মঙ্গলবার, ৪ এপ্রিল, ২০১৭

রামনবমী ~ শ্রেয়সী রায়

আমার মা মোটা করে সিঁদুর পরেন এবং শাঁখা-পলা। আমার বাড়িতে দুপুরে এবং সন্ধ্যেয় শাঁখ বাজে; একটা নির্দিষ্ট বয়েসের পর আমায় দিয়ে এই কাজগুলো আর করানো যায়নি, তাতে হয়তো বাবা-মার মনখারাপ হয়েছে, কিন্তু কোন জোরালো আপত্তি করেন নি। 

আমার বয়েস যখন ৭/৮, আমাদের বাড়িতে প্রথমবার বেড়াতে আসেন মণি কাকু, বাবার কাজের সুবাদে বন্ধু, বাংলাদেশের মানুষ| নুরুদ্দিন আহ্মেদ মণি; প্রথম সন্ধ্যেয় আমাদের খাবার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে তিনি হালকা ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করেন, খাবার ঘরে "বিধর্মী" কারু আসা নিয়ে মা-বাবার কোন অসুবিধে আছে কিনা। মা-কে অমন হা হা করে হেসে উঠতে দেখার অভ্যেস আমার ছিলোই, যদি-ও কাকু একটু অবাক-ই হয়েছিলেন। আর আমি বুঝে গেছিলাম মা পুজো দেন বটে, কিন্তু যাঁরা পুজো দেন না, তাঁদের নিয়ে মায়ের কোন-ই রাগ—দ্বেষ নেই। সেই ছোট থেকে তাই এটাকেই স্বাভাবিক বলে জেনে এসেছি।

বাবা আর আলম কাকুকে অবশ্যি বছরে এক বার আমি নিয়ম করে ঝগড়া করতে দেখেছি। বাবার অফিসের স্পোর্টস কম্পিটিশনের দিনে। দু'জনের একটা করে পা একসাথে বেঁধে যে "থ্রী লেগড রেস" হত, প্রতিবার দু'জনের জুটি তাতে থার্ড হতো এবং একে অপরকে দোষারোপ, ফার্স্ট না হতে পারায়। কিন্তু বছরের পর বছর তাঁদের অন্য কোন পার্টনার বেছে নিয়ে হাহুতাশ কম করার চেষ্টা করতে-ও দেখিনি।

"ছোটদের রামায়ণ" র‍‍্যাপিড রীডিং ক্লাশে ডি.জি স্যার এলে, বই-এর মলাটে ভারী সুন্দর করে ছবি এঁকে দিতেন রামায়ণের-ই কোন ঘটনার। ইলিয়ড, ওডিসি –র সাথে মহাকাব্য হিসেবে রামায়ণ-মহাভারতের নাম শিখেছি, পড়েছি বটে কিন্তু রামনবমী কাকে বলে জানার প্রয়োজন পড়েনি। পূর্ব ভারতের সংস্কৃতিতে রাম প্রায় নেই বললেই চলে।

হঠাৎ এই মধ্য তিরিশে এসে শুনলাম আমার শহরে নাকি রামনবমী হবে; বাসন্তীপুজোর মেলা টেলা নয়, একেবারে ক্ষাত্র্য ধর্ম মেনে তলোয়ার নিয়ে আরএসএসের শোভাযাত্রা। অস্ত্রের শোভা যে আসলে চিৎকৃত হুমকি, ক্ষমতার প্রদর্শন সে'কথা আলাদা করে বলার দরকার পড়েনা। আর এই মুহূর্তে গোটা দেশে যেভাবে একচ্ছত্র ভাবে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানী সংস্কার চারিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে তাতে এই উদ্যোগের অন্তর্নিহিত অর্থ নিয়ে-ও কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। এ' নিতান্তই ক্ষমতার প্রদর্শন; প্ররোচনার ফাঁদ।

গর্ব করে এতদিন বলে এসেছি যে দাঙ্গা দেখিনি আমি, কারণ সম্প্রীতি দেখেছি; সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য প্রশাসনের উদ্যোগ দেখেছি। তার জন্য তোষণ লাগেনি, তার জন্য উস্কানি লাগেনি। কিন্তু সে অহঙ্কার আজ আর রাখা যাবে কিনা কে জানে। ব্যবস্থা আমাদের নিতে হবে। তৃণমূল সরকার যে কোন-ই বন্দোবস্ত নেবে না তা স্থির নিশ্চিত। তার প্রমাণ হলো মুকুল রায়ের ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে এই পুরো ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়া। দায় আমার-আপনার। কারণ দাঙ্গা হলে ক্ষতি আমার-আপনার; তৈরী থাকুন; প্ররোচনাকে আটকে দিয়ে, প্রতিহত করে। বাংলার উৎসব জুড়ে গান-ব্রতকথা-বাউল-আজান-মেলা থাক, তলোয়ার নয়; জহ্লাদের উল্লাসমঞ্চ হওয়া থেকে বাংলাকে আটকানোর ভার নিতেই হবে…