই হাঁটতে লেগেছে। ওদিকে দেখি চওড়া চৌকো গোঁফ, আর বড়বড় চকচকে চোখ নিয়ে একদল দক্ষিন-ভারতীয় যাত্রি ইতিউতি চাইছেন। তাঁদের পছন্দসই "কাপি" পাওয়া দুস্কর এখানে। সবই চায়ের দোকান। তার ওপরে ভাষার ব্যবধান, এখানে সব কিছুই তাঁদের কাছে অচেনা "নার্ত ঈয়েন্ডিয়ান"। হাফ প্যান্ট আর হুডি পরে কিছু সাদা চামড়ার ছেলে ছোকরাও আছে , দু এক জন কিঞ্চিত বয়স্ক বিদেশীও পাওয়া যাবে ভিড়ের মধ্যে। এনাদের যাত্রার কারন কি নিছক "Exotic India" খোঁজার চেষ্টা? সে তো গোটা দেশেই আছে। নাকি পাহাড়ি সৌন্দর্‍্য্য? সে ও গোটা হিমালয়েই ছড়ানো। হিন্দু তীর্থ দেখতে চাইলেও তিরুপতি আছে, বেনারস আছে, আরো কত কি আছেকি জানি? আমার মনে হয়েছে, এসব একটা কারনও ঠিক নয়। আমি আমি ঠিক যে কারনে কেদার চলেছি, এরাও সেই একই কারনে চলেছে কেদারে।

গৌরিকুন্ডে একটাই রাস্তা। সে রাস্তা উত্তর দিকে চলে গেছে কেদারের পথে। মহাভারতের পঞ্চপান্ডব এই রাস্তা ধরেই মহাপ্রস্থানে গিয়েছিলেন। কাজেই কেদার আবহমানকালের। কত দিন ধরে, কত যুগ ধরে মানুষ এখানে আসছে তীর্থ করতে বলা দুস্কর। মহাভারতে, পথের যা বর্ননা আছে, তার সঙ্গে এখনকার দৃশ্যপট প্রায় সবটাই মিলে যায়। কেবল মাঝে মধ্যে দু একটা বিদ্যুতের খুঁটি, লাক্স কোজির বিজ্ঞাপন আর ম্যাগি নুডলসের সহজলভ্যতা মহাভারতের ওপরে যোগ হয়েছে। আর হ্যাঁ, আমাদের চা খাওয়ার অভ্যেস তৈরি করেছে ব্রিটিশরা। মহাভারতের সময় চা খাবার চল ছিলো না। থাকলে হয়ত পাঞ্চালী – "আঁর পাঁরচিনা" বলে চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে পড়তেন, আর মধ্যম পান্ডব চা ও তার সঙ্গে কিঞ্চিত টা এর হুকুম দিতেন দোকানিকে। ভীমসেন খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা ভাল বোঝেন। গৌরিকুন্ডের বাড়ি ঘর ঠিক যেখানটায় শেষ হয়, সেখানে ডুলি ওয়ালাদের আড্ডা। ব্যাপারটা মোটেই জটিল না। একটা কাঠের বেঁটে চেয়ার। তার দুই হাতলের সঙ্গে লম্বা লম্বা দু খানা বাঁশ শক্ত করে বাঁধা। আপনি হেঁটে যেতে চাইছেন না কেদারে, এসে বসে পড়লেন ওই ডুলিতে। এবারে চারজন বাহক ওই দু খানা বাঁশ ধরে চেয়ারটা কাঁধের ওপর তুলবে। ডুলিকে অনেকে ডান্ডি ও বলেন। এই বাহকদের পা ফেলা, একটা দেখবার মত জিনিস। মোড় ঘোরার সময় এক দিকের বাহক কে ছোটো পা ফেলতে হবে, অন্য জনকে লম্বা। নিখুঁত হিসেবে এনারা সেটা করেন। আর আমাদের চেনা পাল্কির গানের হুহুম-নার মতো একটা অদ্ভুত সুর করে ছড়া কাটতে থাকেন। এ ছাড়াও আছে কান্ডি। যাঁদের রেস্ত কম, তাঁরা কান্ডিতে চড়েন। একটা ঝুড়িতে যাত্রিকে বসিয়ে, সেটাকেই বাঁশে ঝুলিয়ে বয়ে নিয়ে যান দু জন বাহক। খরচ ডান্ডির তুলনায় কম।

ডান্ডি বলুন বা কান্ডি, পাহাড়ের এই উচ্চতায় যেটা আপনার চোখে পড়বেই, তা হলো মানুষের পেশী শক্তির অপরিমিত ব্যবহার। এ অঞ্চলে চাষবাস খুব একটা হয়না, কারন পাহাড়ে চাষযোগ্য জমি খুব কম। ধাপ কেটে কেটে সরু ফালি জমি বার করে কিছুটা চাষের চেষ্টা করা হয় বটে, কিন্তু সে ব্যবস্থা নেহাৎই অপ্রতুল। আর চাষের পদ্ধতিও মান্ধাতা আমলের। সেচের তেমন সুবিধে নেই, শুধু মাঝে মধ্যে নদী বা সোতা ছাড়া। তাও সারা বছর সব কটায় জল থাকেনা। জীবন ও জীবকা নির্বাহ তাই খুব কঠিন এ সব অঞ্চলে। অনেক দূরে দূরে কিছু সম্পন্ন ছোটো শহর হয়ত আছে, যেমন রুদ্রপ্রয়াগ বা চামোলি কিন্তু সাধারন জনপদবাসি গাড়োয়ালিদের অর্থনৈতিক সঙ্গতি খুবই কম। এই বাজার অর্থনীতির দেশে যার হাতে পয়সা নেই, তার সামাজিক ক্ষমতাও নেই। ভারতবর্ষের আর পাঁচটা অঞ্চলের মত এখানেও সমাজে ধনি-গরিব দুই ই আছে। তবে তাদের অনুপাতটা বড্ড একপেশে। এখানে গরিবের সংখ্যা অনেক বেশী। এরকম ভয়াবহ দারিদ্র আমি খুব কম দেখেছি। কল্পনা করতে পারিনা, পেটে কতখানি খিদে থাকলে ছেঁড়া চট গায়ে, পায়ে রবারের টায়ারের টুকরো বেঁধে একটা মানুষ কনকনে ঠান্ডায় মাঝরাতে উঠে আর একটা মানুষকে কাঁধে তুলে ৬ হাজার ফুট উঠে আবার নেমে আসে। চোখের সামনে এদের দেখে মন কে বোঝাতে চেষ্টা করেছি, এরা পাহাড়ি, এদের অভ্যেস আছে। কিন্তু যতই বোঝাই, এঁদের মুখের ভাঁজে ভাঁজে যে যন্ত্রনা আর বঞ্চনা স্থায়ী ভাবে লেখা হয়ে গেছে, সেটা দেখার পরে ভুল বোঝা অসম্ভব। যতদিন দেবতা আছেন, দেবতায় বিশ্বাস আছে, ভরসা আছে, ততদিন এই গরিব মানুষ গুলো খিদে পেটে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন। কিন্তু যেদিন দেবতার আসন টলবে, সেদিন এই গরিব মানুষ গুলো কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাওয়া মেদবহুল শেঠ দের ছুঁড়ে ফেলে দেবে ওই মন্দাকিনিতে, সেই সঙ্গে হাজার হাজার বছরের গোলামিকেও বিসর্জন দেবে ওই জলে। এঁরা নিজেরাই নতুন তীর্থ তৈরি করবেন একদিন  

মানুষের কাঁধে চড়ে যেতে যাঁদের মন চায়না, আবার হেঁটে ৬ হাজার ফুট পাহাড়ে চড়তেও যাঁরা নারাজ, তাঁদের জন্যে ডুলির আড্ডার কিছুটা পরেই এক গাল্ হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঘোড়াওয়ালারা। মুখ দেখলেই বুঝবেন, ঘোড়াওয়ালাদের সবাই গাড়োয়ালি নয়। বরং বেশ কিছু মঙ্গোলিয় মুখ চোখে পড়বে। এরা খুব সম্ভবতঃ নেপাল থেকে যাত্রার মরশুমে এখানে আসে ঘোড়া নিয়ে। আর কিছু লোকজন কে দেখে মনে হয় আরো উত্তর পশ্চিমের। মুখের ভাঙ্গা হিন্দি শুনেও মনে হয়, কেমন যেন একটা অচেনা সুর। এরা কি কাশ্মিরি? কি জানি? জিজ্ঞেস করা হয়নি। দরদস্তুর করতে যে টুকু সময়, তার পরে ঘোড়ায় চড়া। আমি এক কথায় ঘোড়ায় চড়ার কথা বলে দিলাম বটে, কিন্তু আনাড়ির পক্ষে ব্যাপারটা এতটা সোজা নয় এখানে ঘোড়ায় সওয়ার হন প্রধানতঃ দু ধরনের লোকজন। একদল খাস উত্তরভারতের বাসিন্দা। ঘোড়ায় চড়তে দেখে বোঝা যায়, এনাদের কিছুটা অভ্যেস আছে। দ্বিতীয় দল, প্রধানতঃ বাঙালি, আর বেশীরভাগই মহিলা। ঘোড়ায় করে কেদারনাথ যাবার খরচ খুব কম নয়। কিছুটা খরচ বাঁচাবার জন্যে অনেকেই বাড়ির মহিলাদের ঘোড়ায় তুলে দেন, আর পুরুষরা হেঁটে যান। অ্যাকিলিসের গোড়ালির মত, বাঙালির হাঁটু খুব দুর্বল জায়গা। হাঁটু বাঁচাতে আনাড়ি মহিলাদের ঠেলে ঠুলে ঘোড়ার ওপর বসানো হলো। মহিলা আতংকে কাঠ হয়ে বসে আছেন ঘোড়ার ওপর। ঘোড়া একটু একটু নড়ছে। মহিলা শিউরে উঠছেন। "নামিয়ে দাও", "আমি এই ভাবে যেতে পারবোনা", "ওরে বাবা", "ঘোড়া বড্ড নড়্‌ রাহা হ্যায়" এই সব টুকরো টাকরা কথা কানে ভেসে আসবে। এই অবধি তবু ঠিক ছিলো। কিন্তু চার মহিলাকে ঘোড়ায় চড়িয়ে ঘোড়াওয়ালা, ঘোড়াগুলোর পাছায় একটা করে থাপ্পড় মেরে দিলো। আর ঘোড়াগুলো কেদারের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। কয়েক কদম চলবার পরে এলো আতংকের দ্বিতীয় লহর। প্রবল বিষ্ময়ে মহিলারা দেখলেন ঘোড়াওয়ালা পেছনে রয়ে গেছে। ঘোড়া গুলো নিজে নিজেই এগিয়ে চলেছে রাস্তায়। এবারে চেঁচামেচির পর শেষ ঘোড়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে একটা ছোট্ট পাহাড়ি ছেলে। কতই বা বয়স? ৯-১০ বছর। এই ক্ষুদেই নাকি ঘোড়া নিয়ে যাবে। তার বাবা আরো যাত্রিদের অন্য ঘোড়ার ব্যবস্থা করবেন গৌরিকুন্ডে। আর আসলে ঘোড়ারা নাকি নিজে নিজেই চলে যাবে, কাউকে নিয়ে যাবার দরকার হবে না। মহিলাদের শেষ ভরসাটুকুও চলে যায় যখন তাঁরা আতংকের তৃতীয় ধাক্কায় আবিস্কার করেন সোজা সামনে যাবার বদলে, ঘোড়াগুলো কেমন যেন কোনাকুনি হয়ে খাড়াই রাস্তায় ওপরে উঠছে। শুকিয়ে যাওয়া গলায় চিঁচিঁ করে অনুযোগ করেন "এই বাচ্ছা, তুমহারা ঘোড়া কোনাকুনি কিঁউ যাতা হ্যায়?। গম্ভির গলায় ক্ষুদে পাহাড়ি ওস্তাদ জবাব দেয় –"হিম্মত না হারে মা-জি"। ব্যাস, ওই টুকুই ভরসা। "মা" বলছে যখন, তখন নিশ্চই ফেলে দেবে না ঘোড়া থেকে। আর ভরসা বাবা কেদারনাথ।

"জয় বাবা কেদারনাথ" , "ব্যোম ব্যোম ভোলে" এই সব হাঁক ছেড়ে ভোরের নরম আলোয় তীর্থযাত্রির দল গৌরিকুন্ড পেরিয়ে পা রাখেন কেদারের রাস্তায়। পাথরে বাঁধানো রাস্তা। প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট চওড়া। আর খাদের দিকে রেলিং দেওয়া। কিন্তু সব জায়গায় নয়। খুব খাড়াই রাস্তা নয় প্রথম কয়েক কিলোমিটার। হাঁটা তেমন কঠিনও নয়। কিছুটা অন্তর জলের ব্যবস্থা রয়েছে। মাঝে মাঝে দু একটা বসার জায়গাও দেখা যাচ্ছে। দু পাশের দৃশ্য অতি মনোরম। ডান দিকে মন্দাকিনি বয়ে চলেছে অনেকটা নিচে দিয়ে। আর বাঁ দিকে খাড়া পাহাড়। পাহাড়ে গাছপালার ঘন জঙ্গল। আর সামনের পাহাড় গুলোর গায়ে দেখা যাচ্ছে একটা সরু সাদা ফিতে। ওটাই রাস্তা, চলে গেছে আরো উত্তরে, কেদারনাথের দিকে। গৌরিকুন্ড সমুদ্রতল থেকে প্রায় ৬ হাজার ফুট উঁচুতেআর কেদারনাথ ১২ হাজার ফুট। কাজেই আপনি ট্রেনে আর গাড়িতে চড়ে এ পর্যন্ত যতটা উচ্চতা উঠেছেন, ঠিক ততটা উচ্চতাই আপনাকে উঠতে হবে এবার পায়ে হেঁটে। তফাত আরো আছে। আমার মত হাওড়া স্টেশন থেকে যদি ধরেন, তাহলে প্রায় ২০০০ কিলোমিটারে আপনি একটু একটু করে ৬ হাজার ফুটে উঠেছেন। এবারে বাকি ৬ হাজার আপনাকে উঠতে হবে ১৪ কিলোমিটার দুরত্বের মধ্যে। মানে প্রতি কিলোমিটারে গড়ে প্রায় ৪২০ মিটার। আমাদের পরিচিত যুবভারতি ক্রিড়াঙ্গনের ছাত মোটামুটি মাটি থেকে ১০০ ফুট ওপরে। এবারে ভাবুন, আপনাকে ১ কিলোমিটারের মধ্যে কি পরিমান ওপরে উঠত হবে।

কাকভোরে যাত্রা আরম্ভের উত্তেজনায় শুরুতে অনেকে স্লোগান দেন, কথা বলেন, জোরে জোরে চলতে থাকেন। শুরুর দিকে চারিদিকে কথা অনেক বেশি। কিন্তু আধ ঘন্টার ভেতরেই শব্দ কমে আসে। তখন শুধু ঘোড়ার খুরের খটখট আর গলায় বাঁধা ঘন্টার ঠুংঠুং আওয়াজ, মানুষের জোরে জোরে শ্বাস নেওয়ার শব্দ, রাস্তার ধারের বনের ভেতর ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজমাঝে মধ্যে দু এক জন ফিরতি পথে নামতে থাকা মানুষের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে যাওয়া ছাড়া গোটা রাস্তায় আর কোনো ভাগাভাগি নেই। সমস্ত রাস্তা জুড়েই ওপরে উঠতে থাকা যাত্রিরা তবে কিনা পয়দল চলা হলেও, দু-পেয়ে আর চার-পেয়ে তে তফাত আছে। প্রায়শঃই ঘোড়াদের জায়গা ছেড়ে দিতে হয়। ব্যাটারা মাঝে মাঝে নাক দিয়ে সর্দি ঝাড়ার মত "ফর্‌র্‌র্‌ ফোঁৎ" করে বিকট এক রকম শব্দ করে। ওইটে আগুপিছু শুনলেই সাবধান হবেন। ব্যাটাচ্ছেলে পিঠে সওয়ার নিয়ে কোনাকুনি ধেয়ে আসছে। মানে মানে রাস্তা ছেড়ে দেওয়াই ভালো।

চলতে চলতে গলা শুকিয়ে যায়। এ রাস্তায় চলার সময় সঙ্গে মালপত্র যতটা সম্ভব হালকা রাখাই ভালো। এক লিটার জলের ওজন ১ কিলো, সেই কবে বইতে পড়েছি ইস্কুলে। এখানে এসে সত্যিটা উপলব্ধি হয় হাড়ে হাড়ে। তবে চিন্তার তেমন কিছু নেই। কিছুটা গেলেই একটা করে জলসত্র পাওয়া যায়। তীর্থযাত্রীদের তৃষ্ণার জল দেওয়া পূন্যের কাজ বলে অনেকের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসে ভর করে মাঝে মাঝেই দু এক জন বসে আছেন জলের জালা নিয়ে। বরফের মত ঠান্ডা কনকনে সে জল পান করলে শরীরে জান ফিরে আসে। আবার হাঁটা শুরু হয় লাঠিতে ভর করে। মাঝে মধ্যে এক একটা মোড় ঘুরলে পাহাড়ের নতুন একটা খাঁজ নজরে আসে। পেছনে তাকালে বোঝা যায়না, কোথা দিয়ে আর কত দূর এলাম। তবে হ্যাঁ, মাঝে মাঝেই এক একটা পাথরের ফলকে কিলোমিটারের হিসেব লেখা রয়েছে।

যাত্রার শুরুতে যে সব অত্যুৎসাহী জোর কদমে পাহাড়ে চড়ছিলেন, এখন ঘন্টা দুয়েক পর তাঁদের অনেকেই ধুঁকতে শুরু করেছেন। পাহাড়ে চড়ার ক্ষেত্রে আপ্তবাক্য হলো গুটিগুটি পায়ে আস্তে আস্তে চলা। বাহাদুরি দেখালেই দম শেষ। যখন মনে হবে আর পারা যাচ্ছেনা, হাঁটু কাঁপছে, কোমর পিঠ ব্যাথায় ভেঙ্গে পড়ছে, তখন একটু রাস্তার ধার করে কোথাও বসে পড়ুন। রাস্তার পাশে বসার জায়গা রয়েছে মাঝে মধ্যে বিশ্রাম নিন, কিন্তু সাবধানেখুব বেশিক্ষন বিশ্রাম নয়। তাহলে অবসাদ চেপে ধরবে। এখনো অনেক রাস্তা সামনে যাবার আছে। ঘড়ি ধরে ৫ মিনিট। তার পরেই উঠে পড়ুন। পরের ২ কিলোমিটারে আর বসা নয়। যদি দলে যান, তাহলে সব দলের মত আপনার দলেও দু একটি কিঞ্চিত কুঁড়ে গোছের লোক থাকবেনই। তাঁরা হয়ত আরো ক-মিনিট বসতে চাইবেন। কিন্তু আপনি যদি দলপতি হন, এসব ওজর আপত্তিতে কান না দেওয়াই ভালো। যত ওপরে উঠবেন, তত দৃশ্যপট বদলাবে। গাছের আকার ছোটো হতে থাকবে। ঝোপঝাড় মিলিয়ে যাবে। আকাশ আরো বেশী করে দেখা যাবে। প্রায় সাত কিলোমিটার পেরিয়ে এসে যখন আপনার মনে হচ্ছে আর এক পা ও এগোতে পারবেন না, গায়ের জামা ঘামে ভিজে চুপচুপে, গলা শুকিয়ে কাঠ, ক্লান্তিতে শরীর ভেঙ্গে পড়ছে, ঠিক তখনই একটা মোড় ঘুরে চোখে পড়বে কয়েকটা বাড়িঘর। আপনি কেদার যাত্রার ঠিক মাঝামাঝি, রামওয়াড়া চটিতে পৌছেছেন।

রামওয়াড়া চটিতে বেশিরভাগ বাড়িই অস্থায়ী কাঠামো। তাও আবার সংখ্যায় সব মিলিয়ে গোটা ১৫-২০ হবে। এখানে যাত্রিরা বিশ্রাম নেন। কিছু খাবার দাবারও পাওয়া যায়। খাবার বলতে পুরি-সবজি, ডাল-ভাত এই সব। তবে কালের নিয়ম মেনে এখানেও হলদে রঙের ম্যাগির প্যাকেট দেখতে পাবেন। আজকাল বেশিরভাগ লোকে সেটাই খায়। তৈরি সহজ, তাড়াতাড়ি হয়, আর টাটকা গরম ধোঁয়া ওঠা খাবার সামনে হাজির রামওয়াড়ায় আধ ঘন্টা জিরিয়ে, অল্প কিছু খেয়ে আবার রাস্তায় নামা। এর পরের চড়াই আরো বেশি। রামওয়াড়ার পরেই দৃশ্যপট বদলাতে থাকে। বড় বড় গাছের আলপাইন অরন্য, যা এতক্ষন সঙ্গে ছিলো, একেবারেই সংখ্যায় কমে আসে। এখন শুধু তৃনভূমি। রাস্তার ডান পাশে মন্দাকিনি এক ভাবে বয়ে চলেছে আমাদের সঙ্গে। দার্জিলিঙের রাস্তায় যেমন চুলের কাঁটার বাঁক বেয়ে গাড়ি কিম্বা ছোট্ট রেলগাড়ি খাড়া পাহাড়ে ওঠে, এবারে এখানের রাস্তায় সেই রকম বাঁক দেখা দিতে শুরু করেছে। বেশিরভাগ রাস্তাই এখন সিঁড়ির মত ধাপ কাটা। চারিদিকের মানুষজন কথা প্রায় বলছেন না। একমাত্র ঘোড়ায় চড়া যাত্রিরা আর ডুলিতে চড়া মানুষজন তাড়াতাড়ি চলেছেন। ডুলির বাহকরা কিভাবে এত তাড়াতাড়ি চলেন সেটা তাঁরাই বলতে পারবেন। মনে হয় বুকের ভেতর বাড়তি দু খানা অক্সিজেন সিলিন্ডার আছে এনাদের। ঘোড়ার ওপর সওয়ারদের দিকে দেখুন। তেনাদের অবস্থা সঙ্গিন। ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা সোজা নয়। দুলুনি, তার ওপরে কাঠ হয়ে বসে থাকেন অনভ্যস্ত লোকজন। আর এইখানেই করেন ভুল। শরীর যত আলগা করে বসবেন, তত গায়ে ব্যাথা কম হবে। না হলে ঘোড়ায় চড়ার পরের দিন গায়ে এমন ব্যাথা হয়, হাত পা নাড়ানোই দুস্কর হয়ে ওঠে। কেন জানি, ঘোড়সওয়ারদের দেখে, আপনার সোনার কেল্লার লালমোহনবাবুর কথা মনে পড়বে। সেই উটে চড়ার দৃশ্য।

রামওয়াড়া ছাড়ানোর পর কিছুটা পথ গেলেই, তুষার শোভিত হিমাদ্রীর শৃঙ্গ দেখা দিতে থাকে। ঘন নীল আকাশের বুকে চোখ ধাঁধানো সাদা তুষারে ঢাকা হিমালয় মাথা উঁচু করে রয়েছেমাথায় সাদা পেঁজা তুলোর মত মেঘ লেগে রয়েছেচারিদিক প্রায় শব্দহীন, কেবলমাত্র অনেক নিচে মন্দাকিনির জলের আওয়াজ। বেশিক্ষন তাকানো যায়না, চোখ ঝলসে যায়। কিন্তু এই দৃশ্য আপনাকে ভরসা দেয়। শুকনো মুখে, হাঁপধরা বুকে, ক্লান্ত পায়ে আর টাটানো পিঠ-কোমর নিয়ে আপনার মন আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে নেয়, আর ভাবে, অনেকটা পথ আপনি এগিয়ে এসেছেন। এখানে রাস্তার দুদিকে আর কোনো সবুজ দেখা যায়না। যে উচ্চতায় আপনি উঠে এসেছেন, এখানে উদ্ভিদ জন্মাতে পারেনা। আপনার হাঁফ ধরা শুধু ক্লান্তির জন্য নয়, এখানে সত্যিই বাতাস অনেক পাতলা হয়ে এসেছে। অক্সিজেন কম। খুব সাবধান হবেন। হাঁটার গতি আরো কমিয়ে দিন। অক্সিজেন কম থেকে অনেক রকম উপসর্গ হতে পারে। প্রধানত মাথা যন্ত্রনা আর বমি পাওয়া। ডায়ামক্স বলে একটা ওষুধ আছে, সকালে গৌরিকুন্ড থেকে সেটা একটা খেয়ে বেরোতে পারেন। তাতে এই উপসর্গগুলো এড়ানো যায়। আমি যখন গৌরিকুন্ড থেকে বেরিয়েছিলাম, তখন কেন এ কথাটা লিখিনি? আরে মশাই, এই এতটা হেঁটে এসে তবেই আমার ওষুধের কথাটা মনে পড়েছিলো। তাই আপনাকে আগে বলিনি। ডায়ামক্স খেলে একটা ব্যাপার একটু খেয়াল রাখবেন। বড্ড ঘন ঘন প্রকৃতির ডাক শুনতে পাওয়া যায়। তবে বড় নয়, ছোটো। সে ব্যবস্থা রাস্তার ধারে অনেক। বড়র ব্যবস্থাও আছে বটে, বাঁশের খুঁটিতে চট টাঙিয়ে অস্থায়ী ব্যবস্থা।

চারিদিকে কেবল কালচে পাথর, আর হলদেটে বালি। না আছে মাটি, না আছে সবুজ। কেবল অনেক নিচে মন্দাকিনির দু পাশে অল্প সবুজ ঘাস। কোনো বড় গাছ গাছালি নেই। সে সব অনেক নিচে ছেড়ে এসেছি আমরাসামনে এখন হিমালয়ের মূল শৃঙ্গরাজি স্পস্ট। কেদার শৃঙ্গ দেখা যাচ্ছে, যার মাথাটা ঠিক ছুঁচলো নয়, অনেকটা শিবলিঙ্গের মত গোল। একটা বাঁক ঘুরেই আপনার সামনের যাত্রিদের দলটা ভাঙ্গা গলায় বলে উঠলো "জয় বাবা কেদারনাথ"। সেই সকাল ৬টায় যাত্রা শুরুর সময় আপনি শুনেছিলেন এই হাঁক, এতক্ষন পরে আবার শোনা গেল। কিন্তু ব্যাপারখানা কি? এ জায়গাটা থেকে প্রথমবার কেদারনাথ মন্দির দেখা যায়, এর নাম দেও-দেখনি। আপনি দেখলেন বহু দূরে সত্যিই দেখা যাচ্ছে কেদারের জনপদ। বেশীক্ষন দাঁড়াবার উপায় নেই। ঘন্টা ৬-৭ চলে গেছে যাত্রা শুরুর পরে। বেলা বাড়লে এখানে পাহাড়ের মাথায় মেঘ জমতে থাকে, এবং প্রায় প্রতিদিনই দুপুরের দিকে ঝিপঝিপ করে বৃষ্টি নামে। অনেকেই সেই জন্যে গৌরিকুন্ড থেকে প্লাস্টিকের চাদর নিয়ে আসেন। সেগুলোও লাঠির মতই ভাড়া পাওয়া যায়।

রাস্তার চড়াই ক্রমশঃ বাড়ছে। একটা সময় মনে হয়, শুধুই ধাপ কাটা সিঁড়ি, সমান রাস্তা প্রায় নেই। চলতে চলতে হাঁফ ধরা বাড়তে থাকে, শরীরের ক্ষমতা কমতে থাকে আরো। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মনের জোর অনেকটা বেড়ে যায়। মনে হয়, ঠিক পারবো, এতটা এলাম, আর একটুখানি, নিশ্চই পারব। আস্তে আস্তে কেমন যেন একটা অবশ লাগার মত অনুভুতি চেপে ধরে শরীর-মনেনেশাগ্রস্থের মত হেঁটে চলাকেদার জনপদ আবার পাহাড়ের ফাঁকে কোথায় হারিয়ে গেছে। শরীরে কষ্ট কি একটু সহনশীল হতে থাকছে? না কি মন, শরীরের কষ্ট থেকে নিজেকে খুব সাবধানে সরিয়ে নিচ্ছে? একটা অপার্থীব জগৎ চারিদিকে। সে জগৎ সুন্দর না অসুন্দর, তার বোধটুকুও যেন লোপ পেয়েছে। সামনে কেবল খাড়াই রাস্তা, তাতে আরো তীর্থযাত্রির হাঁটা। কোথায় আমার বাড়ি? কর্মক্ষেত্র? আত্মিয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব? আমার শিক্ষাদিক্ষা, সংস্কৃতি, অভ্যেস সব কিছুই কেমন যেন অর্থহীন হয়ে যাচ্ছে প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গেআমি কি ফিরতে চাই বাড়ি? এখুনি ফিরে যেতে বললে ফিরে যাবো? বোধহয় না। আমার যাবতীয় পরিচয় ফিকে হতে শুরু করেছে। এমন কি খিদে তেষ্টার বোধও চলে গেছে অনেক আগেই। সামনে একমাত্র সত্য এই রাস্তা, চারিদিকের অচেনা মানুষগুলো, আর সামনে কোথাও থাকা ওই কেদারনাথ জনপদ। আমি কি ভগবানে বিশ্বাস করি? কখনোই নয়। ধর্মে আশা রাখি? নিশ্চিত ভাবেই না। কেন এলাম এখানে? কে বলেছিলো এই কষ্টের মধ্যে এসে পড়তে? কেউ না, কেউ না, কেউ না। শুধু মনে হয়েছিলো, কয়েক হাজার বছর ধরে, মানুষ কিসের টানে হিমালয়ের এই দুর্গম অঞ্চলে আসছে, সেইটা জানতে হবে। আর আজ, এইখানে , এই রাস্তায় চলতে চলতে, ১২ হাজার ফুটের ওপরে এসে, প্রথম বার মনে হলো সেই কারনটা জানতে পারলাম। বেনারসের গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে এরকম অনুভুতি হয়েছে আমার। মনে হয়েছে আমার পরে থাকা মুখোস গুলো এক টানে কেউ ছিঁড়ে ফেলে দিলো। মুখোসের আড়ালে, হারিয়ে যাওয়া মানুষটাকে টেনে বের করে আনছে হিমালয়। পিছুটান নেই, অতীত নেই, অন্য কোনো পরিচয় নেই আমার। এই রাস্তা আর এই ভাবে হেঁটেযাওয়া, আমার আবহমানকালের পরিচয়, আমি যাত্রি।

"আরো আগে, ইতিহাসেরও আগে, ওরা কারা?
ইন্দ্রপুরী-ইন্দ্রপ্রস্থ থেকেই বেরিয়ে যাচ্ছে
হিমালয়ের দিকে-
মহাভারতের মহাপ্রস্থানের পঞ্চনায়ক তাদের সঙ্গিনী
স্ব- স্বরূপ- অনুরূপা-
যুদ্ধ জয় 'রেও যারা সিংহাসনে গিয়ে বসল না
কর্ম উদযাপন 'রেও যারা লোলুপ হাতে
কর্মফল বন্টন করল না নিজেদের মধ্যে,
ফলত্যাগ করে কর্মের আদর্শকে রেখে গেল উঁচু 'রে,
দেখিয়ে গেল প্রথমেই পতন হল দ্রৌপদীর-
পক্ষপাতিতার
তারপর একে একে পড়ল আর সব অহঙ্কার
রূপের বিদ্যার বলের লোভের-আগ্রাসের"
অচিন্ত কুমার সেনগুপ্ত, কবিতা উদ্বাস্তু

বিশ্বাস করুন, স্পষ্ট অনুভব করবেন, একে একে আপনার সব কটা অহংবোধ খসে পড়ছে। এর সঙ্গে আস্তিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। অনুভুতির জগৎ অবহেলার নয়। অনুভুতি মানুষকে মানবিক করে।

সামনের রাস্তা কিছুটা সমতল। অনেকক্ষন পরে সিঁড়ি ছাড়া এমনি রাস্তা দেখলাম। ক্লান্ত পদক্ষেপে কয়েক কদম এগিয়ে সামনের মোড় ঘুরেই দেখি দৃশ্যপট বদলে গেছে। সামনে একটু নিচেই ছলছল করছে মন্দাকিনি। তার ধারে বেশ কিছু লোকজন রয়েছেন, আরো ৫০০ মিটার দূরে মন্দাকিনির ওপরে একটা সাঁকো, আর সেটা পেরোলেই ওপাশে কিছু ঘরবাড়ি। ঘরবাড়ি গুলোর মধ্যেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কেদারনাথের মন্দির। এবারে আর চড়াই ভাঙ্গা নেই। বরং সামান্য কয়েক পা উৎরাই। কেদারনাথের মন্দির আর তার চারপাশ একদম অন্য  গল্প। সে নিয়ে লিখতে বসিনি। কেদারনাথ মন্দির রয়েছে বহাল তবিয়তে। তবে হ্যাঁ, কেদার জনপদের বিস্তর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আর গৌরিকুন্ড থেকে এই রাস্তা আর নেই। এখন উখিমঠ থেকে মন্দাকিনির অন্য পার দিয়ে তীর্থযাত্রিরা কেদারনাথ পৌঁছন। সে রাস্তা কেমন আমি জানিনা। এখনো যাওয়া হয়ে ওঠেনি। তবে যাবার ইচ্ছে রাখি।


গত দু বছর শীতের সপ্তাহান্তে হাসি মুখ নিয়ে গৌতম শুক্লা আসেননি। যে কথাটা চিন্তা করতে চাইনা, এড়িয়ে যেতে চাই, সেটা এখানে লিখবোনা ভেবেছিলাম। বিপর্যয়ের পরে অনেক দিন পর্যন্ত যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়েছি। কিন্তু খোঁজ পাইনি এই সদাহাস্যমুখ গরিব মানুষটার। জানিনা গৌতম শুক্লা এখন কোথায়, আদৌ আছেন কিনা। তাঁর খোঁজেই নতুন পথ ধরে আর একবার কেদারনাথ যাবো।