রবিবার, ১৯ মার্চ, ২০১৭

নির্বাচন'ই শেষ কথা নয় ~ সুশোভন পাত্র

১ কোটি ৮০ লক্ষ প্রাথমিক সদস্য। ৮৯,১০৪ জন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক। ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৪০১টি বুথ কমিটি। ছটি মান্ডলিক কমিটির মাধ্যমে সৰ্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয়। ৪০৩টি বিধানসভা কেন্দ্রে ৮,১৩৮ কিলোমিটার 'পরিবর্তন যাত্রা'। ৭৭টি মহিলা সম্মেলন। ৮৮টি যুব সম্মেলন। ১৪টি প্রাদেশিক বণিক সম্মেলন। ২০০টি অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায় ও দলিত সম্মেলন। ৭৫টি জেলাতে ৩,৫৬৪ কৃষক সভা। শেষ ৬ মাসে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ৩৪টি 'কমল মেলা।' ১,৬৪৯টি মোটর সাইকেল মিছিল। ২,৮০,২৬৭টি গ্রামসভা। ৮,৫৭৪টি পথ নাটিকা। অ্যাড এজেন্সির পরামর্শে রাজ্যের প্রথম সারির সমস্ত প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন। ভিডিও ভ্যানে সব বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ৫৮ হাজার শো। ৭৫টি ভার্চুয়াল 'ভিডিও রথে'র মাধ্যমে শহরে শহরে 'মন কি বাত'। ৫,০৩১ জনের সোশ্যাল মিডিয়া টিম। চারটি ফেসবুক এবং একটি টুইটার হ্যান্ডল। ১০,৩৪৪ হোয়াটস অ্যাপ গ্ৰুপ। ক্যাবিনেট সহ প্রধানমন্ত্রীর হাই প্রোফাইল উপস্থিতি। ব্যক্তিগত অনুদান হিসেবে ১৬,৯১,৭২,৩১৫ টাকা অর্থ সংগ্রহ। 
এই সবটা মিলিয়ে একটা 'ইলেকশন ক্যাম্পেন'। বি.জে.পি'র 'ইলেকশন ক্যাম্পেন'। এই সবটা মিলিয়ে একটা নির্বাচনী রণনীতি। উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনী রণনীতি।    
রাজপুত অধ্যুষিত হিরণওয়াড়া গ্রামে এস.পি'র প্রাপ্ত ভোট ৭, বি.এস.পি'র ১৪, আর বি.জে.পি'র ৭৯০। ব্রাহ্মণ ভূস্বামী সংখ্যাগুরু এবং গুরুত্বপূর্ণ দলিত উপস্থিতির ভাণ্ডডা গ্রামে এস.পি'র প্রাপ্ত ভোট ৯, বি.এস.পি'র ১৫৬, আর বি.জে.পি'র ৫৭০। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জালালাবাদ বি.জে.পি'র প্রাপ্ত ভোট ২৩, এস.পি'র ২৩১, বি.এস.পি'র ৪৫৩। ৩৫% যাদব জনসংখ্যার মেনপুরী বিধানসভায় আবার বিপুল ভোটে বিজিত এস.পি। গ্রামের পর গ্রাম, বিধানসভা পর বিধানসভা এই  একই বাঁধা ধরা 'প্যাটার্নের' প্রতিলিপি। সাধারণ মানুষের নির্বাচনী কড়চা'তে উঠে আসেনি ইশতেহারের অনুচ্ছেদ, পাত্তা পায়নি অর্থনীতির যুক্তি-তক্ক, ব্যালট বক্সে জমা পড়েনি ইস্যু ভিত্তিক মেরুকরণ। বরং ই.ভি.এমে কোথাও যুদ্ধ হয়েছে হিন্দু-মুসলিম'দের। কোথাও ব্রাহ্মণ-দলিত'দের। কোথাও আবার জাঠ-যাদব'দের ¹ ² । 
এই সবটা মিলিয়ে একটা ব্লু-প্রিন্ট। বি.জে.পি'র ব্লু-প্রিন্ট। এই সবটা মিলিয়ে একটা 'প্রোপাগান্ডা'। বি.জে.পি'র 'প্রোপাগান্ডা'। যার ক্যাসকেডিং এফেক্ট একটা নির্বাচনী জয়। বি.জে.পি'র উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী জয়।  
ইরম শর্মিলা'র রাজনৈতিক দল 'প্রজা'র আহ্বায়ক এবং নির্বাচনী পদপ্রার্থী এরেন্দ্র লেইচম্ম। হাভার্ডের অর্থনীতির স্নাতকোত্তর ডিগ্রি আর ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের বিলাসী চাকরি; দুটোই ছেড়ে মাটির টানে ফিরেছিলেন মনিপুরের নির্বাচনী রাজনীতিতে। প্রচারের সময় ঘুরে বেড়িয়েছেন, সবার কথা শুনেছেন, নিজের কথা বলেছেন। সবশেষে  ১১ তারিখ প্রণামী বাক্সে দক্ষিণা জুটেছে ৫৭৩টি। প্রজা'র অন্য মহিলা পদপ্রার্থী মাইতেই মুসলিম নাজিমা বিবি। নিছকই প্রাণোচ্ছল সামাজিক কর্মী। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এক হাজার পারিবারিক নির্যাতনের শিকার মহিলার মামলা লড়ছেন, মনিপুরের দুঃস্থ নারী'দের জন্য গড়ে তুলছেন আস্ত একটা 'হোম'। অনলস নির্বাচনী প্রচারও করেছিলেন এই নাজিমা বিবি। সর্বসাকুল্যে ভোট জুটেছে ৩৩টি    ³ । 
২রা নভেম্বর, ২০০০ ম্যালম, মনিপুর। ভারতীয় সেনা নির্বিচার গুলি চালিয়ে হত্যা করল ১০ জন যুবক কে। পরের দিনই  প্রতিবাদী অনশন শুরু করেছিলেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তরুণী -ইরম শর্মিলা। আত্মত্যাগ আর দৃঢ়তার প্রতীক সেদিনের ইরম শর্মিলা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন আফস্পা'র বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মুখ। মনিপুরের মানুষের চোখের মনি। বিশ্বের 'লৌহ মানবী' ⁴ । টানা ১৬ বছর পর অনশন ভেঙ্গে যেদিন ইরম শর্মিলা বলেছিলেন "আমিও বেঁচে থাকতে চাই। বিয়ে করতে চাই। ভালবাসতে চাই। কিন্তু সবার আগে নির্বাচনী রাজনীতি'তে এসে আফস্পা'র মত কালা আইনের নিরসন করতে চাই" -সেদিনই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল মনিপুর। নাগা, কুকিস, পাইতে, দেস উপজাতি অধ্যুষিত প্রবল চড়াইয়ের পার্বত্য এলাকা হোক বা মাইতেই হিন্দু সংখ্যাগুরু আপাত সমতল -গেঁয়ো যোগীকে ভিখ দেয়নি প্রবল পুরুষতান্ত্রিক মনিপুর ⁵। বি.জে.পি-কংগ্রেসের শক্তিশালী 'মেথডিক্যাল প্রোপাগান্ডার' কাছে ইরম শর্মিলা এবং তাঁর নির্বাচনী রাজনীতির আকাঙ্ক্ষা কে বাণের জলে ভাসিয়ে দিয়েছে মনিপুর। উত্তরপ্রদেশের পৌরাণিক হস্তিনাপুরে যেখানে বহুজন মুক্তি পার্টির 'দুর্যোধন'ও পেয়েছে ৮৫৩ ভোট ⁶, সেখানে ইরম ইরম শর্মিলা কে গুণে গুণে ৯০টা ভোটে দিয়েছে মনিপুর। 
আসলে এই নির্বাচনী রাজনীতি তে, টানা ১৬ বছর নাকে নল গুঁজে অনশন করে, আফস্পা'র মত কালা আইনের বিরুদ্ধে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে, ইরম শর্মিলা'ও হারতে পারে। আবার এই নির্বাচনী রাজনীতি তেই, ৯'র দশকে মেলোড্রামাটিক বাংলা সিনেমায় চোখের জলে ঘর ভাসিয়ে দেওয়া সন্ধ্যা রায় ড্যাং ড্যাং করে লোকসভায় অন্দরে পৌঁছে  গিয়ে নিশ্চিন্তে হাই তুলতে পারে। আর পারে বলেই যে দেশে বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ ক্ষুধার্ত বাস করে ⁷, যে দেশে ২৭ কোটি মানুষ এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে দরিদ্র সীমার নিচে বাঁচে ⁸, যে দেশে প্রতি বছর ১৪,০০০  কৃষক ঋণের দায়ে আত্মহত্যা করে ⁹, যে দেশের ৩০% শিশু অপুষ্টিতে ভোগে ¹⁰, যে দেশে ৬০.৪ কোটির ঘরে শৌচাগার নেই ¹¹, যে দেশে ৭.৫ কোটির ঘরে পরিস্রুত পানীয় জলই নেই ¹², সেই দেশেরই সাধারণ মানুষই আবার বৃহত্তম গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করে বেছে নেয় ৮২% কোটিপতি সাংসদ ভর্তি এক সংসদ কক্ষ। সেই দেশেরই সাধারণ মানুষই নিজের এবং দেশের নিরাপত্তার সমস্ত দায়িত্ব এমন সংসদ কক্ষের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন যে সংসদ কক্ষের শতকরা ৩৪%'র বিরুদ্ধে রয়েছে খুন, ধর্ষণ, কিডন্যাপিং কিম্বা দাঙ্গার মত ফৌজদারি মামলা ¹³ । 
আসলে নির্বাচনী রাজনীতি কোন ফ্লুক নয়, আবেগ কিম্বা আত্মত্যাগের প্রদর্শনী নয়। নির্বাচনী রাজনীতি আদর্শের ভারমাপক দাঁড়িপাল্লা কিম্বা ক্লাসিক্যাল 'শ্রেণী সংগ্রামের' আয়নায়ও নয়। বরং নির্বাচনী রাজনীতি একটা জটিল গাণিতিক বিজ্ঞান। নির্বাচনী রাজনীতি একটা কার্যকরী কৌশলের বাস্তবায়ন। নির্বাচনী রাজনীতি একটি সম্পূর্ণ সাংগঠনিক 'মেশিনারি'। নির্বাচনী রাজনীতি একটা 'প্রোপাগান্ডা'। শুধু ইরম শর্মিলার আত্মত্যাগ কিম্বা লেনিন-স্তালিন'র 'কি করিতে হইবে' দিয়ে এই নির্বাচনী রাজনীতি তে জয় নিশ্চিত হয় না। লোহা দিয়ে লোহা কাটতে ইউ মাস্ট হ্যাভে 'কাউন্টার প্রোপাগান্ডা'। ইউ মাস্ট হ্যাভে বেটার প্রোপাগান্ডা। এটাই নির্বাচনী রাজনীতি। টেক ইট, অর লিভ ইট।