বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ, ২০১৭

অস্ট্রিয়া ভ্রমন - প্রদীপ্ত প্রতিম পাল


৯ই মে - ১৩ই মে

অস্ট্রিয়া বলতে আমি ও আমার ছেলের মনে যে দুটো ছবি চিরকাল জেগে থাকবে তা হল - ইনসব্রুক প্রাডলার স্ট্রাসে তে অল্টপ্রাডল হোটেল আর সালজবার্গ আরিবোনাস স্ট্রাসে তে হোটেল এরিনা। আর মনে থাকবে আশ মিটিয়ে সঙ্গ দেওয়া আল্পস্ কে। আছে ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে চলা ট্রাম, অমায়িক মানুষ, সবুজ কার্পেটে মোড়া country side আর কিলো কিলো অক্সিজেন।

আমার ভ্রমণের আইটিনেরারি তে আগে ঢুকেছে ইতালি। তারপর  অস্ট্রিয়ার বিমান খুঁজতে ট্রানসেভিয়ার সাইটে গিয়ে যখন দেখলাম ১৫ই মে থেকে একমাস আইন্দহোফেন
এয়ারপোর্ট বন্ধ থাকবে তখন তড়িঘড়ি টিকিট কাটতে হল। তারপর বুকিং.কম-এ গিয়ে ইনসব্রুক সিলপার্কের কাছে হোটেল - এসব একের পর এক সারা গেল। সালজবার্গ
এরিনা হোটেলর খোঁজ আমার সহকর্মী বিশালের থেকে পাওয়া - এরকম সেরা জায়গায় একটা ৪-তারা হোটেলে থাকা সত্যিই একটা সুন্দর অভিজ্ঞতা। এই রে - ভেবে বসবেন না আমি একটা নাক উঁচু রইস লোক, তবে সামনে যখন আল্পস্ - একদিন কা সুলতান নয় হলামই।

যাইহোক - ৫দিনের লম্বা ছুটি নিয়ে দুগ্গা-দুগ্গা করে বেরিয়ে পড়লাম, প্রথমবার আল্পস্ এর ইউরোপকে চিনতে। ডেন হাগ থেকে ট্রেনে আইন্দহোফেন ঘন্টা দেড়েক, ঋতঙ্করের
কাছে ইউরোপে প্রথম লম্বা ট্রেন যাত্রা। এই প্রসঙ্গে Rick Steve এর একটা কথা বলি - ভদ্রলোক জাতে আমেরিকান হলেও, যে দেশে গ্যাছেন সেই দেশের মানুষের সঙ্গে
এক্কেবারে মিশে গিয়ে ভ্রমণের মজার কথা শুনিয়েছেন। সেদেশের মানুষ যেভাবে ট্রাভেল করে, যে খাবার খায়, যেভাবে থাকে - তাতে যে শুধু দেশটাকে ছোঁয়া যায় তাই নয়,
ঘোরাটাও সহজ, সস্তা ও উপভোগ্য হয়ে ওঠে। তবু আমেরিকান নিজের ইগো আর স্বভাব ছাড়তে পারেনা। তাই ট্রেনে এক আমেরিকান ভদ্রলোককে যখন বললাম আমরা বাসে (৪০০ অথবা ৪০১) এয়ারপোর্ট যাচ্ছি - তিনি ট্যাক্সি বেছে নিলেন। তার ঘন্টাখানেক পর আবার দেখা হলে শুনলাম কিভাবে চার-ডবল খরচা করে ইলেভেন্থ আওয়ারে পৌছেছেন। যাইহোক, তিনি গেলেন পিসা আর আমরা সুন্দরী অস্ট্রিয়ার পথে। ঠিক ১:০০ টায় ছেড়ে ২ ঘন্টা পর যখন ইনসব্রুকে নামছি - তখন এয়ারহোস্টেসও জানলায় ঝুঁকে পড়েছেন সাদা-কালোয় মেশা আল্পস্-এর সৌন্দর্য দেখতে। এবং ঝকঝকে আবহাওয়া। এয়ারপোর্টের বাইরে f-line বাসও যেন ঠিক আমাদের অপেক্ষায়। আধঘন্টায় ওল্ড সিটি -সিলপার্ক মলে পৌছে গেলাম। তারপর স্থানীয় লোকের সাহায্য নিয়ে পায়ে হেঁটে হোটেল খুঁজতে বেশি বেগ পেতে হয়নি।
ইনসব্রুক শহর চতুর্দিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা। পুরোনো দিনের গন্ধমাখা অল্টপ্রাডল হোটেলে তিনতলায় উডেন ফ্লোরের আমাদের ঘরটা যেন সেই মুডটার সঙ্গে ঠিক মানানসই।
সরু একচিলতে জানলা খুললে সামনেই পাহাড়। বেশী দেরি না করে বেরিয়ে পড়লাম। ইনসব্রুক মানে ইন নদীর ওপর ব্রীজ, আর তার অনেক শাখা - সোজা আল্পস্ থেকে নামছে বরফগলা জল নিয়ে। সেইরকম একটা নদীর ধারে হাঁটতে হাঁটতে পৌছলাম সিলপার্কে - চারদিকে পাহাড়ের প্রাচীর। সবুজ ঘাসের গালচে - ছোট ছোট ওয়াটারবডি আর ব্রীজ। একপাশে একটা পুরোনো চার্চ (এর পাশের শর্টকাট ধরেই আমাদের যাতায়াত এর পথ ছিল)। পায়ে হেঁটেই পৌছে যাওয়া যায় ওল্ড সিটি-সেন্টারে - কবল-স্টোনের মধ্যযুগীয় রাস্তা মুডটা সেট করে নিতে সাহায্য করে। স্কোয়ারে পায়রা দের ঘোরাঘুরি, street-side cafe তে অল্প গলা ভিজিয়ে নেওয়া আর দেশবিদেশের ট্যুরিস্ট দেখতে দেখতে এগিয়ে গেলাম। দ্রষ্টব্য গোল্ডেন Dachl আর ইনসব্রুক ক্যাথিড্রাল।
গোল্ডেন Dachl (ছাদ) ইনসব্রুক শহরের একটা  ল্যান্ডমার্ক। ১৫০০ সালে সম্রাট  প্রথম ম্যাক্সমিলিয়ন (বাবর ভারতে আসতে তখনো ২৬ বছর বাকি আছে), ২৭৩৮ টা সোনার টালি বসিয়ে ছাদ আর নিচের বারান্দা তৈরি করলেন তার সদ্যবিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে জনগনকে দর্শন দেবেন বলে। তা দ্বিতীয় পক্ষকে নিয়ে একটু বাড়াবাড়ি করলেও এই স্ত্রী দশ বছরের বেশী বাঁচেননি। বাড়ির আকার দেখলে - একে রাজবাড়ি বলতে লজ্জা করবে (এতোই ছোট)। বারান্দার নিচে দেওয়ালে কিছু ফ্রেস্কো আছে - ড্যান্সিং মুর আর ম্যাক্সমিলিয়নের জীবনের কিছু গাথা। বাড়িটা এখন International Alpine Convention's Office, মিউজিয়াম ও সিটি আর্কাইভ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে তৈরি (যদিও অষ্টম শতাব্দী থেকেই অস্তিত্ব ছিল) ইনসব্রুক ক্যাথিড্রাল দেখে ব্যারোক স্টাইলটা ঠিক কি, সেটা বোঝার চেস্টা করছি - পেছনে শুনলাম 'এসব সময় নষ্ট করে কি ঘোড়ার ডিম দেখাচ্ছে বলুন তো' - মাঙ্কি ক্যাপ জড়ানো খাঁটি হতাশ বাঙ্গালী কন্ঠস্বর। মে মাস - ট্যুরিস্ট সিজন শুরু হয়ে গ্যাছে। আর সেই দলে ভারতীয়দের প্রাধান্য উল্লেখযোগ্য। আমার কিন্তু দিব্যি ভাল লাগল। ক্যাথিড্রালের বাইরের চত্বরে বিশাল ফোয়ারা, গির্জার দেওয়ালে Apostle দের মূর্তি - বেশ যত্নের ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। ভেতরে সিলিং-এ রঙ্গীন ছবি আর Grandure - ঘুরে ঘুরে অনেকক্ষন দেখার মতো। পরে ভ্যাটিকান সহ বড় গির্জা আরো দেখেছি, কিন্তু মধ্যযুগের বিশালাকার গির্জার সঙ্গে পরিচয় এই প্রথম। সোনালী রঙের গিল্ডেড অল্টার, রং-বেরং এর মার্বেলের বাহার, সাদা মার্বেলের সূক্ষ কারুকাজ, মা মেরীর কোলে যীশুর সজীব মূর্তি মোহিত করে রাখল কিছুক্ষন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ভগ্নস্তুপে পরিণত হওয়া গির্জাকে কয়েক বছরের মধ্যেই আবার নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছিল -সে ছবি ও কাহিনীও পড়বার।

কিছুটা এগিয়ে কংগ্রেস স্কোয়ারে এক বিরল অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলাম। শহরের বিশিষ্টজনের উপস্থিতিতে ব্যান্ড ও মার্চপাস্ট - অনেক বয়স্ক অতিথি তাদের ট্র্যাডিশনাল পোশাকে অংশগ্রহন করেছেন। পুরুষদের ট্র্যাডিশনাল হাফপ্যান্ট, মহিলাদের স্কার্ট, মাথার টুপিতে ফেজান্ট-এর পালক, হাতে সিঙা, ফুল, ফ্ল্যাগ আর বাহারি লাঠি। সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে। আবহাওয়া অনেকটা স্যাঁতস্যাঁতে দার্জিলিং - তবে এই ৭:৩০ টার সময়েও আকাশে আলো নিভতে দেরী আছে। বাড়ি ফিরে খাটের ওপর লেপ জড়িয়ে একটু চা খেতে খেতে মনে হল - স্বর্গের কাছাকাছি আছি।

১০ই মে - পরেরদিন সকালে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে (৬:০০ টা) বেরিয়ে পড়লাম আশপাশ ঘুরে দেখতে। ৮টায় পেটভরে ব্রেকফাস্ট খেয়ে (প্রসঙ্গত বেড-এন্ড ব্রেকফাস্ট ইউরোপের জনপ্রিয় ব্যবস্থা - আমাদের খরচ পড়েছিল দিনপ্রতি ৮৯ ইউরো করে) বেরিয়ে পড়লাম ইনসব্রুক Hoptbahnhof থেকে সালজবার্গের উদ্দ্যেশ্যে। ইনসব্রুক থেকে সালজবার্গ বুলেট ট্রেনে যদিও মাত্র দেড় ঘন্টায় পৌছন যায় কিন্ত তিনজনের যাতায়াতের খরচ পড়বে ৩০০ ইউরো। অন্য অপশন ১০:৩০ টায় রিজিওনাল ট্রেনে (Einfach Raus) এ যাওয়া। সময় লাগবে চারঘন্টা আর যাতায়াতের খরচ ৭৬ ইউরো। আমরা দ্বিতীয়টাই বেছে নিলাম। শহর ছাড়াতেই আল্পস্ দুদিকে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগল। এট্রেন পাহাড়ে চড়েনা - উপত্যকা ধরে কখনো জঙ্গল, কখনো পাহাড়ি ঝরনা, কখনো বিস্তীর্ন লেক -চারঘন্টা ধরে আশমিটিয়ে শুধু দেখা (সৌপর্ণীর কথায় - আইসক্রীমের মত চাটতে চাটতে যাওয়া)। ট্রেনেই খাওয়া-দাওয়া সারা। তাই-তিনটে নাগাদ হোটেলে চেক-ইন করে আর সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে পড়লাম কাসল্ (হোহেনসালজবার্গ) দেখতে। টিপটিপ করে বৃষ্টি, তার মধ্যে স্থানীয় মানুষদের কথায় একটু ভুল বোঝাবুঝি - তারপর টিকিট কেটে (আমাদের প্ল্যান B - Funicular, Guided Tour with Audio Guide, শুধু special show টা বাদ) Funicular-এ চড়ে খাড়া পাহাড়ের মাথায় উঠে যাওয়া। View Point থেকে পাহাড়ে ঘেরা সালজবার্গ শহর টা ছবির মত দেখা যায়। Guided Tour শুরু হয় নুনের গোডাউনের গল্প দিয়ে। সালজ বা নুন সেকালের মহার্ঘ জিনিস, যা পাওয়া যেত আশপাশের খনি থেকে। কাসল্-সেই ব্যবসায়ী দের Protection দিত আর নুনের গোডাউন হিসেবে কাজ করত - বিনিময়ে মিলত অর্থ। Audio Guide-এ ঘরের নম্বর মিলিয়ে পুশ করলে বৃত্তান্ত শুনতে পাওয়া যায়। কাউন্টদের কথা, কেল্লার বেড়ে ওঠবার কথা, কয়েদ ঘর আর বিচিত্র শাস্তি দেওয়ার যন্ত্র (সেগুলো কখনো ভয়ঙ্কর তো কখনো রসিকতার ছাপ দেখা যায়) - দেখতে দেখতে উঠে গেলাম -এক্কেবারে ছাদে।  আশপাশে ঘন্টাঘর, কাউন্টদের বাড়ী - কেল্লার চৈহদ্দির মধ্যেই। পাশে সালজ্ নদীক্যাথিড্রালের অপূর্ব ভিউ। ঘোরানো সিড়ি ধরে নিচে নামার রাস্তায় দেখলাম অর্গান - দ্য বুল। পুতুল দিয়ে সাজানো গ্যালারি - সেযুগের পোষাক আর যুদ্ধাস্ত্র। একতলায় গ্যালারিতে দেশীয় কাঠের পুতুলে ভুতের দেশ, রাজবাড়ি - মন ভরিয়ে দেয়। নীচে নেমে ক্যাথিড্রাল দেখলাম। ফেরার পথে স্টেশনে নেমে পরেরদিন Hallstat যাওয়ার প্ল্যান করতে গিয়ে ধাক্কা খেলাম - ট্রেনে যাতায়াত পড়বে ২২০ ইউরো, OBB'Helpdesk ও কোনো বাসের খোঁজ-দিতে পারল না। অগত্যা হোটেলে ফিরে আসা। তারপর সৌপর্ণীর পরামর্ষে Reception থেকে খবর পেলাম conducted tour আছে - Hallstat না হলেও, পুরো লেক ডিস্ট্রিক্ট। মাথাপিছু ৪২ ইউরো - ছোটোদের হাফ। পত্রপাঠ টিকিট করিয়ে নিলাম - নাহলে খুব আশাহত হতে হত।
একটা কথা বলা জরুরী - অস্ট্রিয়াতে ২৪ ঘন্টার ডে-পাস খুব উপকারি। আর অল্প পয়সায় পেট ভরে খেতে হলে, যেকোনো সুপার মার্কেটে বেকারি থেকে রোস্ট,
ব্রেড, দই, জুস, ফল। সঙ্গে ইলেকট্রিক কেটলি থাকলে হোটেলের ঘরেই চা, সুপ এমনকি ডিম সেদ্ধ - আমরা তাই করেছি - অ্যান্ড দ্য ক্রেডিট গোজ টু মাই গিন্নী।

১১ই মে - এরিনা হোটেলে ভোরবেলা জানলা দিয়ে সূর্যোদয় দেখা ভোলার নয়। সামনে গাছের সারি ডিঙ্গীয়েই আল্পস্ আর তার বরফ মোড়া চূড়োয় প্রথমে নিলচে, তারপর গোলাপী হয়ে সোনালী আলো আশ মিটিয়ে দেখেছি। আমাদের ট্যুর শুরু বেলা ২:০০ টোয়, সকালে বেরিয়ে পড়লাম মিরাবেল প্যালেস দেখতে। এর সিঁড়ি আর বাগানেই সাউন্ড অফ মিউজিকের সেই চিরনবীন গান শেখানোর গান 'ডো-রে-মি-ফা'। বাগানে আছে পাথরের বামন-মূর্তি - মজাদার আর ছোটদের হাতের নাগালে। বাগানে ফুলের কেয়ারি যেন সবুজ কার্পেটের ওপর রঙ্গীন সুতো দিয়ে বোনা। মার্বেল হলে এখনো কনসার্ট হয়। বেরিয়ে সালজ্ নদী পার হয়ে ওল্ড টাউনের পথে লাভ-লক (বা Makartsteg) ব্রিজ। বরফ গলা সবুজ জলের ওপর  - আর তার ফেন্সিং এর ওপর তালা বাঁধলে জোড় অবিচ্ছেদ্য। ওল্ড টাউনের পুরোনো রাস্তা আর বাড়ীর নিচে বাজার বেশ একটা ওল্ড ইউরোপিয়ান চার্ম এনে দেয়। কত রকমের কাঠ আর পোর্সেলিনের পুতুল। সালজবার্গ ক্যাথিড্রাল পাশেই - সুন্দর তবে নতুন করে কিছু বলবার নেই। যেটা বলবার - তাহল গায়ের মার্কেট স্কোয়ার। সার-দিয়ে যে ঘোড়াগুলো দাঁড়িয়ে আছে, তাদের আমরা বিলিতি ছবির বইতে দেখি। আর মস্ত একটা ফোয়ারা - সেই চতুস্পদ দের মূর্তি নিয়েই। হোটেলে ফিরে খাওয়া দাওয়া সারতে সারতে ট্যুরের পিক-আপ গাড়ি এসে গেল। মিরাবেল প্যালেসের সামনে থেকেই প্যানোরামা 'লেক অ্যান্ড মাউন্টেন' ট্যুরের বাস ছাড়ল - সময় লাগবে ৪ ঘন্টা। ট্র্যাডিশনাল পোষাকে ট্যুর-গাইড আমাদের যাত্রা পথের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। মে ট্রী বা মে পোল - May Day বা Pentecost এর দিন, একটা চার-পাঁচ তলা লম্বা ওক কাঠের মাস্তুলের ওপর ঝাউপাতা দিয়ে সাজান - সেটাকে নিয়েই নাচ-গান, উতসব। আর বাড়ির বাগান থেকে সেটা চুরি করতে পারলে পুরস্কার আর পিকনিক। আধঘন্টার মধ্যেই পড়ল লেক Fuschl - পাহাড়ের মাথায় ভিউ-পয়েন্টে আমাদের প্রথম বিরতি। ঝপাঝপ ছবি তোলা অনেক নিচে পাহাড়ে ঘেরা আঁকাবাঁকা বিশাল লেক। ঘন্টাখানেকের মাথায় পৌছলাম St. Wolfgang লেকে। এবার ৪৫ মিনিটের বোট যাত্রা - তবে এটা খোলা থাকে শুধু গ্রীস্মেই (১ লা মে থেকে অক্টোবরের শেষ)। বোটের খোলা ছাদে আরাম করে বসলাম। ঝকঝকে রোদে - ছবি তোলার আজ আইডিয়াল দিন। পাশে ছোট্ট শহর St. Gilgen-এ সুরকার মোতজার্টের মামার বাড়ি। ছোট ছোট কান্ট্রি হাউস আর রিসর্ট - চোখ ভরে দেখা আর বুক ভরে নিশ্বাস নেওয়ার (সে করতে নাকি বিল ক্লিন্টন ও ঘুরে গ্যাছেন) - আমি ক্যামেরা বন্ধ করলাম। বিলের উল্টোপারে St. Wolfgang গ্রামে আমাদের ঘন্টাখানেকের বিরতি। সাধু নাকি শয়তানকে বশ করে গির্জাটা বানিয়ে নিয়েছিলেন। আধো-অন্ধকার চার্চে পুরোনো যুগের গন্ধটা রয়ে গেছে -কাঠের অল্টার, কাঠের তৈরি যীশুর মূর্তি, পুরোনো যুগের ছবি, অর্গান আর সাধুর সমাধি, গ্রামের গির্জায় সেই Grandure টা নেই, তবে অনেকক্ষন ঝাঁঝাঁ রোদে ঘোরার পর চার্চে ছায়া চোখটাকে আরাম দিল। বাইরে বেরিয়ে শহরের পথে কিছুক্ষন ঘুরে বেড়ালাম - সরু Cobble stone এর উঁচুনীচু রাস্তা, লেকের পাশে রেস্টরান্টে গুটিকয়েক মানুষের সান্ধ্যভোজন (White Horse Inn - এই নামে জনপ্রিয় অস্ট্রিয়ান মুভির স্যুটিং হয়েছিল), একটু আড়ালে জলের পাশে বেন্চে বসে গল্পগুজব, দু-তিন তলা কাঠের বাড়ি সময়টা বড় তাড়াতাড়ি কেটে গেল। চড়াই ভেঙে বাসে চড়ে বসলাম। এবার ফেরা - পুরো যাত্রাপথে অগুন্তি গল্প শুনেছি - তিন ভাই পৃথিবী ভ্রমণে বেরিয়ে অস্ট্রিয়ার রূপে মূগ্ধ হয়ে হৃদের পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল - কত বছর কেটে গেল আর তারা পাহাড় হয়ে গেল। রাঁধুনীর চিল চিতকারে ঘাবড়ে গিয়ে ড্রাগন পাহাড়ে ধাক্কা মেরে গোল গর্ত করে ফেলল (সে কীর্তি খাড়া দেওয়ালের মত পাহাড়ে আজও আছে), রাজা অন্ধকারে বনের মধ্যে পথ হারালে চাঁদের আলো তাকে পথ দেখাল (Lake Mondsee) রূপকথা (Folklore) এর constant supply এই ট্যুরের একটা বড় প্রাপ্তি। আর হ্যাঁ বাগান ওলা পুরোনো একটা ক্যাসেলের নতুন করে রেনোভেশন হয়েছে, মালিক এখনো ব্যাচেলর - ইয়ং মেয়েরা ভেবে দেখতে পারেন, তবে পাত্রের বয়স মাত্র ৮০। 

১২ই মে - আবার একটা ঝকঝকে সূর্যোদয়। তবে আজ তাড়াতাড়ি গুছিয়ে গাছিয়ে রওনা দিতে হবে - ৯:৩০ টায় ট্রেন। ১:৩০ টায় ইনসব্রুকে পৌছে - দৌড়ে হোটেলে ব্যাগ রেখে আবার স্টেশনে ফিরলাম। তিনজনের ইনসব্রুক কার্ড কিনেছি (বড় ৩৯, বাচ্ছা ২০) - ২৪ ঘন্টায় ইনসব্রুকের যাবতীয় গন্তব্যে যাওয়া যাবে। আমাদের লক্ষ্য আপাতত Swarovski Crystal Museum - বাস ছাড়বে ২:৩০ টেয় শহরের একটু বাইরে মিনিট ৪০ এর পথ (ঘন্টাদুয়েক অন্তর বাস আছে- সিডিউলটা হোটেলে বা Web site এ চেক করে নেওয়া ভাল)। তবে Web site এ রিভিউ ফিডব্যাক যতটা গর্জেছিল বাস্তবে ততটা বর্ষালো না। Crystal কিভাবে পাওয়া যায় বা তার প্রসেসিং কিভাবে হয় সেই নিয়ে তেমন ইনফরমেশন নেই - কয়েকটা হলে বেশ কিছু Installation Art।  আর উল্লেখযোগ্য হল ভারতীয়দের উপস্থিতি (আর যেন সেই ভাবেই তৈরি গয়না)। ঢোকার পথে Crystal Giant - এদের আইকন। বাইরের বাগানে রয়েছে Crystal Cloud আর গাছের তৈরি ভুলভুলাইয়া বা Maze.আজ মেঘলা সঙ্গে টিপটিপ বৃষ্টি সুতরাং ভেতরে সময়টা মন্দ কাটলো না - তবে আমি রেকমেন্ড করব না।

১৩ই মে  - আকাশের মুখ ভার। তবে পাহাড়ের মাথায় Nordkete এ আজ যেতেই হবে - ইনসব্রুকে সবচেয়ে বড় আকর্ষন এটাই, আর সেই প্রথম দিন থেকে প্ল্যান করছি। ইনসব্রুক কার্ড নিয়েই যাওয়া যায়। ৮:৩০ টায় কংগ্রেস থেকে প্রথমে ফিউনিকুলারে সিগ্রুবে সেখান থেকে কেবল কার (রোপওয়ে) তে হাফেলেকার। টিপটিপ বৃষ্টি টা মেঘের রাজ্যে গিয়ে বদলে গেল বরফ গুড়োয়। রাতভোর পড়ে থাকা সাদা বরফের ওপর প্রথম পদচিহ্ন। এরজন্য প্রিপারেশন সেই কলকাতা থেকে চলছে - জামাকাপড় থেকে জুতো, টুপি, গ্লাভস। গায়ে, মাথায়, জিভের ডগায় বরফ ঝরে পড়ছে। একবার করে বরফের ওপর হড়কাতে হড়কাতে কিছুটা উঠছি আবার নেবে এসে ঘরে ঢুকে নিজেকে (আর সাধের নতুন ক্যামেরাকে) গরম করছি। ১০:০০ টায় অনিচ্ছা সত্বেও নিচে নাবার উদ্যোগ নিতে হল। ফেরার পথে Alpine Zoo (Funicular এর স্টপেজ আছে) দেখবার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু বৃষ্টি বাধ সাধল। অগত্যা গিন্নীর পরামর্ষে Hop-on-Hop-off বাসে (এ ও ইনসব্রুক কার্ডের আওতায়) নিরাপদ আচ্ছাদনের মধ্যে শহরটা দেখে নেওয়া গেল। হেডফোনে কাছাকাছি দ্রষ্টব্যের বিবরণ সবসময় চলছে। যাওয়ার পথে দেখেছি এ বাস আমাদের হোটেলের পাশ দিয়ে যায়- Round Trip সেই ভাবেই করব ভাবছি, কিন্তু Hoptbahnhof স্টপেজ ছেড়ে তিনি অন্য রাস্তা নিলেন। অগত্যা নেমে ভিজতে ভিজতে হোটেল এবং মাল-পত্র নিয়ে এয়ারপোর্টের পথে। ৩:৩০ টেয় ফ্লাইট, আইন্দহোফেন পৌঁছতে বিকেল ৫ টা।