মঙ্গলবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

নাটক : কল্লোল : (পঞ্চাশ বছর পেরোচ্ছে)

শার্দুল সিং বলে কেউ ছিল না! খাইবার বলে কোনো জাহাজ ছিল না! উৎপল দত্ত ইতিহাস জানেন না। কংগ্রেস কখনো নৌ বিদ্রোহকে স্যাবোতাজ করেনি।* *এই নাটকটা যে চলছে এটা বাংলার পক্ষে লজ্জার। বন্ধ করে দেওয়া হোক। এই সব ছিল নাট্যসমালোচনা, তথাকথিত বড় পত্র-পত্রিকায়।* *শেষে যখন এতেও কাজ হল না,তখন একে একে স্টেট্‌সম্যান ছাড়া সব পত্রিকা বলল বিজ্ঞাপন নেব না নাটকের।

একদম হিংস্র হয়ে এক পত্রিকা বলল, সব পত্রিকা সব নাটকের বিজ্ঞাপন নেয় না।পাল্টা এল তাপস সেন-এর মাথায়।এল টি জি জানাল, সব নাটক সব পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয় না। আর তাপস সেন রাতারাতি পোস্টারের বয়ান বানালেন, 'কল্লোল চলছে, চলবে।' ট্রেড ইউনিয়নের কর্মী, ছাত্র-যুব, অন্যান্য নাট্য সংগঠনের জোটের কর্মীদের হাতে হাতে, তারপর দর্শকের হাতে হাতে গোটা পশ্চিমবঙ্গের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে গেল সেই পোস্টার।

এর আগে 'অঙ্গার' আক্রান্ত হয়েছিল মিনার্ভায়। কংগ্রেসী গুন্ডা নেপাল রায়ের নেতৃত্বে কাঁচ ভেঙে 'দেশদ্রোহী' (মানে কং সরকার বিরোধী/ বুর্জোয়া খনি মালিক বিরোধী বলে) নাটককে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল। তারপর থেকে মিনার্ভার পাহারায় থাকত ছাত্র-যুব-শ্রমিকের দল। 'কল্লোল'-এ তাই সুবিধে হল না ও ভাবে গুন্ডামির। ফোন করে ভয় দেখিয়ে, রাস্তায় হেনস্থা করে, জোছন দস্তিদারকে সমর্থনের জন্য মেরে, উৎপল দত্তকে একটি প্রবন্ধের জন্য দেশরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করে 'কল্লোল'-র শিরদাঁড়া ভেঙে দেওয়ার অবিরাম চেষ্টা চলল। শার্দুল সিং চরিত্রাভিনেতা শেখর চট্টোপাধ্যায়কে বারেবারে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়ে দল ভাঙার চেষ্টাও ছিল।

বলরাজ সাহানির মত প্রবীণ আই পি টি এ কর্মী (একদার) অন্য কিছু না পেয়ে নাটকের সঙ্গীতে কেন রাশ্যান, জার্মান নৌ বিদ্রোহের সুর ও গান ব্যবহার হয়েছে তাই নিয়ে হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে ঠুকলেন। তাঁর সাম্প্রতিক জাতীয়তাবাদ উথলে উঠে বলছিল দেশীয় নাটকে দেশীয় সুরই থাকতে হবে। হেমাঙ্গ বিশ্বাস ইন্টারন্যাশনালের জন্ম মনে করিয়ে দিতেই চাপ হয়ে গেল। কম্যুনিস্ট পার্টি ভাঙনের আভ্যন্তরীণ বিতর্কের অংশ এ সব।

সত্যজিৎ-মৃণাল থেকে অজিতেশরা সকলে পথে নামলেন উৎপল দত্ত-র মুক্তির দাবীতে। সারা ভারত থেকে প্রতিবাদ এল। এল বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে। অনেকেই 'কল্লোল'-এর রাজনীতির সঙ্গে সহমত না। কিন্তু শিল্প ও শিল্পীর স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন।* *কলকাতারই আরেক প্রবাদপ্রতিম নাট্যব্যক্তিত্ব একবারের জন্যও ভাঙলেন না তাঁর হিরণ্ময় নীরবতা। প্রতিবাদ করলেন না।

তবু সেদিনকার কং সরকার গণ আন্দোলনের চাপে মুক্তি দিতে বাধ্য হলেন একসময় উৎপল দত্ত সহ অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দীদের। উৎপল দত্ত যখন জেলে তখনও 'কল্লোল' চলেছে। অভিনেতারা যাবতীয় ভয় তুচ্ছ করে কাজ করেছেন। এবং তাঁদের পাহারা দিয়েছে শ্রমিক-ছাত্র-জনতা ঐক্য।

ঠিক এইখানে জনতার শিল্প এবং কম্যুনিস্ট পার্টির সম্পর্ক যেমন করে ফুটে উঠেছিল তা আর কখনো ফুটে ওঠেনি। 'কল্লোল'-এর প্রযোজনা নিয়ে আজ আর লেখার ইচ্ছে নেই। শুধু বলার কথা যে এমন এক ঐতিহাসিক প্রযোজনার পঞ্চাশ বছর কেমন নিঃশব্দেই প্রায় চলে যাচ্ছে। স্বপ্নগুলো সব বদলে গেছে বলে? 'কল্লোল'-এর শেষ দৃশ্যে নাবিকেরা, স্বাধীনতার সশস্ত্র যোদ্ধা পরাজিত নাবিকেরা ক্ষত বিক্ষত দেহ-মন নিয়েও বলতে বলতে যেতেন 'নো সারেন্ডার নো সারেন্ডার'। বাতাসের কানে কি আজ কেউ সেই কথা বলে আর?