শনিবার, ১ এপ্রিল, ২০১৭

তিন তালাক ~ মহম্মদ ইউসুফ হায়াত

মাস সাত আটেক আগের কথা । পরিচিত একজন সকাল সকাল এসে বলল, খুব বিপদে পড়েছে । বাড়িতে থাকা যাবেনা । কথায় কথায় জানা গেল রাগের মাথায় স্ত্রী'কে তিন তালাক বলে ফেলেছে । ফলে একঘরে আর থাকা যাবে না, তাই এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে আশ্রয়ের খোঁজে । পেশায় রাজমিস্ত্রী, খুব কম পড়াশুনা জানা, দিন আনা দিন খাওয়া এক মানুষ আটকে পড়েছে চোদ্দশো বছরের পুরনো ধর্মীয় আইনের বেড়াজালে, যাকে শরিয়ৎ বলেই সবাই জানে । কিন্তু কী এই শরিয়ৎ? সব ধর্মের মতো ইসলাম ধর্মেও অজস্র নিয়ম কানুন, নির্দেশ, বিধি নিষেধ । এইগুলোই একসাথে শরিয়ৎ বলা হয় । কিন্তু অজস্র ভাগ-উপভাগের জন্য এই শরিয়তেও কিন্তু অজস্র বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায় । শিয়া-সুন্নিদের মধ্যে বিভিন্নতা তো আছেই, তাছাড়াও এই দুই মূল ভাগের মধ্যেও অজস্র উপবিভাগ আছে । আমাদের দেশে যেহেতু সুন্নিদের প্রাধান্য বেশি, তাই সুন্নিদের নিয়েই আমরা আলোচনা করব । সুন্নিদের মধ্যে মূলতঃ চারটি ভাগ  । এই ভাগগুলি হল হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলী । প্রতিটাই একেকটা স্কুল অফ জুরিসপ্রুডেন্স । হানাফীরা হল আবু হানিফার মত অনুসারী । যিনি অষ্টম শতাব্দীর তিনের দশক থেকে থেকে আটের দশক পর্যন্ত দীর্ঘসময় অধ্যয়ন ও গবেষণার মাধ্যমে শরীয়তের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাকার হয়ে ওঠেন । মজার ব্যাপার হল এই ব্যাখ্যা কিন্তু তখনই লিপিবদ্ধ হয়নি । হয়েছে অনেক পরে । সেই দ্বাদশ শতাব্দীতে । এতদিন এগুলো গুরু পরম্পরাতেই রক্ষিত হয়ে এসেছিল । পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলমান এনারই ফলোয়ার । মজার ব্যাপার হল উপরোক্ত চার ব্যাখ্যাকার কিন্তু কেউ নিজেদের মধ্যে বিরোধীতায় নামেননি । বলেছিলেন সবারটাই ঠিক । যেটা হোক মেনে চললেই হবে । অথচ এদের অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে ভীষণ রকমের গোঁয়ার্তুমি । তারা অন্য ব্যাখ্যাকারদের কথা সরাসরি নাকচ করে দেন ।

এবারে আসা যাক, কোরাণের নির্দেশের প্রসঙ্গে । কোরাণের সুরা বাকারাহ'র ২২৬ নং আয়াত থেকে ২৩০ নং আয়াত পর্যন্ত তালাকের পদ্ধতি বিবৃত আছে । একই সুরার ২৩১ থেকে ২৩৫ পর্যন্ত আয়াত এবং সুরা তালাকে আছে তালাক পরবর্তী নিয়মাবলী । সুরা বাকারাহ'র উল্লেখিত পদ্ধতি অনুযায়ী তালাক তিনবার বলতে হয় নির্দিষ্ট সময় অন্তর, একসাথে বলার নির্দেশ কিন্তু নেই । হানাফী  বাদে অন্যান্যরা সবাই এক সাথে তিন তালাক মানে না । কিন্তু হানাফী মতের অনুসারীদের বক্তব্য হল, বিচারে ফাঁসি হলে যেমন মৃত্যু হয়, তেমনি খুন করলেও মৃত্যু হয় । প্রথম ক্ষেত্রে মৃত্যুটা সমাজের চোখে বৈধ । আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সমাজের চোখে মৃত্যুটা বৈধ না হলেও মৃত্যুটা কিন্তু হচ্ছেই । সেরকমই একবারে  তিন তালাক বললে হয়ত তালাকটা বৈধ ভাবে হচ্ছে না, কিন্তু বিয়েটাও আর টিকছে না ।

এবার কথা হল, এই আইনগুলো কি অনমনীয়? পরিবর্তন কি কোন মতেই সম্ভব নয়? সমাজের যে মুরুব্বিরা কথায় কথায় নবীর নির্দেশের উল্লেখ করেন, তাদের উচিত মোবাইল, গাড়ি, ইলেক্ট্রিক লাইট ব্যবহার না করা । এমনকী বিশাল বিশাল জনসভায় মাইক ব্যবহার করে ভাষণ দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত । কারণ নবীর আমলে এগুলো কিছুই ছিল না । যদি যুগের প্রয়োজনে নতুন জিনিস ব্যবহার করতে আপত্তি না থাকে, তাহলে সুযোগ থাকলে আইনের পরিবর্তন করতে দেবেন না কেন? কোরাণের ব্যাখ্যা চিরকাল এক থাকেনি । অনেকেই নিজের মতো নতুন করে ব্যাখ্যা করেছেন । কেই পুরনো ব্যাখ্যাতেই থেকে গেছেন, কেউ কেউ নতুন জিনিসকে সাদরে গ্রহণ করেছেন । সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ, পৃথিবীর অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেই আজ তিন তালাক অবলুপ্ত । পাশের বাংলাদেশ- পাকিস্তান তো আছেই । এমনকী সৌদি আরবেও আজ তিন তালাক  নিষিদ্ধ । তাহলে ভারতে হতে সমস্যা কোথায় ? সম্ভবতঃ সারা পৃথিবী জুড়েই সংখ্যালঘুদের মধ্যে অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার একটা আশঙ্কা কাজ করে , একটা নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে । ফলে মূল'কে আঁকড়ে ধরার একটা প্রবণতা দেখা যায়, সেখানে ন্যূনতম আঘাতকেও অস্তিত্বের সঙ্কট বলে মনে করে । তাই যতদিন দেশভাগ হয়নি, ততদিন কিন্তু ভারতে তিন তালাক  চালু ছিল । তারপর যখন দেশভাগ হয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তান-বাংলাদেশের জন্ম হল , সেখানে তিন তালাক নিষিদ্ধ করা সম্ভব হল , আর ভারত পড়ে থাকল সেই তিমিরেই । শাহবানু ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই আরিফ মহম্মদ খানের তৈরি খসড়া মুসলিম বিল আর দিনের আলো দেখল না । সমস্যা আরও গভীর হয়েছে, ভারতের মুসলমানদের চলে আসা কিছু ভারতীয় পরম্পরা । আরবে  বিয়ে ভাঙা এবং নতুন করে বিয়ে করা খুব স্বাভাবিক ঘটনা । কিন্তু ভারতের সমাজ ব্যবস্থায় বিবাহবিচ্ছিন্না মেয়েদের বিয়ে হওয়াটা খুব কঠিন । ফলে ভারতীয় তালাকপ্রাপ্তা মেয়েদের জীবনে নেমে আসে নিদারুণ অভিশাপ । যাঁরা তিন তালাককে সমর্থন করছেন , তাদের বাড়িতেও মেয়ে আছে , এমন দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা তাদের জীবনেও ঘটে যেতে পারে । তাই সমর্থন করার আগে তাদেরও বিষয়টা নিয়ে ভাবা উচিত । 

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তিন তালাক নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান কি সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য, নাকি কুমীরের কান্না?? যে দলের সাংসদ দাদরীর আখলাক হত্যাকান্ডের নায়কের মৃত্যুতে শোকযাত্রায় শামিল হন, এবং তারই উপস্থিতিতে সেই মৃত ব্যাক্তির দেহ জাতীয় পতাকা মুড়ে আনঅফিসিয়ালি জাতীয় সম্মান জানান হয় । গুজরাট দাঙ্গায় যে দলের প্রত্যক্ষ মদদে ঘটে গিয়েছে বীভৎস সব নারী অত্যাচারের ঘটনা । সেই দলের প্রধানমন্ত্রীর মুখে সংখ্যালঘুদের জন্য দরদ উথলে উঠতে দেখলে সত্যিই বিশ্বাস হয় না । বর্তমান সরকার সংখ্যালঘু উন্নয়নের একের পর এক প্রকল্পে টাকার যোগান কমাচ্ছে, নাম কা ওয়াস্তে অনেক প্রকল্পকে খাতায় কলমে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে । তাই তিন তালাক নিয়ে এই সরকারের সদিচ্ছা কতটা আর কতটা সুড়সুড়ি দিয়ে কাজ হাসিলের চেষ্টা, তাই নিয়ে সন্দেহ জাগে ।

তারপরেও কি ভারতের মুসলমান সমাজ চুপচাপ বসে থাকবে? কোন সরকারের অপেক্ষায় না থেকে নিজেরা কবে উদ্যোগী হবে? কোন সরকারই চায় না কোন জনগোষ্ঠীর প্রগতিশীল অংশকে সেই গোষ্ঠীর মুখ হিসেবে তুলে ধরতে ।  কারন শাসকগোষ্ঠী জানে এই প্রগতিশীল শক্তিকে উৎসাহ দিলে এরা ভবিষ্যতে সরকারের বিরোধীতা করতে পিছপা হবে না । তাই মুসলমানদের প্রগতিশীল অংশকেই দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে । কারন বাইরে থেকে কোন জিনিস চাপিয়ে দিলেও কাজ হয়না যতক্ষণ ভেতর থেকে সেই তাগিদটা না আসে । অস্পৃশ্যতা আজ বহুদিন হল বেআইনী , হিন্দু ব্যক্তিগত আইনেও সংস্কার আজ বহুদিন হয়ে গেল ।  কিন্তু সমস্যা এখনও অনেক জায়গাতেই রয়ে গেছে । 

অভিন্ন দেওয়ানী বিধি সমর্থন করতে সমস্যা নেই। কিন্তু এই অভিন্নতার সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করে দেবে? আমরা চাইনা নাগপুরের ছাপাখানায় ছাপা 'অভিন্ন দেওয়ানী বিধি' । আমরা চাই ভারতের সব অংশের মানুষের প্রতিনিধিত্বে তৈরি এক অভিন্ন দেওয়ানী বিধি । আমাদের কাজটা শুরু হয় এখানেই । একথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় , মুসলমানদের মধ্যে একটা বিরাট অংশই কিন্তু মনে মনে তিন তালাক বিরোধী । জনে জনে জিজ্ঞেস করলে দেখা যাবে অধিকাংশই চাইছে না, তালাক প্রথা চলুক । কিন্তু এই ব্যক্তিগত মতগুলোই মাস লেভেলে গিয়ে পরিবর্তিত হয়ে  যাচ্ছে । কারণ ব্যাক্তিগত মতগুলো জানানোর একটা প্ল্যাটফর্ম দরকার ।  দরকার একটা বিতর্কের জায়গার । যাতে বাঁধের দরজাটা খুলে যায় । বিপুল জলরাশি ভাসিয়ে নিয়ে যায় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্লেদ, শ্যাওলা, জঞ্জালগুলোকে । নতুন সেই স্বচ্ছ জলধারাতেই নতুন মুক্ত এক জীবনের সূত্রপাত হবে ।