শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

হাম্বা ~ সুশোভন পাত্র

হিন্দুকুশের চড়াই পেরিয়ে, ৩২৭ খৃষ্ট-পূর্বাব্দে ম্যাসিডনের দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজা আলেকজান্ডার এসে পৌঁছলেন উত্তর-পশ্চিম ভারতে। ক্লান্ত, অবসন্ন, ক্ষুধার্ত বিশাল সৈন্য বাহিনী বিস্তীর্ণ অরণ্য চষে আবিষ্কার করল এক অর্ধচন্দ্রাকার ফল, কলা ¹।  কাঁচা অবস্থায় ভেতরে প্রয়োজনীয় স্টার্চ সরবরাহের তাগিদে ক্লোরোফিল সমৃদ্ধ যে কলার খোসা সবুজ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রঙ বদলে সেটা হয়ে যায় হলুদ। বদলের হিড়িকটা ঠিক আমাদের আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নোট বাতিলের ঘোষণার মত। পাঁজি দেখে আট তারিখ, আট ঘটিকায় সেই যে পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে বললেন -"মিঁত্রো, কষ্ট কেবল দু-দিনের।" জাপান ফেরত সেই দু-দিন বেড়ে হল একমাসের। একমাস এখন একধাক্কায় দিন পঞ্চাশের। আর শাস্ত্রমতে অর্থমন্ত্রীর ভবিষ্যৎ বাণী, কষ্ট নাকি টেনেটুনে ঐ ছ'মাসের ² । সাইজে ছিল তিল, বদলে হয়ে গেলো তাল।
ডিমান্ড-সাপ্লাই'র অর্থনীতির দুর্বোধ্যতায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ হৃদয়ঙ্গম করতে গুজরাটের শাহানশাহর একটু ভুলচুক তো হতেই পারে। প্রজা সকলের দুর্দশার আয়ুষ্কালও অনায়াসে তাই দু-দিন থেকে ছ'মাসে উত্তীর্ণ হতেই পারে। সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী যখন বলছেন দেশজুড়ে 'কালচারাল রিভোলিউশন' চলছে তখন ব্যাঙ্ক-এটিমের লাইনে শ-খানেক কো-ল্যাটারেল ড্যামেজ ঘটতেই পারে ³ ।  কিছু শ্রমিক ছাঁটাই, কিছু আধপেটা কৃষকের আত্মহত্যা, কিছু কন্যাদায়গ্রস্ত বাপেদের হার্টফেলের খবরও কানাঘুষো আসতেই পারে। এমনকি আড়ালে আবডালে ডিমনিটাইজেশনের উদ্দেশ্য-বিধেয়টাই সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। আফটার অল, দার্শনিক হেরাক্লিটাস তো কবেই বলে গেছেন 'বদলই জগতের একমাত্র সত্য' ⁴ । 
প্রধানমন্ত্রীর একমাস আগের ২৫ মিনিটের বক্তব্যে, ডিমনিটাইজেশনের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল 'কালো টাকা উদ্ধার' এবং 'জাল নোটের কারবার বন্ধ।' সেদিন প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যে ১৮ বার 'কালো টাকা' এবং ৫ বার 'জাল নোট' শব্দ-বন্ধ ব্যবহার হলেও, 'ডিজিটাল/ক্যাশলেস ইকোনমির' শব্দ-বন্ধ অনুল্লেখিতই ছিল। শতাংশে শব্দ-বন্ধের গুলোর ব্যবহার ছিল যথাক্রমে, ৭৮.৩%, ২১.৭% এবং ০%। আর গত ২৭শে নভেম্বরের 'মান কি বাত' অনুষ্ঠানে ডিমনিটাইজেশনের ঘোষিত উদ্দেশ্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে, 'ডিজিটাল/ক্যাশলেস ইকোনমির' শব্দ-বন্ধের আমদানি হয়েছে ৭২.৭% হারে, 'কালো টাকা' শব্দ-বন্ধ ব্যবহার কমে হয়েছে ২৭.৩%, আর বেমালুম গায়েব 'জাল নোটের' প্রসঙ্গ ⁵।  আপনি যে এদ্দিন জানতেন দেশে কালো টাকা উদ্ধারের বলশেভিক বিপ্লব হচ্ছে, জাল নোটের বিরুদ্ধে অগ্নিযুদ্ধ চলছে, আদপে তা না, ডিমনিটাইজেশনে নাকি দেশের ইকোনোমি এখন 'ক্যাশলেস' হচ্ছে। ছিল রুমাল, একমাসে হয়ে গেলো আস্ত একটা বেড়াল!
আসলে খোদ আয়কর দপ্তরের তথ্যানুসারে 'লিকুইড ক্যাশে' কালো টাকার পরিমাণ যখন মাত্র ৬%, তখন 'কালো টাকা উদ্ধারের' অজুহাতে ৮৬% ক্যাশের লিগ্যাল টেন্ডার বাতিল; 'ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়ে'র জোগাড় ⁶। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্টে সার্কুলেটেড নোটে জাল নোটের পরিমাণ যখন .০০০৭%, তখন 'জাল নোটের কারবার বন্ধ'র অছিলায় দেশসুদ্ধু  মানুষের ভোগান্তি; 'মশা মারতে কামান দাগা'র ফলাফল ⁷। আর এখন যখন, সমস্ত কালো টাকা'ই বজ্র আঁটুনির ফোস্কা গেরোয় সিস্টেমে ফিরে এসে সাদা হয়ে যাবার সম্ভাবনা ক্রমশ প্রবল হচ্ছে, ⁸ ⁹ এখন যখন মোহালি থেকে কর্ণাটক, উড়িষ্যা থেকে মুম্বাইয়েও নতুন নোট আকছার জাল হচ্ছে,¹⁰ ঘোষণার তিন সপ্তাহ পরেও যখন বাতিল টাকার অঙ্কের মাত্র ১০% পূরণ করা হয়েছে বলে খবর বেরোচ্ছে,¹¹ তখন সাপের ছুঁচো গিলে, প্রধানমন্ত্রীর 'ক্যাশলেস ইকোনমির' অলীক স্বপ্ন দেখানোর চেষ্টা আসলে 'ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া'র উপক্রম।
কাদের ক্যাশলেস ইকোনমির স্বপ্ন দেখাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী? যে দেশের ৯১.২ কোটি মানুষ এখনও ইন্টারনেট পরিষেবাই বাইরে, তাঁদের? যে দেশের মাত্র ১৩ কোটি মানুষ ডেবিট কার্ডে লেনদেন করেন, তাঁদের? না, যে দেশের মাত্র ২.১১% মানুষ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন, তাঁদের? প্রধানমন্ত্রীও কি এই গ্রহেরই, সেই অভাগা ভারতবর্ষের বাসিন্দা, যে দেশে 'ইন্টারনেট পেনিট্রেশন রেট' ২৭%; বাস্তবে কিনা কেনিয়া, নাইজেরিয়া'র থেকেও কম? যে দেশের 'অ্যাভারেজ পেজ লোড টাইম' ৫.৫ সেকেন্ড; আসলে কিনা বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কার থেকেও খারাপ? কিম্বা যে দেশে গড়ে প্রতি ১১৭৬ জনের জন্য রয়েছে  মাত্র একটা কার্ড সোয়াইপ মেশিন ¹² ¹³ ? জনাব, আপনার প্যায়ারের শ্যাম আঙ্কলের দেশেও যখন বেচাকেনার ৪৬ শতাংশই হয় ঐ ক্যাশেই, তখন এদেশে 'ক্যাশলেস ইকোনমির' আষাঢ়ে গল্প ফেঁদে, গাছে তুলে, মইটা না কেড়ে নিলেই কি চলছিল না ¹¹ ?
নিউমেরোগ্রাফিক সংস্থার এন্ট্রেপ্রেনিউর কুলপ্রীত কর, হায়দ্রাবাদের জনৈক ভিক্ষুক কে প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি ভিডিও বানান। ১ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডের ভিডিও তে বিলাসবহুল গাড়ির ভেতরে বসে থাকা ভদ্রমহিলা খুচরোর অভাবে, ভিক্ষুকের কার্ড সোয়াইপ মেশিন ব্যবহার করে ভিক্ষা দেন। প্রধানমন্ত্রী মোরাদাবাদের জনসভায়, তিন বছর আগের সেই ভিডিও হোয়াটস অ্যাপে দেখে, ডিজিটাল ভিক্ষুকের দক্ষতায় আহ্লাদিত হয়ে 'ক্যাশলেস ইকোনমির' তাঁবেদারি করলেন। গরু খোঁজা খুঁজলেও আর একটা রাষ্ট্রনেতাও আপনি পাবেন যিনি, দেশের তাবড় অর্থনীতিবিদ'দের প্রশ্নের উত্তর দেননা, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর'দের উদ্বেগ কে তোয়াক্কা করেন না, সাংসদ কক্ষে উপস্থিত থাকেন না, বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন না; অথচ হোয়াটস অ্যাপে বস্তাপচা স্ক্রিপ্টেড ভিডিও দেখে নিজের ঢাক নিজেই পেটাতে কসুরও করেন না ¹⁴ ।
আর যেমন অন্ধ কানাই, তেমন জুটেছে পাগলা জগাই। প্রধানমন্ত্রী যদি বলেন, 'মিঁত্রো, সব কালো টাকা আছে সুইস ব্যাঙ্কে', বশংবদ পাগলা জগাইরা সমস্বরে ডেকে ওঠেন, 'হাম্বা।' যদি বলেন, 'মিঁত্রো, ক্ষমতায় এলেই প্রত্যেকের একাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা জমা পড়বে', তাঁরা  ডেকে ওঠেন, 'হাম্বা'। প্রধানমন্ত্রী যদি বলেন, 'মিঁত্রো, ডিমনিটাইজেশনে কালো টাকা উদ্ধার হবে', জাল নোট বন্ধ হবে', তাতেও তাঁরা ডেকে ওঠেন, 'হাম্বা'। আর এখন যখন প্রধানমন্ত্রী বলছেন, 'মিঁত্রো, ডিমনিটাইজেশনে দেশের ইকনোমি ক্যাশলেস হবে', এখনও তাঁরা ডেকে উঠেছেন, 'হাম্বা।' বাজি ধরুন, যেদিন রাত্রি ৮ টায়, প্রধানমন্ত্রী টিভির পর্দায়, পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে, জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে বলবেন "মিঁত্রো, কুছ ভি বোলো, টাট্টি তো হামে বাথরুম মে হি করনা চাহিয়ে", সেদিনও এই স্তাবক পাগলা জগাইরা, সমস্বরেই, সপ্তমে সুরে, প্রাণ ভরিয়ে এবং তৃষা হরিয়ে গেয়ে উঠবেন, 'হাম্বা... হাম্বা...হাম্বা'।