বৃহস্পতিবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৭

মন্দির নিয়ে একটি নিরামিষ গল্প ~ পুরন্দর ভাট

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে পুরীর মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া নিয়ে ক্যাচাল বেধেছিল। সম্ভবত মিটেও গেছে। ইন্দিরা গান্ধীকে অতীতে এর আগে এই নিয়মের (বা বেনিয়ম) সম্মুখীন হতে হয়েছিল কারন তার বৈবাহিক সম্পর্ক পান্ডাদের পছন্দ হয়নি। স্বাভাবিক। খাপ পঞ্চায়েত আর কাজীর ক্যাঙারু কোর্টের দেশে তেনাদের ইচ্ছাকে সম্মান জানাতে হবে। এবসলিউট ক্ষমতার অধিকারিণী ভারতেশ্বরী পর্যন্ত পাত্তা পাননি তো, ছোটখাটো নেতা নেত্রী কোনসা ইয়ে, মানে কোউন ক্ষেত কি মুলি?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বা শ্রীমতী ইন্দিরার রাজনীতির চুড়ান্ত বিরোধী হলেও যেকোনো গণতান্ত্রিক মানুষ এই ধর্মীয় পাকামি ও জগদ্দল নিয়মের নিন্দা করবেন। (অবশ্য এক্ষেত্রে সত্যিই ঢুকতে দেওয়া হয়নি এমনটা নয়, একটু গোলযোগ বেধেছিল, সেটা বিরোধীরা গট আপ বলে সন্দেহও করছেন  ;) ) 
যুগ যুগান্ত ধরে এই নিয়ম চলে আসছে। ঈশ্বর রুষ্ট হবেন কিনা জানা নাই কারণ ঈশ্বর তো ঠুঁটো জগন্নাথ, আক্ষরিক অর্থেই ঠুঁটো। যেমত আল্লাতালাও। তার নিজস্ব ক্ষমতা বলে কিস্যু করবার নাই। পান্ডা মৌলবীদের জন্যে স্বর্গে বসেই তিনি টেন্ডার ডাকেন। এবং বানী দেন এই এই করিতে হইবে। এক পা পিছিয়ে দুই পা আগাইবে, ইত্যাদি। এই মসজিদে কাফের যেতে পারবেনা, সেই চার্চে ঋতুমতী মেয়েরা ঢুকতে পারবেনা, ওই মন্দিরে অন্তজ শুদ্রের প্রবেশ নাই.... ইথার তরঙ্গ বাহিত হয়ে ধর্মগুরুদের কানে বাণী আসে। প্রভু আলো দেখিয়েছেন। প্রয়োজন হলেই তিনি দেন। শুধু টাওয়ার টা আসা চাই। ধর্মগুরুরা দরকার হলেই তাকে টেনে নামান। ডেকে পাঠান। মহম্মদ তো প্রায়ই ডাকতেন। ;)

ঈশ্বর যে ঠুঁঠোই নয় স্রেফ ধ্বজভঙ্গও তা প্রমান করে দিয়েছিলেন কালাপাহাড় স্বয়ং। একধার থেকে পাণ্ডা, পুরোহিতদের কেলিয়েছেন, মন্দির পেলেই হাতুড়ি চালিয়েছেন। হিন্দু মন্দির ভাঙার পেছনে অবশ্য মহান আদর্শ বা লুঠের উদ্দেশ্য ছিলনা (তার সাকরেদরা যথেচ্ছ লুটমার করেছেন)। তিনি এসেছিলেন তীব্র প্রতিশোধস্পৃহায়। কালাপাহাড় যে উচ্চ ব্রাহ্মন ঘরের শিক্ষিত সন্তান ছিলেন ঐতিহাসিক সত্য। সুতরাং ওই বাবর, ঔরংজেবের মতো এক গোত্রে ফেলাও যাচ্ছেনা। :) সেদিন পুরীর পান্ডাদের কি হাল হয়েছিল ইতিহাস সাক্ষী। জগন্নাথের ঠিকাদারেরা মাথায় টুপি পরে, চোগা চাপকান বোরখা পরে, কেউ কেউ হয়ত নুনু কাটিয়ে জান বাঁচিয়েছিল। ধম্মো ফম্মো মাথায় থাক।
বলি, উপাচার, ধুপ, দীপারতি রসাতলে বিসর্জন দিলেও দেবতার ঘুম ভাঙেনি। ভগবান প্রাতঃকৃত্যর টাইমটুকু পাননি। ঝেড়ে দৌড় দিয়েছিলেন।

সকলেই জানেন নিয়ম কানুন কারা বানায়। অলঙ্ঘ নিয়মকেও কলা দেখিয়ে দেন কালাপাহাড়রা। শুধু বুকের পাটা থাকা চাই। ধর্মদ্রোহ মানে গোমাংস বা শুকরমাংস ভক্ষন নয়। আমার কতিপয় বন্ধু অভিযোগ করেন আমি অতীতচারী। কিছু বলতে গেলেই উদাহরণ হিসেবে অতীতে, কবেকার কোন আমলে কি ঘটেছিল টেনে আনি। সেই অভিযোগ ঘাড়ে নিয়ে একটা গল্প বলা যাক। বন্ধুরা একটু ধৈর্য ধরে পড়বেন। মন্দিরে প্রবেশের গল্প। গল্প নয়, বাস্তব ঘটনা।

১৯৪৩ এর শেষার্ধ, আজাদ হিন্দ ফৌজের সদর দপ্তরে বসে নেতাজী কাজ করছেন। দিবারাত্রি পরিশ্রমের ফাঁকে বাইরের কারো সাথে দেখা করার সুযোগ থাকেনা।
এমনি এক দিনে ব্রিজলাল জয়সওয়াল এলেন দেখা করতে তাঁর সাথে। ব্রিজলাল সিঙাপুরের ধনিক ও বনিকশ্রেষ্ঠ। তিনপুরুষ ধরে বর্মা মুলুকে ব্যবসা। আদতে তারা গুজরাটি চেট্টিয়ার ব্রাহ্মণ।
বৃদ্ধ ব্যবসায়ী এসেছেন ফৌজি অর্ডার সাপ্লাইয়ের কথা বলতে। নেতাজী তার কাছে সবিনয়ে একটি আর্জি রাখেন তা হলো অনুদানের। আজাদ হিন্দ ফৌজের ফান্ডে একজন প্রবাসী ভারতীয় হিসেবে এটুকু কি তিনি করবেননা? ব্রিজলাল জানালেন নিশ্চই দান করবেন তিনি। ঠিক তিনি নন, খ্যাতনামা চেট্টিয়ার মন্দির পরিষদই তা দেবে। দেশের স্বাধীনতার জন্যে বুকের রক্ত দিয়ে যারা লড়ছে তাদের এটুকু প্রাপ্য। কিন্তু তিনি চান নেতাজীর জনপ্রিয়তা কে মূলধন করতে। সিংগাপুর প্রবাসী হাজার হাজার ভারতীয়দের চোখে বীর সুভাষচন্দ্র বসু যদি তার মন্দিরে বা ব্যবসাক্ষেত্রে পদধুলি দেন তাহলে.....
নেতাজী বেঁকে বসলেন 'আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক হিসেবে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মন্দিরে যাওয়া তার শোভা পায়না' সুভাষ বোস আর নেতাজি এক ব্যক্তি নন।
ধনকুবের ব্রিজলাল চান তিনি ফৌজি পোষাকেই আসুন, নেতাজীর বেশে, তিনি টাকাটা সর্বসমক্ষে মন্দির চত্বরে দিয়ে দেবেন। আরো চমৎকার হবে নাকি বিষয়টা?
নেতাজী শর্ত রাখলেন তিনি যাবেন তবে সংগে থাকবে শিখ, মুসলিম, খৃষ্টান সহযোদ্ধারা। সবাই ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত সৈনিক। এই একটা জায়গায় সকলেই এক।
ব্রিজলাল চুড়ান্ত অসম্মতি দিয়ে জানান দুশো বছরের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যময় চেট্টিয়ার মন্দিরে বিধর্মী কেউ পা রাখেনি! এ সম্ভব নয়। হিন্দু ছাড়া ফটকের ভেতরে কেউ যেতে পারেনা, ব্রাহ্মন ছাড়া ভেতরে গিয়ে দেবদর্শন বারণ, আর পুরোহিত ছাড়া কেউ গর্ভগৃহে প্রবেশ করেনি এযাবৎ!
নেতাজী পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, তাহলে মন্দির কমিটির সাথে ভাল করে আলোচনা করে আসুন ব্রিজলালজি। (১৯৪৩ সালে ব্রিজলাল দান করতে এসেছিলেন সাত লক্ষ টাকা! এখনকার হিসেবে কত হতে পারে?)

পরের দিন ফিরে এলেন ব্রিজলাল। সংগে আরো কয়েকজন কর্মকর্তা। তারা রাজী হয়েছেন! নিমন্ত্রণ করতে এসেছেন নেতাজীকে। সাথে বাকি সহযোদ্ধা দেরও।

দুশো বছরের সংস্কারকে ছিন্ন করে সিংগাপুর চেট্টিয়ার মন্দির সেদিন খুলে গেল বিধর্মীদের জন্যে!
সিঁড়ির পাশে সুভাষ চন্দ্র বোস খুলে রাখলেন তার মিলিটারি বুট, পাশাপাশি নিষ্ঠাবান খৃষ্টান আইয়ার, ধার্মিক মুসলিম জামান কিয়ানী আর হাবিবুর রহমান।
সুভাষচন্দ্র বোস একজন কালাপাহাড়। জগদ্দল পাষাণ কে আঙুলের টোকায় ঝেড়ে ফেলে দেওয়ার হিম্মৎ দেখিয়েছিলেন পরাধীন, ধর্মনিগড়ে বাঁধা সংস্কারাছন্ন সমাজে।

(কৃষ্ণমাচারী ভাস্করণ, নেতাজীর স্টেনোগ্রাফারের বয়ানে)

চৈতন্যদেবের লাশ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে পুরীর মন্দিরের আসেপাশেই।
অসংখ্য দেবদাসীদের কান্না, ঘাম, রক্ত মিশে আছে পাথুরে দেওয়ালে গাঁথনিতে।
এমন মন্দিরে ঢুকে পূণ্য?